Home খেলার চমক থামল গতির ঝড়

থামল গতির ঝড়

মো: মিজানুর রহমান মিজান..

গতির ঝড় তুলে ব্যাটসম্যানের বুকে কাঁপন ধরানো ব্রেট লি অস্ট্রেলিয়ার সোনালি সময়ের তারকা। ক্যারিয়ার যখন শেষ করছেন তখন প্রায় সব সাফল্যেই ছোঁয়া হয়ে গেছে। প্রতিনিধিত্ব করেছেন এমন এক অস্ট্রেলিয়া দলের, যেটা সর্বকালের সেরা দল কিনা তাই কেবল বিতর্কের বিষয়। এমন একটা দলের অংশ হওয়া যেমন গর্বের তেমনি দলে জায়গা পাওয়াটাও অনেক কঠিন বিষয়। বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ গতিময় বোলারদের একজন হিসেবে লি কে গণ্য করা হয়। সমসাময়িক বোলারদের এক অলিখিত গতির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেবল শোয়েবের থেকে সামান্য পিছিয়ে তার অবস্থান। প্রায় নিয়মিতই ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা লির সর্বোচ্চ গতি ১৬০.৬ কি.মি./ঘন্টা। প্রতিদ্বন্দ্বী শোয়েবের সর্বোচ্চ গতি ১৬১.৩ কি.মি./ঘন্টা। দুজনই এই গতির ঝড়টা তুলেছিলেন ২০০৩ এর বিশ্বকাপে, আর দু’জনেরই এই সর্বোচ্চ গতির ধকলটা সামলাতে হয়েছিল ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের। শোয়েব আখতার, শেন বন্ড আর ব্রেট লি এই গতি দানবত্রয়ী মোটামুটি তটস্থ করে রেখেছিলেন ওই সময়ের ব্যাটসম্যানদের। কিন্তু অতিরিক্ত গতিতে বল করার যে অনিবার্য ফলাফল তা এড়াতে পারেননি তিন জনের একজনও। ইনজুরি ব্যাপারটা বরাবরই ক্যারিয়ারে কমা, সেমিকোলনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনজুরির সাথে না পেরে অনেক সম্ভাবনার অনুবাদ করার আগেই অবসরে গিয়েছেন বন্ড; শোয়েবও শেষ দিকে এসে সে গতি আর ধার, ধরে রাখতে পারেননি ইনজুরির সাথে যুদ্ধ করতে করতে। সে তুলনায় বরং লিই খানিকটা বেশি লম্বা করতে পেরেছেন তার ক্যারিয়ারটা। কিন্তু শেষ পরিণতিটা সেই তাদের মতই, ইংল্যান্ড সফরের আগ মুহূর্তে ইনজুরিতে পরে সমাপ্তি টানলেন ১৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। মাঝে সারাজীবন রোমন্থন করে আনন্দ অনুভবের উপযোগী অনেক স্মৃতিই উপহার পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান এই ফাস্ট বোলার। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা সেই ১৯৯৯ সালের একেবারে শেষের দিকে ভারতের সাথে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে। তবে তার আগে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটে। ফার্স্ট গ্রেড ক্রিকেটে হাতেখড়ি ১৬ বছর বয়সে ক্যাম্পবেলটাউনের হয়ে। পরিণত বয়সের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী শোয়েব আখতারের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ এখানেই। কিছুদিনের জন্য নতুন বলের পার্টনারও ছিলেন দু’জন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খলেছেন অনূর্ধ্ব ১৭ ও ১৯ দলে। ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব ১৯ দলের ভারত সফরের পূর্বে দল থেকে ছিটকে পড়েন ইনজুরির কারণে যা তার বোলিং স্টাইলে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ডোমেস্টিকে নিজ প্রদেশ নিউ সাউথ ওয়েলস ব্লুজের হয়ে খেলেছেন। এরপর অস্ট্রেলিয়া এ দলের হয়ে মূল দলে জায়গা পেয়েছেন। অভিষেকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওয়ানডের অভিষেকটাও পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের ৯ জানুয়ারি পাকিস্তানের বিপক্ষে। মূলত বোলার ব্রেট লি ব্যাট হাতেও দলের জন্য বেশ কাজের ছিলেন। বিশেষ করে লোয়ার অর্ডারে তার আগ্রাসী ব্যাটিং দলের অনেক জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছে। আর উপরি পাওনা ছিল তার দারুণ ফিল্ডিং। সব মিলিয়ে লি একজন পরিপূর্ণ ক্রিকেটার। ব্যাট হাতে টেস্টে ২০ গড়ে দলের পক্ষে প্রায় দেড় হাজার রানের জোগান দিয়েছেন যার মাঝে