Home উপন্যাস নীল থাবা

নীল থাবা

জুবায়ের হুসাইন…

‘মরতে এসেছো? জলদি ভাগো!!’
পাক্কা পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল বিপু ভাইয়া।
পিঠে ঝোলানো একটা পিঠ-ব্যাগ। তাতে দু’সেট জামা-প্যান্ট ও টুকিটুকি আরও কয়েকটা জিনিসি। যেখানেই বেড়াতে যায়, সঙ্গে থাকে ব্যাগটা।
আজই বেড়াতে এসেছে ও, ওর ফেসবুক ফ্রেন্ড সাকিবদের বাসায়। এখনও বাসায় পৌঁছতে পারেনি। বাস থেকে নেমে প্রায় মাইল খানেক পথ হেঁটে আসার পর হঠাৎই চিরকুটটা দলা পাকানো অবস্থায় ওর সামনে এসে পড়ে। নিচু হয়ে হাতে উঠিয়ে নিয়ে এপাশ ওপাশ তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। তারপর ভাঁজ খোলে কাগজের টুকরোটার। চোখের সামনে মেলে ধরতেই কাঁপা কাঁপা হাতে লেখাটা ভেসে ওঠে।
থতমত খেয়ে যায় কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া। কে দিল চিরকুটা? ওকেই কি দিল? কেন দিল? মরতে আসার কথা বলছে কেন? এর আগে তো কখনও এখানে আসেনি ও। এলাকার কেউ ওকে চেনেও না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ওর যে ফ্রেন্ডের বাড়িতে ও বেড়াতে এসেছে, তার সাথে আগে কখনও সামনা সামনি দেখা হয়নি। এমন কি, ওর চেহারাও চেনে না ও। ফেসবুকে সাকিবের কোনো ফটো দেয়া নেই। চ্যাট করার সময় অনেক বলেও ওকে ছবি যোগ করাতে পারেনি বিপু।
আর এখানে হঠাৎ চলে আসারও কারণ আছে। আজ প্রায় চার-পাঁচদিন ধরে ফেসবুকে সাকিবকে পাওয়া যাচ্ছে না। মেসেজ পাঠালেও কোনো রিপ্লাই আসছে না। ভাগ্যিস, আগেই কৌশলে সাকিবের ঠিকানাটা জেনে নিয়েছিল ও। নইলে এই চলে আসাটাও হতো না। সেদিন সাকিবদের বাড়িতে যাওয়ার ডিটেইল লিখে জানিয়েছিল সাকিব। তাই আজ অচেনা এবং অজানা এই জায়গাটায় হুট করে চলে আসার সাহস দেখাতে পেরেছে। তাছাড়া নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা বিপুর এক প্রকার শখও বলা যেতে পারে।
এখনও হাতে ধরা চিরকুটটা। চেহারা থেকে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভাবটা এখনও কাটেনি। দৃষ্টি তীক্ষè করে চারপাশটা দেখে নিল আবার। নাহ্, কোত্থাও কেউ নেই। পায়ে চলা মেঠো পথটা বেশ নির্জন। এই শেষ বিকেলের সময়টা তাই কেমন একটা থমথমে ভাব নিয়ে বিরাজ করছে। বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল নিজের অজান্তে। হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে ঢুকপুক করতে লাগল। পেটটা কেমন খালি খালি লাগছে। হঠাৎ করেই গলাটা শুকিয়ে গেল।
কেন হচ্ছে এমন? তাহলে কি কোনো অশুভ কিছুর সঙ্কেত পেয়ে যাচ্ছে ওর পঞ্চ ইন্দ্রিয়?
মেঠো পথটা বিপ্লব খানের ঠিক ফিট পঁচিশেক পেছন থেকে ডানে মোড় নিয়েছে। আর সামনে বেশ খানিকটা সোজা নাক বরাবর চলে গেছে। তারপর ওখান থেকে বাঁক নিয়ে চলে গেছে ডানে। দু’পাশে গাছপালা। বাম পাশটায় ঝোপঝাড় একটু ঘন। ওই ঘন ঝোপের মধ্যে ইতিমধ্যেই অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। দ্রুত সাকিবদের বাড়িতে পৌঁছতে হবে। নইলে পথে কোনো বিপদও ঘটে যেতে পারে।
বাস থেকে নেমে মেন রাস্তা থেকে বায়ে ঢুকে এই পর্যন্ত চলে এসেছে বিপু। পথে একটা মুদি দোকানে জিজ্ঞেস করেছিল সাকিবদের বাড়িটা সম্পর্কে। দোকানদার কেমন তেরছাভাবে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। আশেপাশের আরও দু’একজন ওকে দেখে কেন জানি একটু চক্ষুজোড়া কুঞ্চিত করেছিল। বিষয়টিকে তখন গুরুত্ব দেয়নি ও। আসলে এই নতুন অঞ্চলে ও তো বন্ধুর বাড়িতে শুধু বেড়াতেই এসেছে। অন্য কোনো মিশন বা কোনো কেস নিয়ে তো ও আসেনি। তাই একটু সরলভাবেই নিয়েছিল সবকিছু। কিন্তু এখন ভাবছে সেটা মোটেই ঠিক হয়নি। গোয়েন্দারা যেখানেই যায়, সবকিছুকে সিরিয়াসলিই নিতে হয়।
এই নিয়ে তৃতীয়বার চিরকুটের লেখাটা পড়ল বিপু ভাইয়া।
না, এবারও এই লেখার কারণ বুঝল না। আচ্ছা, এটা ওকে উদ্দেশ্য করেই লেখা হয়েছে তো? কে লিখেছে? আর ওর কাছে ছুড়ে দিলই বা কে? সে কেন ওর সামনে আসছে না? সামনে আসতে কি কোনো কারণে ভয় পাচ্ছে?
মনে মনে একটু হাসার চেষ্টা করল ও। তাতে যদি পরিবেশটা একটু হালকা হয়। একবার ভাবল, এটা ওকে লেখা হয়নি। আগে থেকেই এখানে পড়ে ছিল। কিন্তু সেটা মস্তিষ্কে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ, ও যখন এক মনে গুনগুন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ টুক করে কাগজের টুকরোটা ওর সামনে পড়ে। টুকরোটার দিকে তাকিয়ে একটু গড়িয়ে যেতেও দেখেছে ও। কাজেই, এটা নিশ্চিত হয়ে নিল যে, চিরকুটটা ওকে উদ্দেশ্য করেই লেখা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কে লিখল? কেন লিখল? আর লিখলই যদি, তাহলে সামনে আসছে না কেন? এই অচেনা-অজানা জায়গায় ওর তো কোনো শত্রু থাকার কথা নয়।
আচ্ছা, ভাবল ও, এটা সাকিবের কাজ নয় তো? কোনোভাবে হয়তো ওর আসার খবর জেনে গেছে, আর এখন দুষ্টুমি করে এই চিরকুট রহস্য হাজির করেছে। হতে পারে না? তা পারে। কিন্তু ও-ও তো এখনও সামনে আসছে না।
ধুর! আর টেনশন নিতে পারছে না বিপুর নার্ভগুলো। ঠিক আছে, আগে বেচারার সাথে দেখা হোক, তারপর এর মজা উসুল করা যাবে।
শব্দ করে বড় একটা শ্বাস নিল বিপ্লব। তারপর সামনে হাঁটা ধরল। কিন্তু একটু দূর যেতেই আবার থমকে দাঁড়াল। ওর মনে হলো, কেউ ওকে ফলো করছে। চট করে পেছন ফিরে তাকাল। না, কেউ নেই। তাহলে কি মনের ভুল? উল্টোপাল্টা সব ভাবছে বলে অবচেতন মন ওকে ভয় দেখাতে চাচ্ছে?
আবার হাঁটতে লাগল ও। দু’কদম কি তিন কদম এগিয়েছে, আবার থমকে দাঁড়াল। এবার দাঁড়ানোর পরও কারোর পায়ের শব্দ শুনল।
পেছন ফিরে তাকাল। না, এবারও কাউকে নজরে পড়ল না।
এই প্রথমবার গা’টা ছমছম করে উঠল বিপ্লবের। এদিকে সন্ধ্যেও প্রায় হয়ে এসেছে। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করে বাটন টিপে সময় দেখল। হ্যাঁ, আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি আছে সন্ধ্যে হতে। আশ্চর্য, বাস থেকে নেমে ওই দোকানটা ছাড়িয়ে আসার পর বেশ কয়েকবার সাকিবকে ফোন দিয়েছে ও, কিন্তু প্রতিবারই সিম বন্ধ দেখিয়েছে। সাকিবের মোবাইলে একবারও ঢুকতে পারেনি ও। এখানে কি নেটওয়ার্কের কোনো প্রবলেম আছে? থাকতে পারে। সাকিবের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। আর নেটওয়ার্কের প্রবলেম থাকলে বাড়িতে যোগাযোগ করাও কষ্টকর হবে তাহলে।
বুকটা ঢিবঢিব করছে বিপ্লবের। পথ ভুল করে অন্য কোথাও চলে আসেনি তো ও? না, তা হওয়ার কথা নয়। কারণ, সাকিবের বর্ণনা অনুযায়ীই ও এতদূর এগিয়ে এসেছে। পুরোটাই ওর মেমোরিতে ইনস্টল হয়ে আছে। এত সহজে ওর মেমোরি থেকে কোনো ডকুমেন্ট ডিলিট হয়ে যায় না।
মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল ও। তারপর আবারও হাঁটতে শুরু করল। এবার এক পা সামনে বাড়াতেই পেছনে স্পষ্ট কারো পায়ের শব্দ শুনল ও। কিন্তু এবার আর থামল না। কৌশল পাল্টিয়েছে। দেখতে হবে কে ওকে ফলো করে।
হেঁটে চলল বিপ্লব। পেছনে সমান তালে এগিয়ে আসছে একজোড়া পদশব্দ। কানজোড়া খরগোশের মতো খাড়া করে রেখেছে বিপু।
চলতে লাগল ওভাবে। একসময় চলা অবস্থাতেই পাঁই করে পেছন ফিরে তাকাল। এবং চোখাচোখি হয়ে গেল ছেলেটার সাথে।
দাঁড়িয়ে পড়েছে দু’জনই। ছেলেটার চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় দেখতে পেল বিপ্লব। নিজের মধ্যে নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে সে।
‘কে আপনি?’ হঠাৎ প্রশ্নটা ছুড়ে দিল বিপ্লব।
ছেলেটা কোনো জবাব দিল না।
এগিয়ে গেল বিপ্লব। একটু পিছিয়ে গেল ছেলেটা।
‘আপনি আমাকে ফলো করছেন কেন?’ আবার প্রশ্ন করল বিপ্লব।
এবারও কোনো জবাব দিল না ছেলেটা।
বয়সে বিপ্লবের চেয়ে একটু বড়ই হবে, তবে শরীরটা কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া। মাথার চুলগুলো বেশ লম্বা, এলোমেলো হয়ে আছে। পরনে কালো ফুলপ্যান্ট আর গায়ে ফুলহাতা স্টাইপ দেয়া শার্ট। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল।
‘আপনি…’
বিপ্লবের কথাটা শেষ হলো না, তার আগেই বলে উঠল ছেলেটা, ‘তুমি কেন ফিরে এসেছো? মরতে?’

দুই.
যারপরনাই অবাক হলো বিপ্লব। কিন্তু পরক্ষণই ভাবল, এটা নিশ্চয়ই সাকিব হবে। ওকে ঘাবড়ে দেয়ার জন্যই এই নাটক সাজিয়েছে। নাহ্, ছেলেটা পারেও বটে। ওকে তো সত্যিই ভড়কে দিয়েছে।
বলল, ‘তুমি যতই চেষ্টা করো সাকিব, আমি কিন্তু ঠিকই তোমাকে ধরে ফেলেছি। তবে তোমার প্লানের তারিফ সত্যিই না করে পারছিনে।’
ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল এই কথা শুনে। যেন খুবই অবাক হয়েছে। ঠোঁটজোড়া ঈষৎ ফাঁকা হয়ে আছে।
‘এই সাকিব, কিছু বলো।’ ছেলেটাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও বলল বিপ্লব। ‘আমি সেই কত দূর থেকে তোমার কাছে চলে এলাম। কি, বলেছিলাম না ঠিক একদিন তোমাদের গ্রামে চলে আসব? এখন বিশ্বাস হলো তো?’
ছেলেটার চেহারা আরও কিছুটা বিস্ময়ে ঢেকে গেল। যেন দেহের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি, একটি কথাও বের হবে না মুখ দিয়ে।
এতক্ষণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। এবার বিপ্লব ওর কাঁধটা ধরে একটু ঝাঁকি দিল। বলল, ‘কী ব্যাপার? কোনো কথা বলবে না? এই সাকিব, কী হয়েছে তোমার? কোনো সমস্যা?’
‘তু..তু…তু…’ তোতলাতে লাগল ছেলেটা।
‘হ্যাঁ, আমি। কি, এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না? আরে ফেসবুকে তুমি না হয় তোমার কোনো ছবি দাওনি। কিন্তু আমার ছবি তো দেখেছ। চিনতে পারছ না?’
‘মা..মা..মানে, তু..তু…’
‘ধ্যাত! এই, তুমি কি তোতলা?’ ফিক করে হেসে দিল বিপ্লব। ‘যাক, একটা তোতলা বন্ধু জুটে গেল তাহলে আমার।’
‘তুমি কে?’ এইবার পুরোটা বাক্য শেষ করল ছেলেটা।
‘মানে?’
