Home উপন্যাস যতো সব ভুতুড়ে গল্প

যতো সব ভুতুড়ে গল্প

সোলায়মান আহসান…

সকল জল্পনা-কল্পনাকে ছাতু করে দিয়ে সগীর নাকি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে। এমন এক হট নিউজ নিয়ে সাখাওয়াত সাথীকে খুঁজছে। ঘরে ঢোকার জন্য দরোজা খুলে দেয় বুয়া। তাকে তো আর সাথীর খবর জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই, হন হন করে ভেতরকার ঘরে ঢুকে সাথীকে খোঁজে। সাথীকে পাওয়ার পরিবর্তে পায় অনিন্দাকে। তাকেই শ্যালকের শুভ বিবাহের সুখবরটা দিয়ে ফেলে শুনেছিস! তোর, নোয়া মামার বিয়ে, কী সাংঘাতিক খবর, তাই না? তোর মা কোথায়? এ খবর প্রথম জানার অধিকার তো তারই।
সত্যি! সত্যি বলছ আব্বু! অনিন্দা খুশিতে লাফিয়ে উঠল। মায়ের খবর দেয়ার বিষয়টা বেমালুম ভুলেই গেল।
সাখাওয়াতের তড়পানো যাচ্ছে না। যতক্ষণ সাথীকে খবরটা না দিতে পারছে। তাই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ে জিশানের ঘরেই। দেখতে পেলো জিশান পড়ার টেবিলে। একটু পর বোধ হয় অঙ্কের টিচার আসবে। আর ঠিক এ সময় সাখাওয়াতেরও বাসায় ফেরার কথা নয়। জিশান তার আব্বুর লাফানো ভাব দেখে থতমত খায় প্রথমটায়। এখানেও একই প্রশ্ন একি কথা শুনেছিস, তোর পাগল মামাটার বিয়ে লেগেছে! তোর মা কোথায়? জিশান পড়া থেকে লাফ দিয়ে ওঠে ওয়াও! নোয়া মামা শেষ পর্যন্ত বিয়ে করছে! কী মজা- কী মজা! কবে আব্বু?
সাখাওয়াত কোন জবাব না দিয়ে বের হয়ে গেলো।
সব যদি আগেভাগে বলেই দেয় তাহলে যার ভাই যার জন্য এতো দরদ, বোনটির জন্য তবে কী খবর থাকবে। সাথীকেই প্রথম জানাতে চেয়েছিল। কিন্তুÑ এমন সময় সাথী তো বাসায় থাকার কথা! কোথায় গেলো? হন্তদন্ত হয়ে অবশেষে এলো বেডরুমে। এখানেও সাথী নেই। তার মানে বাইরে। ইতোমধ্যে খুশিতে বাক্ বাকুম পায়রা হয়ে অনিন্দা-জিশান ছুটে এসেছে।
কিরে তোদের মা কোথায়? উভয়কে উদ্দেশ করে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলো সাখাওয়াত।
অনেকটা হতাশ হয়ে বিছানায় বসে পড়ে । পিন মেরে বেলুন ফুটো করার মতো সাখাওয়াতের তড়পানো থেমে যায়।
আম্মু তো স্কুলে হঠাৎ হেডমিস্ট্রেস টেলিফোন করে ডেকে নিলেন। প্রশ্নপত্রে কী ভুল ধরা পড়েছে নাকি। একটা জরুরি মিটিংয়ে যোগ দিতে গেছেন!
এই কথাটা বলতে এতক্ষণ লাগল? আমি সেই থেকে জিজ্ঞেস করছি কোথায় কোথায় হায়! আমার কপাল!
হাত দিয়ে কপাল চাপড়াতে লেগে যায়।
আব্বু, তুমি তো এক দণ্ডও দাঁড়াওনি সেই থেকে শালার বিয়ের খবরে খুশিতে শুধু লাফাচ্ছ!
অনিন্দা বলল। তাকে ঘায়েল করার ক্ষমতা এ বাসায় মেয়েই রাখে। সাথীও পারে না। জিশান তো রীতিমত বাবার ভয়ে থরেকম্প!
ফুস্! বেলুনের বাতাস বের হবার মত একটা শব্দ করল মুখে। এটা পুরনো অভ্যাস সাখাওয়াতের।
এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি আন্-তেষ্টা পেয়েছে। ফ্যানটা কম স্পিডে ঘুরছিল তা দেখে উঠে রেগুলেটর ঘুরিয়ে স্পিড বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত এ কালটাতে মাঝ রাতে একটু শীত পড়ে বলে স্পিড কমিয়ে দেয়া হয়। সেভাবে ফ্যানের স্পিড কম ছিল। কখনো কাঁথাও জড়াতে হয়। কালটা শরৎ বলেই কথা।
অনিন্দা এক দৌড়ে ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করে আব্বুর জন্য এক গ্লাস ঢেলে এনে হাজির।
শেষ পর্যন্ত নোয়া মামা বিয়েতে রাজি হলো আব্বু! ইস্! কী মজা যে করব এবার। নানার বংশের এটাই শেষ বিয়ে।
ভাইয়া জিশানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আব্বুর উৎফুল্ল চেহারা পরখ করছিল অনিন্দা। মুখে আর কোন কথা নেই। সব কথা জমা করা আছে বোধ হয় আম্মুর জন্য।
অন্তু-অন্তু- জিশান, তোরা কোথায়?
টেনে টেনে ডাকা সাথীর কণ্ঠ শোনা গেল। তার কণ্ঠ আবার বহু দূর হতেই শোনা যায়। স্কুলে ক্লাসে যেভাবে ভয়েস থ্রু করতে হয়, তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে বলে, বাসায় এলেও ঐ এক অবস্থা।
এই যে জিশানের আব্বু দেখছি এতো সকালে!
সকাল বলছ কী, এখন তো বিকেল সাখাওয়াত ইচ্ছে করেই এই রসিকতা করলো। সিলেটী ভাষায় ‘সকাল’ শব্দ দিয়ে ‘জলদি’ বোঝায়। সাথীর বাচনিকতায় এমন অনেক সিলেটী শব্দ ঢুকে পড়ে।
কারণ আছে- দারুণ খবর নিয়ে এসেছি তোমার পাগল ভাইটির শুভ বিবাহ লেগেছে, বুঝলে! বসা থেকে ওঠে দাঁড়ায় উত্তেজনায়।
কী, সগীরের বিয়ে! কী বলছ জিশানের আব্বু! সত্যি বলছ তো? কিন্তু তুমি আমার ভাইটিকে পাগল বলবে না।
সাথী খুশিতে একটা বাচ্চা মেয়ে বনে যায়। কী করবে ভেবে পায় না। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চকোলেটের একটা আস্ত প্যাকেট বের করে ঝটপট তা খুলে একটা চকোলেট এগিয়ে দেয় সাখাওয়াতের মুখের দিকে এই নাও শুভ সংবাদ দেয়ার জন্য মিষ্টি মুখ করাচ্ছি একদম নগদ।
সাখাওয়াত সঙ্গে সঙ্গে তা লুফে নিয়ে মুখে পাচার করে দেয়।
দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করে। হি… হি… হি… করে হেসে দেয় অনিন্দা।
সাথী চকোলেটর প্যাকেটটা অনিন্দার দিকে এগিয়ে দেয় এবার। এনেছিলাম তো অন্তুর জন্যই। নে তোরা ভাগ করে খা
জানতে চাইলে না কবে কোথায় তোমার আদরের ভাইয়ের বিবাহ? সাখাওয়াত হাসতে হাসতে বলল।
কবে এবং কোথায় তা তো বলবে
সাথীর কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে। দু’হাত উঁচিয়ে একটা নাচের ভঙ্গিমা করে।
আগামী মাসের ৫ তারিখ মানে কার্তিকের ২১
কী বলছ, তাহলে তো হাতে বেশি দিন নেই আমার স্কুল তোমার অফিস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মুখটা আবার হাঁড়ি সাথীর।
আমাদের পরীক্ষা অবশ্য নেই আম্মু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল। এবার জিশান মুখ খুলল। সাধারণত আব্বু আম্মুর কথার মাঝখানে ওরা সাক্ষী হয় না। নোয়া মামার বিয়ের তারিখটা জানতেই ওরা ছিল।
তাতো জানি- কিন্তু ছুটিছাঁটা কী অতো সহজে পাওয়া যায়!
শোনো, ওসব বলে লাভ নেই পাগলটার থুক্কু! তোমার আদরের ছোট ভাইয়ের বিয়েতে তো যেতেই হবেÑ সে রকম চিন্তা এবং ব্যবস্থা করতে লেগে যাওÑ দেখবে সব ম্যানেজ হয়ে গেছে। হাসতে হাসতে সাখাওয়াত বলল।
তোমার লাফানো দেখে মনে হচ্ছে তোমারি লেগেছে বুঝি! হি… হি… হি… সাথী একটু রসিকতা করলো।
আমার সময় তো শুধু লাফানো নাকি হরদম নেচেছি নাচ দেখতে আসতো আত্মীয়-স্বজনরা
হি… হি… হি… হি… জিশান অনিন্দার মিলিত হাসি।
হা:… হা:… হা:… হা:… সাখাওয়াতের ছাদ ফাটা হাসি।
সিজনটা কিন্তু মজার, একেতো শরৎ আবার শীতের আগমনী পরিবেশ। একটু একটু শীত। ঝলমলে আকাশে তারা আর ছায়াপথ। শুক্রপক্ষের চাঁদের আলো আর তোমাদের বিশাল বাড়ি জুড়ে আনন্দের বন্যা যা জমবে না সাথী!
কিন্তু কার সঙ্গে বিয়ে, কোন অঞ্চলের মেয়ে, তা তো বললে না কিছু কাব্য করতে লাগলে সাথীর বিরক্তি প্রকাশ।
এসব বিস্তারিত তোমার ভাই এসে বলবে। তবে এতটুকু জানা গেছে মেয়েটি আমাদের অঞ্চলেরই, আর সিলেট মহিলা কলেজে পড়ে বেশ বনেদি পরিবার ওরা।
ব্যস! এইটুকু!
আহ্হা তড়পাচ্ছো কেন সগীর দু’একদিনের মধ্যেই আমাদের নিতে আসবেÑ তখন সব বিস্তারিত জানতে পারবে।
সাথী হন হন করে ঘর থেকে বের হয়। বাইরে থেকে এসে কাপড় পাল্টানোর ফুরসত পায়নি। ড্রেসিং রুমে ঢোকার আগে ময়নাকে বলবে বিকেলের নাস্তাটা দিতে। বারান্দায় এসে ময়নাকে পেয়েও যায়।
ময়না, বিকেলের নাস্তাটা দাও- আমি আসছি বলেই ড্রেসিং রুমে ঢোকে।
জিশান অনিন্দা নীরবে ঘর ছাড়ে।
দুই.
টুং… টাং… টুং… টাং… টুং… টাং …
বেশ খানিকক্ষণ কলবেল বাজতে থাকে। কেউ এগিয়ে যায় না। ছুটির দিন বলে সাখাওয়াত লাঞ্চ সেরে বিছানায় কাৎ। পাশাপাশি আলসেমি করছে সাথীও। জিশান অনিন্দা যার যার টেবিলে। লেখার কাজ করছে। মামার বিয়েতে যেতে হবে দু’একদিন পড়াশোনা থাকবে শিকায় তোলা। তাই খানিক এগিয়ে না রাখলে সেকেন্ড সেমিস্টার পরীক্ষায় সিদ্ধ ডিম মিলতে পারে। বিশেষ করে অনিন্দার ভয় অঙ্কে। অঙ্কে শূন্য সে জীবনে না পেলেও ঐ শূন্যটাতে তার ভীষণ ভয়। ঐদিকে ময়নাও রান্না ঘরে গাজর সিদ্ধ করতে ব্যস্ত। বিকেলে হালুয়া করবে ম্যাডাম। তাই সিদ্ধ করে শিল-পাটায় বেটে রাখতে হবে এখুনি। সেও কলবেলের আওয়াজ শুনেও নড়তে পারছে না। তাতে চুলোর গাজর পুড়ে যেতে পারে।
টুং… টাং… টুং… টাং… টুং… টাং …
অনবরত বাজতেই থাকে। তার মানে আগন্তুক খুব ঘনি জন হয়তোবা।
ময়নাÑ এই ময়নাÑ বয়ড়া নাকি, কখন থেকে কলিং বেল বাজছে বলতে বলতে উঠে এগিয়ে যায় সাথী ড্রয়িং রুমের দরোজা খুলতে। আগে আই পয়েন্টে চোখ রাখে। দেখে কাঁধে ব্যাগ হ্যাট মাথায় কালো গেঞ্জি গায়ে লোকটা। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। দরোজার মুখোমুখি নয়। হঠাৎ সগীরের মত মনে হয়। কিন্তু না জানিয়ে হুট্ করে এভাবে আসার কথা নয়। যদিও সগীর তাদের নিয়ে যাবার কথা। সে তো দু’দিন পর। আই পয়েন্টে চোখ রেখে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করে। হ্যা, এবার চেনা গেছে সগীরই তো!
খুট্- শব্দ করে সিটকানি খুলে দেয়।
ও মা! এ যে সত্যি সগীর! কোত্থেকে? ভূত দেখছি নাতো? সাথীর উচ্ছ্বাস দেখার মতো। বাচ্চা মেয়েদের মতো লাফ দেয় দু’তিন বার।
কোত্থেকে আবার বন-জঙ্গল থেকে তোমরা যাকে বলো জীব-জন্তু পশুদের আবাসÑ হা:… হা:… হা:…হা:… প্রাণখোলা হাসিতে পরিবেশ গরম করে তোলে।
সেই জঙ্গলে একটা মেয়ে নাকি তোর সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছে?
