Home স্মরণ ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা

ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান..

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ফররুখ আহমদ। তিনি একাধারে গীতি-কবিতা, সনেট, মহাকাব্য, ব্যঙ্গ-কবিতা, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য ও শিশু-কিশোর কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্য-কবিতার তুলনায় শিশু-কিশোর ছড়া-কবিতার ওপর খুব কম আলোচনা হয়েছে। অথচ তাঁর রচিত শিশু-কিশোর কাব্যের সংখ্যা মোট ২১টি। এছাড়া, তিনি স্কুল-পাঠ্য হিসেবে চারটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এতগুলো শিশু-কিশোর গ্রন্থের রচয়িতা হলেও তাঁর জীবনকালে মাত্র ৪টি শিশু-কিশোর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বাকিগুলো পাণ্ডুলিপি আকারে পাওয়া যায়। তাঁর জীবনকালে যে চারটি শিশু-কিশোর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, তা নিম্নরূপ :
এক.    পাখীর বাসা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৫। প্রকাশক : বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা : কাজী আবুল কাসেম।
দুই.    হরফের ছড়া। প্রথম প্রকাশ : মার্চ ১৯৬৮। প্রকাশক : বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা : এ, মুকতাদির। মুদ্রক : পাইওনিয়ার প্রেস, ঢাকা। দাম : এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা। পৃষ্ঠা : ২৬
তিন.    নতুন লেখা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৯। প্রকাশক : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা।
চার.    ছড়ার আসর (১)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭০। প্রকাশক : বাংলা একাডেমী।
কবির ইন্তেকালের পর নিন্মোক্ত তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় :
পাঁচ.    চিড়িয়াখানা। প্রথম প্রকাশ : ১০ জুন ১৯৮০। প্রকাশক : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী। মুদ্রক : ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স লি:, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা : সবিহ্-উল-আলম। মূল্য : পনেরো টাকা।
ছয়.    ফুলের জলসা। প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ১৯৮৫। প্রকাশক : বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ঢাকা। ছবি : শওকতুজ্জামান। দাম : আট টাকা। পৃষ্ঠা : ২৪।
সাত.    কিস্সা কাহিনী। প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫। প্রকাশক : ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
কবির ইন্তেকালের পর যেসব শিশু-কিশোর গ্রন্থ পান্ডুলিপি আকারে পাওয়া গেছে, তার তালিকা নিন্মরূপ :
ছড়ার আসর (২), ছড়ার আসর (৩), সাঁঝ সকালের কিস্সা, আলোকলতা, খুশীর ছড়া, মজার ছড়া, পাখীর ছড়া, রং মশাল, জোড় হরফের ছড়া, পড়ার শুধু, পোকামাকড়, ফুলের ছড়া, দাদুর কিস্সা, সাঁঝ সকালের কিস্সা।