‘তুমি আসলে কে?’
‘এই সাকিব, কী হচ্ছে এসব?’ হাসিটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে মুখ থেকে বিপ্লবের। ‘আরে আমি, তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড বিপ্লব খান, বিপু।’
‘তুমি আসলে, ..আমি…’ যেন কথা হারিয়ে ফেলল ছেলেটা।
‘বুঝেছি, বিশ্বাস হচ্ছে না, এই তো? ঠিক আছে, আগে তোমাদের বাড়িতে চলো। একটু রেস্ট নিই, তারপর গল্প করা যাবে। দেখছ না, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ইশ্! গ্রামে দেখি সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা নেমে পড়ে।’
ছেলেটার দৃষ্টি এখনও বিপ্লবের চেহারা থেকে সরেনি। কোনো বড় একটা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে ওর মধ্যে। বিপ্লব সেটা পড়তে পারছে না। আসলে ও তো এখন কিছুটা নিরাপত্তা বোধ করছে। এই অচেনা-অজানা জায়গায় ঠিক পথ চিনে বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছানো কষ্টকর হতো।
‘তুমি তাহলে সাকিব নও?’ ছেলেটা হঠাৎ করেই প্রশ্নটা করে বসল।
আর তাতে ভীষণভাবে চমকালো বিপ্লব।
‘সাকিব? আমি?’ এইটুকু বলে যেন ভীষণ হাঁফিয়ে উঠল বিপ্লব। এরপর কী বলবে তা খুঁজে পেল না।
‘তুমি তাহলে কে?’ একইভাবে আবার জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।
‘আ..আমি তো বললাম আমি বিপ্লব খান, বিপু। তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড।’ কিছুটা ঘাবড়ে গেছে বিপ্লব।
‘দেখ ভাই, আমার কোনো ফেসবুক ফ্রেন্ড নেই। আর ফেসবুক জিনিসটা কী তা জানিও না। এখন বুঝেছি, তুমি সাকিব নও। সাকিবের ডান কপালে একটা কাটা দাগ ছিল। তোমার নেই। তাহলে কে তুমি? কেন এসেছ এখানে?’ ছেলেটার মধ্যে এখন বল ফিরে এসেছে।
‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি আমাকে সাকিব বলছ কেন? তার মানে…’ ঠোঁটে আঙুল রেখে  কী যেন ভাবল কিশোর গোয়েন্দা। তারপর আবার বলল, ‘সামথিং ইজ রঙ। হু, আমি বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি।’
‘না, তুমি কিছুই আন্দাজ করতে পারছ না। তুমি জানো না তুমি কোন্ বিপদের মধ্যে এসে পড়েছ। বাঁচতে চাইলে এক্ষুনি ভাগো, যে পথে এসেছো, সেই পথে চলে যাও।’
‘মানে? আপনি আমাকে…’
‘সরি, এভাবে বলতে চাইনি। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমাকে ওরা দেখলে…’ ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক একবার দেখল ছেলেটা।
‘কারা দেখবে আমাকে?’ বুঝতে পারে না বিপ্লব। বিস্ময়ের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমে। ‘আমার বিপদ হবে কেন? বুঝতে পারছি আপনি আমার বন্ধু না। কিন্তু আমি তো আমার বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। জানিয়ে আসিনি, কারণ আমি ওকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছি।’
ঝট করে বিপ্লবকে ধরে রাস্তার বায়ে একটা মোটা গাছের আড়ালে নিয়ে গেল ছেলেটা। মুখে আঙুল রেখে চুপ থাকতে বলল।
একটা মোটর সাইকেল চলে গেল শহরের দিকে। পেছনে রেখে গেল ধোয়ার একটা ঘূর্ণি। ধোয়ার পরিমাণ এতই ছিল যে, আরোহী কারা তা ভালো করে দেখা গেল না। তবে দু’জন যে ছিল, এটা বুঝতে পেরেছে বিপ্লব।
আরও কয়েকটা মুহূর্ত আড়ালেই রাখল বিপ্লবকে ছেলেটা। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে এলো। বলল, ‘আসলে হয়েছে কি, সাকিবকে দেখতে ঠিক তোমারই মতো। পার্থক্য শুধু ডান কপালে একটা কাটা দাগ ছিল ওর।’
‘আস্তে আস্তে।’ ওকে থামিয়ে দিল বিপ্লব। ‘ডান কপালে কাটা দাগ ছিল বলছেন কেন? সাকিব এখন কোথায়? কিছু হয়েছে ওর?’
‘আসলে কী বলব তোমাকে।’ আমতা আমতা করতে লাগল ছেলেটা।
‘বলুন আমাকে, প্লিজ!’
‘ঠিক আছে, তোমাকে সব খুলে বলব। তাছাড়া তুমি সাকিবের বন্ধু বলছ যখন, তোমার বিষয়টা দেখাও এখন আমার দায়িত্ব। চলো, আমরা এগোয়।’
‘কোথায়?’
‘আপাতত আমার বাড়িতে চলো। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে।’
‘ঠিক আছে, চলুন।’
‘ও আর একটি কথা, সাকিব আমাকে তুমি করেই বলতো। কাজেই ওর বন্ধু হিসেবে তুমিও আমাকে তুমি করেই বলবে।’
‘ধন্যবাদ। চলুন যাওয়া যাক।’
‘উহু।’
‘ও সরি। চলো যাই। কিন্তু তোমার নামটা…’
একটু হাসল ছেলেটা। তবে বেশি ফুটল না। বলল, ‘আফজাল আমার নাম।’
গ্রাম্য পথটা ধরে হেঁটে চলল ওরা।
সন্ধ্যার আঁধার তখন চেপে বসতে শুরু করেছে। গ্রামে যে একটু আগেভাগেই অন্ধকার নেমে আসে, তা ভালোভাবেই অবলোকন করল কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া। তবে বুঝতেও পারল না কোন্ রহস্যের জালে আটকে পড়তে যাচ্ছে ও।

তিন.
বিপ্লবকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে ভরসা পেল না আফজাল। তাই নিয়ে তুলল সাকিবের আব্বার চাচাতো ভাই আজমল হাওলাদারের বাড়িতে। আপাতত এই বাড়িটাকেই বিপ্লবের জন্য নিরাপদ ভাবল ও।
আজমল হাওলাদার তো প্রথমটায় বিপ্লবকে দেখেই ভীষণভাবে চমকালেন। সাকিব ফিরে এসেছে? কোথায় ছিল ও এ কয়দিন?
কিন্তু ভুল ভাঙলো আফজাল তাকে সব বুঝিয়ে বলাতে। বিপ্লবও আফজালকে সহযোগিতা করল।
বাড়ির আর কাউকে জানানো হলো না ব্যাপারটা। বিপ্লবের জায়গা হলো কাছারি ঘরটাতে। বাড়ির মূল বিল্ডিং থেকে একটু তফাতেই কাছারি ঘরটা। এক সময় বহুল ব্যবহৃত হলেও এখন আর তেমন হয় না। দূর-দূরান্ত থেকে আজমল হাওলাদারের কোনো আত্মীয় বেড়াতে এলে তার জন্যই খুলে দেয়া হয় ঘরটা। তবে বিপ্লব ভেতরে প্রবেশ করে বুঝল অন্তত মাসখানেকের মধ্যে কারোর পদধুলি পড়েনি এখানে।
পুরো বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ আছে। কিন্তু কাছারি ঘরের বিদ্যুতের লাইনটা দিন সাতেক আগে কেটে গেছে। সেটা আর ঠিক করা হয়নি। তাই হারিকেন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।
টুকটাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও করে নিতে হয়েছে ঘরটা। আফজালই সারল কাজটা।
তারপর সকালে আসবে বলে বিদায় নিয়ে চলে গেল আফজাল। একটু পর চলে গেলেন আজমল হাওলাদার। একা হয়ে গেল বিপ্লব। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। প্লেটে করে ভাত-তরকারি নিয়ে হাজির হলেন আজমল। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে হাতমুখ ধুইয়ে আনলেন বিপ্লবকে। তারপর বিপ্লবের খাওয়া শেষ হলে দরকারি দুই একটা কথা বলে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
বিপ্লব বেশ সাহসী ছেলে। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজ্যের ভয় এসে ওর উপর ভর করল। এরকম একটা নতুন জায়গায় নির্জন একটা ঘরে একলা কীভাবে থাকবে ও? ভয়ে বুকটা দুরু দুরু করছে। কাঠের দরোজাটার খিল আটকে দিয়ে বিছানায় এসে বসল ও। পুরনো খাট। ওর ভর পেয়ে মচমচ করছে। ভেঙে যাবে নাতো?
হারিকেনের তেজও কমে আসছে। উঠে গিয়ে সলতে বাড়িয়ে দিল। একটু বাড়ল আলো। কিন্তু পরক্ষণই আবার কমতে শুরু করল। হারিকেনটা ধরে ঝাঁকি দিল। যা আশঙ্কা করেছিল তাই, তেল শেষ হয়ে গেছে। আর হয়তো মিনিটখানেক আলো দেবে ওটা। তারপর?
প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে মোবাইলটা স্পর্শ করল। না, ওটা জ্বালা যাবে না। চার্জ শেষ করতে চায় না ও। কিন্তু রাত সবে শুরু হয়েছে, পুরো রাতটা এভাবে অন্ধকারে কাটাতে হবে ওকে?
ভয় যেন ঘরের প্রতিটি কোনা থেকে উঁকি দিতে লাগল। নিজের মধ্যে অনেকটাই গুটিয়ে গেল বিপ্লব। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি।
খাটে উঠে বসল আবার। মচমচ শব্দটা যেন আরো জোরে হলো এবার। মনের অজান্তেই একবার চমকে উঠল।
না, সাহস হারা হলে চলবে না। মনে সাহস রাখতে হবে। ‘ভয় পেলে ভয়, ভয় না পেলে কীসের ভয়?’ মনে মনে কয়েকবার আওড়ালো ও। তাতে কিছুটা জোর পেল।
হারিকেনের আলো নিভু নিভু। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর পুরোপুরি অন্ধকারে ঢেকে যাবে ঘরটা।
বাইরে ঝিঁঝিঁদের একটানা শব্দ হচ্ছে। ঘেউ ঘেউ কয়ে একটা কুকুর ডেকে উঠল কোথাও। তাতে সাড়া দিল আরো কয়েকটা কুকুর।
পাশেই কোনো গাছে একটা পেঁচা ডেকে উঠল বিচ্ছিরি কর্কশ কণ্ঠে।
শুয়ে পড়ল বিপ্লব, জড়োসড়ো হয়ে।
চোখ বন্ধ করল। হুড়মুড় করে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল একরাশ ভয় ওর মাথা-ঘাড়-সমস্ত শরীরের উপর। মুহূর্তেই আবার খুলে ফেলল চোখজোড়া।
নিভে গেছে হারিকেনের আলো।
পুরোপুরি অন্ধকার এখন ঘরটা।
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। বাটন টিপে একটা নম্বর বের করে তাতে কল দিল। কানে ধরে রইল। নাহ্, রিসিভ করছে না কেউ।
কল শেষ হয়ে গেল। আবারও কল দিল। এবারও ফল হলো একই। কেউ সাড়া দিল না।
ক্ষান্ত দিল বিপ্লব। না, এভাবে করতে থাকলে চার্জ নষ্ট হবে। কাল কোথাও চার্জ দেয়ার সুযোগ পাবে কি না জানে না। জানে না কী পরিস্থিতিতে পড়বে ও। ওকে সবাই সাকিব বলে মনে করবে। কিভাবে সামলাবে সবাইকে? আজমল হাওলাদার কোনোভাবে সাহায্য করবেন কি?
হ্যাঁ, আপাতত এই বিষয়টা নিয়ে ভাবা যায়। তাতে ভয়গুলো বাসা বাধতে পারবে না।
গোড়া থেকে আবার বিষয়গুলো ভাবল ও। কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে সাকিবের কোনো সাড়া পাচ্ছিল না বিপ্লব। তাই হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল স্বশরীরে এসে হাজির হবে সাকিবদের বাড়িতে। তাছাড়া স্কুলেও ছুটি পাওয়া গেছে কয়েকদিনের। এই সুযোগটা ও হাতছাড়া করবে কেন?
যেই ভাবা সেই কাজ। বাসে চড়ে বসে। নির্দিষ্ট স্টপেজে নেমেও পড়ে। এরপর কিছুটা ভ্যানগাড়িতে করে আসে। তারপর পায়ে হাঁটা পথ। পথের মোড়ে এক মুদি দোকানদারকে সাকিবদের বাড়ির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই কেমন যেন হয়ে যায় লোকটা। যেন ভিনগ্রহের কোনো ভাষায় কথা বলেছে। গুরুত্ব দেয়নি ও। চলে এসেছে ওখান থেকে। খেয়াল করেনি আরও কিছু লোক কেমন কেমন দৃষ্টিতে ওকে দেখছে।
এরপর ওর সামনে এসে পড়ে চিরকুটটাÑ ‘মরতে এসেছো? জলদি ভাগো!!’
