Home গল্প এক টুকরো রুটি

এক টুকরো রুটি

নাজমা ফেরদৌসী…

গোশতের অভাব
অনেক আগের কথা। এক দরিদ্র কৃষক। ছোট এক টুকরো আবাদি জমি ছাড়া আর কিছু তার নেই। ঐ সামান্য জমিটুকু চাষ করে ফসল ফলায় সে। রাজার ভাণ্ডারে জমা দিতে হয় মোটা অঙ্কের কর। তারপর যা থাকে তাতে তার অনেক কষ্টে দিন চলে যায়। তার একটি ছেলে। নাম জেন। ছোট্ট কুঁড়েঘরে স্ত্রীসহ তাদের তিনজনের ছোট্ট এক সংসার। বসে থাকার লোক নয় সে। জীবনযাত্রার মান বাড়াতে যারপরনাই শ্রম ঢালে সে তার জমিতে। দিন পেরিয়ে যায়, জীবনের মান তার বাড়ে না। অভাব অনটন তাদের নিত্যদিনের সাথী। কোনো কোনো সময় ক্ষুধাকে সাথী করেই রাত্রিতে ঘুমাতে যায় কৃষক। দারিদ্র্যের কশাঘাতে শিশুপুত্র জেনের জীবন থেমে থাকে না। কৃষক ও তার স্ত্রী নিজেরা খেয়ে না খেয়ে কাটালেও জেনকে উপোস থাকতে হয় না কখনোই। জেন বেড়ে ওঠে সময়ের সাথে তাল রেখে।
তাদের প্রধান খাদ্য রুটি। রুটির সাথে তারা আলু, সবজি খেতে অভ্যস্ত। সচ্ছল পরিবারে রুটি দিয়ে গোশত, ডিম, দুধ, পনির এসব খাবার দাবার নৈমিত্তিক। দরিদ্র কৃষক। মাঝে মাঝে গোশত বা পনির কেনে। জেনকে ছোট থেকেই নিয়মিত রুটি, সবজি, আলু খেতে অভ্যস্ত করানো হলেও বেড়ে ওঠার এক পর্যায়ে গোশতই তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার হয়ে দাঁড়ায়। সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। তাতে কী! তার বাবা সপ্তাহান্তে একবার মাত্র গোশত কেনে।  গোশতের যা দাম! এর বেশি সম্ভব নয় কিছুতেই। জেনের মনে হয় সারাটা সপ্তাহ ধরে আলু আর রুটি খেতে খেতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সপ্তাহের একটি দিন না হয়ে যদি সাত দিনই সে গোশত খেতে পেতো- আপন মনে সে ভাবে।
একদিনের কথা। সকালে নাশতার সময়। গতকাল তারা গোশত খেয়েছে। অবশিষ্ট ঝোলটুকুন সকালের নাশতায় পরিবেশিত হলো রুটির সাথে। জেন বলল, বাবা আজ গোশত কিনবে না?
আজ পারবো না।
কেন বাবা?
প্রতিদিন গোশত কেনার জন্য অনেক টাকার দরকার। এত টাকা তোমার বাবার নেই।
ক্ষুধা লাগে যে বাবা।
আমাদের রুটি আছে ঢের। রুটি খাও। আলু খাও। সবজি খাও।
এসব ভালো লাগে না যে বাবা।
তাহলে আমার সাথে কাজ করো। আয় বাড়বে সংসারে। তখন আরও বেশিদিন গোশত কিনতে পারবো। তোমার বয়স  তেরো পার হয়েছে। তুমি বড় হয়েছ।
কাজ করতে ভালো লাগে না যে? ইচ্ছে করে না যে?
তাহলে কী করতে ইচ্ছে করে?
ইচ্ছে করে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। শুধু রুটি, রুটি আর রুটি। কোনো গোশত নেই। আমার একঘেয়ে লাগছে। আমি আর থাকব না এখানে। চলে যাব।
কোথায় যাবে বাছা?
অনেক দূরে যাব। অনেক অনে-ক দূরে।
সেখানে গিয়ে কী করবে তুমি?
আমি আমার নিজের ভাগ্য বদলাতে চাই।
ভাগ্য বদলানো মোটেও সহজ কাজ নয়। যুদ্ধের মত কঠিন। এ কঠিন কাজটি কিভাবে তুমি করবে মনে কর?