হাসিমুখে সাথী জিজ্ঞাসা করে।
এখনো বুঝতে পারছি না কতটুকু রাজি চলো, ভেতরে গিয়ে সব খুলে বলি দুলাভাইকে হারিয়ে দিলাম তো! হা:… হা:… হা:… হা:… হা:… হা:… সগীরের হাসি চলতেই থাকে। বোঝা যায় সগীর বেশ স্ফূর্তিতে আছে।
থাম্! বোকার মত শুধু হাসবি না সাথী বিরক্তি প্রকাশ করে।
ড্রয়িং রুম পেরিয়ে আরো দু’দুটো রুম রেখে সোজা চলে আসে ওরা মাস্টার বেডরুমে। সাখাওয়াত একটা বই কপালের ওপর ধরে পড়ছিল। মন দিয়ে।
এই যে জিশানের আব্বু, আসামি হাজির! সাথী ঘরে ঢুকেই বলল।
পড়ার বইটা মুখ থেকে সরিয়ে দেখে সগীর, মানে তার শ্বশুরকুলের শেষ বংশ প্রদীপ মির্জা ইলতুৎমিশ সগীর ওরফে পাগল সগীর। তার সামনে জ্বল জ্যান্ত উপস্থিত। সে স্বপ্ন দেখছে না তো! কারণ বিয়ের আরো আট দিন বাকি। পাঁচ দিন বাকি থাকতে তেনার আসার কথা। আজ কেন!
‘পাগল সগীর’ খেতাবটা সাখাওয়াতেরই দেয়া। কিন্তু সগীর আসলে পাগল নয়। জিনিয়াস। দুনিয়ার সকল জিনিয়াস লোকই পাগলাটে টাইপের হয়। সগীর তেমন গোত্রের মধ্যে পড়ে। এমনিতে স্টুডেন্ট লাইফ ছিল খুবই ব্রাইট। এসএসসিতে মেধা তালিকায় দশের মধ্যে ছিল কততম যেনো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এইচএসসিতে স্টার মার্কস আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস-এ ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! সবার ছোট এই ছেলেটিকে নিয়ে তার শ্বশুরের ছিল বিরাট স্বপ্ন। কিন্তু সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়ে এখন সে টি গার্ডেনের ম্যানেজার। মাঝে রব তুলেছিল চাকরি-বাকরি করবে না, গোলামি সহ্য হয় না। চাকরি মানেই কারু না কারুর চাকরগিরি। গেল বিদেশে। আরো পড়াশোনা করবে। বলা নাই কওয়া নাই হঠাৎ হাওয়া। খোঁজ খোঁজ। অবশেষে এক মাস পর খবর এলোÑ আমি নরওয়ে। মানে! কিভাবে? কী উদ্দেশ্যে? কোন জবাব নেই। ঝাড়া দু’বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বলা যায়। বছরে দুটো কী তিনটে ফোন ছাড়া কোন যোগাযোগ নেই। দু’বছর পর হঠাৎ দেশে ফেরত। বেশি পড়াশোনা করে কী হবে? এটা তার উপলব্ধি। জীবন অল্প দিনের। কোন রকমে দিনগুজরান কর। আর আল্লাহ আল্লাহ কর। লম্বা দাড়ি রেখে পুরোদস্তর পীর সাহেব। দরগায় দরগায় পাগলদের সঙ্গে ঘুরে ফিরে। এভাবে গেল বছর দুয়েক। আবার দাড়ি গোঁফ ছেঁটে ক্লিন শেভ্ড। এবং এই বাগানের ম্যানেজারগিরি নেয়া। এটাতে বেশ লেগে আছে। দেশের চা-শিল্পের উন্নতি করতে গলদঘর্ম। বিয়ে থার ব্যাপারে এক কথা পাগলকে বিয়ে করবে কে! এই হচ্ছে সগীরের কেস হিস্ট্রি। তার বউয়ের প্রিয় ভাই। সাখাওয়াত এসবই ভাবছিল।
কী দুলাভাই! বাজিতে হারিয়ে দিলাম তো! এখন এখন কী হবে? হা:… হা:… হা:… সগীর হাসতে হাসতে বিছানায় বসে।
সগীর! তুমি হঠাৎ! আমরা তো এখনো প্রস্তুতি নিতে শুরু করিনি তোমার তো আসার কথা পড়শু মানে ২৬ তারিখ বিকেলেÑ
আগেভাগেই চলে এলাম কিছু কেনাকাটা করতে হবে না আব্বা জানালেন ঢাকা থেকে যেনো আপনাকে আপুকে নিয়ে কেনাকাটা সেরে আসিÑ
হা:… হা:… হা:…. হা:… সগীর আবারও হাসতে থাকে।
ইয়েস্! সেটা আমাদের মনে পড়েনি তো! ভাল করেছ এসে সাথী যাও যাও জলদি সগীরের খাবারের ব্যবস্থা কর গে।
সাথী এমনিতেই উসখুস করছিল উঠবে বলে। সগীরের খাবার দেবার জন্য। ময়না ময়না গলা ছেড়ে ডাকে সাথী।
জে ম্যাডাম! ময়নার কণ্ঠ শোনা যায়। পরক্ষণে দরোজার কাছে এসে হাজির। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দাঁড়ায়।
কী করছিলি?
গাজর সিদ্ধ করছিলাম ময়নার জবাব।
দেখছিস, কে এসেছে? সগীরের দিকে তাকিয়ে ময়নাকে জিজ্ঞেস করে। ময়না বেশ পুরোনা কাজের মেয়ে। সগীরকে সে চেনে।
মামা আইছেন, বড়ই খুশির খবর ময়না এক গাল হেসে দেয়।
এখন যা, মামার টেবিলে খাবার রেডি র্কগে আমি আসছি
সাথী টেবিলে খাবার সাজাতে বলে ভাবে জিশান অনিন্দাকে জানাতে হয় ওদের মামার খবর। ওদের রুম দুটো একদম কোনায়। প্রায় হাজার ফুট দূরে। সাখাওয়াত বাড়িটা বানিয়েছে জমিদারি স্টাইলে। বিঘেখানিক জায়গার ওপর বাড়িটা। একতলার বেশি ওপরে বাড়ায়নি। ছোট বড় মিলে বারোটা রুম। তিন হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে বাড়িটা। বাড়ির চারিধারে বাগান। এ কোণে কোন ঘটনা ঘটলে অপর কোণার লোকজন টের পায় না। সে কারণে জিশান-অনিন্দা জানতে পারেনি ওদের নোয়া মামার আসার ব্যাপারটা। সাথী ওদের জানাতে ওদিকে এগোয়।
জিশান-অন্ত, তোমাদের নোয়া মামা এসেছেন
ঘরে ঢুকেই হেসে হেসে বলল।
সত্যি! কোথায় আম্মু! ওদের মিলিত প্রশ্ন। টেবিলে লেখালেখি রেখে উঠে দাঁড়ায়। শোরগোল করতে করতে এগিয়ে যায় লম্বা লন দিয়ে। সাথী ওদের পেছন পেছন খানিকটা এসে ডাইনিং রুমে ঢোকে। ময়না তখনো টেবিলে খাবার গোছাতে ব্যস্ত।
ম্যাডাম! মামা কী শুঁটকি খাইবো? ময়না গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে।
শুঁট্কি খাইবো মানে তোর মামা শুঁট্িকর পোকা বলে রান্না ঘরের দিকে যায়। একটা সসপেনে গাজর সিদ্ধ হচ্ছিল। আরেক চুলোয় মুরগির গোশ্ত। এসব ব্যাপারে ময়নাই যথেষ্ট। কাকে কিভাবে খাবার পরিবেশন করতে হবে সব জানা। নিখুঁতভাবে করতে পারে। তবু সাথী এসেছে একটু পরখ করতে। দেখতে পেলো সব ঠিকঠাকভাবে ময়না দিচ্ছে।
ময়না, তোর মামাকে সালাদ করে দিস্ আর শোন্ খাওয়ার পর এক কাপ চা দিস্ মামাকে বলে চলে এলো বেডরুমে। যেখানে তার মনটা পড়ে আছে। এসে দেখলো সগীর নেই। মানে নির্ধারিত ঘরে চলে গেছে। ভাগ্নে-ভাগ্নিরা মামাকে নিয়ে গেছে হয়তো।

তিন.
বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি ঝরে। রাতে শারদীয় হিমটা একটু জেঁকে বসার আয়োজন। সূর্যালো বিকেলেই লোপাট। বৃষ্টির দাপাদাপি। সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক তাপের চেয়ে দু’এক ডিগ্রি কম। বোঝা যাচ্ছে।
আম্মুর কাছ থেকে আগেভাগে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে চলে আসে মামার ঘরে আড্ডা জমাতে জিশান অনিন্দা।
সগীর একটা নক্সিকাঁথা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে শুয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। চা-পাতার ওপর একটা আর্টিক্যাল মনোযোগ দিয়ে। আর্টিক্যালটিতে বাংলাদেশের দেড় শ’ বছরের চা-শিল্পের একটা ইতিহাস তুলে ধরেছে। বর্তমানে চা-শিল্পের উন্নতির জন্য কী করা উচিত সে ব্যাপারেও কিছু পরামর্শ রেখেছে।
মামা, আসতে পারি? জিশান অনিন্দার গলা।
এসেই তো পড়েছিস, আবার অনুমতি কী? আয় আয়, এতো জলদি ছুটি! ম্যাগাজিনটা ভাঁজ করে পাশে রাখে।
আম্মুকে বলে ছুটি মঞ্জুর করিয়েছি অনিন্দা হেসে বলল।
গুড্! বিছানায় উঠে বোস্ ! বেশ হিম পড়েছে। রাতে আরো পড়বে। শীতের আগাম জানান দিচ্ছে। তোদের মিরপুরে প্রাকৃতিক পরিবেশের মজাটা একটু মেলে। ঢাকার অন্য অঞ্চলে শীতকালেও তেমন হিম দেখা যায় না। তোর আব্বু আবার বাগানবাড়ি বানিয়েছে। বেশ ভালোই লাগে। বন-জঙ্গলে বাস করে অভ্যাস তো!
মামা, তুমি বন-জঙ্গলে একা একা থাকো, খারাপ লাগে না?
অনিন্দা হাত নাচাতে নাচাতে চোখ মুখ ভেংচিয়ে বলল।
এবার থেকে মামাকে একা থাকতে হবে না মুচকি হেসে জিশান ।
হুম! সে কথাই ভাবছি মুচকি হেসে জবাব দেয় মামা।
আচ্ছা মামা, তুমি না বলেছিলে, ওসব ঝামেলায় জড়াবে না, সারা জীবন মামা থাকবে, আমাদের নিয়ে এখানে সেখানে বেড়াবে এখন তুমি তো সংসারী হচ্ছো আমাদের কী হবে?
হুম! সে কথাই ভাবছি বনের পশু বনেই সুন্দর
তাহলে তুমি খাঁচায় ধরা দিলে কেন্? অনিন্দা হেসে হেসে বলল।
ধরা পড়ে গেছি সেদিন একটা ম্যাগাজিনে দেখলাম ২১শে ডিসেম্বর পৃথিবীতে ঘটবে মহাপ্রলয়!’
কী বলছ পৃথিবী ধ্বংস হবে! জিশানের উদ্বেগমাখা প্রশ্ন।
মামা, তোমার কথা বুঝতে পারলাম না বুঝিয়ে বল। অনিন্দা আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসল। গালে হাত দিয়ে মামার মুখের দিকে দৃষ্টি।
বলছি শোন, খ্রিষ্টপূর্ব ৩১১৮ থেকে মধ্য আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে মায়া সভ্যতার প্রচলন ঘটে। মায়ানরা ছিলেন গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় দক্ষ। এ কারণেই তারা তৈরি করতে পেরেছিল হাজার বছরের বর্ষপঞ্জিকা। তাদের বর্ষপঞ্জিতে ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বরের পর আর কোন তারিখ নেই। বলে দুই ভাগ্নে-ভাগ্নির দিকে তাকায় সগীর। বুঝতে চায় ওরা বিষয়টায় মজা পাচ্ছে কতটুকু।
তার মানে ঐদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে? জিশান আরো কাছে এগিয়ে এসে বলল।
শোন্, মন দিয়ে শোন্, প্রায় ছয় হাজার বছর আগে মায়া সময় চক্রের প্রচলন হয়। মায়া জ্যোতির্বিদেরা বলেন, ৫১২৫ বছরে একটা সাইকেল শেষ হয় এবং পৃথিবী বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ইতোমধ্যে পৃথিবীর তিনটি সাইকেল শেষ হয়েছে এবং তিনবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ বছরের ২১শে ডিসেম্বরে মায়া সময় চক্রের চতুর্থ সাইকেল শেষ হবে। এ কারণে অনেক জ্যোতির্বিদ বলছেন, এই চক্র শেষ হওয়া মাত্রই নিবারু নামে একটি গ্রহ পৃথিবীর ওপর শক্তিশালী আঘাত হানবে বড় গাড়ি ছোট গাড়িকে ধাক্কা দিলে যা হয় তার মানে পৃথিবী ধ্বংস হবে। সে কথা ভেবে ভাবলাম বলা তো যায় না, তাই সংসারটা না করেই ধ্বংস হয়ে যাবো সেটা কিভাবে হয়। তোর নানাজানও বেশ চেপে ধরলো। রাজি হয়ে গেলাম। ভাল করিনি? হা:… হা:… হা:… হা:… হা:… সগীর উচ্চস্বরে হাসে।
কিন্তু মামী কি তোমার সঙ্গে জঙ্গলে থাকতে রাজি হবে? অনিন্দা বেশ গম্ভীরভাবে বলল।
রাজি না হলে আমি রাজি হতাম না কি! বোকা মেয়ে! শোন্ তোর মামীকে যেদিন দেখতে গেলাম বললাম, পৃথিবীটা বুঝি ধ্বংসই হয়ে যাচ্ছে শিঘ্রী তাই বিয়েটা করতে রাজি হয়ে গেলাম। শুনে খিল খিল করে হেসে দিলো। আর বলল আমি মানুষজন ছাড়া থাকতে পারি না।
হি… হি… হি… হি… হি… অনিন্দা হেসেই খুন।
হি… হি… হি… হি… হি… থাম্ ! বোকার মত হাসে! জিশান অনিন্দাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়।
তার মানে মামী বলেছে তোমার সঙ্গে বনে মানুষজন ছাড়া থাকতে পারবে না, বুঝেছো? অনিন্দা পাকা বুড়ির মত। ক্লাস ফাইভে পড়–য়া মেয়ের পাকামো দেখে সগীর খুব অবাক হয়।
ওমা! বুড়ির মত কথা বলে যে! আমি কী বলেছি তোর মামীকে জানিস? বলেছি বাংলাদেশ একটা ভূমিকম্প ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল, ধাক্কা দিলে শহরাঞ্চল হবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার যে কী ধ্বংস সাধিত হবে তা ভাবাও কঠিন সেই মহা ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাবে গ্রাম-গঞ্জ এসব বন-জঙ্গলের অধিবাসীরা। ব্যস, তোর মামী মুচকি হেসে বলল বন-জঙ্গলেও তো একটা আলাদা সমাজ আছে।
মামা, এসব থাক, এবার বলো তুমি তো বিয়ে-টিয়ে নিয়ে থাকবে ব্যস্ত আমাদের কী হবে, আমাদের নিয়ে বেড়াবে কে? অনিন্দা বলল। হাত দিয়ে মুখের সামনে চলে আসা চুলগুলো সরিয়ে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল কী ভাইয়া, ঠিক বলিনি?
