Home গল্প অনুবাদ গল্প এক টুকরো রুটি

এক টুকরো রুটি

নাজমা ফেরদৌসী..
গত সংখ্যার পর
রুটির অভাব
পরদিন খুব সকালে জমিদার সাহেব ডেকে তোলেন জেনকে। জেন , জেন, ওঠো। নবান্ন উৎসবের রুটি প্রস্তুতির জন্য আমার লোকেরা গম বীজ বুনতে যাচ্ছে মাঠে। তুমি চাইলে যেতে পার।
এতো ভোরে উঠার অভ্যাস নেই জেনের। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে সে, রুটি? কিসের রুটি? খাব না। না না… চিৎকারের সাথে চেতনা ফেরে তার। ধড়মড় করে জেগে উঠে। চোখ মেলে স্বয়ং জমিদারকে দেখে তার প্রতিজ্ঞার কথা মনে হয়।
জেন দেখে বিশাল টেবিলের চারিধারে বসেছে চাষীরা। সকালের নাস্তা সেরে তারা ফসল বুনতে যাবে। জেন তাদের সাথে শামিল হল। জেন ছাড়া আর সকলকে দুধ আর রুটি দেয়া হল। তাকে দেয়া হল এক বিশাল গোশতের টুকরো। তার জন্য বরাদ্দকৃত এ খাবার চাষীদের জন্য যথেষ্ট ঈর্ষনীয় ছিল।
তড়িঘড়ি খেতে শুরু করে জেন। কিন্তু প্রথম গ্রাস মুখে তুলতেই তার মনে হলো সকালের নাস্তায় এমন তৈলাক্ত ভুড়িভোজন! সাথে এক টুকরা রুটি হলে বেশ হতো। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো ‘রুটির চাইতে গোশত ঢের ভাল খাবার। রুটি তো অতি বেশি সাধারণ’।
খেয়েদেয়ে সবাই মিলে মাঠে গেল। জেন দেখল, বীজ বোনার জন্য মাঠকে কর্ষণ করা হয়েছে। মাটির ঢেলাগুলো ঝুরঝুরে আর নরম হয়েছে। কৃষকেরা জানালো বীজ বপনের জন্য মাঠ উত্তমরূপে প্রস্তুত। তারপর সবার সাথে জেনও গমের বীজ ছিটালো ক্ষেতে। বিশাল মাঠে বীজ বুনতে বুনতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে কারও খেয়াল নেই। বিকেল হয়ে এলো। সব চাষীরা একটি গাছের নীচে খাবার খেতে বসল। জেনকে জমিদারের নির্দেশমতো প্রচুর গোশত দেয়া হল কিন্তু কোনো রুটি বা আলু দেয়া হল না। রাতের খাবারেও তাকে গোশত ছাড়া আর কিছু পরিবেশন করা হল না।
এভাবেই চলল দিনের পর দিন। জেনের সম্পূর্ণ নাগালের বাইরে রাখা হতো রুটি। যেভাবে স্বর্ণ বা হীরা জহরত মানুষ লুকিয়ে রাখে, তেমনি। জেন যত পারে গোশত খেয়ে চলে। যখন ইচ্ছে হয় কাজ করে। না হয় ঘুমিয়ে সময় কাটায়। এমন স্বাধীনতার প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা পৃথিবীর খোঁজ সে আর আগে পায়নি কেন সেজন্য আফসোস হয় তার। কিন্তু যতই দিন যায় ততই তার কোথায় যেন একটা কষ্ট দানা বাঁধে। দিনে দিনে তার অস্থিরতা বেড়ে চলে। ক্রমশঃ সে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাচ্ছন্দবোধ হারাচ্ছে। আরও কিছুদিন অতিক্রম হবার পর দেখা গেল সে খাবার টেবিলে নিরাসক্তভাবে গোশতের টুকরো থেকে যৎসামান্য খুঁটে খাচ্ছে, বলা যায় তেমন একটা খেতেই পারছে না। জমিদার মহোদয়ের চোখ এড়ায় না। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমার কী হলো, তোমাকে খেতে দেখছি না যে?