বাবা, আমি জানি এ পৃথিবীটা বিশাল বড়। আমি নিশ্চিত যে এ বিশাল পৃথিবীতে এ গ্রামের চেয়ে ঢের ভালো গ্রাম আছে। সেখানে গেলেই আমার ভাগ্য বদলাবে।
ভালো কথা। তুমি কি কল্পনা করছো যে এক বিশাল পৃথিবী গোশতের প্রকাণ্ড পাত্রসমেত তোমার জন্য অপেক্ষা করছে?
বাবার প্রশ্নে বিব্রত হলেও জেনের উচ্চাভিলাষ দমে না একটুও।
তার বাবা তাকে অনেক  বোঝালেন।
বাড়িতেই থাকো বাবা। আমার এ জমিখণ্ড তো তোমারই সম্পদ। এখানে শ্রম ঢালো। আমাকে চাষবাসে সহায়তা দেবার মত বড় হয়েছ তুমি। একদিন নিশ্চয়ই আমাদের ভাগ্য বদলাবে।
কিন্তু জেন সিদ্ধান্তে অটল। প্রতিদিনই সে এখানে প্রচুর রুটি পাচ্ছিল কিন্তু তার মন তাতে তুষ্ট ছিল না। তার চাওয়া ছিল আরও কিছু। ফলে তার ইচ্ছের লাগামহীন ঘোড়াটা তাকে বাবার অবাধ্যতার প্ররোচনা দিলো।
পরের দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই জেন তার পরিধেয় মলিন পোশাকাদি থলিতে ভরে কাউকে কিছু না বলে বিশাল পৃথিবীর আতিথেয়তার খোঁজে নিখোঁজ হলো।
ভোরের রোদ গায়ে মেখে স্বাধীন জীবনের সুখে বিজয়ী সৈনিকের মত শিস দিতে দিতে পথ চলে জেন। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর সে ভীষণ ক্ষুধা বোধ করে। গাছের তলায় একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটে। গান করে আর পথ চলে। ভর দুপুরের রোদে ঘেমে পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। পাহাড়ি ঝর্ণার পানিতে তেষ্টা মেটায়। ক্ষুধা আরও চাগিয়ে ওঠে। একবার ভাবে বাড়ি ফিরে যাবে। আবার ভাবে, না, কিছুতেই সে তার পরিত্যক্ত বাড়িতে ফিরবে না। গোশতের অভাব সে সইতে পারবে না।
হাঁটতে হাঁটতে রোদ ফিকে হয়ে আসে। বিকেলের দিকে একটি সুন্দর গ্রামে প্রবেশ করে জেন। বিরাট এক মাঠের চার ধারে রঙচঙা নিশান উড়ছে। সেখানে জরি আর রঙিন কাগজের কাটা ফুলঝুরি ওড়া দেখে সে বুঝতে পারল মেলা হচ্ছে। মেলায় জাদুকরেরা তাদের জাদুর খেলা দেখাচ্ছে। কেউ নাচ করছে। কেউ গান করছে। জেন অবাক হয়ে দেখে। ক্ষুধা পিপাসা সব ভুলে গিয়ে অনেকক্ষণ মজা করে সেসব উপভোগ করল।  মেলায় নানান রঙের রকমারি খাবার বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টি, বাদাম, হাওয়াই মিঠে, কেক, কাবাব আরও কত কি!  সেদিকে চোখ পড়তেই তার ক্ষুধা দারুণ চাগিয়ে উঠল। তার কাছে কোন টাকা নেই। একটা পয়সাও নেই। সাধ্য নেই যে কিছু কিনে খাবে। এখন কিভাবে সে ক্ষুধা মেটাবে?