উপরোক্ত তালিকা থেকে দেখা যায়, কবির শিশু-কিশোর গ্রন্থের মোট সংখ্যা ২১টি। তার মধ্যে ৪টি তাঁর জীবনকালে এবং ৩টি তাঁর ইন্তেকালের পর প্রকাশিত হয়। বাকি ১৪টি গ্রন্থই অপ্রকাশিত রয়েছে। তাঁর রচিত শিশু-কিশোর গ্রন্থ সবগুলো প্রকাশিত হলে বাংলা শিশু-সাহিত্য শাখা যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি এক্ষেত্রে ফররুখ আহমদের অসামান্য অবদান সম্পর্কেও যথাযথ মূল্যায়ন করা সহজ হবে। আর তাহলে বাংলা শিশু-সহিত্যে ফররুখ আহমদের অবদান বিশেষভাবে মূল্যায়িত হবে।
কবি ‘নয়া জামাত’ নামে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন পাঠ্য বই হিসাবে। এসব গ্রন্থ ঐ সময় স্কুলপাঠ্য হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফলে একাধিক বার এর মুদ্রণ হয়। এগুলো হলো :
নয়া জামাত (প্রথম ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ : ডিসেম্বর ১৯৫০। তৃতীয় মুদ্রণ : ফেব্র“য়ারি ১৯৫১। প্রকাশক : মুখ্দুমী এ্যান্ড আহসানউল্লাহ লাইব্রেরী, বাবুবাজার, ঢাকা। মুদ্রক : শ্রীনাথ প্রেস, ঢাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী : কামরুল হাসান। মূল্য : এক টাকা চার আনা। পৃষ্ঠা : ৮৪। ইস্ট বেঙ্গল টেক্সট কমিটি কর্তৃক পঞ্চম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত, ঢাকা গেজেট ১৮-১-৫১। চতুর্থ মুদ্রণ : নভেম্বর ১৯৭৮। সংকলক : মাসুদ আলী। প্রকাশক : আধুনিক প্রকাশনী, ১৩/৩ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১। মুদ্রক : পয়গাম প্রেস, ৯ গোপীকিষণ লেন, ঢাকা-৩। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা : আব্দুর রউফ সরকার। মূল্য : সুলভ ছয় টাকা, শোভন সাত টাকা, পৃষ্ঠা : ৬৪।
নয়া জামাত (দ্বিতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ : জানুয়ারি ১৯৫১। প্রকাশক : ঐ। প্রচ্ছদ শিল্পী : ঐ। মূল্য : এক টাকা ছয় আনা। পৃষ্ঠা : ৭২ + ২৬। টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
নয়া জামাত (তৃতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা : ৮৬ + ৩৭। সপ্তম শ্রেণীর জন্য লিখিত বাংলা সাহিত্য। প্রকাশক : ঐ। প্রচ্ছদ শিল্পী : ঐ।
নয়া জামাত (চতুর্থ ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ : ডিসেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা : ৯৬+৬৪। প্রকাশক : ঐ। প্রচ্ছদ শিল্পী : ঐ। টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক অষ্টম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
উপরোক্ত ৪টি পাঠ্যপুস্তুকসহ ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোরদের উপযোগী গ্রন্থের সংখ্যা মোট ২৫টি। শুধু কলেবরের দিক থেকে বিচার করলেও, এর সংখ্যা বিপুল বলা চলে। কিন্তু কলেবরের চেয়েও মূল্যায়নের জন্য যা অধিক গুরুত্বপূর্ণ তাহলো গুণগত মান। গুণগত মানের দিক থেকে ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা অসাধারণ। শিশু-মনস্তত্ত্ব বিচারে এবং শিশুদের উপযোগী ভাব-ভাষা ও ছন্দ ব্যবহারে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। তাঁর প্রথম রচিত শিশু-কিশোর গ্রন্থের নাম ‘পাখীর বাসা’। এটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের নিকট বিপুলভাবে সমাদৃত হয় এবং এজন্য কবি ১৯৬৬ সনে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) আধুনিক বাংলা শিশু সাহিত্যে বেশ জনপ্রিয়তার অধিকারী। তারপর সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) বাংলা শিশু সাহিত্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর রচিত শিশুতোষ কাব্যের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলোÑ আবোল-তাবোল, হ-য-ব-র-ল, খাইখাই, অবাক জলপান, শব্দকল্পদ্রুম, ঝালাপালা ইত্যাদি। এরপর বাংলা শিশু-সাহিত্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তার অধিকারী হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। শিশুতোষ কবিতা রচনায় তিনি এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসেন। এছাড়া, শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে যাঁরা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন : কবি গোলাম মোস্তফা (তাঁর রচিত শিশুতোষ কাব্য- ‘আমরা নতুন আমরা কুড়ি’), জসীমউদ্দীন (‘হাসু’, ‘এক পয়সার বাঁশী’, ‘ডালিম কুমার’), আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান (‘কখনো আকাশ’), হাবীবুর রহমান, সানাউল হক, আতোয়ার রহমান, আবদুর রশীদ খান, আশরাফ সিদ্দিকী, সানাউল্লাহ নূরী, শামসুর রাহমান, জাহানারা আরজু, সুকুমার বড়–য়া প্রমুখ সার্থক শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, আল মাহমুদ, দিলওয়ার, আল কামাল আবদুল ওহাব, বেলাল চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হুদা, এখলাসউদ্দিন আহমদ, আল মুজাহিদী, আবদুল হালীম খাঁ, ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ, মসউদ-উশ-শহীদ, সাজজাদ হোসাইন খান, মাহবুবুল হক, আলী ইমাম, দিলারা মিসবাহ, আবিদ আজাদ, জাহাঙ্গীর হাবীবউল্লাহ, শাহাবুদ্দীন নাগরী, মতিউর রহমান মল্লিক, হাসান আলীম, আসাদ বিন হাফিজ, গোলাম মোহাম্মদ, তমিজ উদ্দীন লোদী, লুৎফর রহমান রিটন, মহিউদ্দিন আকবর, জাকির আবু জাফর, মানসুর মুজাম্মিল, আহমদ বাসির প্রমুখ নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিক শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনায় অবদান রেখেছেন। এভাবে বাংলা সাহিত্যের এ বিভাগটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনায় কবি ফররুখ আহমদের অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কলেবরের দিক থেকে যেমন তেমনি গুণগত বিচারেও শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায় ও নজরুল ইসলামের পাশাপাশি ফররুখ আহমদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোর কবিতার ভাষা, ছন্দ, ভাব, বিষয় ও শিশু-মনস্তত্ত্বের বিচারে তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ শিশু-সাহিত্যিক। তাঁর রচিত বিভিন্ন শিশু-কিশোর কাব্যের সূচির দিকে লক্ষ্য করলেই কবিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সহজ হবে।