এসব কিছু আমার আর ভাল লাগছে না জনাব। সে অতিকায় টেবিলের চারপাশে বসা চাষীদের দিকে তাকায়। তারা ঘরে তৈরি নরম মজাদার রুটি খাচ্ছে। সে কিছুক্ষণ তাদের খাওয়া দেখল। তারপর ভয়ে ভয়ে জমিদার মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করল। আমি ঠিক বুঝতে পারছিনে আমার কী হয়েছে। মনে হয় গোশত এখন আমার কাছে বিস্বাদ ঠেকছে। এক টুকরো রুটি… এর সঙ্গে… ঢের হতো। আমতা আমতা করতে থাকে সে।
এক টুকরো রুটি.. এক টুকরো রুটি.. ঢের হতো, তাই না? আহলাদ কতো ইস্! অত্যন্ত কঠিনভাবে ঝংকৃত হয় জমিদার সাহেবের কণ্ঠে। চোখ রাঙিয়ে তিনি বলে চলেন, তুমিই কি একটুকরো রুটিকে প্রস্তরখণ্ডের মতো ছুঁড়ে ফেলোনি? দেখো এই .. এভাবে..
তৎক্ষণাৎ তিনি টেবিলে রাখা বারকোশ থেকে একটি রুটির টুকরো নিয়ে খাবার ঘরের মেঝেয় বসা কুকুরের দিকে ছুঁড়ে ডাকলেন, টম্মি, এই যে এটা.. তোমার। খাও। কুকুরটি রুটির দিকে তাকালো। সামনের পা দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল, গন্ধ শুঁকলো। তারপর ঠেলে সরিয়ে দিল।
এ্যাই দুষ্টু কুকুর। তেড়ে আসে জেন। হামা দিয়ে এগোয় । কুকুরের পরিত্যক্ত রুটির টুকরোটি পাবার আশায় সে হাত বাড়ায়। কিন্তু নিস্তার নেই। সে ছোঁয়ামাত্র জমিদার তার হাত থেকে রুটির খণ্ডটি ছিনিয়ে নেন।
না না, হবে না বাছা। তোমার জন্য কোনো রুটি নেই। ততদিন যতদিন না নতুন ফসল ঘরে তোলা হচ্ছে। তুমি কি তোমার প্রতিজ্ঞা ভুলে গেছ?
জনাব, কুকুরের পরিত্যক্ত রুটির খণ্ডটি অন্তত আমি কি পেতে পারি না?
না। জমিদার সাহেবের কণ্ঠ ভরাট এবং খুবই কঠিন। তিনি বলে চলেন, যখন তুমি প্রতিজ্ঞাটি করেছিলে তখন তোমার বিচারবুদ্ধি একটি কুকুরের চেয়ে অধিক হওয়া সঙ্গত ছিল। কিন্তু তুমি নিজের পিতাকে অবজ্ঞা করে এক কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রতিজ্ঞার জালে নিজেকে আটকিয়েছ। এখন শুধুই গোশত খাও। আর কিছুই চেও না। চাইলেও পাবে না।
চাষী ও চাকরেরা কাজ ফেলে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল আর বোকার মত হাসছিল। জেন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কেনো সে তার বাবার ¯েœহের ছায়া রেখে এই অচিন গ্রামে এল এজন্য তার নিজের উপর রাগ ধরতে শুরু করল।
এভাবেই পেরিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। জেনের অবস্থার অবনতি হতে থাকল। সে ক্রমশ ফ্যাকাশে ও ক্ষীণ হয়ে পড়ছিল। তার দেহের ওজন কমে আসছে। এক পর্যায়ে তার গোশত খাওয়ার আগ্রহ সম্পূর্ণভাবে মিটে গেল। সে শ্রেফ বেঁচে থাকার জন্য এক চিলতে খেত কেননা সে জানত তার জন্য এছাড়া আর কিছুই নেই। অবশেষে অবস্থা এমন হল যে তার স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও কল্পনায় রুটি ছাড়া আর কিছু রইল না। তার প্রিয় অতিপ্রয় গোশত তার আকাক্সক্ষার তালিকা থেকে পুরোপুরি মুছে গেল।

ভিখারীর দয়া
