Home তোমাদের গল্প লাল জামা

লাল জামা

নিশাত তাসনীম স্বস্তি..

ঈদ আসতে আর মাত্র তিন দিন বাকি। সবাই জামা কাপড় কেনায় ব্যস্ত। বাজার জুড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ। কেউ দুইটা তিনটা জামা কিনছে, কেউবা পছন্দ করতে পারছে না। আবার কেউ বেশি দামের জন্য পছন্দের জিনিস কিনতে পারছে না। ঈদের বাজার করতে গেছে স্বপ্না। বাজারে প্রচুর ভীড়। তাও অনেক কষ্টে ওরা বাজার থেকে সুন্দর তিনটা জামা কিনল। অবশ্য তিনটা ওরাই কিনেনি। একটা দিল ফুফু, একটা আব্বু আর একটা ওর মামা। জামার রঙের হিল, চুড়ি, মালা অনেক কিছু কিনল।
আজ স্বপ্না খুব খুশি। ও অপেক্ষায় আছে কখন ঈদ হবে, কখন নতুন জামা পরে সাজবে।
স্বপ্নাদের বাসার কিছু দূরেই ছোট্ট গ্রাম গ্রামের মাঠঘাট, ঘরবাড়ি, গাছপালা পেরিয়ে শেষ প্রান্তে জোনাকিদের বাড়ি। গ্রামের মিষ্টি শান্ত এক মেয়ে। যার আচার আচরণে সবাই মুগ্ধ। যে এক অজানা কৌশলে সবার মনটা কেড়ে নেয়। সে সব সময় হাসিখুশি থাকে। দেখে মনেই হয় না তার জীবনে দুঃখ বলে কোনো কিছু আছে। তবে তার জীবন দুঃখে ভরা। সে চায় সব সময় হাসিখুশি থেকে সব দুঃখ মুছে ফেলতে। কিন্তু সে পারে না। খুব ছোট বেলায় তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করত। এখন তাও পারে না। এত কাজ করা খুব কষ্টের ব্যাপার। তাই অসুস্থ হওয়ায় কাজে যেতে পারেনি। তিন দিন থেকে তার মা অসুস্থ। গত দুইদিন জোনাকিই কাজ করেছে। আজও যাবে। তবে তার মা আজ বেশি অসুস্থ, আজ যদি না যায় তবে কাজের টাকাও পাবে না ঔষধও কেনা হবে না।
জোনাকি তাড়া তাড়ি কোনো রকমে কাজ করে টাকা নিয়ে নিল। টাকাটা গোনার সময় জোনাকি বলল, আপা ঈদের ল্যাইগা কিছু ট্যাকা বেশি দিবেন না? একডা নতুন জামা কিনতাম। মেমসাহেব ধকম দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়িতে এল। কিন্তু বাড়িতে পা দিতে না দিতেই থমকে দাঁড়াল। দেখল, তার মা মাটিতে পড়ে আছে। হাত-পা সব একই রকম আছে। কিন্তু তার জীবনটাই নেই। সে বুকফাটা চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। তার চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এল। জোনাকিকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। সে পাথরের মত বসে আছে।
আর একদিন পরেই ঈদ। জোনাকি বাড়িতে একা মন খারাপ করে বসে আছে। কিছুক্ষণ পরে সে বাইরে বেরিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় স্বপ্নাদের বাড়ির কাছেই চলে এল। সে বাড়ির মধ্যে কী সব কথা শুনতে পেল। জানালা দিয়ে দেখল। স্বপ্না নতুন জামা পরে দেখছে তাকে কেমন লাগছে। সে অবাক চোখে জামার দিকে চেয়ে থাকল। তার অনেক দিনের স্বপ্ন ঈদে লাল টুকটুক একটা জামা পরে সুন্দর করে মার কাছে সাজবে। ঈদহগাহে গিয়ে খেলবে, মজা করবে। বাবার নামাজ পড়া দেখবে। বাড়িতে এসে সবাই একসাথে খাবে। বাবার কথা মনে করতেই তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বাড়িতে এসেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার বার বার মা-বাবার কথা মনে পড়তে লাগল। তার চোখে ভাসছে- মা-বাবার সঙ্গে সে অনেক মজা করছে। ঘুরে বেড়াচ্ছে, খেলছে, তার স্বপ্নের লাল টুকটুকে জামা পরে। কিন্তু যখন তার কষ্টের দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। সে যেন দেখতে পেল, কুচকুচে কালো জীর্ণ একটা পোশাক পরে শুধুই কেঁদে যাচ্ছে। তার স্বপ্ন পূরণ হলো না। হয়তো কখনো হবেওনা। তার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। হয়ত এই ঈদটা জোনাকির জন্য নয়। অন্য কোনো সুখী মানুষদের জন্য। যারা শুধুই নিজেদের সুখ বোঝে, আর কারোর নয়।

SHARE

Leave a Reply