জমিদারের আশ্রয়ে
মেলা থেকে বেরিয়ে গ্রামের সদর রাস্তায় হাঁটে জেন। ক্ষুধার জ্বালা সে তীব্রভাবে অনুভব করছে। এসময় রাস্তার পাশে একটি বিশালকায় সাদা রঙকরা পাকা ভবন নজর কাড়ে তার। মুক্ত বাতায়ন পাশে বসে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি। তখনও জেন তার পরিচয় জানতে পারেনি। অনেক পরে সে জেনেছিল যে সেই মধ্যবয়সী ব্যক্তিটিই গ্রামের জমিদার। চোখ ঝলসানো বাড়িটি দেখে জেন ভাবে নিঃসন্দেহে বাড়িটি  কোনো ধনবান লোকের।
‘এখানে নিশ্চয়ই প্রচুর গোশতের সন্ধান মিলে যাবে।’- জেন স্বগতোক্তি করে। সে তার টুপিটি খুলে পাত্রের মতো এগিয়ে ধরল সেই মধ্যবয়সী ব্যক্তির দিকে। বলল, জনাব, আমি ক্ষুধায় কাতর। কিছু খাবার পেতে পারি?
জমিদার একটু সময় নিয়ে আপাদমস্তক তাকে দেখলেন। তারপর ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর এক টুকরো খাবার এনে জেনের টুপির  ভেতর রাখতেই আঁতকে ওঠে জেন।
সামান্য এক টুকরা রুটি!  গোশত নয়!! সে কী আশা নিয়ে এলো আর কী পেল? সে রেগে গেল। তারপর রুটির টুকরাটি এমনভাবে রাস্তায় ছুড়ে ফেলল যেনো ওটা একখণ্ড পাথর বা আবর্জনা ছাড়া কিছু নয়।
এ্যাই ছেলে! করছ কি তুমি? চোখ রাঙিয়ে ভর্ৎসনা করেন জমিদার।
রুটি! আর্তচিৎকার করে ওঠে জেন।
হ্যাঁ রুটি। এটা খাবার জিনিস, ফেলবার নয়।
খাব না রুটি। রুটি খেতে খেতে মুখ তেতো হয়ে গেছে। আমার বাড়িতে রাতদিন কেবল রুটি আর রুটি। অসহ্য লাগছিল। তাই বাবার নিষেধ উপেক্ষা করে লুকিয়ে বাড়ি ছাড়লাম।
কেন, তোমার বাবার ক্ষেত-খামার নেই বুঝি?
আছে তো। তবে খুবই সামান্য। গম আর আলু হয় তাতে। বাবা চাইতেন আমি যেন তার চাষবাসে সাহায্য করি।
তো করলে না কেন?
কাজ করতে আমার ভালো লাগে না।
পালিয়ে আসলে কেনো?
ভেবেছিলাম এ বিশাল পৃথিবী আমাকে রুটি আর আলুর চেয়ে ভালো কিছু উপহার দেবে।
হুম। কাজ করতে কারই বা ভালো লাগে! আচ্ছা তুমি লেখাপড়া কিছু জান?
তেমন না। গাঁয়ের স্কুলে গিয়েছিলাম মাসখানেক। লেখাপড়া ভালো লাগেনি।
চিন্তার গভীরে ডুব দেন জমিদার। ছেলেটির কথা মিথ্যে মনে হয় না। উত্তরের কিছু জায়গায় দারুণ অভাব। বছরের পর বছর। সেখানে জমিদারেরা চাষিদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করেন না।  যেসব চাষির একটু জমি আছে তারা করের বোঝায় ভারাক্রান্ত। দুটো সত্তা তার ভেতরে তোলপাড় করে। একটি হলো জমিদারিসুলভ শাসন। অন্যটি পিতৃসুলভ বাৎসল্য। জমিদারি সত্তাটি তাকে কঠিন হতে বলে আর পিতৃসুলভ বাৎসল্য তাকে বেদনার্ত করে ও নমনীয় হতে বলে। যথাসম্ভব কোমল কণ্ঠে তিনি বলেন, আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো তুমি কী চাও? তুমি রুটির অভাবে মরতে বসনি, তোমার বাবা নিশ্চয়ই তোমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েও দেননি। তাছাড়া নিজের পায়ে দাঁড়াবার বয়সও তোমার হয়নি। তোমাকে রোগাক্রান্ত বা পাগল বলেও মনে হচ্ছে না। বলতে বলতে কপালে তাঁর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে। পকেট থেকে রুমাল নিয়ে তিনি ঘাম মুছে আবার বলে চলেন, তুমি জানালে যে তুমি ক্ষুধায় কাতর। তোমাকে রুটি দেয়া হলে তা তুমি তুচ্ছ আবর্জনার মতো বর্জন করলে। আসলে তুমি কী চাও?