সেখান থেকেই শুরু। পরিচয় হয় আফজালের সাথে। তারপরের কাহিনী তো খুবই সংক্ষিপ্ত।
একটা ব্যাপার বুঝতে পারছে বিপ্লবÑ সাকিবদের কোনো বিপদ হয়েছে, বড় কোনো বিপদ, আফজালের কাছে যতটুকু শুনেছে তাতে এটাই পরিষ্কার হয়েছে।
কী হয়েছে সাকিবের? কোথায় ও? আফজাল ওকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এখানে এনে কেন রাখল? এর পেছনে কি অন্য কোনো রহস্য আছে? কী?
আফজালকে কতটা বিশ্বাস করা যায়? ও যা বলেছে তা কি সব সত্যি? নাকি কোনো চাল চেলেছে? নাকি সাকিবই এসব কিছু করছে? তাহলে এই আজমল হাওলাদারের ভূমিকা কী তাতে? তিনি তো মুরব্বি মানুষ। তিনি কেন বাচ্চাদের কোনো খেলার মধ্যে নিজেকে জড়াবেন?
নাহ্, সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আসলে এখন ওর ব্রেনটা একটু রেস্ট চাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবেশে রেস্ট নিবে কিভাবে?
‘সাকিব, তুমি কেন এমন করছো আমার সাথে?’ অস্ফুটে ফিস ফিস করে বলে উঠল বিপ্লব। ‘তুমি কি চাওনা তোমার সাথে আমার দেখা হোক? কেন লুকিয়ে রাখছো নিজেকে? প্লিজ! দেখা দাও আমার সামনে।’
এই সময়ই দরোজায় খট খট করে একটা শব্দ হলো। চমকে উঠলো বিপ্লব।
স্থির হয়ে গেল সমস্ত শরীর। নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেছে। যেন নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলেই কেউ এসে ওকে আক্রমণ করবে।
আবারও খট খট।
একইভাবে বিছানায় পড়ে রইল বিপ্লব। কান জোড়া খাড়া হয়ে গেছে।
‘অ্যাই বিপু, তুমি কি জেগে আছো?’ বাইরে থেকে বলে উঠল কেউ।

চার.
বিপ্লব কোনো সাড়া দিল না। বুঝতে চাইছে বাইরে যে আছে সে কি শত্রু না মিত্র।
‘অ্যাই, আমি আফজাল বলছি। তুমি কি জাগনা?’ আবারও শোনা গেল কণ্ঠটা। এবার আগের চেয়ে স্পষ্ট।
না, ভাবল বিপ্লব। খামোখাই ভয় পাচ্ছিল ও। ওটা আফজালই হবে। আজ তো অনেকক্ষণই একসাথে ছিল ওরা। কাজেই কণ্ঠটা অনেকটাই পরিচিত হয়ে গেছে।
খাট থেকে নামল বিপ্লব। এগিয়ে গেল দরোজার দিকে।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি ঘুমাও। কাল সকালে আসব আমি।’ বলে হয়তো চলে যাচ্ছিল আফজাল।
তাকে থামাল বিপ্লব। বলল, ‘ও আফজাল? এই খুলছি দরোজা।’ খিল টেনে দরোজা খুলল বিপ্লব। পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাটন টিপে অন্ধকার কিছুটা সরানোর চেষ্টা করল।
ভেতরে প্রবেশ করল আফজাল।
‘কী ব্যাপার, ঘুম আসছে না বুঝি?’ জিজ্ঞেস করল আফজাল।
‘না, ঘুম আসছে না।’ জবাব দিল বিপ্লব। ‘নতুন জায়গা তো…’
‘আমিও সেই সময় তাড়াহুড়ো করে তোমাকে রেখে গেলাম। আসলে তখনই আমার ভাবা উচিত ছিল নতুন জায়গায় একা একা তুমি ঘুমাতে পারবে না। বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে শুতে গেছি, এই সময় মনে পড়ল কথাটা। তাই চলে এলাম, তোমার সাথে ঘুমাতে। আপত্তি নেই তো?’ বলে অন্ধকারেই বিপ্লবের মুখের দিকে তাকাল আফজাল।
বিপ্লব মুহূর্তেই জবাব দিল, ‘না না, আপত্তি থাকবে কেন?’ আসলে ও তো একজন সঙ্গীই চাচ্ছিল এতক্ষণ। কিন্তু সেটা কিভাবে বলে সরাসরি। তাই একটু ঘুরিয়ে বলল, ‘তুমি আমার সাথে ঘুমালে আমার কোনো আপত্তি নেই, যদি তোমার পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না থাকে।’
‘যাক,’ বলল আফজাল। ‘একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল।’
‘কোন্ ব্যাপারে?’ কথাটা ধরল বিপ্লব।
‘না কিছু না,’ এড়িয়ে গেল আফজাল। খাটে শুতে শুতে বলল, ‘রাত অনেক হয়েছে। এখন ঘুমিয়ে পড়া উচিত। সারাদিন নিশ্চয়ই ধকল গেছে তোমার শরীরের উপর দিয়ে। এখন ফুল রেস্ট দরকার। আর তাছাড়া সকালে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা আল্লাহই জানেন। কাজেই শরীরটা চাঙা করে নেয়া দরকার।’
‘হু।’ বিপ্লবও আর কথা বেশি বাড়ালো না। আসলেই ওর এখন ফুল রেস্ট দরকার। সকালে কী হবে তা সকালেই ভাবা যাবে। এখন সঙ্গী যেহেতু একজন পাওয়া গেছে, কাজেই নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। বলল, ‘ওসব সকালে ভাবলেও চলবে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। এসো ঘুমিয়ে পড়ি।’
বলল ঠিকই, কিন্তু ভাবনাগুলো সহসাই ওর মগজ থেকে গেল না। এলোমেলোভাবে ওগুলো আসা-যাওয়া করলই, যতক্ষণ ও সজাগ ছিল।
নিকষ কালো অন্ধকারের রাত। যেন অমাবস্যাকেও হার মানাবে। শীতল বাতাস গাছের পাতাগুলোকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। টুপটাপ করে শিশিরও ঝরে পড়ছে গাছের পাতা আর ঘাসের ডগায়। হিমেল পরশের শীতল ছোয়াটা কাছারি ঘরের ভেতরেও দাপিয়ে বেড়াতে ভুল করছে না। শীতে শরীর গুটিয়ে গেছে দুই কিশোরের। একে অন্যকে জড়াজড়ি করে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে ওরা।
ঝিঁঝিঁ পোকারা অনেক আগেই থেমে গেছে। কুকুরগুলোও শেষবারের মতো ডেকে উঠেছে মিনিট দশেক আগে। পেঁচাটা বুঝি শীতের কামড়ে বাসা থেকেই আর বের হয়নি আজ। নিশাচর এই পাখিটা আজ আর খাবারের খোঁজে বের হবে না।
সুনসান নীরবতা পুরো এলাকাটা জুড়ে।
দুঃস্বপ্ন দেখছে বিপ্লব। ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে একদল জংলী মানুষ। চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ জংলী মানুষগুলো সাদা পোশাক পরা মানুষে পরিণত হয়ে গেল। ইয়া লম্বা শরীর তাদের। পেশিগুলো খুব মজবুত। যে লোকটা ওকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে, তার গায়ে যেন দুনিয়ার সব শক্তি ভর করছে। শরীরটাও ভীষণ ঠাণ্ডা। ওর চামড়া ভেদ করে তার পরশ লাগছে ভেতরে। ঢুকে যাচ্ছে আরও ভেতরে। একটু পরেই সেই ঠাণ্ডা বয়ে যাচ্ছে ওর শিরা-উপশিরা ধরে। ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো শরীরে। কাঁপতে শুরু করেছে ও।
লোকটা ওকে ছুড়ে ফেলল। এক দঙ্গল বরফের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করল বিপ্লব। বরফগুলো গলে পানি বয়ে যাচ্ছে। ধুয়ে যাচ্ছে ওর শরীর। আর তাই দেখে উল্লাসে চিৎকার করছে লোকগুলো। আরে, ওগুলো তো মানুষ না, সাদা-কালো পশমের ভালুক!
উঠতে চেষ্টা করছে বিপ্লব। কিন্তু পারছে না। ঠাণ্ডা এতটাই লাগছে যে, দেহের কোনো পেশিই কাজ করছে না। সবগুলোই যেন অবশ হয়ে গেছে। রক্ত চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে যেন।
দূরে কোথাও খুট খুট করে শব্দ হলো। চোখ মেলতে চেষ্টা করল ও। বার তিনেক চেষ্টার পর পুরো চোখ মেলতে পারল। চোখে এসে ঢাক্কা খেল একরাশ অন্ধকার। মুহূর্তেই সব মনে পড়ে গেল। ও আসলে স্বপ্ন দেখছিল। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। এই শীতেই কাঁপছে ও, এখনও।
কিন্তু শব্দ হলো কিসের?
চোখ মেলে ওভাবেই পড়ে রইল ও। কান খাড়া করে ফেলেছে।
আবার হলো শব্দটা। এবার স্পষ্ট।
দরোজাটার ঠিক বাইরে এসে থামল শব্দটা। যেন ভারী পায়ে হেঁটে এসে থামল কেউ বা কিছু।
আফজালকে কি ডাকবে? না থাক, আগে দেখা যাক ব্যাপারটা কী।
পুরনো কাঠের দরোজার ফাঁক-ফোকর গলে ভেতরে মৃদু আলোর রেখা এসে ঢুকল। টর্চের আলো হবেÑ ভাবল বিপ্লব। তারমানে কোনো মানুষই হবে।
টর্চের আলো এপাশ ওপাশ নেচে বেড়াল। তারপর স্থির হলো দরোজার খিল লাগানো যেখানে, ঠিক সেখানটাতে।
সতর্ক হয়ে উঠল বিপ্লবের সমস্ত স্নায়ু।
ধীরে ধীরে শব্দ না করে উঠে বসল, যদিও শব্দ না করে এই খাট নেমে নামা প্রায় অসম্ভব।
নেমে পড়ল খাট থেকে। বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল দরোজার দিকে, একটু কৌণিকভাবে।
একটু নড়ে উঠল দরোজাটা।
সরে গেল বিপ্লব। ভাবল, কেউ কি খুলতে চাইছে দরোজা? কেন?
আবারও নড়ল দরোজা।
আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইল বিপ্লব।
নিভে গেল টর্চের আলো। তারপর এগিয়ে যেতে লাগল এক জোড়া ভারী পদশব্দ।
এতক্ষণে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা ফোস করে ছাড়ল বিপ্লব।
পরক্ষণই ওর পঞ্চ ইন্দ্রিয় কিছুর তাগাদা দিল। দ্রুত হাতে তবে সাবধানে দরোজার খিল খুলল। বাইরে এবং ভেতরে উভয় জায়গায় অন্ধকার থাকায় আলো বা অন্ধকারের কোনো পরিবর্তন হলো না।
নেচে নেচে এগিয়ে যাচ্ছে এক চিলতে আলো। তাকে বারবার ঢেকে দিচ্ছে লম্বা একটা ছায়া। অর্থাৎ লোকটা চলে যাচ্ছে।
বারান্দা থেকে নিচে নেমে এলো বিপ্লব। ভাবল একবার, তাকে অনুসরণ করবে। কে এসেছিল, কেন এসেছিল তা জানার চেষ্টা করবে। কিন্তু পরক্ষণই চিন্তাটা বাতিল করে দিল। এমনিতেই অনেক রিস্ক নিয়ে ফেলেছে ও। আর সেটা বাড়াতে চায় না।
গলার স্বর অনেকটাই নামিয়ে তবে দৃঢ়তার সাথে জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে, কে আপনি?’
স্থির হয়ে গেল আলোটা। দু’টো মুহূর্ত ওভাবেই থাকল। তারপর আলোটা ঘুরে এপাশে চলে এলো। উপরে উঠে এলো টর্চের আলো। সরাসরি বিপ্লবের চোখেমুখে এসে আছড়ে পড়ল।
চোখজোড়া ধাঁধিয়ে গেল ওর। শব্দ করে ঢোক গিলল।

পাঁচ.