‘পাখীর বাসা’ গ্রন্থে মোট ৪১টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- পাখীর বাসা, ঘুঘুর বাসা, বকের বাসা, প্যাঁচার বাসা, মজার ব্যাপার, মজার কোরাস, মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকড়া, নরম গরম আলাপ, বাদুরের কীর্তি, দাদুর কিস্সা, বিশেষ অনুরোধে, পাখপাখালী, টুনটুনী, কাঠঠোকরা, কুটুম পাখী, টিয়ে পাখী, ফিঙে পাখী, ঝড়ের গান, বৃষ্টির গান, বর্ষা শেষের গান, শরতের গান, বৃষ্টির গান, ফাল্গুনের গান, চৈত্রের গান, শাহজাদী, শাহজাদা, সিতারা, শাহীন, রংমহল, সাম্পান, জঙ্গীপীর, তিতুমীর, মহান নেতা, ঈমান একতা, শৃঙ্খলা, আজাদ পাকিস্তান, আমাদের সবুজ নিশান, আমরা গড়বো পাকিস্তান, আশা উঁচু রাখ্, তোরা চাস্নে কিছু, তোরা চলরে ছুটে।
‘নতুন লেখা’ কাব্যে কবির মোট ৬৮টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- মেঘের ছড়া, বৃষ্টির ছড়া, পয়লা আষাঢ়, বর্ষার গান, চিতল বোয়াল, ইলশেগুড়ি, ইলিশ, রুই-কাতলা, শ্রাবণের বৃষ্টি, শরতের সকাল, হৈমন্তী সুরে, পউষের কথা, সৌখিন পাখী, শ্রমিক পাখী, শীতের পাখী, পাখীর ঝাঁক, মেঘের শীতে, ফাল্গুনে, চৈত্রের কবিতা, রং-তামাসা, সবাই রাজা, দাদুর কথা, সহিস ও মহিষ, ফেলুর ছড়া, হোঁদুল কুৎকুৎ, হাসি, কান্না, উদো-বুধোর ঝগড়া, পালোয়ানী কিস্সা, ঘোড়া, হাতি, মাছি, মশা, ছাগল, ষাঁড়, গণ্ডার, বন্ধু নির্বাচন, ছুঁচো, বাঘের মাসী, লালু মিঞার দুঃখ, চোপড়ের কথা, সাজ পোষাক, টাকার বান্দা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা, রাক্ষস খোক্ষস, সবুজ নিশান, সবুজের স্বপ্ন, ঈদের কবিতা, পাক ওয়াতান, অশেষ আজান, মুজাহিদের গান, কচি-কিশোর, পথের গান, শাহীনের গান, কিস্সা শোনার সন্ধ্যা, দুষ্টু জিনের কিস্সা, সিন্দাবাদ ও বুড়োর কিস্সা, নৌফেল ও বাদশা হাতেম তা’য়ীর কিস্সা, রাসূলে খোদা, মক্কা শহর আঁধার যুগে, মায়ের কোলে নূরনবী, শৈশবে নূরনবী, আল-আমীন, সত্যের সন্ধানী, সত্যাসত্য, শিশুদের নবী, মদীনায় নূরনবী, শেষ কথা।
‘চিড়িয়াখানা’ গ্রন্থে মোট ৩২টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- চিড়িয়াখানা, কাঠবিড়ালি, বিড়াল, শিয়াল, বেজী, বানর, হরিণ, ঘোড়া, জেব্রা-জিরাফ, চিতা, বাঘ, ভল্লুক, অজগর, উট, বাইসন, বুনোহাতী, গণ্ডার, সিংহ, আজর প্রাণী, উটপাখী, আলবাট্টস, ঈগল, শ্রমিক পাখী, সৌখিন পাখী, সারস পাখী, ভোদর, কুমীর, হাঙর, সীল মাছ, জলহস্তী, সিন্দুঘোটক, তিমি।
‘ফুলের ছড়া’ গ্রন্থে মোট ২৭টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- ফুলের জলসা, কদম কেয়া, শাপলা, ফুলের দেশে, গন্ধরাজ, শাপলা-শালুক, শিউলি, ঝুমকো-জবা, পদ্মফুল, গাঁদাফুল, জুঁই চাপা, অর্কিড ফুল, ডালিয়া, গুলমোহর, গোলাব, ক্রিসানথিমাম, রক্তকরবী, রঙ্গন, চম্পা, কাটালীচাঁপা, সূর্যমুখী, সন্ধ্যামণি, রাতের ফুল, রজনীগন্ধা, হাসনাহেনা, দোপাটি, ম্যাগনোলিয়া।
‘কিস্সা কাহিনী’ গ্রন্থে মোট ৩টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। এগুলোর শিরোনাম যথাক্রমে- আলী বাবার কিস্সা, আলাউদ্দীনের কিস্সা, সাতমঞ্জিলের কাহিনী।