একদম ঠিক, মামা, তোমাকেও আমরা হারাচ্ছি বোধ হয় জিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আ হা….
দুর বোকা, বিয়ের সব আয়োজন করবে তো অন্যেরা, তোদের নানাজান, মামারা, তারপর তোর আব্বু-জমিদারকা লাড়কা আমি শুধু পাগড়ি আচকান পরে হাতির পিঠে চড়ে বসবো
মামা, তুমি হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে যাবে? জিশান হাসতে হাসতে বলে।
তোর নানাজী হাতির পিঠে চড়ে বিবাহ করেন। তোর আব্বু হাতির পিঠে চড়েই আসে। তোর তিন মামাও বিয়ে করেন হাতির পিঠে চড়ে। এটা আমাদের ঐতিহ্য-পারিবারিক রেওয়াজ। বুঝেছিস! তোর বিয়েও হাতির পিঠেই চড়ে হবে।
দুর! মামা কী যে বলো না জিশান লজ্জা পায়। মুখ নিচু করে।
কিন্তু হাতি আসবে কোত্থকে? অনিন্দা জানতে চায়।
আমাদের নিজেদের হাতি আছে না! জানিস না, আমাদের দু’দুটো হাতি। শ্রীমঙ্গলের বনে কাঠ বহন করে!
না, জানতাম না মামা কোনদিন বলোনি অনিন্দা বলল।
তাহলে এবার তুমি আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়?
এবার বেশি দূর নেবো না। নানা বাড়ি যাচ্ছিস নানার অঞ্চলের দশটা পাঁচটা না দেখলে চলবে কেন, কী বলিস?
মামা, তোমাদের জেলায় একটা মস্তবড় দিঘি আছে না, রানী নাকি ডুবে মারা যায়
দিঘি তো আমাদের দেশে ম্যালা তুই বোধ হয় বোধ হয় কমলা রানীর দিঘির কথা বলছিস হ্যাঁ, সেটা অবশ্যই একটা দর্শনীয় বস্তু। ঐ দিঘিকে কেন্দ্র করে একটা মজার উপকথার প্রচলন আছে। কতটুকু সত্য তা জানি না।
মামা, বল না সেই কাহিনী, শুনবো আমরা! অনিন্দা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলল। সে কখনো স্থির থাকে না।
হ্যাঁ, মামা, আমাদের সেই গল্পটা শোনাও! জিশানও আঙুল উঁচিয়ে বলল। আঙুল দিয়ে ঐ গল্পটা বলার ভঙ্গি করে।
প্রথমেই বলছি, আমাদের অঞ্চলের ঘটনা হলেও আমি তেমন ভালোভাবে জানি না। এক কাজ করলে কেমন হয়, গল্পটা আমরা যেদিন দিঘি দেখতে যাবো, সেদিন দিঘির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলব।
না, একটু হলেও বলো মামা! অনিন্দা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে আব্দার জুড়ে।
হা…. উ… ই… জিশানের চোখে ঘুমপরী আসন পাততে এসেছে। বার দু’য়েক হা করে সে ‘হাই’ তুলল। কিন্তু গল্প শোনার জন্য জোর করে চোখ মেলে রেখেছে। তা আর কতক্ষণ সম্ভব হবে কে জানে।
সগীর লক্ষ্য করল। জিশানের চোখে ঘুমপরী আসন পাততে এসেছে, আজ থাক সগীর জিশানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল।
গল্প বললে আমার ঘুম চলে যায় মামা, তুমি শুরু কর। এক ঝাঁকুনি দিয়ে সোজা হয়ে বসে জিশান।
গৌর গোবিন্দের নাম শুনেছিস তোরা?
হ্যাঁ, তুমি একদিন বলেছিলে হযরত শাহ জালালের সঙ্গে যার যুদ্ধ হয়। পরাজিত করে শাহ জালাল সিলেট বিজয় করেন।
গৌর গোবিন্দ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় সে ছিল সমুদ্র সেনের পুত্র। তার রাজ্য ছিল বিশাল। গৌর নামের রাজ্য ছাড়াও প্রাচীন শ্রীহট্ট অর্থাৎ আজকের সিলেটের একাংশ তার শাসনাধীন ছিল। একবার গৌর রাজ্যের অধিপতি যাকে গৌর গোবিন্দ বলা হতো, তার মায়ের কঠিন অসুখ হলো। রাজ্যের সকল বৈদ্যের চিকিৎসা ফেল, ব্যর্থ। কোন চিকিৎসাই যখন গোবিন্দের মায়ের আরোগ্য দিতে পারছিল না তখন রাঢ় দেশ হতে চক্রপানি দত্ত নামে এক বৈদ্যকে ডেকে আনা হলো। সেই বৈদ্যের চিকিৎসায়, গোবিন্দের মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ‘মহারাজা’ গৌর গোবিন্দ তখন খুশি হয়ে বৈদ্য চক্রপানি দত্তকে শ্রীহট্টের উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য ও সমতল মিলিয়ে একটি বিশাল পরগনা দান করেন। চক্রবর্তী উপাধি দিয়ে শাসন পরিচালনার ক্ষমতাও দেন। কিন্তু চিকিৎসক চক্রপানির শাসন কাজ পছন্দের নয় বলে পুত্র মহীপতি চক্রবর্তীকে তা দান করে পূর্বের রাঢ় রাজ্যে ফিরে যান। মহীপতির পৌত্র রঘুপতি চক্রবর্তীর স্ত্রীই হলেন কমলা রানী চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন যেমন সুন্দরী, গুণবতী শিক্ষিতা এবং প্রজাবৎসল বা প্রজাদরদি মহীয়সী নারী হিসেবে বিখ্যাত। এসব অবশ্য লোক মুখে শোনা-কিংবদন্তি।
মামা, তোমার ইতিহাস কিংবদন্তি শুনতে শুনতে রাত বেড়েই চলেছে গল্পটা বলো না প্লিজ! অনিন্দা বলল। ওর আসলে এসব ইতিহাস শুনতে ভাল লাগে না। কঠিন মনে হয়। মনেও থাকে না ছাই! গল্পটাই মনে থাকে তার, আর রাজা-রানীর মজার গল্প শুনতে বেশ লাগে।
এবার গল্পটা বলছি। ঐ রাজ্যে সুপেয় পানির অভাব তীব্র। রানী বললেন পানির জন্য দিঘি কাটা হোক। রাজা রঘুপতি শত শত মণ ধান আর স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে বিশাল দিঘি কাটালেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দিঘিতে পানি ভরে উঠতে চায় না। এখানে সেখানে অল্প স্বল্প পানি উঠলেও বিশাল দিঘি পানি শূন্য। আহ্নিক-বাহ্নিক নানা নৈবদ্য-আচ্চা করেই চলেছেন রাজা। দিঘিতে পানির তবু দেখা নেই। বৃষ্টিরও কোন দেখা নেই। পানির অভাবে জন জীবনে নাভিশ্বাস। এমন সময় রাজ্যের প্রধান পূজারী স্বপ্ন দেখলেন রানী কমলা যদি ঐ দিঘিতে সাতদিন সাত রাত পূজা-আচ্চা দেন, তবেই পানিতে ভরে উঠতে পারে দিঘি। রাজা রঘুপতি বললেন এটা অসম্ভব। তার প্রাণেশ্বরী রানী কিভাবে সাত দিন সাত রাত দিঘিতে অবস্থান করবে! এটা মানা যায় না। পূজারীকে বলেন অন্য কোন নারীকে দিয়ে তা করাতে। কিন্তু রানী কমলা পূজারীর এই স্বপ্ন আজ্ঞা শুনেই রাজি হয়ে গেলেন। বললেন প্রজারা পানির জন্য কষ্ট করছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে। জীবন দুর্বিষহ। তিনি রাজি পূজা দিতে। কষ্টের বিনিময়ে যদি প্রজাদের উপকার হয় তা তিনি কেন করবেন না! রাজা বললেন, রানী তা হয় না। শুরু হলো রানীর বাক্যুদ্ধ। রানীর অনশন। রাজা নিরুপায় হয়ে বাধ্য হলেন রানীর দিঘিতে পূজা-আচ্চার আয়োজন করতে।
মামা, রানী দিঘিতে কী করলেন?
হয়তো দিঘিতে ছিলেন না দিঘির আশপাশে ঘর করা হয়েছিল, সেখানটাতে থাকতেন। মাঝে মাঝে পূজা দিতে দিঘিতে নামতেন। ঠিক সাত দিন সাত রাত পর শেষ প্রহরে আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেল। কড়্ কড়্ কড়্ কড়্ শব্দে বাজ পড়তে থাকে। মুষলধারায় বৃষ্টি নামে। গোটা দিঘি ও আশপাশ অঞ্চলে বৃষ্টি। আর মাটির ভেতর থেকে কল্ কল্ কল্ কল্ করে পানির স্রোত উঠতে থাকে। একরাতে ভরে গেল বিশাল দিঘি পানিতে। কয়েক শ’ একর জমিও বিশাল দিঘি পানিতে ভরে থৈ থৈ করে উঠলো। রানীর ঘটল সলিল সমাধি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও রানীকে আর পাওয়া গেল না। শত শত জেলে জাল ফেলে তন্ন তন্ন করে খুঁজে নিষ্ফল হলো।
রানীকে আর পাওয়াই গেল না? অনিন্দার দুঃখভরা কণ্ঠে প্রশ্ন।
সগীরের ভয় তাড়ানো হাসি। না আর পাওয়া যায়নি। রানীর বিয়োগ বেদনায় রাজা রাজকর্ম ছেড়ে দেন। সঠিক কী ঘটেছিল তা তো এতো দিন পর জানা সম্ভব নয়। সেই থেকে এর নাম হয়, কমলা রানীর দিঘি। সত্যি এটা একটা দেখার মত দিঘি। শোনা যায় আজও সেই রানীকে দিঘিতে পানসী নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াতে সখিদের নিয়ে স্নান করতে দেখা যায়। বিশেষ করে গভীর জ্যোৎস্না রাতে। অনেকে বেড়াতে এসে রানীকে পানসীতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
মামা, আমরাও যখন দিঘি দেখতে যাবো, রাতেই যাবো যদি রানীকে দেখা যায় জিশান বলল।
ওরে বাপ্স! রাতে এতো বড় দিঘি দেখতে যাওয়া আমার ভয় ভয় করবে এখনই গায়ে কাঁটা দিয়েছে
জিশান-অনিন্দা, গুড্ বাই সবাই ঘুমের রাজ্যে ডুব দিয়ে স্বপ্নে দিঘি দেখোগে! হা:… হা:… হা:… হা:…

চার.