চোখ-মুখ থেকে বুক, পা তারপর নিচে নেমে গেল আলোটা। এগিয়ে আসছে আলোর মালিক। ওর সামনে ঠিক চার হাত দূরে এসে থামল। চিনতে পারল টর্চের মালিককে, আজমল হাওলাদার।
‘ও আপনি!’ বলল বিপ্লব। আপাতত এই কথাটাই এলো ওর মুখে।
‘দুঃখিত তোমাকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য।’ বললেন আজমল হাওলাদার। ‘আসলে প্রচণ্ড শীত পড়েছে তো, তাই এসেছিলাম এই চাদরটা দিতে। আসলে হয়েছে কি, বাড়িতে এক্সট্রা কোনো কাঁথা বা কম্বল নেই তো, তাই সে সময় দিতে পারিনি। কিন্তু শীত বেশি পড়াতে আর থাকতে পারলাম না। নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছিল তোমার।’ কথাগুলো বলার সময় সেগুলো কেমন বেধে বেধে যাচ্ছিল। কিন্তু অন্ধকার হওয়াতে আজমল হাওলাদারের মুখের পরিবর্তনগুলো দেখতে পারল না বিপ্লব।
‘তা ঠিক, শীত বেশ পড়ছে। রীতিমতো তো কাঁপছিলাম আমি।’ চাদরটা নিতে নিতে বলল বিপ্লব। কিন্তু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে বাড়িতে এক্সট্রা কোনো কাঁথা বা কম্বল নেই এই কথাটা। এটা হতেই পারে না। গ্রামে এমন কোনো বাড়ি নিশ্চয়ই নেই যে বাড়িতে অতিরিক্ত দু’একটা গরম কাপড় নেই।
আজমল হাওলাদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চাদরটা নিয়ে রুমে ফিরে এলো বিপ্লব। দরোজা আটকে দিয়ে চাদরটা দিয়ে দু’জনের শরীর বেশ করে ঢেকে নিল। শীত পুরোপুরি না কমলেও কিছুটা আরামবোধ হচ্ছে এখন।
অল্পক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে পড়ল বিপ্লব।

বিষয়টা অতটা জটিল হলো না, যতটা জটিল হবে ভেবেছিল।
তবে বিপ্লব আপাতত পরের দিনটাতে কাছারি ঘর থেকে বের হলো না। ফজর হতেই এসেছিলেন আজমল হাওলাদার। তিনিই পরামর্শ দিয়ে গেছেন ঘর থেকে আপাতত বের না হতে। বের হলে নাকি তার বিপদ হতে পারে।
‘আসলে বিষয়টাকে আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। সাকিবের এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এতটুকু একটা ছেলে, ওর আবার শত্রু হবে কিভাবে? দিনকাল খুব খারাপ হয়ে গেছে।’ কথাগুলো বলেছেন আজমল হাওলাদার।
‘ওদের বাড়িটাতে একটু যাওয়া যায় না?’ জিজ্ঞেস করেছে বিপ্লব।
‘কার কাছে যাবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করেছেন আজমল।
বিপ্লব জানে সাকিবের মা নেই। বাবার সাথেই থাকে ও। কোনো ভাইবোনও নেই। বলল, ‘কেন, ওর আব্বা তো আছেন।’
এ কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘তাহলে আর দুঃখের কথা বলছি কী? সাকিব ছোকরাটা নিখোঁজ হওয়ার পরের দিনই তো মানুষটাও গায়েব হয়ে গেল।’
‘মানে?’ বিপ্লবের কপালে দু’টো ভাঁজ পড়ল। নড়েচড়ে বসল ও।
‘হ্যাঁ বাবা, ওর বাবাও নিখোঁজ হয়েছেন। যদি তা না হতেন তাহলে তোমাকে তার সামনে নিয়ে গিয়ে বলতাম এই যে তোমার আদরের সন্তান সাকিব। তোমাকে সাকিব বলে দিব্যি চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু…’ বেশ চিন্তিত দেখাল আজমল হাওলাদারকে।
‘এ তা সাংঘাটিক ঘটনা! সাকিবের আব্বা তো পরিবেশ বিজ্ঞানী ছিলেন।’
‘খুব ভালো বিজ্ঞানী ছিল আমার ভাইটা। ও তো শুধু আমার ভাই-ই ছিল না, বন্ধুও ছিল। কিন্তু…’ লুঙ্গির খুট দিয়ে চোখ মুছলেন।
‘তাহলে তো চাচাজান, ওদের বাড়িতে আমাকে যেতেই হবে।’ বলল বিপ্লব। ‘আপনি হয়তো জানেন না, আমি একজন গোয়েন্দা। এই মুহূর্তে ওদের বাড়িতে যাওয়াই আমার প্রথম এবং প্রধান কাজ বলে আমি মনে করছি।’
একটু যেন চমকালেন আজমল হাওলাদার। তবে সেটা বাইরে প্রকাশ হতে দিলেন না। কিন্তু কেমন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বিপ্লব বলল, ‘আপনি ইচ্ছা করলে এখানকার পুলিশের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন। তাদের কাছে আমার তথ্য অবশ্যই আছে। আমি তো ভাবছি আজই একবার পুলিশের কাছে যাবো। আচ্ছা, এই ঘটনা ঘটার পর পুলিশ আসেনি?’
‘হ্যাঁ এসেছিল। রুটিন কিছু কাজ করে চলে গেছে। আসলে আমিই চলে যেতে বলেছি। পুলিশ এসে কী করবে বলো? সালমান হওলাদার ছিল একজন মস্ত বিজ্ঞানী। তার মতো মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। তাকে খুঁজে বের করা কি পুলিশের কাজ?’
‘মানে?’
‘এই দেখ, তোমাকে এসব কী বলছি। কিন্তু দেখ, আজকের দিনটা অন্তত তোমাকে বাইরে বের হওয়া ঠিক হবে না। আমি আগে বাইরের দিকটা একটু সামলে নিই। তুমি নিশ্চয়ই ও বাড়িতে যাবে। কারণ তুমি তো গোয়েন্দা। আর আমি জানি তুমি পারবে সাকিব ও তার বাবাকে খুঁজে বের করতে। এটা যে করতেই হবে। আমি চাই না দেশের এতো বড় একজন বিজ্ঞানী এভাবেই হারিয়ে যাক। তুমি কী বলো?’
‘দেখুন চাচাজান, এখানে আমি নতুন। তবে আপনার কাছে যতটুকু শুনলাম ও জানলাম, তাতে এটা পরিষ্কার যে, এখানে বড় ধরনের কিছু একটা ঘটে গেছে। আর রহস্য যত জটিল হয়, ততই আমার ভালো লাগে। আমি তাতে বেশ আনন্দ পাই। তাই সাকিব এবং তার আব্বাকে খুঁজে বের করা এখন আমি আমার দায়িত্ব বলে গ্রহণ করেছি। তবে এক্ষেত্রে আপনার সাহায্য আমার লাগবে।’
একটু থতমত খেলেন আজমল হাওলাদার। বিষয়টা বিপ্লবের নজর এড়ালো না। তবে সেটা বুঝতে দিল না। জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আমাকে সহযোগিতা করবেন তো?’
‘অবশ্যই করবো। কেন করবো না। আমিও তো চাই ওরা ফিরে আসুক। দেশের এত বড় ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’ একটু থামলেন তিনি। তারপর আবার বললেন, ‘ঠিক আছে, এখন আমি যাচ্ছি, সময়মতো তোমাকে সব বলব আমি। সে পর্যন্ত কষ্ট হলেও এই কাছারি ঘরেই তোমাকে থাকতে হবে। কি, রাজি তো এভাবে থাকতে?’
হাসল বিপ্লব। বলল, ‘হ্যাঁ আমি রাজি। তবে যত দ্রুত পারেন সাকিবদের বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’
কথা এ পর্যন্তই হয়েছিল সকালে। এখন বিকাল প্রায় শেষ হতে চলেছে। এর মাঝে সকালে একবার ও দুপুরে একবার খাবার দিয়ে গেছে আফজাল। ছেলেটা মজুর খাটে। তাই ইচ্ছা থাকলেও বেশি সময় ওকে দিতে পারছে না। তবে ওর সাথে বিস্তারিত কথা বলা জরুরি। অনেক তথ্য জানা যাবে ওর সাথে কথা বললে বলে বিপ্লবের বিশ্বাস।
মনে মনে ঠিক করল, আজ রাতেই আফজালের সাথে কথা বলতে হবে। এবং সম্ভব হলে তখনই একবার সাকিবদের বাড়িতে যাবে। খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। ওর এতপ্রিয় বন্ধুটা কোথায় আছে, কেমন আছে তার কিছুই ও জানে না। আল্লাহ, ও যেখানেই থাকে যেন ভালো থাকে।
আজকাল এরকম নিখোঁজের ঘটনা অহরহই ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটছে মুক্তিপণের আশায়। কিন্তু এ কেসটা ব্যতিক্রম। কারণ সাকিব নিখোঁজ হওয়ার পরপরই নিখোঁজ হয়েছেন তার আব্বা। কাজেই মুক্তিপণ চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আজমল হাওলাদারের কথা অনুযায়ী, সাকিবের আব্বা সালমান হাওলাদার একজন বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী। বিপ্লব আগে এই নামের কোনো বিজ্ঞানীর কথা শোনেনি। সাকিবও ওকে বলেনি। আর সব যে ও জানবে, তাও না। তাছাড়া গ্রামেগঞ্জে এখনও অনেক মহৎ ব্যক্তি আছেন যারা নীরবে-নিভৃতে কাজ করতে ভালোবাসেন।
সালমান হাওলাদার সম্পর্কে আরও বেশি জানতে হবে।
মোবাইলে বাড়িতে কথা বলেছে বিপ্লব। সবাই ভালো আছে। ও-ও ভালো আছে বলে জানিয়েছে। ইচ্ছে করেই সাকিবের নিখোঁজের খবরটা জানায়নি। খামাখা ওদেরকে চিন্তায় ফেলতে চায়নি ও। গোলাপী, ওর ছোট বোন তো বলেই দিয়েছে এক বস্তা গল্প নিয়ে ফিরতে হবে। দুই রাত জেগে ওকে সেগুলো শোনাতে হবে।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। আজমল হাওলাদার সেই যে সকালে ওর সাথে দেখা করে গেছেন, আর আসেননি। হয়তো ব্যবস্থা করতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু ওর তো আর তর সইছে না।
হারিকেনে তেল ভরে দিয়ে গেছেন আজমল। কাজেই আজকের রাতে আর অন্ধকারে থাকতে হবে না।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ? ধুর ছাই! এই লুকোচুরি আর ভালো লাগছে না। আমার চেহারা সাকিবের মতো হতে গেল কেন? কিংবা সাকিবের চেহারা আমার মতো?
অধৈর্য হয়ে উঠেছে বিপ্লব। একা একাই বেরিয়ে যাবে কি না ভাবছে, ঠিক এই সময় হাজির হলো আফজাল। অনেকটা হাঁফাতে হাঁফাতে এলো ও। আর ও এসে যে খবরটা দিল, তাতে বিপ্লবের অন্তরাত্মাটা খাঁচা ছাড়ার উপক্রম হলো।
দড়াম করে হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় আছড়ে পড়ল।

দশ.
অভ্যাস মতো মাথার পাশে বালিশের নিচে রাখা মোবাইল ফোনটা বাম হাতে উঠিয়ে নিল বিপ্লব। আন্দাজে একটা কী-তে চাপ দিয়ে স্ক্রিনকে আলোকিত করলো। চোখ পিট পিট করে তাকাল। কিন্তু কিছুই পরিষ্কার দেখতে পেল না। দু’সেকেন্ডে পরই নিভে গেল মোবাইল স্ক্রিনের আলো। আবারও বাটন টিপে আলো জ্বালল। এবার চোখ দু’টোকে জোর করে মেলে ধরল মোবাইলের স্ক্রিনের ওপর। হ্যাঁ, এবার দেখতে পেল। কিন্তু দেখার পরও বিশ্বাস হতে চাইল না। তাই আবারও স্ক্রিনটা আলোকিত করে তীক্ষèভাবে তাকাল। না, ওর চোখ ভুল দেখছে না।
এবং তক্ষুনি তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। শরীরের নিচে ক্যাঁচ-কোঁচ করে উঠল পুরনো খাট। ঝাঁ করে মনে পড়ে গেল সব। ও এখন সাকিবদের গ্রামে সাকিবের চাচার কাছারি ঘরে শুয়ে আছে। তবে হঠাৎ করে শোয়া থেকে উঠে বসায় পিঠটা কেমন জ্বালা করে উঠল। বুঝতে পারল এটা গত রাতের আঘাতের ফল। মনে পড়ল রাতের ঘটনাটা। আফজালকে সাথে নিয়ে সাকিবদের বাড়িতে ঢোকার উদ্দেশে গিয়েছিল। কিন্তু ঢুকতে পারেনি। বরং আচমকা পিঠের ওপর এসে পড়ে একটা বুনো বিড়াল। গায়ের শার্ট ভেদ করে পিঠে বিড়ালের দু’টো নখের আঁচড় লাগে। ওখানটা এখনও জ্বালা করছে।
আফজালের কথা মনে হতেই পাশে তাকাল। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ছেলেটা এখনও।
মনটাই তেতো হয়ে গেল বিপ্লবের। অনেক দিন পর ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেছে। নিজেকে বেশ অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে। কেন এমন হলো? আসলে গতকাল রাতের ধকল সইতে না পেরে বেশিই ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। আর শরীরটাও ছিল বেশ দুর্বল। তাছাড়া শুয়েছিলও বেশ রাত করে।
কিন্তু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কিশোর গোয়েন্দা এই নামাজ কাজা হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে।
ঝাড়া দুই মিনিট ঝিম মেরে বসে রইল ও। তারপর খাট থেকে নিচে নামল। ইচ্ছে করেই আফজালকে ডাকল না। ঘুমাক বেচারা, নামাজ তো কাজা হয়ে গেছেই, এখন আর উঠিয়ে লাভ কী?