একদিন খামার বাড়ির আঙিনায় জেন জমিদারকে একাকী পেয়ে তার দুপা আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, জনাব, আমাকে মুক্তি দিন। আমাকে দয়া করে চলে যেতে দিন। আামি আর পারছিনে। দয়া করে আমাকে আমার প্রতিজ্ঞার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করুন।
দুঃখিত বাছা। প্রতিজ্ঞা প্রতিজ্ঞাই। এটা ভাঙা যায় না। ওয়াদা রক্ষা করতে হয়, জীবন দিয়ে হলেও। তোমার অন্য কোন কথা থাকলে বলতে পার।
আর কিছু নয়। আমি মুক্ত জীবন চাই।
সময়মত তুমি মুক্তি পাবে। নতুন শস্যের রুটি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তুমি আমার কাছে থাকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তোমাকে আমি ওয়াদাভঙ্গে সাহায্য করতে পারিনে। শপথের তুলনা শপথ ছাড়া আর কিছু নয়।
জেন নিজেকে একজন সম্পূর্ণ অসুখী মানুষ হিসেবে দেখছে। ভাবছে এভাবে আর কতোদিন? কিন্তু বাস্তব হলো সে এভাবেই দিন কাটাচ্ছে এবং কাটাতে পারছেও। কষ্টের দিনগুলোকে ভীষণ দীর্ঘ মনে হয়। তারপরও সে দিনগুলো কোনো না কোনোভাবে অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছিল।
ডিসেম্বর মাস এল। সামনেই উৎসবের দিন। প্রতিটি বাড়িতে সাজ সাজ রব। ঘরে ঘরে কেক তৈরির প্রস্তুতি চলছে। জমিদারগিন্নীর পাকঘরে উপাদেয় কেক তৈরি করা হচ্ছে। সুগন্ধে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করছে। জমিদারের সব লোকজন ভোজসভায় হাজির। জেন নিজেকে আস্তাবলে রাখা খড়ের গাদার ভেতরে লুকিয়ে রাখল, যাতে তার জন্য নয় এমন সব খাবারের সুঘ্রাণ তার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে উত্তেজনা ঘটাতে না পারে। এসব দেখা আর সুঘ্রাণ পাওয়াতে তার কষ্ট ও দুঃখ বৃদ্ধি ছাড়া আর কী হবে?
জমিদারের চোখ এড়ালোনা যে জেন ভোজসভায় যোগদান করেনি। তিনি তাকে খুঁজতে বেরোলেন। আস্তাবলে তাকে খুঁজে পেয়ে বললেন, ওহো জেন! আজকের পুরো দিনটাই মনে হয় তোমাকে ক্ষুধা নিয়ে কাটাতে হবে। এই দিনে কেক আর রুটি ছাড়া আমরা আর কিছু তৈরি করিনি যে।
হায়! আজ উৎসবের দিনে গরিব ভিখিরি পর্যন্ত পেটপুরে ভোজন করছে। আমিই শুধু ক্ষুধার্ত রইলাম! আক্ষেপ করে জেন বলল।
আহা বেচারা!! সহমর্মিতা প্রকাশ করেন জমিদার। সুযোগটা কৌশলে কাজে লাগায় জেন। বলে, তাহলে আমাকে এ বাড়ি থেকে একটু বেরোতে দিন যাতে আমি অন্তত ভিক্ষে করে ক্ষুধা মেটাতে পারি।
তুমি চাইলে… তা করতে পার। জমিদারের মন সামান্য ভেজে, – তবে এ গ্রাম ছেড়ে গেলে কিন্তু আমার লোকেরা পাকড়াও করবে তোমাকে।
না না, আমি ক্ষুধা মিটিয়েই চলে আসব।
জেন কালবিলম্ব না করে রাস্তায় নেমে এল। জমিদারের লোকেরা পিছু নিয়েছে । পাহারায় রেখেছে যাতে সে পালাতে না পারে। প্রথম যে বাড়ির দরজায় সে কড়া নাড়ল সেটি খুলেছিল একটি ছোট মেয়ে। বিনয়-ন¤্র কণ্ঠে জেন বলল, এক গরিব পথিক তোমাদের পরিবারের প্রতি শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। তোমার মা কি দয়া করে কিছু খেতে দেবেন?