‘ছড়ার আসর’ গ্রন্থে মোট ১৬টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। এগুলো যথাক্রমে- ঘড়ি বাজে ঢং ঢং, একটা চেয়ার, বনের মাঝে, পেঁচার বাসা, পেঁচাটা কয়, তুলতে গিয়ে, তুই খুলিনা মুই খুলি, নাচন নাচন ধূম নাচন, গান চলেছে জাহান জুড়ে, খেলার ছড়া, পেঁচা ও পেঁচানি, হাঁসের গপ্প পিঁপড়ে, ডাঙ্গুলি, বড়াই কাতলা মাছ।
‘আলোকলতা’ গ্রন্থে মোট ২০টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- আলোকলতা, কোলা ব্যাঙ, খাজা-ভাজা, কুলপী বরফ, কোন্টা ভালো, ঠাট্টা, চানাচুর, বাদাম, রেলের মিঠাই, মিঠাই খাওয়া, বনের পাঠশালা, শিয়াল পন্ডিত, শিয়ালের ফাঁকি, বেজী আর শিয়াল, মাঝির ছড়া, মেঘের ছড়া, পথের খবর, ব্যঙ্গমা, তারার ছড়া, শিয়ালের চালাকি।
‘খুশীর ছড়া’ গ্রন্থে মোট ৭৬টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- (অ আ ক খ), ছড়াছবির দেশে-১ (১৮টি ছড়া), ছড়াছবির দেশে-২ (২০টি ছড়া), ছড়াছবির দেশে-৩ (২১টি ছড়া, ছড়া ও ছবি (১৬টি)।
‘পোকা-মাকড়’ গ্রন্থে মোট ২৪টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- পোকা-মাকড়, পিঁপড়ে, পিঁপড়ের দল, পিঁপড়ের নেতা, উইপোকা, মাকড়সা, মশা, মাছি, ফড়িং, টিডডি ফড়িং, তেলাপোকা, কাঁচপোকা, বোলতা, ভোমরা, মৌমাছি, মৌচাক, মৌমাছির রাজ্য, প্রজাপতি, মথ প্রজাপতি, রেশম গুটি, লাক্ষা কীট, বিল্লী, জোনাকি, প্রবালের দেশ।
‘মজার ছড়া’ গ্রন্থে মোট ১৪টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- মজার ছড়া, তেলের ছড়া, তৈলাভাবের ছড়া, মাছের ছড়া, কপির ছড়া, হানাদার বাহিনীর ছড়া, মীর জাফরের ছড়া, দেশের ছড়া, লড়ছি, ঘুমভাঙানোর ছড়া, কেল্লার ছড়া, দু’মুখো মানুষের ছড়া, দা-লালের ছড়া, গোলামের ছড়া।
‘পাখীর ছড়া’ গ্রন্থে মোট ২৫টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। কবিতাগুলির শিরোনাম যথাক্রমে- ভূমিকা, বুলবুলি, মোরগ, হাঁস, কবুতর, টুনটুনি, চড়ুই, বাবুই, সাতভায়রা, দোয়েল, কোকিল, শালিক, ময়না, টিয়া, ঘুঘু, বক, চিল, কাক, শাহবাজ, ফিঙে পাখী, আবাবিল পাখী, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, কাগাবেগা, পেঙ্গুইন।
‘সাঁঝ সকালের কিস্সা’। পুঁথির কাহিনী নিয়ে গদ্যে এবং পদ্যে-বিভিন্ন আঙ্গিকে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ৭টি কবিতা। এগুলো যথাক্রমে- আজব সফরের কাহিনী, দৃষ্ট জিনের কিস্সা, হিন্দবাদের কথা, সিন্দাবাদের পয়লা সফর, সিন্দাবাদের দুসরা সফর, সিন্দাবাদ ও বুড়ার কিস্সা, নৌফেল ও হাতেম তা’য়ীর কাহিনী।
‘ছড়াছবি’ গ্রন্থটিতে মোট ১৮টি শিরোনামহীন ছড়া সংকলিত হয়েছে।
‘দাদুর কিস্সা’ একটি অসম্পূর্ণ পান্ডুলিপি।