দরোজার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে ভোরের মিষ্টি আলো ঢুকছে ভেতরে। খিল খুলল দরোজার। বাতাসে হিমেল পরশ থাকলেও তার মাঝে একটু যেন উষ্ণতারও মিশ্রণ আছে। তবে ভালোই লাগল ওর কাছে।
আবার এসে খাটে বসল বিপ্লব। পিঠের ব্যথাটা বেশ জ্বালাচ্ছে। বুঝতে পারছে না একটা বিড়ালই তো পড়েছে লাফিয়ে ওর পিঠের ওপর, তাই বলে এত ব্যথা হতে হবে? দূর! ব্যথার কথা আর মনেই আনা যাবে না। ভুলে থাকতে হবে। তাতে বরং লাভই হবে। আর সে চেষ্টাই করতে লাগল ও এখন থেকে।
আড়চোখে আবারও আফজালের দিকে তাকাল ও। বালিশের কোনায় মুখটা একটু হা হয়ে আছে। লালা বের হয়ে বালিশের কোনাটা বেশ ভিজিয়ে দিয়েছে। কোত্থেকে একটা মাছি ঢুকেছে ঘরে। আফজালের মুখের চারপাশে ভন ভন করছে। তার পাখনা থেকে নীল একটা আভাও যেন বের হচ্ছে।
খুবই বিরক্তি লাগছে বিপ্লবের। পেটের ভেতরটায় হঠাৎ কেমন খালি খালি লাগছে। প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে। হালকা গ্যাসও হচ্ছে বোধহয় পেটের মধ্যে।
নাহ্, সাকিবের কেসটার একটুও অগ্রগতি হয়নি। শুরু থেকেই ঘোরের মধ্যে আছে। গত রাতে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজটাকে একটু ক্লু মনে হলেও ওতে যা লেখা আছে তা থেকে কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। ধ্যাত, আর ভাল্লাগছে না। হাল বুঝি এবার ছেড়েই দিতে হয়। কিন্তু তাই বা হয় কী করে? বন্ধুর বিপদে ও এগিয়ে যাবে না? ভীরুর মতো সটকে পড়বে? না না, ও তা পারবে না। এই রহস্যের জাল ওকে ছিঁড়তেই হবে।
মনের অজান্তেই হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। মুখের পেশি টান টান হয়ে গেল।
এই সময় দরোজায় দেখা গেল আজমল হাওলাদারের মুখ। একহাতে খাবারের পাত্র ও অন্য হাতে পানির জগ নিয়ে রুমে ঢুকলেন তিনি। পুরনো টেবিলটাতে রাখলেন। তারপর বসলেন খাটে। একবার তাকালেন আফজালের ঘুমন্ত দেহটার দিকে। তারপর ফিরলেন গোয়েন্দার দিকে। বললেন, ‘আজ থেকে তুমি ইচ্ছা মতো বাইরে বের হতে পারবে। তবে একটু সাবধানে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, তোমার আব্বা, মানে সাকিবের আব্বা আর কি, এখনও নিখোঁজ। কাজেই শত্রুরা তোমাকে দেখলে হয়তো নতুন করে কোনো কৌশল আঁটতে পারে। সে সুযোগ ওদেরকে দেয়া যাবে না।’ একটু থামলেন। তারপর আবারও বলতে লাগলেন, ‘এখন খেয়েদেয়ে নাও। আর আফজালটা দেখছি এখনও ওঠেনি।’
‘রাতে একটু দেরিতে ঘুমায়েছে তো,’ বলল বিপ্লব। ‘তাই…’
‘ও। তা সারা রাত বুঝি গল্প করেছো দু’জনে?’
‘হ্যাঁ মানে…’
‘ঠিক আছে। তুমি খেয়ে রেস্ট নাও। আমাকে একটু শহরে যেতে হবে।’ উঠে দাঁড়ালেন আজমল হাওলাদার। ‘তবে আবারও বলছি, তোমাকে সাবধানে থাকতে হবে। কোনোমতেই শত্রুদের নজরে পড়া যাবে না। তুমি তো আবার গোয়েন্দা।’
ঝট করে মুখ তুলে তাকাল বিপ্লব, সরাসরি আজমল হাওলাদারের মুখের উপর দৃষ্টি ফেলল। মুখটা সরিয়ে নিলেন ভদ্রলোক। কেমন যেন ধরা পড়া ভাব তার চেহারায় খেলা করে গেল। তবে তা মুহূর্তের জন্য। দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। অন্তত বিপ্লবের কাছে সেটাই মনে হলো।
বিপ্লবের মনের মধ্যে কী একটা উঁকি দিয়েও মিলিয়ে গেল। কিছু একটা যেন তার অবচেতন মন ওকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছে। ধরতে পারছে না ও।
‘আমি তাহলে গেলাম।’ বলে আর দাঁড়ালেন না আজমল হাওলাদার। খোলা দরোজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
লোকটার গমন পথের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল বিপ্লব।
প্রায় মিনিট খানেক পর সম্বিৎ ফিরল ওর। দরোজার ওদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল আফজালের দিকে। এখনও একইভাবে ঘুমাচ্ছে ছোকরা।
দৃষ্টি সরিয়ে খাবার পাত্রের দিকে নিবদ্ধ করল। সরে গিয়ে পানির জগটা হাতে উঠিয়ে নিল। তারপর দরোজা দিয়ে বাইরে গিয়ে মুখ-হাত ধুয়ে নিল। এসে বসল খাটে।
মাছিটা এবার ওর খাবারের প্লেটের উপর দিয়ে ভন ভন করতে লাগল। বিরক্তিতে নাক কুঁচকে গেল ওর। বার বার তাড়িয়েও কাজ হচ্ছে না। যাচ্ছে না মাছিটা। ধুর, ও ওর মতোই থাক। আমার কী তাতে? মনে মনে বলল বিপু।
খাবার শেষ করল। হাত ধুয়ে প্লেটেই রাখল পানি। ইচ্ছে করতে না এটো পানি বাইরে ফেলে দিতে। খাওয়ার পর কেমন আলসেমিতে পেয়ে বসল ওর। আবারও শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করতে। এমনটা তো কখনো হয় না। এখন কেমন হচ্ছে তাও বুঝতে পারছে না।
ওভাবেই বসে রইল কিছুক্ষণ বিপ্লব। তারপর অনেকটা নিজের অজান্তেই পকেট থেকে গতারাতে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজটা বের করল। মেলে ধরল চোখের সামনে। পড়ল আবার- জানলে খবর আছে। গোটা গোটা অক্ষরে কালো বলপয়েন্ট কলম দিয়ে লেখা শব্দ তিনটে। কী খবর আছে তা কাগজটা পাওয়ার পর থেকেই উদ্ধার করতে চেয়েছে বিপ্লব। কিন্তু পারছে না। কাগজটা এবং তাতে লেখাটা এখন ওর কাছে নিরর্থক মনে হচ্ছে। তারপরও কী ভেবে চোখের সামনে মেলে ধরে রইল। তবে দৃষ্টিটা তখন আর কাগজের লেখার উপর নেই। চলে গেছে অন্য কোথাও। হারিয়ে গেছে ওর মন। উড়াল দিয়েছে অজানার উদ্দেশ্যে। এ কারণেই বুঝি একটু তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিল ওর। আর তাতে হাতের আঙুল ঢিলা হয়ে কাগজটা নিচে পড়ে গেল। পড়বি তো পড়, পড়লো প্লেটের এটো পানির মধ্যে। দেহের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল বিপ্লবের। ধড়মড় করে চেতন ফিরে পেল। তাকাল কাগটার দিকে। পানিতে ভিজে গেছে ওটা। আর তাতে একটা লেখা ফুটে উঠেছে।
মুহূর্তে পুরো সজাগ হয়ে গেল কিশোর গোয়েন্দার পঞ্চইন্দ্রিয়। দ্রুত হাতে ওটা উঠিয়ে নিল। মেলে ধরল টেবিলের উপর। একটা মোবাইল নম্বর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খুশি হয়ে উঠল ওর মনটা। যাক, একটা ক্লু বোধহয় সত্যিই পাওয়া গেল।
প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল। কাগজের নম্বরগুলো টিপে ইয়েস বাটন চাপল। মোবাইলটা কানে চেপে ধরল। হ্যাঁ, রিং হচ্ছে ওপাশে।
বার পাঁচেক রিং হওয়ার পর কেটে গেল। কানের উপর থেকে সেটটা সরিয়ে এনে চোখের সামনে মেলে দেখল ঁংবৎ নঁংংু লেখা ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ এটা সত্যিই একটা মোবাইল নম্বর। এবং নম্বরটা চালুও আছে। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিপুর। নম্বর যখন একটা পাওয়া গেছে, তখন কথাও বলা যাবে। হয়তো এই মুহূর্তে সে ব্যস্ত আছে। তাই কেটে দিয়েছে। পরে আবার চেষ্টা করা যাবে।
খুশির খবরটা আফজালকে দেয়ার তাগাদা অনুভব করল। এবার আর না ডেকে পারল না ওকে। প্রথমে মৃদু পরে জোরে ঢাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলল আফজালকে।
আফজাল ঘুম থেকে জেগে উঠল। প্রথমটাই কিছু না বুঝতে পারলেও পরক্ষণে সব মনে পড়ে গেল। তারপর বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল এতক্ষণ ঘুমিয়েছে বলে।
বিপ্লব বলল, ‘সূত্র একটা বোধহয় পাওয়া গেছে। এখন জলদি উঠে হাতমুখ ধুয়ে নাশতা খেয়ে নাও। সূত্রটা নিয়ে এগোতে হবে আমাদের।’
আফজাল সূত্রটার বৃত্তান্ত না জেনে হাতমুখ ধুতে চাইল না। কিন্তু বিপ্লব জোর করায় হাতমুখ ধুয়ে নাশতা নিয়ে বসল। আর বিপ্লব সূত্রটার কথা খুলে বলল ওকে।
‘কিন্তু কাগজের মধ্যে অদৃশ্য লেখাটা লিখল কী করে?’ অবাকই শোনাল আফজালের কণ্ঠ।
‘এটা খুবই সোজা।’ জবাবে বলল বিপ্লব। ‘লেবুর রস দিয়ে লিখেছে নম্বরটা কেউ। আমরা তো এভাবে অনেক খেলাও করেছি। তুমিও এটা পরীক্ষা করে দেখতে পারো। লেখার সঙ্গে সঙ্গে কাগজ সেই রস শুষে নেয়। এরপর পানিতে ভেজালে লেখাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’
‘বাহ্, বেশ মজার তো!’ উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল আফজালের কথায়।
ততক্ষণে আফজালের নাশতা শেষ হয়ে গেছে। বলল, ‘এখন আমরা কী করবো?’
‘আজমল চাচা এসেছিলেন। তিনি বলে গেছেন এখন আমি বাইরে বের হতে পারবো। আর কোনো চিন্তা নেই।’
‘তারমানে তিনি তোমার ফিরে আসার বিষয়টা সবাইকে বলে দিয়েছেন।’
‘আমার ফিরে আসা মানে?’
‘মানে সাকিবের ফিরে আসা আর কি।’
‘হ্যাঁ, তবে আমি চাই সাকিব সত্যিই বাস্তবে ফিরে আসুক। ওর যদি কিছু হয়ে যেয়ে থাকে, তাহলে আমি অনেক কষ্ট পাবো।’ বিপ্লবের চোখজোড়া কেমন ছলছল করে উঠল।
‘সাকিবকে আমরা ফিরে পাবোই। ফিরে যে পেতেই হবে ওকে।’ মুখে জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেও কেমন ভাঙা ভাঙা শোনাল আফজালের গলাটা।
বিপ্লব তখনও চেষ্টা করে চলেছে নম্বরটিতে যোগাযোগ করার। পেয়েও গেল। কৌশলের কারণে ও কিছু না বলে চুপ রইল। শুনতে চায় কে কথা বলে।
‘হ্যালো!’ ওপাশে বলে উঠল কেউ। পুরু ভরাট কণ্ঠ।
একটু যেন চমকালো বিপ্লব। কে কথা বলে? কেমন পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে যে! এগারো.
‘হ্যালো কে? হ্যালো কে বলছেন? কী ব্যাপার? কথা বলছেন না কেন?’
বিপ্লব নিরুত্তর। ওপাশের কথা শুনছে, কিন্তু কোনো জবাব দিচ্ছে না। আসলে ও কিছু একটা মেলাতে চাচ্ছে। কিন্তু মিলাতে পারছে না। তাই বেশ অস্বস্তি লাগছে।
ওপাশ থেকে তখনও ‘হ্যালো’ বলেই চলেছে।
একটু পর ওপাশ থেকেই লাইনটা কেটে গেল।
মোবাইল সেটটা কান থেকে নামিয়ে নিল বিপ্লব। তাকাল আফজালের দিকে।
আফজাল বলল, ‘কো কথা বলল? তুমি কোনো কথা বললে না কেন?’
বিপ্লব একটু রহস্যময়ভাবে হাসল। বলল, ‘কথা এখন বলিনি, কিন্তু বলব না এ কথা তোমাকে কে বলল? পরে সময় মতো কথা বলে নেব।’
‘সময় মতো মানে? কখন সময় হবে?’
‘সেটা কি আর আমি এখন জানি? সময় মতো সেটাও জানতে পারবো।’
‘ধ্যাৎ, তুমি আমার সাথে ইয়ার্কি করছো।’ কিছুটা আশাহত হলো আফজাল। স্পষ্ট প্রকাশ পেল তার কণ্ঠে।
ঠিক এই সময় হন্তদন্ত হয়ে একটা ছেলে কাছারি ঘরে প্রবেশ করল। একটু যেন হাঁফাচ্ছে ছেলেটা। ওকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ বিপ্লব। মাথার চুলগুলো খাড়াখাড়া। ঠিক যেন তারকাঁটার মতো। গোলাকার মুখমণ্ডল। উপরের ঠোঁটটা একটু উপরের দিকে উল্টানো। গায়ে সাদা-কালো চেক হাফহাতা টি-শার্ট। পরনে বাদামী ফুলপ্যান্ট। তবে রং উঠে প্রায় সাদা হয়ে গেছে। ছেলেটা হাতে সবুজ-লালের মিশ্রণযুক্ত একটা ক্যাপ।
বিপ্লবকে কিছু বুঝে উঠার আগেই ছেলেটা ওকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হড়বড় করে একগাদা কথা বলে গেল, ‘এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? কেন হারিয়ে গিয়েছিলে? জানো তোমার জন্য আমার কত খারাপ লাগছিল? আমি ঠিক মতো ঘুমাতেও পারিনি এ কয়দিনে। বলো না কোথায় ছিলে এ কয়দিন? এই সাকিব, বলো না কোথায় ছিলে?’
