Home তোমাদের গল্প অন্তুর ঘুড়ি

অন্তুর ঘুড়ি

মুহাম্মাদ রিয়াজ উদ্দিন..

অন্তুর আজ স্কুল বন্ধ। ছুটির দিন এলেই অন্তু একটু স্বস্তি পায়। সারাদিনই ইচ্ছেমতো খেলতে পারে। যে স্কুলে অন্তু পড়ালেখা করে সেখানে খেলার মাঠ নেই। আর এই শহরে কোন স্কুলে খেলার মাঠ আছে অন্তু জানে না। মাঝে মাঝে ব্যস্ত শহরের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর মানুষের ভিড়ে নিঃশ্বাস নিতেও ওর কষ্ট হয়। ছোট্ট মনের এসব কষ্টগুলো কাকে বলবে ও? ওর ইচ্ছেগুলো কিভাবে পূরণ হবে এমন ভাবনা ওর মাথায় আসে। বাসায় স্কুলের হোম ওয়ার্ক করা শেষ হলে যেটুকু অবসর পায় তখন কম্পিউটারে গেমস খেলেই সময় পার করে ও। তাই ছুটির দিন এলেই অন্তুর আনন্দের অন্ত থাকে না। এদিন আব্বু-আম্মুও পড়ার জন্য বকা দেন না। মনে মনে অন্তু ওর বাবা-মায়ের অনেক প্রশংসা করে। বাবা-মায়ের মতো যেন ভালো মানুষ নেই। আর যখন পড়ার জন্য তাগিদ দেন তখন বড় কষ্ট অনুভব করে অন্তু। সে কষ্টগুলো অন্তু নিজের ভেতরই চেপে রাখে। আট বছরের অন্তুর মনে যতটুকু ভাবনা জমে তাতে ও বড্ড কষ্ট পায়। কেন আব্বু-আম্মু পড়ার জন্য বকা দেন, কেন শুধু পড়া আর পড়ার কথা বলেন।
সেই সকালে উঠেই অন্তু ওর খেলনাগুলো নিয়ে বসেছে। নানা ধরনের খেলনা নিয়ে একা খেলতে ইচ্ছে হয় না। মাঝে মাঝে বাসার কাজের ছেলে নয়নকে ডাকে। নয়ন ওর সমবয়সী। আজও নয়নকে সাথে নিয়েছে। ‘আচ্ছা নয়ন, তুমি ঘুড়ি উড়াতে পার?’ কথাটি বলেই অন্তু নয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘হ্যাঁ পারি।’ মাথা ঝুলিয়ে উত্তর দেয় নয়ন। কাজের ছেলে হলেও অন্তু নয়নকে অনেক ভালোবাসে। অবসরে কার্টুন চ্যানেলে কার্টুন দেখে। নয়ন যে কাজের ছেলে এমনটি কখনো অন্তু ভাবে না। সুযোগ পেলে নয়নকে বই থেকে গল্প পড়ে শোনায়, স্কুলের গল্প বলে। নয়ন অন্তুর মুখের এসব গল্প শুনে মুগ্ধ হয়। আনন্দে ওর মন ভরে ওঠে। নয়ন স্কুলে যেতে পারেনি। লেখাপড়ার সুযোগও তাই হয়নি। ওদের মধ্যে অনেক বন্ধুত্ব দেখে অন্তুর বাবা-মাও আনন্দ অনুভব করেন। নয়ন গ্রামের ছেলে হলেও অনেক আদর করেন। নতুন নতুন পোশাক কিনে দেন। নিজেদের সাথেই ওকে খাওয়ান।
অন্তু কৌতূহল নিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করে, ‘নয়ন আমাকে ঘুড়ি উড়ানো শিখাবে?’
‘শিখাবো অন্তু। কিন্তু কোথায় উড়াবো? এখানে যে খোলা আকাশ আর মাঠ নেই।’
‘সেটাই আমি ভাবছি।’
আগামী মাসে অন্তুর স্কুল বন্ধ হবে তখন বাবা-মায়ের সাথে গ্রামে দাদাবাড়ি যাবে এমনটি জানায় অন্তু। সাথে নয়নকে নিয়ে যাবে। গ্রামে এক সাথে ঘুরবে, আনন্দ করবে। গ্রামে অন্তুর দাদার অনেক জমি আছে। বলা যায় বিশাল মাঠ। খোলা আকাশের নিচে ওরা ঘুড়ি উড়াবে।