অবশ্যই দেবেন। অপেক্ষা করুন। ভেতরে যায় মেয়েটি। খুশিতে জেন আটখানা হতে না হতেই হঠাৎ দপ করে নিভে যায় তার খুশি। সে শুনছে, মেয়েটি তার মাকে একটি রুটি দেয়ার কথা বলতেই মা জিজ্ঞেস করেন, ছেলেটি যেন কে?
জমিদার বাড়ি থাকে সে। জেন তার নাম। মেয়েটির কথা শেষ হতেই উঁচু কণ্ঠে তার মা বললেন, ও, ঐ যে সেই ছেলেটি যে কিনা রুটি ছুঁড়ে ফেলেছিল?
হ্যাঁ মা , সেই ছেলেটিই। ততক্ষণে মহিলাটি বেরিয়ে এসেছেন। জেনকে দেখতেই ধমকে উঠলেন তিনি, এ্যাই ছেলে রুটি তোমার কাছে এতই ফেলনা? দেবনা তোমাকে রুটি। তারপর ঠাস্ করে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অগত্যা জেন আরেক দরজায় কড়া নাড়ে।
চলে যাও, রুটি তোমার জন্য নয়। গ্রামের প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়ে জেনকে প্রায় একই ধরনের কথাবার্তা শুনতে হল। একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটল। দ্বারে দ্বারে ঘুরল সে। কিন্তু কেউই এমন ছেলেকে রুটি বা কেক দিতে আগ্রহী হল না যে কিনা রুটি ছুঁড়ে ফেলেছে। অবশেষে জেন কী আর করবে। তুষারে আবৃত পথের ধারে বসে ফোঁপাতে লাগল সে। শীতে তার রক্ত যেন হিম হয়ে আসছে। ক্ষুধা এবং ক্লান্তি মিলে তার তন্দ্রাভাব এসে গেল।
কাঁদছ কেন?
একটি হিমজড়ানো কণ্ঠ তার কানে পৌঁছাতেই সে দেখে একটি বৃদ্ধা ভিখিরির মুখ। একটি ছেঁড়া কম্বল গায়ে জড়িয়ে সে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। তার মাথা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। কুঁজো হয়ে যাওয়া পিঠের ওপর ঝুলছে একটি ভারী ব্যাগ। তার চোখ জুড়ে দয়া মায়ায় ভরা চাহনীর একটি ঝলক চোখে পড়ে জেনের। নির্বাক তাকিয়ে থাকে সে। বৃদ্ধা কম্পিত কণ্ঠে বলে, বলোতো বাছা, কী হয়েছে?