আরও অনেক কথা বলল ও।
বিপ্লব ‘থ’ মেরে গেছে। কোনো কথাই যোগাচ্ছে না মুখে। তবে এটা বুঝতে পারল যে, ছেলেটা ওকে সাকিব ভেবে ভুল করছে। একটু খুশিও হলো তাতে। যাক, সাকিবের আরেকজন বন্ধুকে তাহলে পাওয়া গেল।
‘এই নাও তোমার ক্যাপ।’ বলল ছেলেটা। ‘আর কতদিন রাখব বলো? সেই যে আমাকে রাখতে দিলে, তারপরই তো হারিয়ে গেলে। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি?’
আফজাল এগিয়ে এলো বিপ্লবকে সাহায্য করতে। ছেলেটাকে ওর গায়ের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘এই মিলন, একটু তো থামবে, না কি? হড়বড় করে একগাদা প্রশ? করে যাচ্ছ। ওকে বলার সুযোগ তো দেবে। এদিকে এসো।’
কাজ হলো এতে। বিপ্লবকে ছেড়ে দিল ছেলেটা। তবে বিপ্লবের কাছ থেকে নড়ল না। বলল, ‘কিন্তু এটা কেমন কথা, ও আমাকে না বলে এতদিন কোথায় ছিল?’
এবার কথা বলে উঠল বিপ্লব। মিলনের কাছ থেকে ক্যাপটা নিয়ে মুখে হাসি ভাব রেখে বলল, ‘সরি বন্ধু। আমি আসলে হঠাৎ করেই একটু বাইরে চলে গিয়েছিলাম তো, তোমাকে জানিয়ে যেতে পারিনি সে কারণে। এখন আমি ম্যালা ম্যালা সরি। কি, এবার খুশি তো?’ মিলনকে এবার নিজেই বুকে জড়িয়ে ধরল ও।
দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিল মিলন। কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। বলল, ‘তোমার কণ্ঠ অমন লাগছে কেন?’
একটু কাঁশল বিপ্লব। মানে গলা পরিষ্কার করার ভান করল। বলল, ‘না মানে, একটু ঠাণ্ডা লেগেছে তো, তাই।’
‘ও!’ তবুও যেন মেনে নিতে পারছে না মিলন।
‘এখন বলো, এ কয়দিন তুমি কেমন ছিলে?’ জিজ্ঞেস করল বিপু ভাইয়া।
‘আমার আর থাকা।’ কেমন অবজ্ঞা ভরেই যেন কথাটা বলল মিলন। ‘এই ছিলাম আর কি।’
বিপ্লব ক্যাপটা মাথায় পরে নিল। যাক, কাজেই দেবে জিনিসটা। কপালটা ঢেকে রাখা সম্ভব হবে। তারপর বলল, ‘চলো আফজাল, আমরা এবার বের হই।’
‘কোথায় যাবে এখন?’ আফজালের জিজ্ঞাসা।
‘আমাকে সঙ্গে নেবে না?’ প্রশ? মিলনের।
‘অবশ্যই তোমাক নিয়ে যাব।’ জবাব দিল বিপ্লব।
‘তা এখন কোথায় যাবে ঠিক করলে?’ এবারের প্রশ?টা আফজালের।
‘আপাতত নায়েবের পুকুরের ওদিকটাতেই চলো। আজ তো মিলন আছে আমাদের সাথে। ও যেখানে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিল, সে জায়গাটাও দেখা হবে।’
‘তারমানে তুমি সাকিব ও সাকিবের আব?ার নিখোঁজ হওয়ার সাথে মিলনের জ্ঞান হারানোর সম্পর্ক আছে বলছ?’ প্রশ? ছুড়ল আফজাল।
‘কখন বললাম সে কথা আমি?’ পাল্টা প্রশ? বিপ্লবের।
‘না তা বলোনি, তবে নায়েবের পুকুরের ওখানে যেতে চাচ্ছ তাই জিজ্ঞেস করলাম।’
‘তুমি আমার ব্যাপারে এত খোঁজখবর রাখো?’ কিছুটা অবাকই শোনাল মিলনের কণ্ঠ।
আফজাল বলল, ‘তাহলেই বোঝো ও তোমাকে ভুলে গেছে কি না।’
‘সরি সাকিব, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলে গেছ, তাই ওভাবে বলেছিলাম তখন।’ বলল মিলন।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। এখন চলো বের হওয়া যাক।’ তাড়া লাগাল বিপ্লব।
তিন জনের দলটা একটু পরেই রওনা দিল। উদ্দেশ্যÑ রহস্যময় নায়েবের পুকুর। আফজালের ভাষ্যমতে, জীবন্ত পুকুর।
পুকুরে এখন পানি ততটা না থাকলেও বোঝা যায় একসময় খুবই গভীরতা ছিল তার। এখন শুকিয়ে গেছে চারপাশটা। মাঝখানে বুকসমান পানি বিরাজ করছে। চারপাশটা এখনও বেশ খোলামেলা। যেন বিশার এক কচু পাতার মাঝখানটিতে এক ফোঁটা শিশিরবিন্দু।
পুকুরের স্থানটি বৃক্ষশূন্য থাকলেও আশেপাশে গাছগাছালির অভাব নেই। বড় ছোট সব রকমের বৃক্ষ আছে এখানে। ওরা বড় একটা বৃদ্ধ কড়ই গাছের নিচে এসে থামল। কড়ই গাছটার ঠিক পেছন দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। পাশের গ্রামের সাথে সংযোগ রক্ষা করেছে এই রাস্তাটি।
এলাকাটা বেশ সুনসান। পাশের গাছগুলোতে পাখি কিছু উড়লেও তা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ এ মুহূর্তে তাছের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে না। যেন কোনোকিছুর জন্য গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছে।
‘এখন বলো তুমি কোথায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিলে।’ মিলনকে উদ্দেশ্য করে বলল বিপ্লব।
জায়গাটা দেখিয়ে দিল মিলন। পুকুরের পানির ঠিক কাছাকাছি একটা শিমুল গাছ আছে। গাছটাকে ঘিরে জায়গাটা একটু উঁচু আকৃতি ধারণ করেছে। ওখানেই গাছের মোটা একটা শিকড়ের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল মিলন।
উঁচু ঢিবিটাতে উঠে গেল ওরা।
চারপাশটা একটু নজর বুলিয়ে নিল বিপ্লব। শিমুল গাছটার ঠিক পেছন দিক দিয়ে রাস্তাটা। রাস্তায় এই মুহূর্তে কোনো লোক চলাচল নেই।
‘আচ্ছা আফজাল,’ বলে উঠল বিপ্লব। ‘তুমি বলছিলে পুকুরটা জীবন্ত। তোমার এ কথা বলার কারণটা একটু ব্যাখ্যা করো তো।’
কেশে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিল আফজাল। তারপর বলা শুরু করল, ‘আসলে বিষয়টা আমিও ভালোমত জানিনে। লোকমুখে শোনা কথা। মুরুবি?রা বলেন তাই আমরাও বলি। তবে বছর চারেক আগের কথা, তখন পুকুরটাতে বেশ পানি ছিল। এখনও পানি থাকে বর্ষার সময়। তো সেই বছরে বর্ষার সময় পুকুরটা ছিল একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ। দক্ষিণ পাড়ায় বাড়ি হাবুলদের। ও প্রায়ই এদিকে আসত, আমাদের সাথে খেলাধুলা করতো। তারপর সন্ধ্যার আগেই ফিরে যেত। সেদিনও ও আমাদের সাথে খেলা করেছিল। সন্ধ্যার আগেই নামল তুমুল বৃষ্টি। আমরা সেই বৃষ্টির মাঝেই খেলা চালিয়ে গেলাম। এভাবে খেলতে খেলতে কখন যে মাগরিবের আজান দিয়েছিল, তা কেউ খেয়াল করিনি। একসময় খেয়াল হতেই সবাই যার যার মতোন ছুটলাম বাড়িতে। তখন তো আর জানিনে যে হাবুলের এতবড় বিপদটা হবে। রাতে বোধহয় আমার একটু জ্বরও এসেছিল। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে জানতে পারলাম হাবুলকে নাকি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। শুনে খুব খারাপ লাগল। মনে মনে ভয়ও লাগতে লাগল। ও তো কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের সাথেই ছিল। খারাপ কিছু হয়ে যায়নি তো ওর? নায়েবের পুকুর যে জীবন্ত, তাতো সবাই-ই আমরা জানি। ওই পুকুর ওকে কিছু করেনি তো? কিছুতেই এই ভয়টা মন থেকে তাড়াতে পারলাম না। তাই অন্য বন্ধুদের নিয়ে ছুটলাম পুকুরের দিকে। আমার সাথে সাকিব, মিলন, আরও অনেকেই ছিল।’ এই সময় মাথা ঝাঁকিয়ে আফজালের কথায় সমর্থন জানালো মিলন। আফজাল তার গল্প বলে চলল, ‘আমরা বার বার আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম যেন হাবুলের খারাপ কিছু না হয়। কিন্তু দোয়া করলে আর কী হবে, যা হওয়ার তা তো আগের দিন রাতেই হয়ে গেছে। সাকিবই আবিষ্কার করল হাবুলের লাশটা। পুকুরের ও’পাড়ে তখন ঘন কলাবাগান ছিল। কলাবাগানের ওখানেই পানিতে ভাসছিল হাবুলের লাশ।’
শেষের দিকে আফজালের কণ্ঠটা ভিজে উঠেছিল। হয়তো হাবুলের চেহারাটা তখন মনের পর্দায় ভেসে উঠছিল।
মিলন বলল, ‘কিন্তু আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিনে। সাকিব কেন এতদিন পর হাবুলের বিষয়টা জানতে চাইছে। ওর কি মনে নেই সেসব? এই সাকিব, ব্যাপারটা কী বলো তো?’ তাকাল বিপ্লবের দিকে। চোখেমুখে একরাশ জিজ্ঞাসা।
বিপ্লব কেমন থতমত খেয়ে গেল। এবার বুঝি ধরা পড়েই গেল। কী বলবে ওকে? সত্যি কথা বলে দেবে? সেটা কি ঠিক হবে? কতটুকু ভরসা করা যায় ওকে? না, এখনই সব জানিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। ও যে সাকিব নয়, এটা এখনই পরিষ্কার করতে চায় না বিপ্লব। দ্রুত নিজেকে সামলে নিল ও।
এবারও সাহায্যে এগিয়ে এলো আফজাল। বলল, ‘আরে সেসব কিছু না। আসলে অনেকদিন আগের ঘটনা তো, তাই ওর মনে ছিল না সব। এ কারণেই শুনতে চাইছিল। এই, আমি ঠিক বলছিনে?’ সমর্থনের আশায় বিপ্লবের দিকে তাকাল আফজাল।
প্লিব মাথাটা ঈষৎ নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, ‘আমার তো সবই মনে আছে। মাঝে মাঝে এই পুকুরের পানিতে টাকার জালা ভাসতে দেখা যেত। প্রায়ই রাতে লম্বা লম্বা পা ফেলে কারা যেন এই পুকুরের উপর দিয়ে হেঁটে যেত।’
আশ্চর্য হলো আফজাল। এসব জানল কী করে বিপ্লব? কিন্তু পরে বিপ্লব মূল কারণটা বলেছে। আসলে প্রায় সব পুরনো পুকুর নিয়েই এই রকম গল্প লোকমুখে প্রচলিত আছে। তখন আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে আফজাল।
‘ও!’ আর কোনো কথা জোগালো না মিলনের মুখে।
বিপ্লব নেমে গেল ঢিবিটা থেকে। এগিয়ে গেল পুকুরের সামান্য পানির দিকে। ওকে অনুসরণ করল বাকি দুই কিশোরও।
পানির কিনারে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল বিপ্লব। পুকুরের পানি বেশ অস্বচ্ছ। শেওলা পড়ে গেছে। ছোট ছোট পোকামাকড় কিলবিল কিলবিল করছে। হালকা কটু গন্ধও বুঝি মিশে আছে পানিতে। তারপরও ডান হাতে কিছু পানি তুলে নিল বিপ্লব। চোখের সামনে নিয়ে দেখতে লাগল। আসলে ওর মস্তিষ্ক তখন অন্য কোথাও কাজ করছে। এটা কেবল অন্য দু’জনের কাছে আইওয়াশ মাত্র।
‘এই বিপু, সরি সাকিব,’ বলে উঠল আফজাল। ‘এটা কী করছ? এই ময়লা পানিতে কেউ হাত দেয়? ফেলে দাও ফেলে দাও!’