উপরোক্ত সূচিপত্র থেকে মোট ৩৭১টি ছড়া-কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়াও, আরো অনেক ছড়া-কবিতা অগ্রন্থিত রয়েছে। তা থেকে ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতার বিপুল ভাণ্ডার সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। উপরোক্ত গ্রন্থ তালিকা ও শিরোনাম থেকে তাঁর শিশু-কিশোর ছড়া-কবিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা চলে। এগুলোর বিষয়বস্তু যেমন বিচিত্র তেমনি শিশু-কিশোরদের জন্য তা একান্ত উপযোগী। বাংলাদেশের প্রকৃতি, ফুল, পাখি, জনপদ ও জীব-জন্তু, জড় ও অজড় অসংখ্য বিষয় ও বস্তু-নিচয়কে তিনি তাঁর ছড়া-কবিতার বিষয়বস্তু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। শিশু বয়সে কচি-কাঁচাদেরকে এসবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য কবির আন্তরিক প্রয়াস এতে পরিলক্ষিত হয়। এ থেকে তিনটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়Ñ
প্রথমত, শিশু-মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে কবি অতিশয় সচেতন এবং তাদের মন-মানস, চিন্তা-বুদ্ধি-কল্পনা যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে সহজে বিকাশ লাভ করে, সেসব বিষয় নিয়েই কবি তাঁর ছড়া-কবিতার ডালি সাজিয়েছেন। বিষয়ের মধ্যে বৈচিত্র্য ও নানা বর্ণ-সুষমার সমাবেশ ঘটেছে। বৈচিত্র্য, রং ও বর্ণিলতা শিশু-কিশোর মনকে সহজেই আকৃষ্ট করে থাকে। কবি  অত্যন্ত সজাগ ও নিপুণতার সাথে তা প্রকাশ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ্য করলে এটা স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় যে, বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী-নিসর্গ, ফুল-পাখি, জীব-জন্তু ও নানা বৈচিত্র্যময় অসংখ্য উপাদান নিয়ে কবি এসব ছড়া-কবিতা লিখেছেন। ফররুখ আহমদ সম্পর্কে অনেকের অভিযোগ, তাঁর কবিতায় আরব্য নিসর্গের বর্ণনা অধিক। কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, তাঁর কবিতায় সবকিছুই আছে, কেবল বাংলাদেশ নেই। উপরোক্ত বিভিন্ন শিশুতোষ কাব্য-কবিতা পড়লে তাঁদের ধারণা যে সম্পূর্ণ ভুল, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে। তাঁর সমগ্র শিশু সাহিত্যে কোথাও আরব্য প্রকৃতির বর্ণনা নেই। সর্বত্রই কেবল বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও অপরূপ সৌন্দর্যের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা।
তৃতীয়ত, ফররুখ আহমদের শিশুতোষ কাব্য-কবিতায় ব্যবহৃত শব্দরাজি বিচার করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, এতে তিনি খুব সহজ-সরল শব্দ ব্যবহার করেছেন। যুক্তাক্ষরযুক্ত কোন শব্দ তিনি যথাসম্ভব পরিহার করেছেন। ফলে এসব শব্দের উচ্চারণ, পঠন-পাঠন, অর্থ অনুধাবন শিশু-কিশোরদের জন্য খুবই সহজ। তাছাড়া, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, ফররুখ আহমদের কাব্যে বিশেষত তাঁর প্রথম দিককার রচিত কাব্যে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তাঁর রচিত শিশুতোষ কাব্য-কবিতায় এ ধরনের কোন শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এখানে ব্যবহৃত সব শব্দই খাঁটি বাংলা শব্দ। কতিপয় উদ্ধৃতির দ্বারা উপরোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করে তোলার প্রয়াস পাব।
আয় গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া
দিনটাতে,
পাখীর বাসা খুঁজতে যাবো
একসাথে॥
(পাখীর বাসা : পাখীর বাসা)

বাপ্রে সে কী ধুম ধাড়াক্কা
দিচ্ছে ধাক্কা, খাচ্ছে ধাক্কা,
গুঁতোর চোটে হয় প্রাণান্ত
হাঁপিয়ে ওঠে ক্যাবলা কাণ্ড!
লাগলো যখন বিষম তেষ্টা
ক্যাবলা করে ডাবের চেষ্টা।
তাকিয়ে দেখে পকেট সাফ,
ভিড়ের ভিতর দেয় সে লাফ।
(মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকরা : ঐ)

চৈতী মাঠে গনগনে রোদ্দুরে
ইচ্ছা করে বেড়াই ঘুরে ঘুরে॥

কাঠবিড়ালী পশ্মী কোটে
বিষম রোদে হাঁপিয়ে ওঠে,
কাকের করুণ কান্না ঠোঁটে
মিলায় দূরে দূরে॥
(চৈত্রের গান : ঐ)

হো-হো হাসি, হি-হি হাসি
শুনি হাসির হররা
বাঁকা হাসি পিঠের উপর
পড়ে যেমন দোররা!

কাষ্ঠ হাসি দেখে কারো
যায় যে জ্বলে পিত্ত,
কাষ্ঠ হাসির মহড়াটা
চলছে তবু নিত্য!
(হাসি : নতুন লেখা)

উলশেগুড়ি! ইলশেগুড়ি!
আসলো উড়ে মেঘের ঘুড়ি,
হাওয়ায় বাজে রেশমি চুড়ি;
ইলশেগুড়ি! ইলশেগুড়ি!
মনপবনের নাইরে জুড়ি,
ফোটায় সাদা ফুলের কুঁড়ি!!
(ইলশেগুড়ি : ঐ)

দেখতে যাবো কাজের ফাঁকে
প্রাণীর বাসা জগৎটাকে
খোদার গড়া এই দুনিয়ায়
কেউ পানিতে কেউবা ডাঙায়
কেউবা ঘোরে শূন্য হাওয়ায়
দেখি আজব চিড়িয়া খানায়।
(চিড়িয়াখানা : চিড়িয়াখানা)

হরিণ ঘাটা নদীর বাঁকে
দল বেঁধে ভাই হরিণ থাকে,
একটু খানি শব্দ হ’লে
হাওয়ার আগে হরিণ চলে
বিজলি আলো ঝিলিক দিয়ে,
মিলায় যেন চোখ ধাঁধিয়ে।
(হরিণ : চিড়িয়াখানা)

মুর্গী নিয়ে পাতিশিয়াল যায় যে পালিয়ে,
চুরি-স্বভাব শিয়ালগুলো খায়রে জ্বালিয়ে।।
(শিয়াল : চিড়িয়াখানা)

‘হরফের ছড়া’ ফররুখ আহমদের একটি বিখ্যাত শিশু-কিশোর কাব্য। এখানে প্রত্যেকটি বাংলা বর্ণ নিয়ে এক একটি ছড়া রচিত হয়েছে। এগুলো এতোই সুন্দর ও আকর্ষণীয় যে, শিশুরা এসব ছড়া পড়ে সহজেই বাংলা বর্ণমালা শিখতে পারে। যেমন :
ক-য়ের কাছে কলমিলতা
কলমিলতা কয়না কথা
কোকিল ফিঙে দূর থেকে
কলমি ফুলের রঙ দেখে।
…  … … …
ঝ-য়ের পাশে ঝিঙে
ঝিঙে লতায় ফিঙে
ঝিঙে লতা জড়িয়ে গেলো
কালো গরুর শিঙে।

ফররুখ শিশু-মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন তাই নয়, শিশু-কিশোরদেরকে তিনি গভীরভাবে ভালবাসতেন। ছন্দ, শব্দ, ছড়া-কবিতার মাধ্যমে শিশু-কিশোররা আনন্দ লাভের সঙ্গে সঙ্গে যাতে চরিত্রবান নাগরিক ও আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি তাঁর বিভিন্ন ছড়া-কবিতার মধ্যে কৌশলে ছোট ছোট কথায় চমৎকার সব উপদেশ ও উৎসাহব্যঞ্জক বাণী পরিবেশন করেছেন। যেমন :
নতুন সফরে শুরু হোক আজ জীবন সেই,
মুক্ত প্রাণের রোশনিতে ভয়-শংকা নেই।
এভাবে দেখা যায়, ফররুখ আহমদ শিশুদের জন্য অসংখ্য ছড়া-কবিতা রচনা করেছেন। এগুলো বিষয়বস্তুর দিক থেকে যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ তেমনি শিশু-কিশোরদের মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সম্পূর্ণ উপযোগী। এতে তারা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি নানা বিষয়বস্তুর আকর্ষণ তাদেরকে এগুলো পাঠ করতে উৎসাহ যোগায়। আনন্দ লাভের সাথে সাথে তারা অনেক শিক্ষণীয় বিষয়ও জানতে পারে। সার্বিক বিচারে বাংলা শিশুতোষ কাব্য রচনার ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদের অবদান অসামান্য এবং তিনি এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। অবিলম্বে তাঁর সব শিশুতোষ কাব্য-কবিতা প্রকাশের ব্যবস্থা করে তার যথাযথ মূল্যায়ন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

SHARE

Leave a Reply