Home স্বাস্থ্য কথা বধিরতা লজ্জাকর অবস্থা

বধিরতা লজ্জাকর অবস্থা

মাহমুদ হাসান..

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বিভিন্ন মাত্রায় বধিরতায় আক্রান্ত, যদিও এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০৫ সালে বিশ্বের ২৭৮ মিলিয়ন লোক বিভিন্ন মাত্রায় শ্রুতিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত, যাদের মধ্যে ৬২ মিলিয়ন শিশুকালে আক্রান্ত হয়েছেন। মোট আক্রান্তের দুই-তৃতীয়াংশ উন্নয়নশীল দেশের। এর থেকে বাংলাদেশের একটি চিত্র পাওয়া যায়।
কানে শোনার একক ডেসিবল। যদি কোনো শিশু ৯০ ডেসিবল বা তার বেশি শ্রবণশক্তি হারিয়ে থাকে তাহলে সে কিছুই শুনতে পারে না; ফলে কথা বলা বা ভাষা কোনোটাই শিখতে পারে না। মাঝারি মাত্রায় শ্রবণশক্তি হারালেও যথাসময়ে কথা বলতে ও ভাষা শিখতে পারে না। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর একটি শিশুর কথা বলা, ভাষা শেখা, মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য শ্রুতিজনিত সমস্যা দ্রুত নির্ণয় এবং এর সমাধান খুবই জরুরি।
শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ
একটি শিশু বিভিন্ন সময়ে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। জন্মের আগে (গর্ভাবস্থায়), জন্মের সময় অথবা জন্মের পর।
গর্ভাবস্থায় শ্রবণশক্তি হারানোর কারণগুলো হলো
১.    জেনেটিক ত্রুটির কারণে অন্তঃকর্ণের বিভিন্ন অংশ তৈরিই হয় না, যা শ্রবণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২.    গর্ভাবস্থায় মা বিভিন্ন ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল রোগে যেমন টক্সোপ্লাজমোসিস, রুবেলা, সাইটোমেগালো ভাইরাস, হারপিস ও সিফিলিসে আক্রান্ত হলে।
৩.    গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন ওষুধ যেমন স্টেপটোমাইসিন, জেনটামাইসিন, টোবরামাইসিন, কুইনিন, ক্লোরোকুইন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে।
৪.    পুষ্টিহীনতা, থাইরয়েডজনিত সমস্যার কারণে।
জন্মের সময় শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ
১.    জন্মের সময় নবজাতকের অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে।
২.    নির্ধারিত সমযের আগে অথবা কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে।
৩.    জন্মগ্রহণের সময় নবজাতক কোনো কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হলে।
৪.    নবজাতক বেশি মাত্রায় জন্ডিসে আক্রান্ত হলে।
৫.    মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হলে।
জন্মপরবর্তী সময় শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ
১.    জেনেটিক ত্রুটির কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম হওয়ার পর এমনকি বড় হলেও শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।
২.    বিভিন্ন জীবাণুবাহী রোগ যেমন মিজেলস, মামস, বেরিসেলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হলে।
৩.    মধ্যকর্ণের প্রদাহ- কানপাকা রোগ।
৪.    কোনো কারণে কান আঘাতপ্রাপ্ত হলে অথবা কানের অপারেশনের পর জটিলতার কারণে।
৫.    উচ্চ শব্দের কারণে।
৬.    কানের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন ওষুধ সেবনে।
যদি শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ নির্ণয়ে দেরি হয় এবং যথাসময়ে চিকিৎসা করা না হয় তাহলে শিশুর কথা বলার ক্ষমতা, জানার ক্ষমতা, ভাষার দক্ষতা ও মানসিক বিকাশের ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে স্কুলে বা বন্ধুমহলে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব পেয়ে বসে। সে জন্য জন্মের পরপরই শ্রুতিজনিত ত্রুটি নির্ণয় এবং এর প্রতিকার ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের জন্মের পর শোনার ক্ষমতা নির্ণয় করার জন্য প্রত্যেক শিশুকেই প্রাথমিকভাবে কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা উচিত। তা ছাড়া যেসব শিশুর শ্রুতিসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে তাদের অবশ্যই বিশদভাবে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। যেসব শিশু জন্ম থেকে শ্রবণ সমস্যায় ভোগে, তাদের কথা শেখার আগেই অর্থাৎ জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই তা নির্ণয করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারলে এরা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতোই বেড়ে উঠবে। এড়ানো যাবে অনেক জটিলতা। সুতরাং দ্রুত শ্রুতিত্রুটি নির্ণয়ের জন্য প্রথমে শিশুর গর্ভাবস্থায়, জন্ম ও জন্মপরবর্তী সময়ের বিভিন্ন বিষয়ের পুরো ইতিহাস, শিশুর পরিবারের অন্যান্য সদস্য সম্পর্কে জানা ও শিশুকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি।
অনেক সময় মা-বাবা অভিযোগ করে থাকেন যে ঘরে অনেক জোরে শব্দ হলেও শিশুর ঘুম ভাঙে না। শিশুর বয়স এক থেকে দুই বছর হওয়া সত্ত্বেও কথা শিখছে না অথবা স্কুলে ভালো করছে না। এদের দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো শ্রুতি জটিলতা আছে কি না তা নির্ণয় করা উচিত।
চিকিৎসা
শ্রবণ ক্ষমতা কী পরিমাণে কমে গেছে, কী ধরনের শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, কখন থেকেÑ ভাষা শেখার আগে না পরে তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়।
চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো : ক. কথা বলা ও ভাষা শেখানো, খ. সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং গ. প্রয়োজনীয় চাকরি পেতে সহায়তা করা।
১.    সর্বপ্রথম প্রয়োজন মা-বাবাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, বধিরতা সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা ও মানসিক সাহায্য করা। কোন মা-বাবাই এটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না যখন জানতে পারেন তাদের আদরের সন্তান জন্মবধিরতায় ভুগছে। তারা খুবই হতাশায় ভোগেন, এমনকি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তোমরা কোনো ভাইবোনও তোমাদের আদরের ভাইবোনের এ অবস্থা সহজে মেনে নিতে পারো না।
২.    অনেক শিশুর সামান্য যেটুকু শ্রবণক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে তা কাজে লাগানো যায় কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। এটা ঠোঁটের নড়াচড়ার মাধ্যমে শিখতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। আজকাল উন্নতমানের কানে শোনার যন্ত্র পাওয়া যায়, তবে এ যন্ত্র ব্যবহারে অনেকের মধ্যে কুসংস্কার, লজ্জা কাজ করে। এটিকে চশমার মতোই গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া এমন উন্নতমানের কানে শোনার যন্ত্র পাওয়া যায়, যা বাইরে দেখা যায় না, যা চশমার পরিবর্তে কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের মতো।
৩.    যাদের শ্রবণক্ষমতা নেই বললেই চলে, অর্থাৎ ককলিয়া কাজ করছে না তাদের জন্য ককলিয়ায় ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করা হয়।
৪.    তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে অথবা হাতের বিভিন্ন রকম নড়াচড়ার মাধ্যমেও শেখানো যায়, ভাব প্রকাশে সহযোগিতা করা যায়।

বন্ধুরা, তোমরা কিন্তু এখন থেকেই সতর্ক হতে পারো। তোমার ভাই বা বোনের মাঝে এরকমটি পরিলক্ষিত হলে উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলো অবলম্বন করতে পারো। তোমাদের বাবা-মাকেও বিষয়গুলো অবহিত করতে পারো।

SHARE

Leave a Reply