অন্তুর গ্রামে যাওয়ার কথা শুনে ওর আব্বুও দ্বিমত করেননি। ছেলের এমন আগ্রহ দেখে বাবা-মা দু’জনেও অনেক খুশি। অন্তুকে কয়েকটি ঘুড়ি কিনে দেবেন এমনটি বলেছে ওর বাবা। অন্তুর মন খুশিতে ভরে উঠল। রাত যায় দিন আসে। একাকী নিজের কল্পনায় অন্তু আনন্দের ছবি আঁকে, নিজের মনে অনেক স্বপ্ন বোনে। গ্রামের নানা চিত্রই ওর চোখের সামনে ভাসে। নয়নকে নিয়ে সারা বিকেল ঘুড়ি উড়াবে। ঘুড়িটা অনেক উপরে উঠবে। আরো নানা ভাবনা ওর মাথায় ঘুরপাক খায়। দিন গুনতে গুনতে ঠিক এক সময় ওর স্কুল বন্ধ হয়। ওর বাবাও অফিস থেকে ছুটি নিলেন। এক সাথে সবাই গ্রামে এলেন। দাদার বাড়িতে এসে অন্তুও বেশ উৎফুল্ল। গ্রামের ছেলেরা ওকে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ওর ঘুড়ি উড়ানোর ইচ্ছেটা সবাইকে শুনিয়ে দেয়। গ্রামের বাজার থেকে অন্তুর বাবা নানা রঙের কয়েকটি ঘুড়ি এনে ওর হাতে দেয়। অন্তুর চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। মুহূর্তের ভেতর ওর মনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
দুপুরে সবার সাথে খেয়ে দেয়ে নয়নকে নিয়ে অন্তু বেরিয়ে পড়ে ওর দাদাবাড়ির পেছনের দিকে খোলা মাঠে। গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে মাঠে উপস্থিত। অন্তু সবার নাম ধরে ডাকে। কী যে খুশি হয়েছে অন্তু তা মুখে না বললেও সবাই বুঝতে পারে। কতদিনের ঘুড়ি উড়ানোর স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলেছে। নয়নের হাতে প্রথম ঘুড়িটা আকাশে উড়লো। মুহূর্তের ভেতর শিশুরা করতালির মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করল। ধীরে ধীরে নাটাই থেকে সুতা ছাড়ছে নয়ন। বাতাসের সাথে নেচে নেচে ঘুড়িটা অনেক শূন্যে উঠে গেল। অত বড় ঘুড়িটা এখন এতটুকু দেখাচ্ছে। এবার অন্তু অনেক আগ্রহ করেই নাটাই ওর হাতে নিলো। অন্তুর এ ভালো লাগা কিভাবে অন্যদের জানাবে? নয়ন শুধু অন্তুর মুখে তাকিয়ে ওর আনন্দের পরিমাণটা বোঝার চেষ্টা করে। অন্তুও নয়নের মুখে তাকিয়ে একটু হাসল। অন্তু আরো সুতা ছাড়ে। নড়ে চড়ে ঘুড়ি উড়ায়। নয়ন কখনো সুতা ছাড়তে বলে আবার কখনো নাটাই ঘুরিয়ে কমাতে বলে। অন্তুও ওর কথা শুনে তাই করে। অন্তুর অনেক দিনের স্বপ্ন আজ সত্যি হলো।
পুরো বিকেলই ওর হাতের ঘুড়িটা মুক্ত আকাশে ছিল। এঁকে বেঁকে নেচে নেচে ওর ঘুড়িটাও অনেক মজা করেছে। পশ্চিম আকাশের ডুবো ডুবো সূর্যি মামা বিদায় জানিয়ে শুধু বলছে- অন্তু, আজ বাড়িতে যাও, কাল আবার এসো।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply