Home সায়েন্স ফিকশন অন্য পৃথিবী

অন্য পৃথিবী

আবদুল গাফফার রনি..

দুরন্ত বেগে ছুটছে মহাকাশযান পঙ্খিরাজ-১৯৭১। সেকেন্ডে এক লক্ষ আশি হাজার কিলোমিটার গতিতে। অথচ দশ মিনিট আগেও ছিল মাত্র আশি হাজার। একটা ব্ল্যাকহোলের কোল ঘেঁষে যাওয়ার সময় হঠাৎ গতিটা বেড়ে গেছে। সময় মতো ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব টের পাননি মহাকাশযানের রেডিও ডিটেক্টর। না পাওয়াই স্বাভাবিক। মানুষের তিন মাত্রার মগজের চিন্তার ফসল ওটা। মহারহস্যের ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব বুঝতে পারা ওটার জন্য কঠিনই। বড্ড বাজেভাবে ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণে ছুটে যাচ্ছিল পঙ্খিরাজ-১৯৭১। অসাধারণ দক্ষতায় পতন ঠেকিয়েছে বিদ্যাপতি। সময়মতো পঙ্খিরাজ-১৯৭১ এর নাক অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিতে পেরেছে।
‘শাবাস, বিদ্যাপতি!’ জৈব রোবটের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ড. জামিল। মহাকাশযানটার মতো বিদ্যাপতি নামের এই জৈব রোবটরাও তাঁর নিজের হাতে তৈরি। রোবট হলে কী হবে, ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কখনো কখনো জামিলের চেয়েও বেশি ওর। মূল চেম্বারে বসে দ্রুত কম্পিউটারের কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছেন ড. জামিল। কন্ট্রোলরুম থেকে বিদ্যাপতির হাঁক ভেসে এলো থ্রিডি স্পিকারের মাধ্যমে, ‘স্যার শূন্য দশমিক এক ছয় আলোকবর্ষ দূরে একটা ওয়ার্মহোল দেখতে পাচ্ছি!’
‘ওয়ার্মহোল! পাথভিউয়ার মনিটরের ওপর চোখ রাখলেন জামিল। ভেতর দিয়ে চালিয়ে যাও। দেখতে চাই ওপাশে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর জগৎ আছে কি না।
বিদ্যাপতি মনিবের আদেশ পালন করল। মহাকাশের এক জগৎ থেকে আরেক জগতে ঢুকে পড়ল পঙ্খিরাজ-১৯৭১। মাত্র দশ সেকেন্ডে পাড়ি দিয়েছে দশ লক্ষ আলোকবর্ষ পথ।
‘বিদ্যাপতি!’ হাঁকলেন ড. জামিল। ‘মহাকাশযানের গতি কমাও।’
‘কতই আনব স্যার?’
‘এক লাখে রাখলে চলবে।’
‘ওকে স্যার।’
ভাবনায় মগ্ন হয়ে পড়লেন ড. জামিল। দুর্ভাবনা নয়। বরং সুখস্মৃতির ঢেঁকুর তুলছেন। এইমাত্র চারমাত্রার জগৎ পাড়ি দিলেন পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে।
‘স্যার!’ থ্রিডি স্পিকার থেকে আবারো বিদ্যাপতির হাঁক এলো।
‘কী হলো বিদ্যাপতি?’
‘সামনে একটা গ্রহ দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীর মতো নীল।’
বোতাম টিপে মূল চেম্বারের ক্রিমাত্রিক স্ক্রিনটা অন করলেন জামিল। তাতে ভেসে উঠল দশমিক শূন্য শূন্য আলোকবর্ষ দূরের একটা গ্রহ। পানির রেখা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। মাঝে মাঝে সবুজ আর ধূসর রঙের ছাপ। মরুভূমি জঙ্গল দুটোই আছে দেখছি। নিজেই নিজেকে বললেন জামিল।
‘বিদ্যাপতি!’ হাঁকলেন তিনি। স্পেসশিপ ঘোরাও। ওই গ্রহে ল্যান্ড করতে চাই।
‘ওকে স্যার।’
দুই.