জেনের নীরবতা দেখে তিনি একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করেন, Ñ বলো, কী চাও তুমি?
জেন ভাবছে কী বলবে। তার ভেতরেও দু’টি সত্তা কাজ করছে। একটি তার গোশতের প্রতি দুর্বলতার প্রবৃত্তি। অন্যটি তার আজন্ম দরিদ্রতার ভেতরেও কারও সাহায্য নেয়ার প্রতি অমুখাপেক্ষিতা। এমন একটি সমাজে তারা বড় হয়েছে যেখানে কোনো মুক্ত চিন্তা প্রকাশের সুযোগ নেই। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো জমির মালিকানা থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভরশীল। এখানে নেই কোনো দয়ালু মানবিক সম্পর্কের পরিচয়। কাজেই সে দয়া মায়া অথবা ¯েœহ আশা করবেই বা কার কাছে? তবু সে এক বুক সাহস নিয়ে মনের স্বপ্নসাধ প্রকাশ করার জন্য কথামালা সাজাতে লাগল। বারো বছর বয়সী একটি বালকের পক্ষে যতটা সম্ভব বিনয় ঝরিয়ে জেন বলল, আপনি… আপনি যদি আমাকে এক টুকরো গোশত দিতেন! অন্তত এক চিলতে… আপনি পারতেন নিশ্চয়ই.. ..আপনি মনে হয় ধনবান — আমতা আমতা করে জেন।
ও। এই তাহলে তোমার চাওয়া?
জি হ্যাঁ। আর কিছু নয়।
আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি। তোমার ইচ্ছে পূরণ কর। তোমাকে আমার ভোজনশালায় স্বাগতম জানাচ্ছি। যতো খুশি খাও।
জেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে যতো খুশি গোশত খেতে পারবে! কালবিলম্ব না করে সে জমিদারের ভোজনশালায় প্রবেশ করতেই ঝলসানো গোশতের ঘ্রাণে তার মন ভরে যায়। বিশালকায় ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে আসন গ্রহণে দেরি হয় না তার। গৃহর্কতার নির্দেশমত পরিচারিকা সদ্য কাবাবকৃত এক বিশাল আকারের গোশতের টুকরো তার সামনে রাখল। খাওয়ার জন্য প্রাণ আইঢাই করছে। কী চমৎকার ঘ্রাণ! কাবাবের বাষ্পায়িত সুবাস তার নাকে প্রবেশমাত্র বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় পেট মোচড় দিলো তার। সে খাবার গ্রহণে উদ্যত হতেই জমিদার হাত উঁচু করে তাকে থামালেন। জেন তার দিকে তাকালো। তিনি মুচকি হেসে বললেন, খাওয়া শুরুর আগে একটি কথা বলি। তুমি এ বিশাল গোশতখণ্ড থেকে যতো চাও খেতে পার। তবে একটি শর্ত।
কতো ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে সে গোশত খেতে যাচ্ছে তাতেও আবার শর্ত! বিরক্তিভরে জেন গ্রীবা তোলে। সেটি কী জনাব?
তেমন কিছু নয়। একেবারেই সাধারণ । তুমি রুটির টুকরো ছুঁড়ে ফেলেছিলে। কাজটি তোমার অন্যায় হয়েছে, হয়নি?
আমি জানি না, হয়তো হয়েছে।
হয়তো নয়, অবশ্যই ভুল হয়েছে।
জি আচ্ছা বলুন।
শোনো তুমি তোমার বাবাকে উপেক্ষা করে আর একটি অন্যায় করেছ। তোমাকে যথোচিত শিক্ষা পেতে হবে।
কী শিক্ষা দিতে চান দিন। দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন। আমি খুবই ক্ষুধার্ত।
এ গোশত মুখে তুলবার আগে একটি প্রতিজ্ঞা করতে হবে। কথা দাও, নতুন শস্যদানার রুটি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তুমি এখানেই থাকবে। কালকে আমরা আগামী মৌসুমের জন্য গম বীজ বপন করতে যাচ্ছি। যতদিন এ বীজ থেকে গাছ, গাছ থেকে গম এবং গম থেকে রুটি তৈরি না হচ্ছে ততদিন তুমি যত চাও গোশত খেতে পার, তবে কোন রুটি খাওয়ার অনুমতি তোমার থাকবে না। এক টুকরোও নয়। এক চিমটেও নয়। কণামাত্র নয়। মাথা কাৎ করে একবাক্যে রাজি জেন।
তুমি কি বুঝেছ কতো শক্ত প্রতিজ্ঞা তোমার?