উঠে দাঁড়াল বিপ্লব। তবে পানি ফেলল না। আসলে হাতের উপর পানি নিয়ে কতক্ষণই বা রাখা যায়! এমনিতেই পড়ে গেছে।
মিলন বলল, ‘তুমি এ কয়দিনে অনেক বদলে গেছ সাকিব।’
ওর দিকে তাকিয়ে বোকা বোকা একটু হাসল বিপ্লব। কিছুই বলল না।
এই সময় দূরে কোথাও ইঞ্জিনের শব্দ হলো। এবং ক্রমেই নিকটে আসতে লাগল। বিপ্লব বুঝতে পারল এটা কোনো মোটর সাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ।
কান খাড়া করে সেদিকে তাকিয়ে রইল তিন কিশোর।
মোটর সাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ আরো কাছে চলে এলো।
হ্যাঁ, এবার মোটর সাইকেল আরোহীকে দেখা যাচ্ছে। দু’জন আরোহী আছে ওতে। শিমুল গাছটার ওপাশের রাস্তা ধরে গ্রামের ভেতরেই চলেছে।
কনুইতে জোরে একটা টান অনুভব করল বিপ্লব। আফজাল ওকে টানছে। বুঝতে পারল না বিপ্লব কেন। কোনো প্রশ? না করে সে টানে সাড়া দিল ও।
সাকিব ও বিপ্লবকে অন্য একটা মোটা গাছের আড়ালে চলে গেল আফজাল।
এই গ্রামে প্রথম যেদিন ঢুকেছিল, সেদিনও আফজাল ওকে এভাবেই টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটা গাছের আড়ালে। এবং সেদিনও একটা মোটর সাইকেল আসছিল।
তাহলে কি…
ওর ভানায় ছেদ ঘটাতেই যেন প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। দ্রুত হাতে ওটা বের করল বিপ্লব। আজ সকালে গতকাল রাতের কুড়িয়ে পাওয়া কাগজের অদৃশ্য লেখা থেকে উদ্ধার করা নম্বর এটা। মুখে এক চিলতে মুচকি হাসি দেখা দিল ওর।
বারো.
মোটর সাইকেলটা ঠিক শিমুল গাছটার ওপাশে থামল। আর এদিকে আফজাল খামচে ধরল বিপ্লবের বাহু। যেন নখ বসিয়ে দেবে ওর মাংসপেশিতে।
‘অত জোরে চেপে ধরছ কেন আফজাল?’ মৃদুস্বরে বলল বিপ্লব।
আফজাল মুখে কিছু না বলে ঠোঁটের উপরে আঙল চাপা দিয়ে চুপ থাকতে বলল।
মিলন কেমন উসখুস করছে। ওকে হাত দিয়ে ইশারা করে থামতে বলল আফজাল।
তবুও পুরোপুরি শান্ত হলো না মিলন।
গলাটা লম্বা করে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল ছেলেরা ওরা কী করে।
মোটর সাইকেলের ড্রাইভার তার সিটে বসা। পিছনের আরোহী নেমে গেছে। রাস্তার ধারে বসল সে। কিছু একটা করল। সম্ভবত প্রাকৃতিক কর্ম সারল। তারপর আবারও উঠে বসল মোটর সাইকেলের পিছনে। এতক্ষণ ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ায় ছিল। তাই আর দেরি না করে গিয়ার চেঞ্জ করে এগিয়ে চলল মোটর সাইকেল।
কারোর মুখ দেখতে পেল না ছেলেরা। কারণ, হেলমেট পরা ছিল দু’জনই।
মোটর সাইকেলটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরও কিছু সময় একইভাবে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল ওরা। তারপর যখন ইঞ্জিনের শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে গেল, তখন বের হয়ে এলো।
প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোনটা আবারও বেজে উঠল বিপ্লবের। বের করে দেখল, আগের নম্বরই। ইয়েস বাটন টিপে কানে ধরল। পূর্বের মতোই কোনো কথা বলল না। ওপাশে ‘হ্যালো, কে বলছেন? কথা বলছেন না কেন?…’ প্রভৃতি বলেই চলল। একটু পর যথারীতি কেটে গেল লাইন।
আফজাল আবারও জিজ্ঞেস করল, ‘একই নম্বর বুঝি?’
বিপ্লব কিছু না বলে উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
‘তাহলে কথা বলছ না কেন?’
এ কথার কোনো জবাব দিল না বিপ্লব। বলল, ‘চলো, আপাতত এখানকার কাজ শেষ।’
‘মানে?’ আফজাল অবাক। ‘কিছুই তো ভালো করে দেখলে না এখানে। তাহলে এত তাড়াতাড়িই এখানকার কাজ শেষ বলছ কেন?’
‘কারণ আমাদের মূল কাজ এখানে না।’ জবাব দিল বিপ্লব। ‘সাকিবদের ঘরে ঢোকাটাই আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ।’
‘কিন্তু কয়েকবারই তো চেষ্টা করে আমরা ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছি।’
‘হ্যাঁ ব্যর্থ হয়েছি ঠিক, কিন্তু সফল যে হবো না, সেটা বলছ কেন?’
‘কিভাবে ঢুকবে তুমি? তোমার কাছে তো চাবি নেই।’
‘না নেই চাবি। তবে চাবি পেতে কতক্ষণ?’
‘মানে?’
‘ওসব মানে টানে পরে কোরো। এখন চলো।’ বলে হাঁটা ধরল বিপ্লব।
বাকি দুই কিশোর কিছুক্ষণ ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ওরাও রওনা দিল বিপ্লবের পেছন পেছন।
সাকিবদের বাড়িতে যাওয়ার পথে গ্রামের অনেকেরই সাথে দেখা হলো ওদের। সবাই-ই সাকিবের এ কয়দিনের নিখোঁজ হয়ে থাকার ব্যাপারটি জানতে চাইল। অনেক কষ্টে সবকিছু সামলাল ও। তবে আফজালই বেশি সহযোগিতা করল। প্রায় সবাই সাকিবের আব্বার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়েও অনেক প্রশ্ন করল। এবং দুঃখ প্রকাশ করল।
সাকিবদের বাড়ির সামনে আসতেই আজমল সাহেবের সাথে দেখা হয়ে গেল ওদের। প্রায় দৌড়ে ওদের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা? আমি সেই কখন থেকে তোমাদের অপেক্ষায় আছি।’
‘আমরা একটু গ্রামটা ঘুরে দেখতে গিয়েছিলাম।’ বলল বিপ্লব।
চোখ টিপে ওকে থামতে বলল আফজাল। মিলনের সামনে এভাবে বলাটা ঠিক হবে না। তারপর নিজেই বলল, ‘না মানে, গিয়েছিলাম একটু নায়েবের পুকুরের ওদিকটায়।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেলেছ তোমরা। আমি সেই কখন থেকে ঘরের চাবি নিয়ে তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি।’
‘চাবি ম্যানেজ করতে পেরেছেন আপনি?’ উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল বিপ্লবের কণ্ঠে।
‘হ্যাঁ, এই দেখ।’ হাতের তালুতে দু’টো চাবি দেখালেন আজমল।
‘তাহলে আর বাইরে দাঁড়িয়ে আছি কেন? দ্রুত চলেন ভেতরে ঢোকা যাক।’ বলেই আগে আগেই এগিয়ে গেল বিপ্লব।
আজমল হাওলাদার ঘরের তালা খুললেন। ভেতরে প্রবেশ করল সবাই।
বিপ্লব প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়াল। এটা একটা লম্বার বারান্দা। ডানে একটা ছোট ঘর। খোলা। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল রান্না করার জিনিসপত্র রয়েছে সেখানে। তারমানে এটাই রান্নাঘর। অর্থাৎ ঘরের বাইরের দেয়ালটা বাউন্ডারি লাইনের কাজ করছে। বেশ মজা লাগল ওর। সবকিছুই সালমান হাওলাদার করতেন লোকজনের আড়ালে। ভালোই সাজিয়েছেন তিনি তার আবাস ও কর্মস্থল।
কিন্তু একটা ব্যাপার ও কিছুতেই মেলাতে পারছে না। এতদিন তালা বন্ধ থাকলে তো ভেতরে একটা গুমোট ভাব থাকার কথা। সেসবের কিছুই নেই। তাহলে কি এখানে নিয়মিত কারোর যাতায়াত আছে? কারা যাতায়াত করে? কেন করে?
আচ্ছা, আজমল হাওলাদার বলেছেন, ঘরের চাবি পুলিশের কাছে থাকে। সত্যিই কি তাই? অন্য কারোর কাছে নেই তো, ডুপ্লিকেট কপি? বাড়িটা তো এমনিই পড়ে আছে। লোকজনের আসা-যাওয়াও নেই। বাইরে ঝোলানো তালায় মাপ নিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে নেয়া খুবই সোজা। আর যদি তাই হয়, তাহলে এখানে নিয়মিত যাতায়াত আছে কারোর।
বাইরে একটা মোটর ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল এই সময়। কিছুটা যেন চমকে উঠলেন আজমল হাওলাদার। তবে কেউ সেটা খেয়াল করল না। আফজাল ও মিলন তো ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখায় ব্যস্ত। আর বিপ্লব নিজের মধ্যে এতটাই মগ্ন যে অন্য কোথায় কী হচ্ছে তা ওর নজরে পড়ছে না। তবে ইঞ্জিনের শব্দটা যখন ওরও কানে গেল, তখন একবার মুখ তুলে তাকাল আজমল হাওলাদারের দিকে। লোকটা কি ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ? ও তাকাতেই ঝট করে মুখ সরিয়ে নিল? নাহ, চিন্তাটা বাতিল করে দিল। এভাবে ভাবা ঠিক হচ্ছে না।
‘আজকাল দেখা যাচ্ছে গ্রামে বেশ মোটর সাইকেল চলাচল করছে।’ বলল বিপ্লব। ‘আগেও কি এমন চলতো? মোটর সাইকেল কেনার মতো সামর্থ্য গ্রামের কয়জনের আছে?’
বিপ্লবের প্রশ্নটা মূলত আজমল হাওলাদারকে উদ্দেশ্য করেই।
ভদ্রলোক সেটা বুঝতেও পারলেন। বললেন, ‘বিষয়টা আমিও খেয়াল করছি। দু’টো লোককে প্রায়ই মোটর সাইকেল নিয়ে গ্রামে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওদের সাথে আমার কখনও কথা হয়নি। ব্যাটারা সব সময় হেলমেট মাথায় দিয়ে রাখে।’
থেমে গেছে ইঞ্জিনের শব্দ। বিপ্লবের মনে হলো, সাকিবদের বাড়ির কাছেই কোথাও থেমেছে। আর…
ঠিক এই সময় কোকিলের কুহু ডাক ভেসে এলো। অর্থাৎ আজমল হাওলাদারের মোবাইলটা বেজে উঠেছে। কল দিয়েছে কেউ। পকেট থেকে ওটা বের করলেন ভদ্রলোক। তারপর স্ক্রিনে কলারের নামটা দেখে কেমন চমকালেন। আড়চোখে তাকালেন বিপ্লবের দিকে। বিপ্লব এবার ভদ্রলোকের চমাকানোটা খেয়াল করল। কিন্তু ও যে তার চমকানো ধরে ফেলেছে তা বুঝতে দিল না। স্বাভাবিক রইল।
আজমল বললেন, ‘সরি। একটা গুরুত্বপূর্ণ কল এসেছে। একটু ধরতে হচ্ছে।’ বলে এক পাশে সরে গেলেন। ওপাশের কলারের সাথে কথা বলতে লাগলেন।
বিপ্লব কান দুৎটোকে তীক্ষè করে ফেলল। তাদের মাঝে কী কথা হয় তা শুনতে চায়। কিন্তু সব কথা শুনতে পেল না ও। দু’একটা কথা কানে এলেও ভালোভাবে বুঝল না। গ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা হচ্ছে। এ ভাষার সাথে পরিচিত নয় ও।
এই সময় ঝাঁ করে ওর মাথায় একটা কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করল। একটু আড়াল মতো জায়গায় সরে গেল। তারপর আনলক করে ডায়াল বাটন চেপে একটি নম্বরে কল দিল। মোবাইলটা কানে না ধরে হাতে ধরে রেখে তাকিয়ে রইল আজমল হাওলাদারের দিকে।
আজমল হাওলাদার এই নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো চমকালেন। কান থেকে মোবাইলটা সরিয়ে চোখের সামনে ধরে দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তারপর আবার কানে ধরে দ্রুততার সাথে বললেন, ‘সরি। একটু পরে তোমাকে আমিই কল দিচ্ছি। আমার গুরুত্বপূর্ণ একটা কল এসেছে। ওটা রিসিভ করতে হচ্ছে। এখন কেটে দাও।’ তারপর পাঁচ সেকেন্ড পর পুনরায় ইয়েস বাটনে ওকে করলেন।
বিপ্লবের চোখজোড়া সামান্য বড় বড় হয়ে গেল। আর ক্রমে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কাল রাতে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজে লুকানো নম্বরটা তাহলে আজমল হাওলাদারের।

তেরো.
কল কেটে মোবাইল বন্ধ করে দিল বিপ্লব। যা জানতে চেয়েছিল তা জানা হয়ে গেছে। সবার অলক্ষে মোবাইল সেটটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে এগিয়ে গেল আজমল হাওলাদারের দিকে। বলল, ‘কলটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কার সাথে কথা বলছিলেন?’