এখানে বোধহয় না এলেই ভালো হতো। মনে মনে আক্ষেপ করছেন জামিল। বেশ ভালোভাবে গ্রহটির পৃষ্ঠের দিকে এগোচ্ছিল পঙ্খিরাজ-১৯৭১। গভীর রাত তখন গ্রহটির এই অংশে। মাটি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে তারা। হঠাৎ কোত্থেকে আরেকটা স্পেসশিপ এসে ধাক্কা মারে তাদের স্পেসশিপের গায়ে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে দুটোই। তাল শামলাতে না পেরে হাজার ফুট গভীর এক হ্রদের পানিতে ঝপাৎ করে পড়ে এক সাথে।
আজব এক হ্রদ। ডাঙ্গার কোনো নিশানা নেই। ওপরে তাকালে মনে হয় দূরে বহুদূরে তারাভরা এক টুকরো অন্ধকার আকাশ। চার পাশটা সুনসান অন্ধকারে ছাওয়া। সার্চ লাইটের আলো জ্বেলে দেয় বিদ্যাপতি। কিন্তু বিশাল হ্রদের জমাট অন্ধকার তাড়ানোর সাধ্য নেই সেই আলোর। পঙ্খিরাজ-১৯৭১ পানিতে ভাসতে পারে। খুব বেশি ক্ষত হয়নি তার। কিন্তু যেটার সাথে ধাক্কা লেগেছে সেটার কী অবস্থা? মনিটরে চোখ রাখলেন জামিল। চিৎপটাং হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে ওটা। জামিলের মনে হলো ঠিক যেন স্পেসশিপ নয়, দানবাকার কোনো জানোয়ার। পেছনের দিকে একটা সিগন্যাল লাইট জ্বলছে আর নিভছে। হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল জামিলের। বিশাল একটা দানব মস্ত হাঁ করে ছুটে আসছে উলটে যাওয়া স্পেসশিপটাকে গিলে খাওয়ার জন্য। হাঁ-টা এতোবড়, আস্ত একটা ডাইনসোর ঢুকে যাবে তার ভেতর।
‘বিদ্যাপতি! কুইক! দানবটাকে ঠেকাও।’
‘ওকে স্যার।’ বলে বিদ্যাপতি মহাকাশযানের একস্টারনাল টিউব থেকে লেজার রশ্মির একটা বিম ছুড়ে মারল দানবটার চোখ লক্ষ্য করে। মুহূর্তেই নিথর হয়ে গেল দানবটা। কয়েক সেকেন্ড পর চার হাত-পা মেলে ভেসে উঠল পানির ওপর। ব্যাঙ! এত্তবড়! বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন জামিল। এ কোন জগতে এলামরে বাবা…’ কথা শেষ করতে পারলেন না। চোখ চলে গেল মনিটরে । শত শত দানব মাথা তুলে এগিয়ে আসছে!
‘বিদ্যাপতি!’ জামিল বিদ্যাপতিকে ডাকলেন ঠিকই, কিন্তু আদেশ করার দরকার হলো না। তার আগেই সে পঙ্খিরাজ-১৯৭১ কে পানি থেকে এক হাজার ফুট ওপরে উঠিয়ে ফেলেছে।
হৃদের চারপাশে ছবি ভালো করে স্ক্যান করো। বিদ্যাপতিকে আদেশ করলেন জামিল।
অবাক কাণ্ড! হ্রদ নয় ওটা? বিরাট একটা কুয়া! মনিটরে স্ক্যান করা ছবিগুলো দেখে বিড়বিড় করে বললেন ড. জামিল।
তিন.
মহাকাশযান ওপরে উঠে এসেছে। স্থির হয়ে ভেসে আছে শূন্যে। জামিল ভাবছেন কী করবেন। চারিদিকে হাজার হাজার স্পেসশিপ আকারের জানোয়ার উড়ছে। তাদের পেছনের সিগন্যাল লাইটগুলা জ্বলছে নিভছে। আসলে ওগুলো দৈত্যাকার জোনাকি! কী সাইজ একেকটার! এতোবড় জোনাকি, এতোবড় ব্যাঙ যে গ্রহে বাস করতে পারে সে গ্রহের মানুষগুলো না জানি কত বড় সে কথা জানতে বড্ড ইচ্ছে করছে জামিলের। বিদ্যাপতিকে নির্দেশ দিলেন মাটিতে ল্যান্ড করতে। দূরে একটা পুরনো পাকাঘর দেখা যাচ্ছে। ঘর তো নয় যেন আস্ত একটা শহর। পঙ্খিরাজ-১৯৭১ উড়ে গিয়ে নামল সেই ঘরের বারান্দায় ।
জামিল ইনফ্রারেড ক্যামেরায় তোলা ঘরটার বিভিন্ন অংশের লাইভ ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করছেন। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে ঘরটা। আবার ঠিক চিনতেও পারছেন না। সার্চ লাইটের আলো ঘরটার কাছে জোনাকির মিটমিটি আলো ছাড়া কিছু নয়।
হঠাৎ মনিটর অন্ধকার হয়ে উঠল। জামিল ক্যামেরার জুম কমিয়ে ফেললেন ১০০০০০%। মনিটরে স্পষ্ট হয়ে উঠল হিমালয়ের সমান একটা কালো জাগুয়ারের ছবি মস্ত থাবা বাড়িয়ে দিয়েছে সে পঙ্খিরাজ-১৯৭১ এর দিকে। থাবার ঘা যদি লাগে ডিমের খোসার মতো চুরমার হয়ে যাবে মহাকাশযান।
কুইক! আরো একবার চেঁচিয়ে উঠলেন জামিল।
মুহূর্তেই ঝলসে উঠল লেজার টিউবের মুখটা। ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল ভারী জানোয়ারটার দেহ।
‘বিদ্যাপতি! এই ভুতুড়ে গ্রহে আর নয়। যেদিক থেকে এসেছিলাম সেদিকেই ফিরে চলো।’
আকাশের দিকে ঘুরে গেল পঙ্খিরাজ-১৯৭১ এর নাক। বাতাসে ধাক্কা মেরে উড়ে চলল অনন্ত মহাকাশের পানে। পার হলো সেই ওয়ার্মহোল। তারপর একসময় সন্ধান পেল আসল পৃথিবীর।
চার.
জামিলের দেড়শ বছরের পুরনো বাড়িটার ছাদে ল্যান্ড করেছে পঙ্খিরাজ-১৯৭১। স্পেসশিপ থেকে বেরিয়ে এলেন ড. জামিল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় কানে এলো পাশের বাড়ির ঝগড়াটে মহিলার উত্তেজিত কণ্ঠ। জগমোহনকে বলছে, কোথায় তোর জামিল? ডাক ওকে। আজ তার বৈজ্ঞানিকগিরি বের করছি। আমার পুষিকে মেরেছে! জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব ব্যাটাকে।
জামিল নেমে এলেন। কিন্তু বাইরে বেরোলেন না। ল্যাবরেটরিতে বসেই বাইরে কী ঘটছে দেখার জন্য সিসি ক্যামেরা চালিয়ে দিলেন। মনিটরে ভেসে উঠল বারান্দার ছবি ঝগড়াটে মহিলা বারান্দার এক কোণে মরে পড়ে থাকা কালো বিড়ালটার পাশে বসে বিলাপ করছেন। বিদ্যুৎ চমকের মতো কী যেন মনে পড়ে গেল জামিলের। গত রাতে স্ক্যান করা সেই বিশাল পৃথিবী, সেই বাড়ি আর কুয়াটার ছবি খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর তড়াক করে একলাফে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। ঝগড়াটে মহিলার তোয়াক্কা না করে মৃত বিড়ালটাকে নেড়েচেড়ে দেখলেন। কী বুঝে আবার এক দৌড়ে ঢুকলেন ল্যাবরেটরিতে। সেকেন্ডের মধ্যে একটা টর্চ নিয়ে ফিরে এলেন। তারপর এক দৌড়ে ছুটে গেলেন কুয়ার পাড়ে। টর্চের আলো ফেলে কুয়ার ভেতরে উঁকি দিলেন। চিৎপটাং হয়ে পানিতে ভাসছে একটা মরা ব্যাঙ!

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply to Azizur Cancel reply