আমি.. আবেগে কণ্ঠ বুঁজে আসে জেনের, ফোঁপাতে থাকে সে। একটু থেমে থেমে বলে, আমি এ পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী মানুষ।
খামোশ! অমন নির্বোধের মতো কথা বলোনা। রাগ ফুটে ওঠে বৃদ্ধার কণ্ঠে। সে বলে চলে, তুমি জোয়ান ছেলে। তুমি স্বাস্থ্যবান। কাজ করে খেতে পার। তুমি অসুখী হতে যাবে কেন? আমাকে দেখো। এক বুড়ি ভিখিরি আমি। কারও কোনো উপকার করতে পারি না তাই আপনজনেরাও আজ পর হয়ে গেছে। থাকার ঘর নেই। হাঁড়িতে চাল নেই। বার্ধক্যের ভারে ন্যূব্জ দেহ। কাজ করতে অক্ষম। আমি শুধু ভিক্ষেই করতে পারি।
তবু, লোকেরা আপনাকে অন্তত তাদের দুয়ার থেকে তো খালিহাতে ফিরিয়ে দেয় না। কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দেয়। আজকের এ দিনে কেউ একখণ্ড রুটি পর্যন্ত দেয়নি আমাকে। আমি বিশ্বাস করি না। কারণ এ গ্রামের লোকেরা বড় দয়ালু। সবসময়ই তারা আমাকে কিছু না কিছু দিয়ে সাহায্য করে থাকে।
কিন্তু আমাকে নয়।
জেন তার পেছনের পুরো ঘটনা বুড়িকে বর্ণনা করে শোনালো। বৃদ্ধাকে সে জানালো যে সে এখন এ দুঃসহ জীবন থেকে কোনপ্রকারে পালাতেও পারছে না । জমিদারের লোক-লস্কর সারাক্ষণ তাকে নজরবন্দী করে রেখেছে। বুড়ি শুনে আফসোস করল। বলল,
তোমার গল্পটা বড়ই দুখের। কিন্তু সত্যি কথা কি জানো, শুনলে কষ্ট পাবে। শোনো। তোমার আজকের এ পরিণতির জন্য তুমি নিজেই দায়ী। তবে আজকের পবিত্র এ দিনে আমি আমার কষ্ট করে জোগাড় করা রুটি থেকে একটি খণ্ড তোমাকে দেব। তুমি আমাকে পিঠের থলেটি নামাতে সাহায্য করতো দেখি। জেন তার পিঠ থেকে বিরাট বোঝাটি নামিয়ে দিতেই বৃদ্ধা বলে, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি তো বেশ কর্মঠ। অলস নও মোটেও। বলতে বলতে বুড়ি রুটি দিয়ে জেনের পকেট বোঝাই করে দিল। অনেক দিন পর জেন অত্যন্ত তৃপ্তি ও আনন্দভরে রুটির স্বাদ গ্রহণ করল। ভিখিরিকে জানালো অনেক অনেক ধন্যবাদ। রাত নেমে আসার আগেই জমিদার বাড়ির আস্তাবলে খড়ের গাদার ভেতরে গিয়ে শুয়ে রইল সে।
জমিদারের কাছে ফিরে গিয়ে চাকরেরা যা যা দেখেছে সব তাকে বললো। সেই রাতেই জমিদার জেনের খোঁজে আসলেন। দেখলেন, জেন পরম নিশ্চিন্তে খড়ের গাদায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তার নির্দেশে পরদিন সকালেই জেনকে হাজির করা হল জমিদারের বৈঠকখানায়। ভয়ে ভয়ে জেন জমিদারের মুখোমুখি দাঁড়ালো। জমিদার বললেন, আমি সব শুনেছি। তোমার প্রতি এক বৃদ্ধা ভিখিরির দয়ার দৃষ্টান্ত দেখার পর, আমি একজন ধনবান মানুষ হয়ে তোমার প্রতি আরও অধিক কঠিন হই কী করে? শোনো আজ হতে তোমার খাবারের তালিকায় গোশতের সাথে কেবল আলু যোগ করা হল। তবে, শপথের শর্তানুসারে, যতদিন নতুন গম তোলা না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত রুটি পাবে না।

সুখের দিন
বসন্তের অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন দিন কাটে জেনের। প্রতিদিন সে ফসলের মাঠে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে প্রাণভরে উপভোগ করে ফসলের সম্ভার। গভীর আবেগে তাকিয়ে দেখে কিভাবে বাড়ছে গমের দানা। শীতকাল শেষ হল। অবশেষে বসন্ত এল। গমের পরিপুষ্ট সোনালি দানার ভারে গাছ নুয়ে পড়েছে। জেন বুঝতে পারে তার কাক্সিক্ষত সময় এসে গেছে। সে জমিদারের কাছে খবর দেয়। জমিদারের চাষীরা ফসল কাটতে লেগে যায়। জেন কারও হুকুমের অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই লেগে যায় ফসল তোলায়। চাষীদের সাথে উদয়াস্ত খাটতে লাগল সে। তার কাছে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত উপভোগ্য মনে হচ্ছে। সে তার নিজের রুটির জন্য খাটছে! কতই না তৃপ্তিদায়ক সে পরিশ্রম!!