রয়েছে সর্বোচ্চ ৬৪ রানের ইনিংসসহ ৫টি অর্ধশত। ওয়ানডেতে প্রায় ১৮ গড়ে তিনটি অর্ধশতসহ ১১৭৬ রানের সংগ্রাহক তিনি। আর মূল পরিচয়ে তো ব্রেট লি অনন্য। ২০০৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া দলের অন্যতম ভরসা শেন ওয়ার্ন নিষিদ্ধ হলে লি, ম্যাকগ্রা আর এ্যান্ডি বিকেলকে নিয়ে দলের বোলিং এ্যাটাক সাজানো হয়। যা পরবর্তীতে টুর্নামেন্টের মারাত্মক বোলিং ডিপার্টমেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং তিনজনে মিলে মোট ৫৯ টি উইকেট তুলে নেন। যার মাঝে লির শিকার ছিল কেনিয়ার বিরুদ্ধে একটি হ্যাটট্রিকসহ ২২ উইকেট মাত্র ১৭.৯০ গড়ে। লির এই পারফরম্যান্স দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। এরপর থেকে নিয়মিতই ওয়ানডে বোলারদের র‌্যাংকিংয়ে সেরা  দশে থাকতে শুরু করেন তিনি। ২০০৬ এর শুরুতে র‌্যাংকিংয়ে প্রথম স্থানে চলে আসেন। তার বিশ্বকাপ সাফল্য আরও সমৃদ্ধ হতে দেয়নি সেই পুরনো শত্রু ইনজুরি। ২০০৭ বিশ্বকাপ জিতে টিমমেটরা আনন্দে মেতে উঠলেও তাকে কেবল দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ইনজুরির থাবার কারণে। ওয়ার্ন এবং ম্যাকগ্রার অবসরের পর লির ওপর বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ে দলের বোলিং আক্রমণে নেতৃত্ব দেবার। সে দায়িত্ব তিনি সূচারুরূপেই পালন করেছেন। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রায় দুর্বোধ্য হয়ে ওঠা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকেই। কিন্তু এ সময় থেকে ইনজুরির সাথে তার সখ্য যেন নিয়মিত হয়ে ওঠে। শেষে ২০১০ সালে শুরুতে ঘোষণা দিলেন টেস্ট ম্যাচটা আর খেলছেন না তিনি। ৭৬ টেস্টে অংশ নিয়ে উইকেট শিকার করেছেন ৩১০টি উইকেট, যা অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের মাঝে চতুর্থ সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ বছরের জুলাই মাসের ৭ তারিখে। আর সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ১৩ জুলাই তারিখে। যদিও আইপিএল ও বিগব্যাশটি টোয়েন্টিতে খেলা চালিয়ে যাবার কথাও জানিয়েছেন। ২২১ ওয়ানডে খেলে সংগ্রহ করেছেন ৩৮০টি উইকেট, যা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ম্যাকগ্রার সাথে যৌথভাবে প্রথম স্থানে (সার্বিকভাবে সপ্তম)। এছাড়াও টোয়েন্টি টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ২৫টি, উইকেট নিয়েছেন ২৮টি। আর টোয়েন্টি টোয়েন্টির প্রথম হ্যাটট্রিক করা বোলারের নামও ব্রেট লি। ক্যারিয়ার জুড়ে পাওয়া পুরস্কার আর স্বীকৃতির তালিকাটা বেশ দীর্ঘই তার। ২০০০ সালে ব্র্যাডম্যান ইয়াং ক্রিকেটার অব দ্যা ইয়ার হবার মাধ্যমে এর শুরু। ওই বছরেই উইজডেনের ইয়াং ক্রিকেটারের খেতাব গেছে লির ঘরে। বর্ষসেরা টেস্ট ও ওয়ানডে দলের সদস্য হবার গৌরব অর্জন করেছেন একাধিকবার। ২০০৬ সালে উইজডেন তাকে ক্রিকেটার অব দ্যা ইয়ারই নির্বাচন করে ফেলে। অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে প্রশংসার স্তবকে ভেসেছেন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। এ তালিকায় আছেন খোদ শোয়েব আখতারও; বলেছেন “লি এক্সপ্রেস বোলিংয়ের আইডেন্টিটি।” এত এত প্রশংসা আর পরিসংখ্যান কি আসলে লিকে বোঝাতে পারছে? নাহ! বরং সেটা কেবল গল্পের একটা অংশের বর্ণনা দিচ্ছে। লিকে বোঝানোর জন্য তার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের উক্তিটি আনা যাক। ২০১১ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের সাথে ম্যাচে ফিল্ডিং করতে গিয়ে কপাল কেটে গিয়েছিল লির। সে ম্যাচ হেরে অস্ট্রেলিয়াও ছিটকে যায় বিশ্বকাপ থেকে। ম্যাচ শেষে প্রতিক্রিয়ায় পন্টিং বলেছিলেন “লির চোখে যে আগুন দেখেছি তা যদি সবার চোখে থাকত তাহলে হয়ত ম্যাচের ফলাফলটা অন্যরকম হত।”

SHARE

Leave a Reply