আজমল হাওলাদার তখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। চেহারায় কেমন উদভ্রান্তের একটা ছাপ পড়ে গেছে। তিনি বারবার একটু আগের নম্বরটিতে কল দিচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবারই ডিসকানেক্ট দেখাচ্ছে। বিরক্তি এবং উত্তেজনায় ছটফট করছেন তিনি, বিপ্লব স্পষ্ট বুঝতে পারছে। বিপ্লবের প্রথম কথাটা বুঝতে না পারলেও শেষের প্রশ্নটার জবাবে কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন, ‘তুমি চিনবে না ওদের। আর হ্যাঁ, আমাকে এক্ষুনি একটু বের হতে হচ্ছে। চাবিটা তোমার কাছেই থাক। যখন ইচ্ছে ব্যবহার করতে পারবে। তবে সন্ধ্যার আগেই কাছারি ঘরে চলে যেও।’
বলে অনেকটা হন্তদন্ত হয়েই বেরিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কুঁচকানো ভ্রƒ-টা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে এলো বিপ্লব। আজমল হাওলাদার ওর প্রশ্নের জবাবে ‘ওদের’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তারমানে তিনি যার সাথে কথা বলছিলেন, তিনি একা নন, সঙ্গে আরো লোক আছে। এখন প্রশ্ন হলো- তারা কয়জন আছেন? এবং তারা কারা?
হঠাৎ কী মনে হলো ওর, সঙ্গীদের কাছে ডাকল। হ্যাঁ, মিলনকে সব খুলে বলতে হবে। তা নাহলে ওর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই পুরো ঘটনা মোটামুটি খুলে বলল ও। ওকে সহযোগিতা করল আফজাল। তবে ইচ্ছে করেই বেশ কিছু পয়েন্ট গোপনই রাখল।
সব শুনে মিলনের চোখজোড়া তো ছানাবড়া হয়ে গেল। ইয়া বড় বড় চোখ মেলে অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে থাকল। তা দেখে হেসে দিল বিপ্লব। বলল ওর পিঠ চাপড়ে, ‘এখনও বিশ্বাস করতে পারছ না, এই তো? কিন্তু এটাই সত্যি। আমি সাকিব নই। আর সাকিবের খোঁজ পাওয়ার জন্য এই মুহূর্তে তোমার সাহায্য আমাদের দরকার।’
মিলন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। আফজাল বলল, ‘এই মিলন, ওসব অবাক-টবাক পরে হলেও চলবে। এখন বিপু কী বলছে সেটা শোনো।’
বিপ্লব বলল, ‘হ্যাঁ মিলন, এখন আমি যেটা বলছি সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখবে, আমার সত্যিকারের পরিচয় আমি না বলা পর্যন্ত গ্রামের আর কাউকে দেবে না। কি, ঠিক আছে তো?’
ঘাড়টা একপাশে অনেকখানিকই কাঁত করে ফেলল মিলন, অর্থাৎ ঠিক আছে।
এবার কাজের কথা বলল বিপ্লব, ‘এই মুহূর্ত থেকে তুমিও এই কেসের একজন গোয়েন্দা। তাই তোমার এখনকার কাজ হচ্ছে সাকিবের চাচা আজমল হাওলাদারের পিছু নেয়া। খুব সাবধানের সাথে কাজটা করতে হবে। কিছুতেই ধরা পড়া চলবে না। তিনি কোথায় যান, কী করেন, কাদের সাথে কী কথা বলেন, সব জানার চেষ্টা করতে হবে। পারলে আজ রাতেই আমার সাথে দেখা করবে। অথবা কাল সকালে দেখা করলেও চলবে। আমি আবারও বলছি, এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে চোখের আড়াল করা চলবে না। শুধুমাত্র তিনি বাড়িতে ফিরে এলেই তোমার ডিউটি শেষ হবে। তারপর অবস্থা বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করব আমি। কি, এ কাজে রাজি তো তুমি?’
ওর হয়ে আফজালই জবাব দিয়ে দিল, ‘অবশ্যই রাজি।’
মিলন বলল, ‘হ্যাঁ আমি যাচ্ছি।’ বলেই রওনা দিল।
দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা একটু চিমটি কেটে ধরে ছেড়ে দিল বিপ্লব। অর্থাৎ কিছু একটা গভীরভাবে চিন্তা করে নিল।
বাইরে মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার শব্দ পাওয়া গেল। তারপর আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল। অর্থাৎ যারা এসেছিল তারা আবার চলেও গেল।
বিপ্লব ভেতরটা আরো ভালো করে দেখার দিকে মনোযোগ দিল। এই রুমটা ছেড়ে পাশের রুমে চলে গেল। পেছনে পেছনে আফজালও। রুমটা ছোটখাট হলেও বেশ সাজানো গোছানো। সিঙ্গেল একটা বেড বেশ পরিপাটি করে পাতা। অবশ্য কেমন মলিন হয়ে পড়ে আছে বেডসিটসহ পুরোটা। মাথার কাছে বেড সুইচও দেখা গেল একটা। একটু তফাতে রিডিং টেবিল। সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা বই-খাতা। একটা টেবিল ল্যাম্পও আছে। রিডিং টেবিলের উপর একটা কম্পিউটার মনিটর, কম্পিউটার মাউস ও কি-বোর্ড। টেবিলের নিচে সিপিইউ। রিডিং টেবিলের পাশে বইয়ের একটা আলমিরা আছে। থরে থরে বই সাজানো তাতে।
রিডিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বিপ্লব। ধূলার হালকা একটা আস্তরণ পড়ে গেছে পুরো টেবিল, বই-খাতা, মনিটর, মাউস, কি-বোর্ডের উপর। হাত দিলেই ছাপ পড়ে যাবে।
দু’একটা বই-খাতা উল্টে-পাল্টে দেখল বিপ্লব। বইয়ের আলমিরাটার সামনে চলে এলো। হিউজ কালেকশন সাকিবের। বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ে ঠাসা পুরো তাকগুলো। বইয়ের উপরেও বই রাখা হয়েছে জায়গার সঙ্কুলান না হওয়াতে। প্রায় সব ধরনের বই আছেÑ সায়েন্স, লিটারেচার, ইতিহাস, বিখ্যাত লেখকদের প্রবন্ধ সঙ্কলন, বিভিন্ন ম্যাগাজিন- কী নেই এখানে!
আবারও রিডিং টেবিলের সামনে চলে এলো বিপ্লব। আর আফজাল আলমিরা থেকে একটা করে বই টেনে হাতে নিচ্ছে এবং এক-দুই পৃষ্ঠা উল্টে রেখে দিচ্ছে। টেনে নিচ্ছে নতুন আরেকটি বই।
রিডিং টেবিলের ড্রয়ারটা খোলা পেল বিপ্লব। নব ধরে টান দিতেই খুলে গেল। ভেতরে টুকিটাকি বেশ কিছু জিনিস। একটা মডেমও দেখতে পেল ও। অর্থাৎ এই মডেমের সাহায্যেই ইন্টারনেট চালাতো সাকিব।
কম্পিউটারের মনিটর, কি-বোর্ড আর মাউসে হাত বুলালো বিপ্লব। প্রিয় বন্ধুর স্পর্শ পেতে চাইলো যেন। মনে মনে বলল, ‘তুমি কোথায় গেলে বন্ধু? আমাদের কি দেখা হবে না, একটিবারের জন্যও?’
চোখজোড়া ভিজে উঠেছিল ওর। কাঁধে আফজালের হাতের স্পর্শ পেতেই ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিল। বলল, ‘হঠাৎ সাকিবের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো কি না, তাই নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।’
কী মনে হতে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করে অন করে নিল। পকেটে রাখতে রাখতেই রিংটোন বেজে উঠল। তাই দ্রুত আবার বের করে চোখের সামনে মেলে ধরল। অচেনা একটা নম্বর থেকে কল এসেছে। আফজালের দিকে একবার তাকিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরল। সালাম দিতেই ওপাশ থেকে হালকা মিনমিনে গলায় কেউ বলে উঠল, ‘আমি কি গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়ার সাথে কথা বলছি?’
বিপ্লব পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আপনি কে বলছেন প্লিজ!’
‘আমাকে তুমি চিনবে না। কিন্তু তোমাকে আমি চিনি। তুমি এই মুহূর্তে যে কেসটার তদন্ত করছো, সে ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমার কাছে এমন কিছু তথ্য আছে যা তোমাকে জানানো উচিত বলে মনে করছি।’
‘কিন্তু আপনি কে? কেন আমাকে সাহায্য করতে চাইছেন?’
‘সেটা না হয় সামনা-সামনিই বললাম।’
‘তারমানে আপনি আমার সাথে দেখা করতে চাইছেন।’
‘এই তো বুদ্ধিমান ছেলে। না, লোকে যা বলে তা ঠিকই আছে। চালিয়ে যাও, ভবিষ্যতে সার্লোক হোমসকেও ছাড়িয়ে যেতে পারবে।’
এ কথায় একটুও গললো না বিপ্লব। স্পষ্ট বুঝতে পারছে লোকটার আসল উদ্দেশ্য এটা নয়। তাই বলল, ‘আমার মনে হয় আমরা কাজের কথায় ফিরে যেতে পারি।’
মিনমিনে গলাতেই বেশ জোরে হেসে উঠল ওপাশের লোকটা। বলল, ‘ওকে ওকে।’ তারপর কোথায় কখন দেখা করতে হবে তা বলল লোকটা। এবং বলেই কল কেটে দিল।
বিপ্লব পাক্কা পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। নিজেকে সামলে নিয়ে তারপর আফজালকে বলল, ‘আমাকে এক্ষুনি একটু যেতে হচ্ছে।’
‘কিন্তু লোকটা কে?’ জিজ্ঞেস করল আফজাল।
‘এখনও চিনি না। তুমি এদিকে থাকো। আমার ফিরতে দেরি হলে তালা আটকে কাছারি ঘরে অপেক্ষা কোরো।’ বলে আর দেরি করল না বিপ্লব। হনহন করে বেরিয়ে গেল।
পেছনে ঘোরের মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগল আফজাল। নাহ্, ছেলেটা নিজের ইচ্ছেই ছাড়া কিছু খোলাসা করে না। তবে বেশ কাজের যে, এটুকু বোঝা হয়ে গেছে।

লোকটার গড়ন বেশ ছিপছিপে। হালকা দেহের অধিকারী মানুষটার মাথায় ততোটাই পাতলা ধবধবে সাদা চুল। একটা চুলও আর কালো নেই। শুকনো মুখটায় থুতনিতে একগোছা দাড়ি। বাতাসে দুললে দেখতে চমৎকার লাগে। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরেন তিনি। পায়ে লাল চামড়ার স্যান্ডেল।
লোকটাকে সাদাসিধে মনে হলেও একটা আভিজাত্য যেন উঁকি দিয়ে যায়। চালচলনে বেশ ভারিক্কি ভাব বজায় রেখে চলেন। আর কথা বলেন বেশ মেপেমেপে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলেন না।
নায়েবের পুকুরে ঢিবিটার উপরেই অপেক্ষা করছিলেন তিনি। বিপ্লব কাছে যেতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়ার ক্ষমতা রাখেন তিনি।
‘বিপু ভাইয়া!’ মুখে হাসি টেনে রেখে মিনমিনে গলায় বলে নিজের রোগাটে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন লোকটা।
‘হ্যাঁ,’ বলল বিপ্লব। ‘আপনি…’
‘হাশেম বিশ্বাস।’ মুখের হাসিটা একই রকম রইল।
‘ওকে স্যার। চলুন, ওই গাছটার নিচে বসে কথা বলা যাক।’
‘হ্যাঁ চলো।’
বিপ্লব দেখল লোকটা বারবার ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, আড়চোখে। বুঝতে পেরেও না দেখার ভান করে তাকে ভালো করে দেখতে সুযোগ করে দিল। লোকটা যেন ওর চেহারায় কিছু একটা খুঁজে পেতে চাইছে।
‘এবার বলেন আপনি আমার মোবাইল নম্বর পেলেন কিভাবে।’ শুরু করল বিপ্লবই।
‘বিখ্যাত মানুষদের সবকিছুই অতি সহজেই খুঁজে নেয়া যায়। ধরো আমাদের জাতীয় কবি সম্পর্কে তোমার খুব জানতে ইচ্ছে করলো। তখন তুমি কী করবে?’
‘যেখান থেকে যেখান থেকে জানা সম্ভব সেখানে সেখানে খোঁজ করবো।’
‘রাইট। তাহলেই বোঝো,…’
‘তারমানে আপনি বলতে চাইছেন আমি একজন বিখ্যাত মানুষ?’
‘বুদ্ধিমানদের সাথে কথা বলার মজাই আলাদা। তোমার সাথে কাজ করতে ভালোই লাগবে মনে হচ্ছে।’
‘মানে…?’
‘ও সরি। হ্যাঁ যা বলছিলাম।’ বলে বিপ্লবের মুখের দিকে কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন হাশেম বিশ্বাস। এবং তাকিয়েই রইলেন। যেন কোথাও হারিয়ে গেছেন।
‘সরি স্যার!’ বলল বিপ্লব হাশেম বিশ্বাসের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।
‘ও হ্যাঁ, কী নিয়ে যেন কথা বলছিলাম আমরা?’ যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন হাশেম বিশ্বাস।
‘স্যার আমি যে কেসটা নিয়ে তদন্ত করছি তার ব্যাপারে আপনি আমাকে সাহায্য করার কথা বলেছেন মোবাইলে।’
‘আজমল হাওলাদারকে কেমন মনে হয় তোমার?’ হঠাৎই প্রশ্নটা করে বসলেন লোকটা।
একটু যেন থতমত খেয়ে গেল বিপ্লব। এই ধরনের প্রশ্ন ও আশা করেনি। বলল, ‘আপনি কি তার ব্যাপারে আমাকে সতর্ক থাকতে বলছেন?’
‘লোকটা মহা ধুরন্দর। একেবারে গোখরো সাপের মতো। সুযোগ পেলেই ছোবল ম

SHARE