ফসল তোলার পর সে মাড়াই করার কাজেও অংশ নিল আনন্দভরে। এরপর গম ভাঙার কলের জন্য নিয়ে গেল । সেই গম পিষে হল ময়দা। জমিদার গিন্নি অত্যন্ত যতœ করে জেনের জন্য তার কাক্সিক্ষত রুটি প্রস্তুত করলেন। সে রুটি ছিল গরম, তুলতুলে নরম, তৃপ্তিদায়ক এবং মর্যাদার। ঘরে তৈরি সে রুটি তার নাসারন্ধ্রে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুগন্ধ বিতরণ করছিল। বিশালকায় রুটি থেকে একটি খণ্ড কেটে জমিদার নিজ হাতে জেনকে দিলেন। ভাবলেন, এবার নিশ্চয়ই সে রুটি ছুঁড়ে ফেলার পুনরাবৃত্তি করবে না। জেন হাত বাড়িয়ে রুটির টুকরো নেয়। বলে, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি আমাকে সমুচিত শিক্ষা দিয়েছেন।
বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয় জেন। জমিদার পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে বিদায় নেয়। ব্যবহার্য কাপড়-চোপড়ের সাথে থলিতে কিছু রুটি নিতে ভুলল না সে। যে পথ ধরে এসেছিল, সেই পথেই বাড়িমুখো হয় জেন। গান গেয়ে পথ চলছিল সে। তাকে পৃথিবীর সুখী মানুষদের একজন মনে হচ্ছিল। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর তার চিরচেনা গ্রামের দিগন্তরেখা দৃষ্টিগোচর হতেই আনন্দে চিৎকার করে জেন। একসময় দৌড়াতে থাকে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখে তার বাবা চিরাচরিত নিয়মে ফসলী জমিতে কাজ করছেন। জেনকে পেয়ে তার বাবা সানন্দে দুবাহু বাড়িয়ে তাকে টেনে নেয় বুকে। তার ফিরে আসাকে স্বাগত জানায়।
জেনের বাকি জীবনটা কাটে তার নিজ ভূমিখণ্ডে। সেখানে সে পালা করে গম ও আলুবীজ বপন করত। সেগুলোর পরিচর্যা যতœআত্তি করত। খেয়ে পরে বেশ কেটে যেত দিন। মাঝে-মাঝে গোশত খেত। গোশত দেখলেই জমিদারের সেই বিশালকায় কাবাবের কথা মনে পড়ত। মাঝে-মধ্যে মনে হত সেই বৃদ্ধা ভিখিরির দয়ার কথা, যে কিনা তাকে একটুকরো রুটি দান করেছিল। আর বিজ্ঞ জমিদার সাহেব যে শিক্ষা তাকে দিয়েছেন তা-কি ভোলার! বলার অপেক্ষা রাখে না, তার পর হতে আর কোনোদিন জেন এক টুকরো রুটিও অপচয় করেনি।

একটি বিদেশী লোককথা অবলম্বনে

SHARE

Leave a Reply