একদিকে একমাত্র জামাই সাখাওয়াতের শ্বশুর বাড়ি যাওয়া, একমাত্র আদরের মেয়ে সাথীর বাপের বাড়ি ফেরা, আর বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ ছেলের বিয়ে উপলক্ষে বাজার-সদাই করে বাড়িমুখো হওয়া, তাই স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে সবাই হয়রান। দিন হলো পার, গভীর রাত অবধি চলল স্যুটকেস টানাটানি।
দেখতে দেখতে নতুন পুরনো মিলে স্যুটকেস ভরে উঠলো চারটে। এছাড়া ছোটখাট হ্যান্ড ব্যাগ, ফ্লাস্ক, পানির বোতল, টুকটাক বিরাট লটবহর। অবশ্য একটা বড় মাইক্রোবাস ঠিক করা হয়েছে ওদের বহনের জন্য।
খুব ভোরে ঢাকা যাত্রা করবে ওরা রাজনগরের উদ্দেশে। মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত রাজনগর থানায় জিশান অনিন্দার নানা বাড়ি। বিশাল বাড়ি। সাতাশ বিঘে জমির ওপর বাড়িটা। মানুষের নিত্য দিনের আহার-বিহারে যা যা প্রয়োজন ওদের নানা বাড়ির চৌহদ্দিতে পাওয়া যায়। উৎপন্ন হয়। এমনকি চাল ভাঙানোর কলও বাড়ির ভেতর।
সারা রাত সাখাওয়াত সাথী তেমন ঘুমোতেই পারেনি। একদিকে গোছানো শেষ হতেই চায় না অন্য দিকে বাসাটা একেবারে ফাঁকা রেখে যাওয়া। সাখাওয়াতের বিজনেস পার্টনার বন্ধু আজীম বলেছে রাতে একটা লোক রাখার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু দিনে? আজকাল যা ঘটনা দিনের আলোয় ঘটে। তাছাড়া আরেকটা পিছুটান সাখাওয়াতকে খুব ভাবিত করে সাধের গাছের যত। এ ক’দিন গাছগুলো অভিভাবকহীন অযতে পড়ে থাকবে। পানিটানি দেয়াও হবে না হয়তো। যদিও এসব দেখার জন্যই আজীম লোকটাকে দেবে। কিন্তু ও বেটা তো বুঝবে না কোন গাছ কতটুকু পানি খায়। বিশেষ করে কিছু কলাম করা গাছ পানি না পেলে দু’তিন দিনে শুকিয়ে লাকড়ি হয়েও যেতে পারে।
এসব ভাবতে ভাবতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সাখাওয়াত। ঘড়ির দিকে নজর গেল রাত পৌনে তিনটে। রাতের দুই তৃতীয়াংশ চলে গেছে। ক্লান্তি সমস্ত শরীর জুড়ে। ঘুম হয়তো আসবে। কিন্তু যখন ঘুমটা জেঁকে বসবে তখনই ভোরের আজান শোনা যাবে। ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া চারটের। আজানের একটু আগেই ওঠার ইচ্ছে। কিন্তু শরীর বিট্রে করতে পারে। বিকেলে এবং মাঝ রাতে এক পশলা ভারী বৃষ্টি হওয়ায় শীত শীত ভাবটা পৌষের মতো। তাই নক্সিকাঁথাটা বুক অবধি টেনে নেয়।
সাথীও শুয়ে পড়ে। তার বার বার মনে হতে থাকে বুঝি এটা ওটা গোছানোতে বাদ পড়লো। বেশ অনেকদিন পর বাপের বাড়ি যাচ্ছে। সবার জন্য একটু আধটু উপহার নিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সময়ের অভাবে কেনাকাটার ফুরসত মেলেনি। সব সময় গেছে সগীরের বিয়ের কেনা-কাটায়। বিয়ের জিনিস বলে কথা। পছন্দ করাই কঠিন।
শাড়ি কিনতে গিয়ে বিপত্তি। রঙ নিয়ে দেশ নিয়ে। কোন রঙের শাড়ি হবে। সগীর আহাম্মকটা বলল আপু, বিয়ের শাড়ি তো লাল রঙেরই জানি। এই হলো ওর জ্ঞানের দৌড়। বললাম, এতো দামি একটা শাড়ি কিনবি বিয়ের পরও যাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরতে পারে এমন রঙের নে। আমতা আমতা করে। কী জানি আপু আমি জানি লাল রঙের হয় বিয়ের শাড়ি। সাখাওয়াতকে জিজ্ঞেস করতেই বলল আমার বউ সাজাচ্ছি, আমার চয়েস জানতে চাচ্ছ? এরপর সগীর ইন্ডিয়ান শাড়ি নেবে না। অগত্যা দেশী কাথানের দিকে যেতে হলো। এসব নানা কথা সাথীর মনে জাগছিল। এতো ক্লান্তি সমস্ত দেহ জুড়ে তবু ঘুমকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল নানা কথা, আবেগ। আর বাপের বাড়ি ফেরার উত্তেজনা।
জুলহাস ঠিক ফজরের আজানের সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে হাজির। যখন যেখানে ওরা যাক জুলহাসের ডাক পড়ে। সাখাওয়াতের বিজনেস পার্টনার মেহদির গাড়ি। আর ড্রাইভার জুলহাস নির্ধারিত। একটু পুরনো মডেলের মাইক্রো। কিন্তু খাঁটি জাপানী ও বনেদি গোত্রের। টয়োটা কারাভান। হাইওয়েতে গাড়ি ফিন ফিন করে চলে। আর ড্রাইভার জুলহাসও পাকা চালক। এর আগে জুলহাস সাখাওয়াতের ফুফাতো ভাই এনাম চৌধুরীর গাড়ি চালাতো। তাই, এদের আত্মীয়-স্বজনদের ঘর-বাড়ি মানুষ-জন সব চেনা। ওর ড্রাইভিংয়ে লং ওয়েতে জার্নি করতে বাচ্চারা সাথী কমফোর্ট ফিল করে।
টুং… টাং… টুং… টাং… টুং… টাং…
কলবেল বেজে উঠলো। এর আগেই গাড়ির হর্ন জানান দিয়েছিল জুলহাসের আগমন। সাথীই টের পায় প্রথম। সাথীর চোখে ঘুম আসার সুযোগ পায়নি। খুব ভোরে রওয়ানা দেওয়ার প্রোগ্রাম থাকলে সাথী এমনিতেই টেনশনে ঘুমোতে পারে না। এপাশ ওপাশ করেছে। সাখাওয়াত অবশ্য খানিকটা ঘুমিয়েছে। নাক ডাকাও শোনা গেছে।
এ্যাই ওঠো! জিশানের আব্বু! পিঠে বার কয়েক ধাক্কা দিয়ে ডাকে সাথী সাখাওয়াতকে।
কী! কী! আজান হয়ে গেছে?
তার মানে আজানের ধ্বনি সাখাওয়াতের কানে ঢুকেনি।
আজান হয়ে গেছে। একটু আগে। জুলহাস এসেছে। সাথী বিরক্তি প্রকাশ করে। হিংসে হয় বুঝি জিশানের আব্বুর প্রতি। সে ঘুমোতে পারেনি বলে।
টুং… টাং… টুং… টাং… টুং… টাং…
আবার বেল বেজে উঠল।
উঁ…. হুঁ…। সাখাওয়াত আড়মোড়া ভেঙে এক ঝটকায় ওঠে। এগিয়ে যায় ড্রয়িং রুমের দিকে। দরোজা খুলতে। ওদের বেডরুম হতে ড্রয়িং রুম দুটো ঘর রেখে।
স্লিপার পায়ে গলিয়ে ছুটে যায় হন্তদন্তভাবে।
একটু পর সাখাওয়াত ফিরে আসে। সাথী ঘরে নেই। বাথরুমে। সাথীর অভ্যাস সকালেই বাথ সেরে নেয়া। কোথাও জার্নি করলেও এর অন্যথা সে করে না।
বিছানায় বসে ভাবে এ মুহূর্তে সগীর জিশান ও অনিন্দাকে ডেকে তোলা দরকার। এদিকটার খবর ওদের অজানা। তাছাড়া বেশ রাত অবধি ওরাও গোছানোতে ছিল ব্যস্ত। ক্লান্তি ওদের দেহে নেমে এসে বলছে ক্ষমা করো ক্ষমা করো! কিন্তু এখনতো আর ক্লান্তিকে ক্ষমা করা যাবে না।
সাখাওয়াত প্রথমে আসে সগীরের রুমে। দেখে সগীর পশ্চিমমুখী। নামাজ পড়ছে। বাহ্ নিজে নিজেই উঠে গেছে! মনে মনে খুশি হয়। আর উঠবে না, বিয়ে করতে যাচ্ছে, মনের খুশিতে ঘুম কি আর আসে! এরপর আসে জিশানের ঘরে।
জিশান জিশান
দু’ডাক দিতেই সাড়া পাওয়া গেল। জি আব্বু
ওঠো, গাড়ি এসে গেছে। মুখ ধুয়ে ওজু করে নামাজ পড়ে নাও।
জিশান অবশ্য নামাজ নিয়মিত পড়ে। অনিন্দা সব ওয়াক্ত না পড়লেও দিনে তিন-চার ওয়াক্ত পড়ে। সাথী এ ব্যাপারে সতর্ক। এরপর আসে অনিন্দার ঘরে।
অন্তু, মা অন্তু মা-রে! অন্তু মা, ওঠ্ মা গাড়ি এসে গেছে।
অনিন্দা একটু ঘুমকাতুরে। সুইচ অন করে লাইট জ্বালে।
অন্তু, অন্তু, মা ওঠ না মা-রে, গাড়ি এসে গেছে
উঁ…. হুঁ…. জ্বালাচ্ছ কেন আব্বু ঘুমের মধ্যেই অনিন্দার কথা।
তাহলে তুমি থাক বাড়ি পাহারা দাও আমরা চললাম।
অনিন্দার কানে বুঝি এবার পানি গেল। নড়েচড়ে উঠল।
আমরা চললাম বলে সাখাওয়াত হাঁটা দিলো। পা দিয়ে জোরে জোরে চলে যাওয়া শব্দ করলো।
এবার কাজ হলো। লাফ দিয়ে উঠলো।
আমাকে রেখে যেয়ো না অনন্দিার কাঁদো কণ্ঠ।
তাহলে জলদি এসো
সাখাওয়াত বেডরুমে এসে দেখে সাথীও ফজরের নামাজ পড়ে নিচ্ছে। গোসল সেরে বের হয়েই সাথী নামাজ পড়ছে। নামাজ তার নিজের পড়া এখনো হয়নি। বাথরুমে ঢোকে। ওজুর জন্য। ওজু করে এসে দেখে অনিন্দা তাদের বিছানায় কাৎ। ওদিকে না যেয়ে টাওয়াল দিয়ে হাত-মুখ মুছে নামাজে দাঁড়ায় সাখাওয়াত। সাথীর পাশেই আরেকটা জায়নামাজ পেতে।
অন্তুÑমা অন্তু, ঘুম শেষ হলো না? যাও, বাথরুমে গরম পানি রাখা আছে গোসল করে নামাজ পড়ে রেডি হয়ে নাও। নামাজ সেরে উঠে সাথী অনিন্দাকে বলল। কিন্তু তাতেও নট নড়নচড়ন অনিন্দার।
অন্তু, তাহলে তুমি থাক, আমরা বেরিয়ে পড়ি এমন আলসে মেয়ে হয়েছে না।
আম্মু, রাতে আমার একদম ঘুম হয়নি কী সব স্বপ্ন দেখেছি
অনেক রাত অবধি জাগলে ঘুম হয় না আমি তো মোটেই ঘুমোতে পারিনি গাড়িতে ঘুমিয়ে নেবো তুমিও গাড়িতে ঘুমিয়ো। পেছনের পুরো তিনজনের সিট তোমার জন্য।
অনিন্দা এবার ওঠে। ধীরে ধীরে হেঁটে আসে নিজ ঘরে। এটাচ বাথ। টাওয়াল জামা-কাপড় নিয়ে ঢুকে পড়ে বাথরুমে।
জিশান রেডি হয়ে নেয় সবার আগে। সগীরও রেডি হয়ে বিছানায় শুয়ে। এক হাঁটুর ওপর আরেক হাঁটু তুলে অপেক্ষা করছিল দুলাভাইয়ের ডাকের। জিশান মামার রুমে এসে দেখে মামাকে।
কী জিশান বাবু, রেডি?
কখোন!
দেখতে এলাম তুমি রেডি কী না। আমিও ফিটফাট অনেকক্ষণ! দেখগে, তোর আব্বু এখনো বাথরুমে। জমিদারকা লাড়কা গদাই লস্করি চালে চলতে অভ্যস্ত হা:… হা:… হা:… হা:…
কী, সগীর এখনো শুয়ে? সাখাওয়াতের হঠাৎ প্রবেশ। সাখাওযাত ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে সুগন্ধে ভরে গেল।
মামা, আব্বু জমিদারকা লাড়কা ঠিকই বাট লেজি না
কী, সগীর আমাকে লেজি বলেছে? সাখাওয়াত কৃত্রিম রাগ দেখায়।
দুলাভাই, আপনার পারফিউমটার নাম কী? খুব সুন্দর ঘ্রাণ আসছে
সগীর এবার দুলাভাইকে একটু খুশি করতে চায়। একটু আগে ভাগ্নের কাছে যে দুর্নাম করেছে তা মোচন করার জন্য।
ব্রান্ডের নাম টাম আমার মনে থাকে না ভাই-ভাবীরা লন্ডন থেকে যখন আসে গোটা কয়েক নিয়ে আসে। লোক মারফতও পাঠায়। সবাই জানে আমি সুগন্ধি বিলাসী। এক সময় আমাদের সুগন্ধির ব্যবসা ছিল। আমাদের আগরের বাগান ছিল।
আচ্ছা দুলাভাই তা তো জানতাম না আপনারা গন্ধবণিক ছিলেন তাহলে!
ঠিক গন্ধ বণিক নয় আমরা আগরের গাছ চাষ করতাম। সেখান থেকে আগরের কাঠ সংগ্রহ করে, প্রসেস করে আতর বের করে দুবাই এক্সপোর্ট করা হতো। এটা আমার দাদার আমলে।
বাহ্, একটা মজার জিনিস জানলাম। শুনেছি আমার দাদারাও আগরের ব্যবসা করতো। সগীর দুলাভাইয়ের সঙ্গে তাল দেয়। খোঁচা-খুঁচি করা থেকে বিরত থাকে। তবে সুযোগ পেলে এই ‘গন্ধ-বণিক’ শব্দটা দিয়ে দুলাভাইকে ঘায়েল করবে মনে মনে ঠিক করে রাখে। কারণ ঐ শব্দে দুলাভাইয়ের আপত্তি আছে মনে হয়। তবে দুলাভাই আর যাই বলুন, আপনার পারফিউমটা ভীষণ ভীষণ ভাল লাগছে ব্রান্ডটা কী দেখতে হবে
আমি বলি আমি বলি আব্বু সম্ভবত ইসা মেখেছে। ঠিক বলিনি?