হ্যাঁ জনাব।
তুমি যদি এ শর্ত মানতে না চাও তাহলে তোমার এখনই চলে যাওয়া ভাল।
চলে যাব! অসম্ভব।
শুধু গোশত খেয়ে দিনের পর দিন কাটাতে পারবে তুমি?
কেন নয় জনাব? শর্তটি আমার জন্য মোটেও কঠিন নয়। আমি প্রতিজ্ঞা করছি। আমি রুটিবিহীন খুব ভালই দিন কাটাতে পারব দেখে নিবেন। এমনকি চিরদিন। আমাকে আপনি প্রতিদিন গোশত খেতে দেবেন এতে আপত্তি করার প্রশ্নই নেই। বরং আমি তো এমনটিই চেয়েছিলাম।
তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। আর শোনো, নতুন গম আসার আগে কিন্তু তোমাকে কোথাও যেতে দিচ্ছি না। পালাতে চেষ্টা করলে বন্দী করা হবে। রাজি তো?
একশো বার। এমন সুরভিত গোশত কোনোদিনই আমি দেখিনি। এ যে আমার আজন্ম স্বপ্ন! এমন গোশতের প্রাচুর্য ফেলে পালিয়ে যাওয়া যায়? নিশ্চয় আমি পালাব না জনাব। মুখে যেন খই ফোটে তার। অপরিণামদর্শী দরিদ্র ছেলেটির গোশতের জন্য অন্ধ হাহাকার দেখে মমতা জড়ো হয় জমিদারের মনে। খাও তাহলে, প্রচুর গোশত প্রাণ ভরে খাও তুমি। জেন আনন্দের আতিশয্যে ধন্যবাদ জানাতেই ভুলে গেল। সে আপন মনে খেয়ে চলে।
হাড় থেকে সুস্বাদু গোশত ছাড়িয়ে পরম তৃপ্তিভরে খাচ্ছে সে। দেখে মনে হয় এককণা, একরত্তি থাকা পর্যন্ত সে খেয়ে চলবে। বেশ একচোট খেয়ে নিয়ে জেন বলল, কী অপূর্ব স্বাদ এর! আচ্ছা জনাব, আমি যে এভাবে খাচ্ছি বিনিময়ে কী দিতে হবে আমাকে?
তার কথা শুনে জমিদার তাকে বললেন, তোমার কী আছে দেবার?
না মানে বলছিলাম আরকি, কাজ ছাড়া কে-ই বা খেতে দেয়?
তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার বুদ্ধির তারিফ করছি। কেউ কাউকে কাজ ছাড়া বসিয়ে খাওয়াতে চায় না একথা সত্যি। কিন্তু এখানে তোমাকে তেমন একটা কাজ করতে হবে না। কেবল খাবে ঘুমাবে। তবে শুয়ে বসে থেকে তোমার একঘেঁয়ে লাগলে ভিন্ন কথা। একঘেঁয়েমী দূর করতে সামান্য কাজ ইচ্ছেমত করতে পার।
জেন অবাক হয়। তার স্বপ্নসাধ ডানা মেলে উড়াল দেয় তাকে ঘিরে। রঙিন সব স্বপ্ন। যতো চাও গোশত খেতে পারো, তাও আবার কাজকর্ম ছাড়াই! বাবা বলতেন কাজ ছাড়া খাবার জোটে না, আর এখানে? নিশ্চিন্তে দিন গুজরান কর। পেট ভরে গোশত খাও। ইচ্ছে হয় কাজ কর নাহয় না কর। কেউ কিছু বলবে না। এর চেয়ে ভাল জায়গা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। জেনের মন-প্রাণ , সমস্ত সত্তা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় এই জমিদার বাড়িতে।
ইতিমধ্যে জেনের বিশাল গোশতখণ্ডটি খাওয়া প্রায় শেষ। অবশিষ্ট হাড়খানা থেকে খুঁটে খুঁটে সর্বশেষ কণাপর্যন্ত সাবাড় করল সে। জমিদার নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন অভাবতাড়িত ছেলেটির দিকে।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply