Home গল্প নতুন ব্যাট

নতুন ব্যাট

মুনতাসীর মারুফ..

বলটা উইকেটে লাগার সাথে সাথে রুবনের চোখ-মুখ কালো হয়ে যায়। ব্যাটটা বগলদাবা করে বলটা কুড়িয়ে ও রওনা দেয় মাঠের বাইরে। উইকেট পেয়ে আমি বা আমার দলের কেউই উল্লাস প্রকাশ করি না। আমি আর আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করা মিশু দৌড়ে যাই ওকে থামাতে। অন্যরাও ছুটে আসতে থাকে।
মিশু বলে- ‘কই যাস, কই যাস, আমি কি তোকে আউট দিয়েছি?’
আমি অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। দোষটা তো আমারই – যেহেতু আমিই বোলার।
উইকেটকিপার হাবিব হতাশ ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কি রে ভাই, দেইখ্যা-শুইন্যা বল করতে পারিস না?’
আমি মিন মিন করি, ‘আমি তো ঠিকমতোই বল করেছিলাম, অতটা ঘুরবে আমি কি জানতাম?’
রুবন অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। শেষে সমাধান দেয় আম্পায়ার মিশুই, ‘আচ্ছা আচ্ছা, এইটা নো বল কল করলাম। রুবন ক্রিজে যা।’
সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। নয়তো আজকে পুরো খেলাটাই মাটি হতো।
ক’দিন আগেও ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। প্রতিদিন বিকেলে আমরা ক্রিকেট খেলি প্রায় ১২ থেকে ১৬ জন। জোড় সংখ্যা হলে দুই ভাগে দল করতে সুবিধা। কিন্তু বেজোড় সংখ্যায় হলে মানে কোনদিন ১৩ বা ১৫ জন হয়ে গেলে এক দলে একজন খেলোয়াড় বেশি হয়ে যায়। বিনা বাক্য ব্যয়ে দুই পক্ষের নিরাসক্ত সম্মতিতে আমরা রুবনকেই সেই বাড়তি খেলোয়াড় হিসেবে নিতাম বা দিয়ে দিতাম। কারণ, ওর অন্তর্ভুক্তি বা না-থাকা দলের শক্তির তারতম্যে কোনো প্রভাবই ফেলে না। হাত ঘুরিয়ে বল করতে পারে না বলে রুবনকে বোলিং করতে দেয়া হতো না। ব্যাট করতে দেয়া হতো একদম শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। ওকে অন্য পাশে রেখে হয়তো ব্যাটসম্যান কিছু রান যোগ করতে পারতো। কিন্তু রুবন কোনদিন দুই রানের বেশি করে ফেললেই ব্যাপারটা হতো বিস্ময়কর। আর ওকে ফিল্ডিংয়ে রাখা হতো এমন জায়গায় যেখানে সাধারণত ব্যাটসম্যানরা বল পাঠায় না। দুই-একবার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাকে ফিল্ডিং করতে দেয়া হয়েছিল। আমাদের পাড়ার ক্রীড়া ইতিহাসে ফিল্ডার হিসেবে রুবনের ক্যাচ ধরার কোনো নজির নেই।
কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে পুরো চিত্রটি একদম পাল্টে গেছে। রুবন এখন দলের অন্যতম সম্পদ। বল করতে সে নিজ থেকেই চায় না তেমন। আমরাই মাঝে মধ্যে সাধাসাধি করি। অথবা সে মর্জি হলে এক-দু ওভার করে। তবে ফিল্ডিংয়ে সে নিজ থেকেই একটু নিরাপদ জায়গায় দাঁড়ায়। অথবা অনেক সময় ফিল্ডিং করেই না। এটা নিয়েও ওকে সাধারণত কিছু বলা হয় না। অথবা বললেও সে যে ফিল্ডার হিসেবে দলের কত বড় সম্পদ, তা তাকে সবিস্তারে বুঝিয়ে অনুরোধ করা হয় মাত্র। ব্যাটিংয়ে নামে ওর ইচ্ছানুযায়ী। এবং অধিকাংশ সময়ই তা ওপেনিংয়ে। মাঝে-মধ্যে দয়া হলে অন্য কাউকে ওপেন করার সুযোগ দিয়ে সে তিন নম্বরেও খেলতে নামে। ওর ব্যাটিংয়ের সময় প্রতিপক্ষের বোলারদের তটস্থ থাকতে হয়। ফাস্ট বোলারদের বলের গতি কমে চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসে, কোনো সুইং করে না বল, উইকেট সোজাও যায় না। স্পিনারদের বল টার্ন করে না একদম। রুবন পেটানোর পর বল আকাশে উঠে গেলেও ফিল্ডারদের গতি মন্থরই থাকে। তবে রুবন অতটা ‘অবিবেচক’ না। দশ ওভারের খেলায় পাঁচ-ছয় ওভার পর আউট হয়ে গেলে সে তেমন মাইন্ড করে না। কিন্তু বোলারের ভুলে প্রথম দু-এক ওভারে কখনো আউট হয়ে গেলেই সর্বনাশ। পুরো খেলাই আমাদের পণ্ড।
এই নাটকীয় পরিবর্তনের কারণ রুবনের মামা। আগে আমাদের ব্যাট ছিল কাঠ দিয়ে নিজস্ব হস্তশিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত। চাঁদা দিয়ে কেনা হতো টেনিস বল। তার ওপর লাল টেপ পেঁচিয়ে বানানো হতো টেপ-টেনিস বল। বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে অনেক সময় টেনিস বলটা ফেটে গেলে এর ভেতর খড়, কাপড় ইত্যাদি ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে কাজ চালানো হতো। স্ট্যাম্পের কাজ করে বাঁশের কঞ্চি। সপ্তাহ দুয়েক আগে ঢাকা থেকে রুবনের মামা রুবনের প্রাইমারি স্কুলের বৈতরণী পার হওয়া উপলক্ষে তাকে উপহার পাঠিয়েছেন একটা ব্যাট। ও রকম ব্যাট আমরা কেবল টিভিতেই দেখেছি, একবার সদর স্টেডিয়ামে আন্তঃজেলা কলেজ টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের খেলতে দেখেছি ওরকম ব্যাট দিয়ে- কখনো ও রকম ব্যাটে হাত লাগানোর সৌভাগ্য হয়নি। সঙ্গে গোটা পাঁচেক টেনিস বলও পাঠিয়েছেন তিনি।
এর পরই রাতারাতি রুবনের ক্রিকেটীয় ও সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন হলো। আগামী কয়েক মাসের বলের জোগান রুবনই দেবেÑ এমন আশ্বাস পাওয়া গেল। ব্যাটটা দিয়ে রুবন অন্য কাউকে খেলতে দিলো না। তবে, ওরকম একটা ব্যাট হাতে নিতে পারা এবং খেলার আগে-পরে মাঝে-মধ্যে শ্যাডো করার সুযোগ পাওয়াটাই আমাদের কাছে চরম সৌভাগ্য মনে হলো। এমন আশ্বাসও পাওয়া গেল, কিছুদিনের মধ্যেই কেউ কেউ ওই ব্যাট হাতে বল পেটানোর মতো সৌভাগ্যের অধিকারী হবে। এতেই খেলোয়াড় সমিতিতে বিভক্তি দেখা দিলো। কয়েকজন ওই ব্যাট হাতে খেলার সুযোগ পাওয়ার আশায় রুবনকে খেলার মাঠের কর্তৃত্ব ও অবারিত অধিকার দিয়ে দিলো। বিরোধী গ্র“পের খেলোয়াড়দের ভাষায় যা নির্লজ্জ দালালি আর চামচামি। খেলার নৈতিকতা আর বিশুদ্ধতা রক্ষায় আগ্রহী কয়েকজন রুবনের স্বেচ্ছাচারিতায় আহত ও ক্ষুব্ধ হলেও রুবন-গ্র“প দলে ভারী হওয়ায় এবং আমাদের মনেও ব্যাটটা হাতে নেয়ার কিঞ্চিত লোভ থাকায় মুখ বুজে এই অত্যাচার সয়ে নিলাম।