হতে পারে। ড্রেসিং টেবিলের পারফিউম কর্নার থেকে গোলাপি রঙের একটা প্যাকেট তুলে তার ভেতর হতে ছোট্ট একটা বোতল বের করে মেখেছি খেয়াল করিনি।
দুলাভাই, এইবার আপনি ধরা পড়ে গেছেন একেতো আপনারা গন্ধ-বণিক ছিলেন মানে সুগন্ধি সম্পর্কে অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে উপরন্তু আপনি একজন সুগন্ধি-বিলাসী, মানে সুগন্ধিপ্রেমিক, আপনার পক্ষে নাম না জেনে, ব্রান্ড না দেখে, সুগন্ধি ব্যবহার করা একটা অসম্ভব ব্যাপার। এবার বলুন, আমি ঠিক বলিনি?
এই যে তোমরা এখানে? গল্প করছিস সগীর গল্প করার সময় এখন! সাথী হন্তদন্ত হয়ে সগীরের ঘরে প্রবেশ করেই প্রথম আক্রমণ চালাল ছোট ভাইটির ওপর।
আর তোমার আক্কেলটা কী, শালার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলে ও না হয় পাগল, তুমি তো না
দেখো সগীর, আমি যদি তোমাকে রসিকতা করে পাগল টাগল বলি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ এখন সে নিজেই তা বলছে
আপনিও প্রতিবাদ করুনÑ হা:… হা:… হা:… সগীর হাসতে থাকে।
আপু, তোর পারফিউমটার ঘ্রাণ দারুণস! দুলাভাই তো গন্ধ-বণিক ছিলেন কিন্তু বলতে পারলেন না কোন ব্রান্ডের পারফিউম ইউজ করেছেন। তোরটা বলতে পারবি?
পারবো না কেন তোর দুলাভাইয়ের অনেক ব্রান্ডের এসেন্স ব্যবহার করে তাই কখন কোনটা ফুস্ ফুস্ করে মাখে বলতে পারে না আমি মাত্র দু’টো তিনটে ব্রান্ডের মাখি তাই বলতে পারি আমি মেখেছি হ্যাভেনলি ড্রিম, ফ্রান্সের।
যাক্ তুমি তবু নাম বলতে পারলে।
আম্মু, আমি রেডি এই দেখো ঠিক আছে না? অনিন্দা কাপড় পরে ফিটফাট হাজির।
ব্যস! তাহলে চলো, নাস্তার টেবিলে।
ওরা রাজনগর যাবে বলে ময়নাকে আগেই ওর বোনের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ে বাড়ির হট্টগোলের মধ্যে ময়নাকে নিতে চায়নি। তাই, নাস্তা টেবিলে সাথী সাজিয়ে রাখে। পাউরুটি, বাটার, ডিম পোচ, চা আর খানিকটা মুরগির তরকারি। সাথী জার্নির আগে তেমন খায় না। অনিন্দাও একই পথের পথিক। খাওয়ার ব্যাপারে আপত্তি নেই সাখাওয়াত, জিশান ও সগীরের।
খাওয়ার টেবিলে ওরাই এসে বসলো।

পাঁচ.
ছুটির দিন বলে খুব ভোরে রওনা দেয়ায় যানজটের যন্ত্রণায় পড়তে হয়নি।
ঢাকা-টু-রাজনগর মৌলভীবাজার হয়ে আসার রাস্তা বেশ উন্নত। গাড়ির গতি ছিল ঘণ্টায় আশি থেকে একশ পার কিলো।
দুপুরের দিকে গাড়ি জিশানের নানা বাড়ির প্রধান গেইট অতিক্রম করে খানিকটা চলার পর গাড়ি বারান্দায় ইন করে। সগীর হাতের ঘড়ির দিকে চোখ রাখে পৌনে একটা। পৌনে পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছে। আরো আধঘণ্টা আগে পৌঁছতে পারতো। পথে যাত্রা বিরতি দেয়। নাস্তা-পানি, বাথরুমের জন্য।
জিশান অনিন্দা গাড়ি থেকে নেমেই ভোঁ দৌড়। অন্দর মহলে। গাড়ি বারান্দায় ভিড় জমে চাচা-চাচীদের। চাচাত ভাই-বোনদের কেউ কেউ সেই ভিড়ে জড়ো হলেও জিশান-অনিন্দাকে পেয়ে ছুট।
গাড়ি বারান্দায় চলে কুশল বিনিময়। সাথীর বড় ভাই লন্ডন থাকেন। আরমান মির্জা। সাথীর সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা। ভাইয়াকে সালাম করতেই ছোটবোনকে জড়িয়ে আদর করে। মেজভাই আসলাম মির্জা চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ী। তিনিও সাথীকে ধরে আদর করেন। সেজো ভাই আমান মির্জা বড় ডাক্তার। রাজশাহী মেডিক্যালে আছেন। তিনিও এসে সাথীকে আদর করেন। সেই সঙ্গে ভাবীরাও। সাথী সবার ছোট না হয়েও এখানে সে ভাইদের ছোটবোন হওয়ায় আদরটা পাওয়া হচ্ছে।
সগীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসব প্রত্যক্ষ করছিল। সাখাওয়াতও ছোটবোনের বর হিসেবে বড়ভাই-ভাবীদের স্নেহ-ভালবাসাসূচক কথা শুনছিল।
এই যে আসামি! দূরে কেন বলেই সেজো ভাবী এগিয়ে সগীরকে হাত ধরে টেনে এনে সবার মাঝে দাঁড় করায়। সেজো ভাবী বিথি আবার একজন নজরুলগীতি শিল্পী। কণ্ঠটা তাই সুরেলা। ভাবীর দেশ কুষ্টিয়া। ভাষাও খুব পরিশীলিত।
সগীর শেষ পর্যন্ত আমাদের সববাইকে একত্র হতে সাহায্য করল কী বলো? মেজ ভাবী ইয়াসমিন বলল। এই ভাবীর বাড়িও সিলেট জেলার বাইরে, রাজশাহী।
এ রকম একটা ঘটনা না ঘটলে কি আমরা ছুটে আসতাম সেই লন্ডন থেকে? ক্রেডিটটা ছোট মিয়াকে দিতেই হবে। বলল বড় ভাবী লিসা। এই ভাবীর বাড়ি ঢাকার অদূরে এককালের বাঙলার রাজধানী সোনারগাঁও।
সগীর ছাড়া সব ভাই বিয়ে করেছে সিলেটের বাইরে। অবশ্য সাথীর বিয়ে সিলেট জেলায় ফেঞ্চুগঞ্জ।
সগীর ভাবীদের মুখরোচক ঠাট্টা-মশকরার মধ্যে বড়ভাইদের সামনে খানিকটা লজ্জা পাচ্ছিল।
এমন সময় সগীরের মা এসে উদ্ধার করলো। এ্যা তোমরা ইয়ানো উবা গল্প কররায় কেনে, ঘরো হামাও আও আও
মা সবাইকে জড়িয়ে ধরে আদর সোহাগে ভরিয়ে দেন। মুখে উচ্চারণ করতে থাকেন নানা দোয়া ও মোনাজাতের শব্দাবলি।
সবাই এসে বসে বিশাল বৈঠকখানায়। সাধারণত বাইরের অভ্যাগতদের এখানে বসানো হয়। আত্মীয়-স্বজন ও নিকটজনদের বসার জন্য আরো দুটো বৈঠকখানা রয়েছে। নিচ তলায় এবং দোতলায়। তবে গাড়ি বারান্দার সংলগ্ন বলে সবাই ঢুকেই এখানটাতে বসে পড়ে।
বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এখানে আপ্যায়নের ব্যবস্থা আছে। দু’এক মিনিট বাদেই দেখা গেল ট্রলিতে করে অনেক গ্লাসে শরবত এবং মিষ্টি, মিষ্টান্ন, ফলমূল নিয়ে হাজির এক গৃহপরিচারিকা।
মা লিসা, তুমি সবেরে তুলিয়া দাও মা বললেন বড় বউকে। এসব ব্যাপারে বড়র ডাক পড়ে।
লিসা উঠে গিয়ে ট্রলি থেকে মিষ্টি ইত্যাদি বাটিতে তুলে তুলে একজন একজন করে হাতে তুলে দেয়। কে কী খাবে বড় কথা নয় তুলে দেয়ায় রয়েছে এখানকার আদব।
এসব দেখতে সগীরের ভালই লাগছিল।
বৈঠকখানায় সামান্য নাস্তা এবং কুশল বিনিময় সেরে চলে যায় যে যার ঘরে। সেভাবে সাথী সাখাওয়াত সগীরও চলে আসে নিজ নিজ রুমে। এ বাড়িতে রুমের তো শেষ নেই! দোতলা নিচতলা মিলিয়ে নাকি সাতচল্লিশটা। অবশ্য শুধু বসবাসের জন্য নয় নানা কাজে ব্যবহৃত হয় অনেক রুম। তবে বিয়ে উপলক্ষে অনেক পরিবার একত্র হওয়ায় পড়ে থাকা খালি রুম গম্ গম্ করছে মানুষে। পুরো বাড়ি কেমন জেগে উঠেছে।
দোতলার মাঝামাঝি তিন তিনটে পাশাপাশি রুম সাথীদের জন্য বরাদ্দ। সাথী পরিবারের একমাত্র মেয়ে। আদরের তো বটেই। তাই রুমগুলো দেয়া হয়েছে স্পেশাল। সগীরের অবশ্য নিজস্ব রুম দোতলার সর্বদক্ষিণে। জিশান অনিন্দার আবদারে সগীর মাঝামাঝি একটা রুমে উঠেছে।
জিশান অনিন্দা কিছুসময় চাচাত ভাই-বোনদের সঙ্গে কাটিয়ে নিজ নিজ ঘরে এসে শুয়ে পড়ে। ভ্রমণের ক্লান্তি তো কাউকে ক্ষমা করে না! হোক সে মাইক্রোবাসে। এসির ভেতর। সগীরও গা এলিয়ে দেয়। বাড়িতে এলে সগীরের তেমন কোন কাজ থাকে না। কর্মহীন হয়ে পড়ে।
সাথী ও সাখাওয়াতও কাপড় না পাল্টিয়ে একটু গড়াগড়ি দেয় বিছানায়। এমন ধোবদুরস্ত বিছানা পেলে কার না গড়াতে ইচ্ছে হয়।
খট্ খট্ খট্….
দরোজায় নক্ করার শব্দ। সাথী শোওয়া থেকে টেনে টেনে ওঠে। কে এলো আরামকে হারাম করতে। ভাবটা এমন।
আফা! টেবিলে খাবার দেয়া অইছে মাইঝিয়ে কইছুইন খাইতা
বিশ্রাম আর নেয়া হলো না।
এই যে জিশানের আব্বু, টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। মা বলেছেন খেতে।
জিশান অনিন্দাদের ডাকো। সগীরও আমাদের সঙ্গে খাক।
হ্যাঁ, ও রকমই ব্যবস্থা। আব্বা নাকি আমাদের সঙ্গেই বসবেন।
নিচতলায় আরেকটি ডাইনিং রুম রয়েছে। বিশাল। বাইশজন একসঙ্গে খাওয়ার ব্যবস্থা। এছাড়া আরো একটা হল রুম রয়েছে। বড় ধরনের খাওয়া-দাওয়ায় ওটা ব্যবহৃত হয়। নিচেরটায় চাচাদের একসঙ্গে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জিশানরা দেখে এসেছে।
সাথী প্রথমে জিশানের ঘরে এবং পরে অনিন্দার ঘরে এসে ডেকে নিয়ে আসে। সগীরকেও ডেকে আনে।
জিশান-অনিন্দা নানাজানের কথা শুনে কোন উচ্চবাচ্য না করে সুড়সুড় করে খেতে টেবিলে আসে। সগীরও নিপাট ভদ্রলোকের মত হাজির।
কি তা বা তোমরা খানি শুরু করছ নানি?
মির্জা আবদুল লতিফের কণ্ঠ শুনে সবাই সচকিত হয়ে ওঠে। জিশান অনিন্দা উঠে সালাম জানায়।
সাখাওয়াত, সাথী ও সগীরও আসন ছেড়ে ওঠে।
বও, বও তোমরা বও বলতে বলতে নানাজান বসেন তাঁর নির্ধারিত আসনে।
জিশানরা যখন আসে তখন তিনি ছিলেন একটি দরবারে। বাড়ির বাইরে একটা মসজিদ আছে সেখানে একটা বিচারে ছিলেন। জোহর নামাজ সেরে এসেছেন।
নানাজান, আপনি ভাল আছেন? অনিন্দা জিজ্ঞেস করে।
আল্হামদুলিল্লাহ! বাহ্ আমার ময়না পাখিটার বাক্কা মাত হিগ্ছে
মনহর… মনহর…
গলা ছেড়ে ডাক দেন মির্জা লতিফ। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত বিগত দুই পুরুষ হতে। কিন্তু ঠাট বাট এখনো ধরে রেখেছে এঁরা। এটা সম্ভব হয়েছ প্রজা পীড়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের মধ্য দিয়ে নয়। পরিবারের ছেলে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে। বিদেশ বাড়ি থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা অর্জন করে। তাই বাড়ির শান শওকত বজায় রাখার জন্য খানসামা, বাবুর্চি, চাকর-বাকর মিলিয়ে সংখ্যা অর্ধশত হবে। মনহর অনতিদূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পার্শ্বসহচর। বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক চাকর। জবাব নেয় জ্বে ঠাকুর!
বিকালি বেলায় আমার নাতি-নাতিরারে লইয়া আমার মাছোর খামার দেখাইয়া আনিয়ো সাথী তুমিও যাইয়ো দামান্দরে লইয়া
জে আইচ্ছা ঠাকুর
মনহর জবাব দেয়। এসব ব্যাপারে ম্যানেজার সুবিমলেরই দেখার বিষয়। তিন তিনটে গাড়ি সুবিমলের হুকুমেই নড়চড় হয়। তবে মনহর মির্জা সাহেবের খাস চাকর হিসেবে মিডিয়া হিসেবে তার একটা ভূমিকা থাকে।
নানাজান, আমরা কমলা রানীর দিঘি দেখতে চাই জিশান বলল আস্তে আস্তে। সে নানাজানকে ভীষণ ভয় পায়। এমনিতে লম্বায় ছ’ফুট। বিশাল দেহ। টকটকে ফর্সা। বয়স হয়ে চামড়া লালচে ভাব হয়েছে। মোটা গোঁফ। চাপ দাড়ি। অনেকটা আগের দিনের রাজা-বাদশাহর চেহারা।
ও, কমলা রানীর দিঘি তোমরা দেখছো নানি? সগীর মাছোর খামার দেখাইয়া কমলা রানীর দিঘি দেখাইয়া আনিস
নানাজান এতো সহজে রাজি হবেন ভাবেনি জিশান। জিশান খুশিতে হেসে দেয়। অনিন্দাও।
লও, তোমরা শুরু করো বা আমি তো আর খাইবার দায়ে বইছি না তোমার তানোর লগে সাক্ষাতের লাগি আইছি তোমরা খাও, আমি সামান্য লইমো নে
নানাজান একটা প্লেটে সামান্য ভাত নিলেন আর ডাল-সবজি দু-চামচ। জিশান অনিন্দা দেখলো সংক্ষিপ্ত খাওয়া নানাজানের।

ছয়
নানাজানের হুকুম অলংঘনীয়। অন্তত মির্জা বাড়িতে এমন কেউ নেই নানাজান মির্জা লতিফের কথার অন্যথা করে। এটা চিরাচরিতভাবে চলে আসছে। তাই, নানাজানের হুকুম মতো বিকালেই দুটো জিপ গাড়ি রেডি।
সুবিমল একবার এসে সগীরকে জানিয়ে যায় ছোড ঠাকুর, গাড়ি রেডি, আপনারা কয়জন যাইতা।
সগীর জানায় পাঁচজন। একটা গাড়িই যথেষ্ট। সুবিমল জানায় জিশানের বড় চাচার মেয়ে এবং সেজো চাচার মেয়েও যেতে চায়। তাই গাড়ি দুটোই রেডি রাখা আছে।
জিশান অনিন্দা বিকেল হবার আগেই রেডি। মামার ঘরে এসে জ্বালাতন করতে থাকে রেডি হবার জন্য। ওদের মন তড়পাচ্ছে কমলা রানীর দিঘি দর্শনের জন্য। আব্বু-আম্মুকে একবার তাগাদা দিয়ে এসেছে।
সাথীর আবার সাজু-গুজু করতে ম্যালা সময় লাগে। সাখাওয়াত তাই সাথীকে এ ব্যাপারে বার বার সতর্ক করে।
নোয়া মামা, তুমি না ফরেস্ট রেঞ্জার! বাড়িতে এলে কুঁড়ে হয়ে যাও কেন? অনিন্দা পাকামোভাবে বলে।
ও মা! এযে বুড়ি আম্মা! বুড়ি আম্মা! বাড়িতে এলে একটু আলসেমি করতে হয় সামনে আছে ঝক্কি ঝামেলা
সাখাওয়াতের তাগাদায় শেষ পর্যন্ত সাথী সাজা-গোজায় তেমন সময় নেয়নি। চারটা বাজার আগেই রেডি।
খবর আসে বিকেলের চা টেবিলে দেয়া হয়েছে। চা-টা খেয়েই নিচে নামবে সবাই মিলে।
চায়ের টেবিলে সবাই মিলিত হলো। বড় ভাইয়ের মেয়ে হেমা এবং মেজ ভাইয়ের মেয়ে টুসিও ওদের সঙ্গে বিকেলের নাস্তায় একত্র হয়েছে।
জিশান অনিন্দার মোটেই দেরি সহ্য হচ্ছিল না। তবে টেবিলে মজাদার পিঠাগুলোর লোভ সামলাতেও পারছিল না। পটাপট খেতে পারছিল না তপ্ত বলেই। তেলে ভাজা পিঠা। সিলেটী ভাষায় বলেÑ হান্দেশ। এ ছাড়া তিলের নাড়– ও চিঁড়াভাজাও জিশানকে খুব টানছিল। কিন্তু খাওয়ায় লেগে গেলে সময় পার হয়ে যাবে। ঝটপট দুটো পিঠা গিলে (খাওয়ার জন্য যে পরিমাণ চিবিয়ে খেতে হয় তা না করে) ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি দিয়ে ভেতরে পাচার করে নেমে আসে নিচে।
চাচাত বোনেরা এবং ওরা নিচে নেমে এলে কী হবে ওদের আব্বু মামা আম্মু তখনো নামতে বাকি। গরম গরম চা। গরুর খাঁটি দুধের আর বাগানের টাটকা চা-পাতার মজাদার চা আয়েশ করেই খাচ্ছিলেন তারা।
মির্জা সগীরের বাগানের সেরা চা-পাতার চা-ই এ বাড়ির লোকেরা খায়। সগীরের চা-পাতা যে সেরা তা এবার ইংল্যান্ডের একটি ফেস্টিভালে অ্যাওয়ার্ড জয়ের মাধ্যমেই প্রমাণিত।
সগীর, তোমার বাগানের চা সত্যিই অপূর্ব। সাখাওয়াত চায়ে চুমুক দিয়েই বলল।
এক কাজ করলে হয় না ফ্লাস্কে চা সঙ্গে নিয়ে গেলে হয় না? সাথী বলল।
তা হয়, কিন্তু সেটা তো পেতে আরো দশ-পনেরো মিনিটের ব্যাপার ওদিকে ছেলে-মেয়েরা নিশ্চয়ই অস্থির
আপু, তোমার ফ্লাস্কে চা নিতে হবে না ডানকান বাগানের ভেতর দিয়ে যাবো আমরা সেখানের ম্যানেজার আমার বন্ধু লোক, এবার লন্ডনে পরিচয় হয়। ওকে ফোন করে দিচ্ছি আমরা আসছি কিছু সময়ের জন্য, ব্যস, চা-টার ব্যবস্থা এমনিতেই করবে।
সগীর বলল। সগীরের কথায় সাথী ফ্লাস্কে চা নেওয়া থেকে বিরত হলো। তবু উসখুস করছিল তার মন। শুধু চা খাওয়ার জন্য কারু বাসায় কিছু সময়ের জন্য আবদ্ধ হওয়া পছন্দ হচ্ছিল না।

গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাল্কা বৃষ্টি নামল। তেমন বেগ নেই। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। ইলশেগুড়ি বৃষ্টির চেয়ে একটু ভারী। বৃষ্টির ধারা গাড়ির উইন্ড স্ক্রিনে এসে পড়ছিল। তাছাড়া গাড়ির দু’পাশের জানালায় বৃষ্টির ধারা এসে অস্বচ্ছ করছিল দৃষ্টিপথ।
কী মজা কী মজা বৃষ্টি হচ্ছে চিৎকার করে হাততালি দেয় অনিন্দা। বৃষ্টি অনিন্দার প্রিয়।
হুম! মজা বুঝি! বৃষ্টি পড়লে বেড়াবো কিভাবে? বলল চাচাত বোন হেমা। লন্ডন প্রবাসী। মেজাজ সাহেবী। বৃষ্টি বুঝি তার পছন্দ নয়। স্নো পড়লে খুশি হতে পারতো।
ভিজে ভিজে! বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব মজা লাগে! অনিন্দা পটাপট জবাব দিলো।
আরেকটু বললে না, ভিজে ভিজে টনসিল বাড়াতে কেমন লাগে? বলবে গলা ব্যথা গলা ব্যথা জিশান বড় ভাইসুলভ কণ্ঠে কথাগুলো বলল। সঙ্গে সঙ্গে পরখ করে অনিন্দার প্রতিক্রিয়া।
গাড়ি চলছে আগ পাছ করে দুটো। একটা জিপ আরেকটা মাইক্রো।
একটু পর বৃষ্টির ধারা আরো চিকন হয়ে এলো। শরৎকালের বৃষ্টির এমনই মেজাজ। দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অবশ্য এসব বৃষ্টি শীত নামায়। বিশেষ করে এতদঞ্চলে। পাহাড়ি পরিবেশ কি না।
সগীরসহ জিশান অনিন্দা হেমা আর টুসি একটা মাইক্রোতে। আর জিপ গাড়িটাতে ম্যানেজার সুবিমল একজন গানম্যান এবং সাখাওয়াত সাথী।
গাড়ি ছুটছিল বাতাস ও বৃষ্টির ধারার সঙ্গে লড়াই করে। বেশ বাতাসও ছেড়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস। জানালা ফাঁক করলেই বোঝা যায়। হু হু হু হু করে ঝড়ো বাতাস বইছে।
মামা, এভাবে মুখে তালা দিয়ে বসে আছো কেন? অনিন্দার পাশেই সগীর। একটা খোঁচা দিয়ে সে বলল।
তোদের কথা শুনছি ভাল লাগছে বৃষ্টিটা দেখতে।
চাচা-চাচা আমাদের একটা স্টোরি শোনাও না! হেমা বলল।
হ্যাঁ, মামা একটা গল্প শোনাও জিশান বেশ ভাব নিয়ে বলল।
কিন্তু আমরা পৌঁছতে তো বেশি দেরি নেই ড্রাইভার সাব, আমাদের খামার বাড়ি পৌঁছতে কত সময় লাগবো? সগীর জানতে চায়। গল্পটা শুরু করে অর্ধেকটা শেষ করেই যাতে নামতে না হয়, সে জন্য।
আধাঘণ্টা ড্রাইভার জানাল।
তাহলে বলা যায় সগীর একটু নড়েচড়ে বসে।
এখন যে গল্পটা শোনাবো সেটা শুধু গল্পই নয়। সত্যি তিন সত্যি। পত্রিকায় পড়েছি। ভৌতিক গল্প।
ভূতের গল্প তো রাতেই শুনতে মজা। অন্ধকারে কেউ কারু মুখ দেখা যায় না। গা ছম ছম করা ভাব। গল্প শুনতে শুনতে পিলে চমকে ওঠা। জিশান বলতে থাকে।
না না সে রকম ভূতের গল্প নয় এটা। বলছি, শোনো তোমরা। একবার এক নাবিক জাহাজ নিয়ে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে বার্মুডার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। জাহাজটির গন্তব্য গ্রিনল্যান্ড। এমন সময় জাহাজটা বেশ টাল খেতে থাকে। সাগরের এসব স্থান এমনিতে ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যাপ্টেন ফেদারিকা সতর্ক হলেন। আইসবার্গ থাকে যেখানে সেখানে। তাপমাত্রা হিমাঙ্ক শূন্যে তো বটেই। দিনের আলো শেষ হয়ে আসছে। শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রে তাঁর দুটো চোখ। সব সময় নজর রাখছেন। সহকারীদের একটু পর পর নির্দেশ দিচ্ছেন। মালবাহী জাহাজ বলে যাত্রীদের নিয়ে কোন উপদ্রব নেই। এমন সময় ক্যাপ্টেনের চোখে পড়ল একটা জাহাজ। ক্যাপ্টেন সতর্ক হলেন। এ পথে জাহাজের যাতায়াত খুব কম। রেডিও সিগন্যাল পাঠালেন ক্যাপ্টেন। কোন প্রতিউত্তর নেই। ক্যাপ্টেন খুব সতর্ক ও অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন জাহাজটিকে। দেখে মনে হতে থাকে জাহাজটি লক্ষ্যহীন ধেয়ে চলছে। স্রোতে ভেসে চলেছে। ক্যাপ্টেন ফেদারিকা আন্দাজ করলেন হয়তো দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটি। তিনি তাঁর এক সহকারী হেনরি কেরিকে নির্দেশ দিলেন জাহাজটি লক্ষ্য করে এগোতে। ভুলে গেলেন গন্তব্যের কথা। ভুলে গেলেন গ্রিনল্যান্ডে যাওয়া। ক্যাপ্টেন ছুটছেন কালো জাহাজটির রহস্য উদঘাটন করতে। রোখ চেপে বসেছে তার। কিন্তু একি! যতোই জাহাজটি ধরার জন্য এগোচ্ছেন, ততোই সরে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন চিন্তিত হলেন। তাঁর দীর্ঘ নাবিক জীবনে এমন ঘটনা তিনি দেখেননি দুর্ঘটনায় পতিত জাহাজ সাগরে ভাসমান চলতে।
তারপর? জিশান খুব মজা পাচ্ছিল না বোধ হয়।
তারপর তো মজার ঘটনা ধীরে ধীরে বলছি। রাত ঘনিয়ে এলো। ধীরে ধীরে দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটিও দৃষ্টির সীমার বাইরে চলে গেলো। ক্যাপ্টেন বিফল হয়ে জাহাজের দিক পরিবর্তন করে গন্তব্যে চলে এলেন। একদিন নাবিকদের এক অনুষ্ঠানে ক্যাপ্টেনদের জীবনের অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা বর্ণনার সুযোগে ক্যাপ্টেন ফেদারিকা জাতে স্প্যানিশ এ গল্পটা শোনালেন। স্প্যানিশ ভাষায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার গল্পটা বর্ণনা করলেন। আর যায় কোথায়। উপস্থিত আরো দু’একজন ক্যাপ্টেন সেই অদ্ভুত জাহাজকে দেখার সাক্ষী হয়ে গেলেন। এরা কৌতূহলবশত জাহাজের অনুসন্ধানে দিগ্ পরিবর্তন করে এগোয়নি সত্য তবে সনাক্ত করেছে। কোন স্থানে জাহাজটাকে দেখা যায়। একজন তরুণ ইংলিশ ক্যাপ্টেন বল্টন বলল আমি ইংলিশ, আমার আজ থেকে শপথ, ঐ জাহাজের রহস্য ভেদ করবো। ফেদারিকা মনে মনে বলল আমিও স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন, দেখে ছাড়ব জাহাজের রহস্য।