তো, এমনি করেই চলে আমাদের প্রতিদিনের ক্রিকেট খেলা। রুবন তার নতুন ব্যাটে খেলে আর আমরা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার স্বপ্ন দু’ চোখে এঁকে পড়ে থাকি ‘কাষ্ঠযুগে’ই। ষষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাস এখনও পুরোদমে শুরু হয়নি বলে আমাদের অফুরন্ত সময়। মাঝে মধ্যে এখন ১৫ ওভারের খেলাও খেলে ফেলি।
এরই মধ্যে একদিন গুঞ্জন শুনি, সবাই বলে, এ পাড়ায় নাকি এক নতুন ছেলে এসেছে।
আমাদের খেলোয়াড় সমিতির সবচেয়ে তুখোড় ব্যাটসম্যান রিজভীর বাড়ির পাশে চৌধুরী বাড়ি। জানা গেল, ছেলেটি চৌধুরী সাহেবের নাতি। প্রায় সাত-আট বছর পর এসেছে গ্রামে। এবার ক্লাস ফাইভে উঠেছে। ছুটিতে বাবা-মাসহ এসেছে বেড়াতে। একদিন রিজভী জানায়, সেই ছেলেটি আজ আসছে আমাদের খেলা দেখতে। রনি বিকেলে নিয়ে আসবে তাকে।
আমাদের মধ্যে উত্তেজনার ঢেউ খেলে যায়। সবাই সাধারণত খেলার সময় ময়লা বা ছেঁড়া কোনো কাপড় পরে আসি, যাতে খেলার সময় কাপড় নোংরা হওয়ার চিন্তা করতে না হয়। কিন্তু আজকের কথা ভিন্ন। সবাই সবচেয়ে সুন্দর টি-শার্টটা পরে খেলতে এসেছে আজ। ছেলেটির আগমন সংবাদেই হোক অথবা অন্য কোন কারণে, আজকে হাজির খেলোয়াড় সমিতির ১৬ জনই। ৮ জন করে দল ভাগ হয়। অন্যান্য দিন টস করে ব্যাটিং-বোলিং বাছাই করা হলেও আজকে তা হয় না। রুবন বলে দেয়, ওর দল ব্যাটিং করবে। তাই আমাদেরও তা মেনে নিতে হয়।
ব্যাটিং শুরু করে রুবনই। আমি ওর বিপক্ষ দলের ক্যাপ্টেন। ওর চামচারা এসে আস্তে করে বলে যায়Ñ আজকে ভুলেও কোনো গড়বড় হলে যার কারণে হবে হয় সে চিরতরে খেলার মাঠ থেকে বহি®কৃত হবে অথবা নতুন ব্যাটটা আর কারো হাতে নেয়া হবে না কখনো।
আমি লাল-টেপ দিয়ে প্যাঁচানো টেনিস বলটা আমার দলের ফার্স্ট বোলার সঞ্জয়ের হাতে দিয়ে শুকনো মুখে সে কথা জানিয়ে দিই। বলি, ‘রুবনকে পেটানোর বল দিস। বেশি জোরে করিস না। নাহলে কিন্তু ও রাগ করবে। আর আজকে রাগ করলে কিন্তু খবরই আছে।’
সঞ্জয় আস্তে করে মাথা কাত করে। আমি ফিল্ডারদের জায়গামতো দাঁড় করাই। আর গ্রামেরই আরও কয়েকটা ছোট ছেলেমেয়ে মাঠের পাশের গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকে খেলা দেখার জন্য।
রুবন পজিশন নেয়। ব্যাট ধরার অঙ্গভঙ্গি একদম টিভিতে দেখা বিদেশী ক্রিকেট খেলোয়াড়দের মতো। একবার তাকিয়ে নেয় গাছতলার দিকে। মুচকি হাসিও দেয়।
সঞ্জয় দৌড় শুরু করে। রুবন তৈরি হয় জোরে পেটানোর জন্য। প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ছেলেটিকে মুগ্ধ করে দেয়াই ওর উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে। ব্যাট ধরার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে, বল যেভাবেই আসুক, সে ওটা গাছতলার দিকেই পাঠাতে চেষ্টা করবে।
কিন্তু সে চেষ্টা করার সুযোগ রুবন পায় না। আমাদের দেখা সঞ্জয়ের সম্ভবত সবচেয়ে দ্রুতগতির বল এটাই। ইয়র্কার। এবং রুবন ব্যাট নড়ানোর আগেই মাঝখানের স্ট্যাম্পে বলের আঘাত। স্ট্যাম্পটা উপড়ে পড়ে যায় কয়েক হাত দূরে।
ছেলেদের হাততালি আর উল্লাসের ধ্বনি শোনা যায়। আমরা সবাই হতভম্ব। রুবনের চেহারা হলো দেখার মতো। রাগে চোখ দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। একই সাথে ঐ চেহারায় লজ্জা আর হতাশা মিলেমিশে একাকার। আমরাও কী করবো বুঝে উঠতে পারি না। রুবনের দলের খেলোয়াড়-কাম-আপাতত আম্পায়ার সাইফুলও কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। এখন ‘নো বল’ ডেকেই বা কী হবে। ইজ্জতের যে ফালুদা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।
রাগে যেন হিতাহিত জ্ঞান হারায় রুবন। বলটা কুড়িয়ে হাতে নিয়ে ব্যাটটা বগলদাবা করে কারও দিকে না তাকিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।
আমরা গিয়ে ঘিরে ধরি সঞ্জয়কে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিরীহ ও নির্বিরোধী টাইপের ছেলেটি, সঞ্জয় আমাদের এতবড় সর্বনাশ ডেকে আনলো। কী ব্যাপার? এমন করলি কেন? এখন রুবনকে মানাবে কে? জীবনে আর ঐ ব্যাট হাতে নেয়া হবে? বলের জন্য ক’দিন আবার খেলা বন্ধ থাকবে, কে জানে! ক্ষোভ আর হতাশায় আমরা মুখর।
সঞ্জয় মুচকি হাসে। আমাদের প্রশ্ন আর ভর্ৎসনার তুবড়ির মাঝে সে হাত তুলে দেখায় গাছতলার দিকে। গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে দর্শক ছেলেরো। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি ওদের ছাড়িয়ে আরও একটু দূরে চলে যায়। সেখানে দৃষ্টিপথে দেখা যায় সঞ্জয়ের ছোট ভাই রাজুকে। ওর এক হাতে ঠিক রুবনের ব্যাটের মতো একটা ব্যাট। আরেক হাতে লাল টেপ মোড়ানো একটা বল।
বিস্ময়ভরা দৃষ্টি ঘুরিয়ে আমরা তাকাই সঞ্জয়ের দিকে। সঞ্জয় লাজুক গলায় বলে, ‘কাল রাতে আমার ছোট কাকু এসেছেন ঢাকা থেকে। তিনিও আমার জন্য উপহার নিয়ে এসেছেন একটা ব্যাট আর কয়েকটা বল। ভাবছিলাম, দু-একদিন পর ওগুলো নিয়ে আসবো। কিন্তু আজকেই মওকাটা যখন পাওয়া গেল, ভাবলাম, কাজে লাগাই। এটা শুধু আমার একার ব্যাট না, একার বল না- এগুলো আমাদের সবার। আমরা সবাই আজ থেকেই এই ব্যাট দিয়ে খেলতে পারব। কারো দয়ার আশায় বসে থাকতে হবে না।’
নিজেদের একটা ব্যাট! আজ থেকেই সবাই এই ব্যাটে খেলবো! নতুন ব্যাটে! উল্লাসে হুল্লোড় করে উঠি সবাই।

SHARE

Leave a Reply