তারপর কী হলো চাচ্চু? বোঝা যাচ্ছে ছোট্ট টুসি গল্পটায় মজা পেয়েছে।
বলছি, ক্যাপ্টেন ফেরার পথে আবার সেই জাহাজটিকে দেখে। এবার তার রোখ পেয়ে বসে যেভাবে হোক জাহাজটির কাছাকাছি যেতে হবে তার। সেভাবে সহকারী ক্যাপ্টেন কেরিকে নির্দেশ দেয়। কেরি ধীরে ধীরে জাহাজটাকে লক্ষ্য রেখে এগোতে থাকে। খুব সকালে তারা রওনা দিয়েছিল। দুপুর গড়িয়ে যেতে থাকে। কিন্তু দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটি যেনো স্রোতের টানে ভেসে ভেসে যাচ্ছিল। এক সময় ক্যাপ্টেন লক্ষ্য করলেন জাহাজটি চলা বন্ধ হয়ে গেছে। কোন আইসবার্গে আটকে গেল না তো! মৃত্যুদূত হয়ে কোথায় অপেক্ষা করছে বলা মুশকিল। তবু ক্যাপ্টেনের রোখ চেপেছে ঐ জাহাজের কাছাকাছি যাবেই।
এমন বিপদ সামনে জেনেও ক্যাপ্টেন এগোচ্ছেন! জিশান বড় বড় চোখ করে জানতে চায়।
স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তো বোকা, ইংলিশটা হলে দূর থেকে দেখেই এসে পত্রিকায় গল্প ফেঁদে বসে নাম কুড়োতো।
তারপর কী হলো চাচ্চু? টুসির তর সইছে না রহস্য জানার।
তারপর ধীরে ধীরে যতই কাছে এগোতে থাকে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি স্পষ্ট হতে থাকে। স্পষ্ট হতে থাকে জাহাজের নামটি।
কী নাম জাহাজের? হেমা প্রশ্ন করে।
মেরি এন্ডারসন। ইতালির ওনাসিস গ্রপের এমন নামের একটা জাহাজ ডুবির কথা ক্যাপ্টেন ফেদারিকা জানতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ঘটনা সেই জাহাজটি প্রায় ষাট বছর পর কিভাবে সাগরে ভাসতে পারে। বিশ্বাস হতে চায় না।
ক্যাপ্টেন নিজের জাহাজটিকে তবু সামনে ধাবিত রাখে। সহকারী কেরি জানান আর সামনে এগোনো মানে মহাবিপদ। আইসবার্গে আটকে আছে জাহাজটি। দিনের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মনুষ্যহীন মেরি এন্ডারসনকে। জাহাজের গায়ে কোন ক্ষতচিহ্ন নেই। কোন ক্ষতিগ্রস্ত হবার চিহ্ন দেখতে পেলেন না ফেদারিকা। দূর থেকে ছবি নিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। আবহাওয়া প্রতিকূল বলে। অবশেষে বিফল হলেন সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটন করতে।
ভয়েস থেকে ফিরে ক্যাপ্টেন শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন এ কাহিনী নিয়ে কিছু একটা লিখবেন। এমন সময় কেবিন বয় একটা পত্রিকা দিয়ে গেলো। ক্যাপ্টেন অলসভাবে পত্রিকা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখছিলেন। এমন সময় একটা হেডিং-এ তাঁর চোখ আটকে গেলÑ জাহাজের সেই সুন্দরী নারীটি অদৃশ্য! কোন সুন্দরী নারী? ক্যাপ্টেন এক নিঃশ্বাসে কাহিনী পড়ে ফেললেন। সেই ইংলিশ ক্যাপ্টেন বল্টন লন্ডনে গিয়ে বোমা ফাটিয়েছেন। ধার করা গল্প নিয়ে তিনি রঙ ছড়িয়েছেন। তিনি বলেছেন সেই জাহাজে তিনি প্রবেশ করে দেখেন একটা ঘরে মেয়েদের গাউন, কাপড়-চোপড় সব পড়ে আছে। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড গ্যাসের চুলোয় একটু আগে কেউ রান্না করেছে এমন দৃশ্যও নাকি দেখতে পায়। ঐ পথে চলাচলকারী কয়েকজন নাবিকের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকায় বলেছে অনেকেই ঐ জাহাজে একজন স্বর্ণকেশীকে দেখতে পেয়েছে। ক্যাপ্টেন ফেদারিকা হা:… হা:… হা:… হা:… করে হেসে ওঠে। একেই বলে ইংলিশ। গাঁজাখুরি গল্প ছেপে বিখ্যাত হতে এরাই পারে! সে স্প্যানিশ! পরল না মিথ্যার বেসাতি করতে!
ক্যাপ্টেন ফেদারিকা ঐ ইংলিশ ক্যাপ্টেনের গাঁজাখুরি গল্পের প্রতিবাদ করলো না কেন? জিশান বলল।
এসব গল্প একবার পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পেলে প্রতিবাদ করে কোন লাভ হয় না। মজার গল্প মানুষ একটু নেয় বেশি।
দেখতে দেখতে মাইক্রো চলে আসে মাছের খামারের কাছে। এটা মির্জাদের খামার বাড়ি। নানা ধরনের গাছ-গাছালিতে ভরা। দেড় শ’ একর জমিতে পুকুর কেটে মাছের চাষ করা হয়। দশ-বারোটা ছোট বড় দিঘিতে মাছের চাষ চলে।
মাইক্রো থেকে সগীরসহ জিশান অনিন্দা হেমা টুসি নামল। জিপ গাড়িটা একটু পেছনে পড়েছে। তার অপেক্ষায় ওরা। বৃষ্টি এখন একদম নেই। ঝক ঝকে আকাশ। বিকেলের রোদ্দুরে দিঘির পানি চকচকে দেখাচ্ছিল।
মাছ চাষ দেখা শোনা করে এমন দু’জন এগিয়ে এলো। সগীরকে চিনে কী না বোঝা গেল না। তবু লম্বা একটা সালাম দিলো। সগীর এদের সঙ্গে কথা না বলে জিপ গাড়ির উপস্থিতি চাচ্ছিল। সুবিমল এলেই সব কিছু নড়েচড়ে উঠবে। এরা মির্জাদের চেয়ে ম্যানেজার সুবিমলকে চেনে বেশি। মালিক-মোক্তারও ভাবে তাকে। তাই সুবিমলের অপেক্ষা করতে থাকে সগীর।
ঐ যে- ঐ যে এসে গেছে জিপ গাড়ি এক সঙ্গে বলে উঠলো জিশান অনিন্দা হেমা টুসি।
জিপ গাড়ি এসে থামলো তাদের মাইক্রো বাসটির পাশেই। প্রথমে নেমে এলো সুবিমল। তারপর সাখাওয়াত ও সাথী। সবশেষে গানম্যান রমেশ। স্বাস্থ্যটা টিনটিনে হলে কী হবে গোঁফটা দশাসই।
একটু আগে আসা মাছের কর্মী দু’জন এগিয়ে যায় সুবিমলের দিকে। হাত তুলে জানায় আদাব। তারপর এগিয়ে আসে সাখাওয়াত সাথীদের দিকে। বিনয়ের সঙ্গে জানায় আদাব। ছোট ঠাকুর, চলো খা মাছোর খামার দেখতা সুবিমল বলল।
ওবা, কৃষ্ণপদ, হরিপদ তোমরা আগে আগে যাও, জালুয়া তারারে কও খ্যাপ মারতো
কৃষ্ণপদ হরিপদ দৌড় দেয়।
সাখাওয়াত সাথী সগীর ছেলে মেয়েরা হাঁটতে থাকে। একটু আগে বৃষ্টি হওয়ায় মেঠোপথ পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে।
মেঘ দেয়ায় রাস্তা পিছলা অই গেছেÑ আপনারা লায় লায় দেখিশুনি আউকা ম্যানেজার সুবিমল বলল।
ওরা ধীরে ধীরে হেঁটে দিঘির কাছে আসতে না আসতেই জেলেরা বড় জাল দিয়ে এক খ্যাপ প্রায় গুটিয়ে এনেছে। জাল থেকে বের হয়ে যাবার জন্য রূপালি মাছগুলো লম্ফ ঝম্ফ করছে। বিকেলের রোদ ওদের গায়ে এসে পড়ায় রূপালি শরীরগুলো ঝিকঝিক করে উঠছে।
বাহ্ কী সুন্দর মাছ লাফাচ্ছে অনিন্দা চিৎকার করে খুশি প্রকাশ করলো।
আমরা বাড়িতে মাছ নিবো জিশান বলল ম্যানেজার সুবিমলকে।
অবশ্যই মামু, কোন কোনটা নিবা তুমি দেখাইয়া দিয়ো সুবিমল বলল।
জাল টানা শেষ হলে উঠে এলো বড় বড় রুই কাতলা মৃগেল মাছ। দুই কেজির নিচে ওজনের মাছ পুনরায় পানিতে ছেড়ে দিলো। এ সময় সাধারণত জাল ফেলার নিয়ম নয়। জিশানদের আনন্দ দেবার জন্যই এ ব্যবস্থা।
এরপর দিঘির পাশ দিয়ে গোটা দল ঘুরে ঘুরে দেখলো। সে সময় মাছের পরিচর্যাকারী চাষিরা মাছের খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। আর পানির নিচ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মাথা উঁচিয়ে টপাটপ খাবার খাচ্ছিল। কে কতো আগে মুখে পুরতে পারে তার যেনো প্রতিযোগিতা চলছিল মাছেদের সঙ্গে এতে খুব মজা পাচ্ছিল জিশান, অনিন্দা, হেমা ও টুসি।
কয়েকটা দিঘি ঘুরে পুরো দলটি একটা একচালা ঘরে এসে বসে। চারিদিকে খোলা এই একচালা ঘরেই হয় মাছ বিক্রি। সুবিমল জানায়।
খান আষ্টেক প্লাস্টিকের চেয়ার এবং রাউন্ড টেবিল পাতা ছিল। সেই চেয়ারে এসে বসে একে একে। দুই ঝুড়ি মাছও দেখা যায় ঐ ঘরের সামনে।
ছোট ঠাকুর, মাছ কতোটা বাড়িত পাঠাইতাম?
বেশি পাঠাইবার কাম নাই বড় সাইজের আটটা রোউ আর চাইরটা কাতলা দিলেই অইবোÑ
মিরগা দিতাম নানি, ঠাকুর? সুবিমল বিনয়ের সঙ্গ জানতে চায়।
সুবিমল সাখাওয়াতকে জিজ্ঞেস করে না। কারণ সে এ বাড়ির দামান। সম্মানিত মেহমান।
চাইরটা মিরগা দিতা পারুইন সগীর মাছ-টাছের ব্যাপার ততো বোঝে না। তাছাড়া এসব চাষের মাছে স্বাদও কম। তবু নিজের দিঘির মাছ। বাড়ির ভেতরও একটা পুকুর আছে। ওটাতেও মাছ চাষ করা হয়। তবে তা স্পেশাল মাছ। সুবিমলের নির্দেশ মতো ওদের জন্য চানাচুর বিস্কিট কোক এলো। সবার হাতে হাতে পৌঁছে দিলো মাছ চাষের কর্মীদের একজন। হেঁটে হেঁটে সবার যেমন ছিল ক্লান্তি তেমন ক্ষুধা। তাই হাতের কাছে পাওয়া কোক বিস্কিট চানাচুর বেশ কাজে লাগল।

সাত
গাড়ি চলছে কমলা রানীর দিঘির উদ্দেশে। মির্জাদের খামার থেকে বের হতেই সূর্য পশ্চিমে বেশ হেলে পড়েছে। গোধূলি লগ্ন এখনো শুরু হয়নি। তবে দিনের সূর্যালো এতোটাই হেলে পড়েছে যে রাস্তার দু’পাশের উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয় সূর্যের রশ্মি কম পড়ছিল। রাস্তাটার দু’ধারে সারি সারি গাছ। সবুজের অবাধ বিচরণ এখানটাতে। চারিদিকে গাছ আর গাছ। ঘন বনাঞ্চল।
খামার বাড়ি থেকে মাইক্রো বের হবার সময় সগীর হাতের ঘড়ির দিকে নজর রাখে। সোয়া পাঁচটা। সুবিমলকে যেভাবে বলা আছে তাতে পথে ডানকান টি গার্ডেনে যাত্রা বিরতি করলে নির্ঘাত সন্ধ্যে হবে ওখানেই। রাতে কমলা রানী দিঘি দেখে মজা পাবে ওরা? না, পাবে না।
সগীর মনে মনে ভাবে। সিদ্ধান্তটা চট্ট করে নিতে পারে না। ওদিকে বন্ধুটিও নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে। দুলাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা দরকার। জিপ গাড়িটা মাইক্রোর পেছন পেছন আসছে। দাঁড় করিয়ে কথা বলা যায়।
ড্রাইভার সাব, পেছনের গাড়িকে সিগন্যাল দিন, আপনি থামবেন
জ্বি ছোট ঠাকুর ড্রাইভার বলেই স্পিড ধীরে ধীরে কমিয়ে বাম দিকের মোড় নেয়ার সিগন্যাল দেয়। পেছনের জিপটা তা দেখে বুঝতে পারে থামতে হবে। কোন সমস্যা হয়েছে বুঝি।
ধীরে ধীরে এক পর্যায় মাইক্রো রাস্তার এক পাশে থামানো হলো। দরোজা খুলে সগীর বের হলো। জিপ গাড়িটা মাইক্রোর পেছনে দাঁড়ায়। সগীর জিপ গাড়ির কাছে এগিয়ে যায়। জানালার গ্লাস সরিয়ে সাখাওয়াত মাথা বের করে বিরক্তি প্রকাশ করে কী, ব্যাপার, গাড়ি থামানো হলো কেন?
দুলাভাই, আমরা এখন কোথায় যাবো?
তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমরা এখন তোমার হাতের পুতুল যেমনি নাচাবে তেমনি নাচতে হবে সাখাওয়াত একটু ঝাঁজ নিয়ে বলল।
দুলাভাই, রেগে গেছেন আমার ওপর আমি জানতে চাচ্ছি এখন ডানকান টি গার্ডেনে যাওয়া ঠিক হবে কিনা কমলা রানীর দিঘি দেখতে রাত হয়ে যাবে যে!
কিন্তু তুমি যে বন্ধুকে বলে রেখেছো মাইন্ড করবে না তো?
ওটা আমি কাল গিয়ে বুঝিয়ে বললে মাইন্ড করবে না। আমাকে কাল যেতে হবে বিয়ের দাওয়াত দিতে।
তাহলে সোজা চলো কমলা রানীর দিঘির দিকে। সাখাওয়াত বলল।
সগীর দ্রুত চলে এসে গাড়িতে উঠলো। ড্রাইভার সাব, সোজা কমলা রানীর দিঘির দিকে যাউখা।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। রাস্তা তেলতেলে। কালো পিচঢালা। খুব প্রশস্ত না হলেও সম্প্রতি সংস্কার করা রাস্তাটি গাড়ি চলাচলে আরামদায়ক।
মামা, তোমার মুখে তালা কেন? তোমার মুখে তালা ঝুললে আমরা বড় কষ্ট পাই অনিন্দা বেশ রসিকতা করা শিখেছে।
সত্যি, মামা আরেকটা ভৌতিক গল্প শোনাও। জিশান বলল।
চাচ্চু, আমরা যে দিঘিটা দেখতে যাচ্ছি, ওটার নাকি একটা স্টোরি আছে, ওটা শোনাও! হেমা বলল।
না না মামা, ঐ গল্প আমাদের বলেছ, অন্যটা শোনাও অনিন্দা বলল।
ঠিক আছে অন্যটাই শোনাবো, যেহেতু এক দল শুনে ফেলেছে দিঘির গল্পটা। এটাও একটা ঐতিহাসিক গল্প। দিঘির গল্প। একদম সত্যি।
ভূতের মামা ?
না, অদ্ভুত! ভিন্ন ধরনের গল্পটা আমি যে টি গার্ডেনের ম্যানেজার এটা একটা পুরনো বাগান। এখনো ইংরেজ সাহেব এর মালিক। এ গার্ডেনের রয়েছে নানা গল্প। বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করেছিল লড়াই করেছিল সেসব স্বাধীনতাকামীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। ঐ বাগানে এমন একটা টর্চার সেল আছে। তার অনতি দূরেই একটা টিলার ওপর সাহেবদের আনন্দ ফুর্তি করার জন্য ছিল ক্লাব। এসব ব্যাপারে সহযোগী ছিল জমিদার মোহিনী মোহন চৌধুরী। উত্তর সিলেটের এক বড় জমিদার। জমিদারের নিজস্ব একটা রঙ মহলও ছিল। যেখানে ইংরেজ সাহেবদের মাঝে মধ্যে নিমনতন্ন করে জমিদার ধন্য হতেন। আয়োজন করতেন নাচ-গানের আসর। মোহিনী মোহনের রঙমহলটি যেমন জৌলুসপূর্ণ তেমনি আয়োজনও থাকতো জাঁকালো। দিল্লি, লক্ষে, কলকাতা, বারানসি থেকে মশহুর শিল্পী আনা হতো। বুঝতেই পারছ জমিদারদের বিলাসিতার ব্যাপার-স্যাপার।
মামা, তুমি দিঘির গল্প বলতে চেয়েছিলে
বলছি, অস্থির হলে চলবে কেন। জমিদার বাড়ির ছিল একটা বিশাল দিঘি। আগের দিনে মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে ছোট বড় পুকুর এবং দিঘি কাটা হতো। অনেকে নিজের আভিজাত্য শান-শওকত প্রকাশ করতেও পুকুর-দিঘি কাটাতো। জমিদার মোহিনী-মোহনের উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপনে তার স্ত্রী সুভদ্রা তারিনী চৌধুরানী ক্ষুব্ধ হয়ে একদিন ঐ দিঘিতে আত্ম বিসর্জন দিলেন।
আত্ম বিসর্জন মানে চাচ্চু? হেমা কঠিন বাংলা বোঝে না। তাই প্রশ্ন করেছে।
আত্ম বিসর্জন মানে-স্যুসাইড করলো বুঝেছো?
কিভাবে?
সগীর ব্যাপারটা খোলাসা করে বলতে চায় না। শিশুদের মন বড়ই কোমল-কঠিন বিষয় না বলাই ভালো, তাই।
পানিতে নিজে নিজে ডুবে মারা গেল, বুঝেছো?
তারপর? জিশান প্রশ্ন করে।
গাড়ি চলছে। এঁকে বেঁকে পথ দিয়ে। এখানকার রাস্তাটা টিলার ভেতর দিয়ে। দিনের আলো এমনিতে এখানে কম প্রবেশ করে। আর সূর্য তখন পাটে বিদায় নিতে ব্যস্ত। তাই অন্ধকার ঘুটঘুটে। সবাই মন দিয়ে শোন! বলছি,
তারপর শুরু হলো একের পর এক দূর্ঘটনা। জমিদার একদিন দিঘিতে নেমে সাঁতার কাটছিলেন। শখ করে সেদিন নামেন। ব্যস, জমিদার ডুবে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডুবুরি ডাকা হয়। জাল ফেলা হয়। জমিদারকে পানির ভেতর পাওয়া যায় মাথা মাটির ভেতর ঢুকানো। সবাই বলাবলি করতে থাকে রানী প্রতিশোধ নিয়েছে। মৃত লাশ তুলে আনা হলো।
তারপর? অনিন্দা ভয় পাওয়া কণ্ঠে বলল।
তারপর জমিদারের পতন শুরু হলো। একে একে বংশের সর্বশেষ ব্যক্তিটিও জীবিত থাকল না। সম্প্রতি সেই জমিদার বাড়ির দিঘিটি আবার সংবাদপত্রে উঠে এসেছে। পরিত্যক্ত দিঘিটি সংস্কারের জন্য পানি সেচ করে শুকানোর পর কী পাওয়া গেছে জানো? জমিদার বাড়ির রঙমহলে একদিন যা শোভা পেতো একটি শ্বেতপাথরের টেবিল, এক জোড়া শ্বেতপাথরের গাভী আর সোনার তৈরি এক পাটি চটি।
সোনার চটিটি কার ছিল?
সম্ভবত জমিদার বাবুর। বিলাসী জীবন যাপন করতেন তো!
আর ঐ রঙমহলের কী অবস্থা মামা? জিশান জানতে চায়।
রাজ বাড়িটি প্রতœবিভাগের অধীন। ঝুঁকিপূর্ণ দালান বলে সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তবে অনেক বছর আগের রঙমহল কি থাকে? বুঝতেই পারছ, লুটপাট করার লোক এখানেও ছিল সক্রিয়। যার আলামত দিঘিতে পাওয়া গেল।
তুমি দেখেছো মামা? জিশান আবার প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ, কয়েকবার। এরপর তোরা আমার টি গার্ডেনে বেড়াতে গেলে নিয়ে যাবো।
ছোড ঠাকুর, আমরা কমলা দিঘির কান্দাত আইছি।
আমরা এসে গেছি গন্তব্যে। কমলা রানীর দিঘির কাছাকাছি। গাড়ি এসে থামে একটা মেঠোপথে ঝোপঝাড় ঘেরা পুরনো কারুকাজ করা তোরণের পাশে। তোরণের ওপর লেখা কমলা রানীর দিঘি।
এসে গেছি এসে গেছি বলতে বলতে একে একে নেমে আসে গাড়ি থেকে সবাই।
জিপ গাড়িটি এবারও দেরি করল পৌঁছতে। জিপ গাড়ির অপেক্ষায় সবাই হাত-পা সোজা করে নেয়। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ছিল গাড়িতে। বসতে বসতে শরীর লেগে এসেছে। তাই হাত ছুড়ে পা ছুড়ে জড়তা কাটাতে লেগে যায়।
জিপ গাড়ি থেকে নেমে আসে সাখাওয়াত সাথী সুবিমল গানম্যান একে একে।
সবাই একত্র হয় এক জায়গায়।
দুলাভাই, দেখেছেন, ডানকান টি গার্ডেনে না গিয়েও রাত হয়ে এলো।
তবে আকাশ বেশ পরিষ্কার পূর্ণিমাও আছে মন্দ লাগবে না দিঘি দেখতে সাখাওয়াত বলল হেসে হেসে।
চলো, জিশান অনিন্দা হেমা টুসি।
সগীর সবার সামনে। পাশাপাশি সুবিমল ও গানম্যান। তোরণের কাছে আসতেই একজন বুড়ো লোক পথ রোধ করে দাঁড়ায়। বাবরী চুল লম্বা দাড়ি গেরুয়া রঙের লুঙ্গি এবং ফতুয়া পরা। গলায় কয়েক গাছি মালা।
আফনারা যাইতা কুবায়? হাত দিয়ে থামিয়ে প্রশ্ন করে সগীরকে।
কমলা রানীর দিঘি দেখাত
পাগল অইছুন নি সাব, রাইতে কমলা রানীর দিঘি দেখাত আইন না দিনে আইবা ফিরিয়ে যাউখা
পাগল বুড়োটা শক্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। তোরণ খুব বড় নয়। এখন যেতে হলে ওকে সরিয়ে যেতে হবে। না সরলে যাওয়া ঠিক হবে না। সগীর ভ্যাবাচাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে বুড়োকে নিরীক্ষণ করে।
সগীরের সঙ্গে বুড়োর বাদানুবাদ হচ্ছে দেখে সুবিমল ও সাখাওয়াত এগিয়ে আসে কিতা অইছে মুরুব্বি কিতা
আপনারা ঐ এলাকার মানু নি কিতা?
অয়। তাইন রাজনগরের মির্জা সাবের পোয়া, এইন তান দামান সুবিমল বলল। কিন্তু বুড়ো পাগল রাস্তা ছাড়তে রাজি নয়। রাইত কমলা রানীরে দিঘিত দেখা যায় কনু সময় সখিতারারে লইয়া নাওয়া নায়ি করইন কনু সময় নাউয়ে বইয়া বেড়াইন অনেকেই দেখছুইন যারা কমলা রানীরে দেখুইন তারর বিমার অয় এর লাগি নিষেধ। আপনারা গেইটো সাইনবোর্ড পড়ছুইন না?
সগীর এবার বুঝতে পারে বুড়োর পথ আগলে ধরার কারণ। মুখে বলে না, আইন্ধারে চইখো পড়ছে না এহন আমরা কিতা না দেখিইয়া যাইতামগি নি? অতো দূর থাকি আওয়া গেছে
এবলা আপনারার মুর্জি।
বলেই রাস্তা ছেড়ে দেয় বুড়ো। সগীর লক্ষ্য করলো বুড়োটি দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য একটা একচালা ঘর করা সেদিক হাঁটা শুরু করে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। সগীর ভাবছিল বুড়ো হয়তো আবার এদিকে ফিরে আসবে। তা এলো না। ঐ দিকেই তার আস্তানা বোধ হয়।
দিঘি দেখতে এসে প্রথমটাতে বাধা পেয়ে পুরো দলটির উৎসাহে ভাটা পড়ে। বিশাল শান বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িও কেউ ভাঙতে সাহস পায় না। শুধু চারদিকে চোখ বুলিয়ে আনে সবাই। বিশাল দিঘি। পানি টইটর। চাঁদের আলো এসে পড়েছে স্বচ্ছ দিঘির পানিতে। চিক চিক করছে পানি।
ঐ যে ঐ যে রানী নৌকায় বসা সাদা শাড়ি পরা অনিন্দা চিৎকার করে ওঠে।
সবার সৃষ্টি অনিন্দার নির্দেশিত আঙুলের দিকে। সবাই দেখতে পায় একটা নৌকা চলছে ধীরে ধীরে। বেশ দূরে। কিন্তু রানীকে অন্য কেউ দেখতে পেলো না।
রানী কোথায় রানী কোথায় দেখছি না তো! সবাই বলল।
আমি দেখেছি রানীকে দেখেছি অনিন্দা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল।
সগীর মনে মনে ভাবে বুড়োর কথাই সত্যি হলো নাকি চোখে ধাঁধা দেখা। সে যাইহোক এখানে আর থাকা সমীচীন নয়।
দুলাভাই, সাথী আপু চলো আমরা ফিরে যাই! জলদি চলো।
সগীরকে এর বেশি বলতে হলো না। সুড়সুড় করে দ্রুত সবাই চলে এলো। গাড়িতে উঠে বসলো ঝটপট সবাই। কেউ কোন কথা বলল না। চুপ।
ড্রাইভার সাব বাড়িত যাইখা ।
সগীরের মনে হলো তার কণ্ঠও বুঝি কেঁপে উঠলো। কানে নিস্তব্ধ রাতে বনের এক শব্দ থাকে, সে শব্দ কানে আসছিল। আর কয়েকটা পাখির ডাক।

SHARE

Leave a Reply