Home গল্প দইওয়ালা

দইওয়ালা

আফজাল আনসারী..

বামুক কাঁধে করে চলছে গোয়ালা। বামুকের দুই পাশে ঝুলানো মাটির হাঁড়ি। মাটির হাঁড়িতে দই, মিষ্টি, ক্ষির আরও কত কী! গোয়ালার গলার কণ্ঠস্বর বেজায় প্রখর; একবার হাঁক ছাড়লে সারা গাঁয়ের ছেলে পেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পয়সা হাতে না থাকলেও আমরা চলে আসি। অন্তত মিষ্টি না পেলেও মিষ্টির সুঘ্রাণে নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। মাকে বলে অন্তত দু-এক টাকা দামের হালকা সন্দেশ পেলেই মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।
গোয়ালা না বলে দইওয়ালা বললেই যুৎসই লাগে। মাথায় পাগড়ি, কোমরে ধুতির প্যাঁচের ওপর প্যাঁচ এবং পেট মেদভুঁড়ি চাড়ির মত। কাঁধে বাঁশের বাঁকানো বামুক এর দুই পাশে ঝুলানো মাটির হাঁড়ির বাহারি সারি। মাঝে মধ্যে সেই দইওয়ালার গায়ে পাতলা গেঞ্জি থাকে, আবার অনেক সময় গরমের দিনে খালি গায়েই চলে আসে।
আজও দুপুরবেলা ডাকছে দই! দই! বাজখাঁই আওয়াজে সারা গ্রামে দইয়ের ডাক পড়ে যাচ্ছে। তার দইয়ের ডাক; মনে হচ্ছে দই মুখেই আমাদের ডাকছে। আমরা তার ডাক শুনে ভোঁ দৌড়। সোজা দইওয়ালার চারিদিকে ঘিরে ধরেছি। কিন্তু পয়সা আনেনি কেউ। মিষ্টির লোভে সবাই হাজির। মনে হয় মাগনা মাগনাই আমাদের সবাইকে দই দেবে।
দইওয়ালা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়েÑ কই পয়সা কই?
পয়সার কথা শুনে যে যার বাড়ি দৌড় মারি। বায়না দু’চার আনা যে যা পারি আনি। যে আনতে পারে না, সে ফিরে না, ছোট হলেও বিবেক লজ্জা বলে একটা জিনিস আছে। খেলার সময় মনে না থাকলেও এখন দিব্যি তা মনে হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো আমার মা ধান ভানছে। ঢেঁকির ওপর পা দিয়ে ধপাং ধপাং করে চাল ভানছে। আমি মাকে সাহায্য করব বলে মায়ের সাথে কোমর ধরে ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছি। ধান ভানার ছলে গোপনে আমার লক্ষ্য মায়ের আঁচলের দিকে: কারণ আট আনার একটা আধুলি ওখানে বাঁধা। খুব কৌশলে তা খুলে ফেলেছি, মা ঢেঁকির চুরুনের দিকেই তাকিয়ে পাড় দিচ্ছেন। আট আনা হাতে পেয়েই কিসের ধান ভানা, কিসের মাতৃখেদমত, তাড়াতাড়ি দইওয়ালার কাছে হাজির। আট আনা দিতেই চিনির একটা সন্দেশ দিল। আহ! সেকি মিষ্টি দুধের ছানা আর চিনি দিয়ে তৈরি। মুখে দিতেই তা গলে গেল। মনে হচ্ছে এক কেজি সন্দেশ একাই খেয়ে ফেলব।
কিশোরকালে এ এক জ্বালা! সব কিছুই বেশি পেতে মন চায়। মায়ের আদর থেকে শুরু; আবদার ভালোবাসা স্নেহ, ভাগাভাগি কামনা বাসনা সবকিছুই কেবল বেশি পেতে মন চায়। এমন সময় আমার এক দুষ্টু মামা হাজির। গোপনে সন্দেশ কিনে খাচ্ছি বলেই টের পেল কি না জানি না। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। এসেই সঙ্গী সাথী সবাইকে দূরে রেখে তাদের সামনেই সাতবার উঠবস করিয়ে ছাড়লেন। ভয়ে ভয়ে তা করে ফেললাম। মনে মনে ভাবছি মায়ের আঁচল খুলে আট আনা চুরি করেছি বলেই মনে হয় এই শাস্তি। মামা চলে যাওয়ার পর বুঝলাম, না সন্দেশ খাওয়ার কথা মামা জানেই না; আমরা লুকিয়ে চুকিয়ে গতকাল কাচের গুলি খেলেছিলাম তার বকেয়া শাস্তি দিয়ে গেলেন। চুরির লজ্জা থেকে আপাতত রক্ষা পাওয়া গেল।
কিন্তু দইওয়ালার প্রতি একটা ক্ষোভ হলো। বেটা না এলে তো চুরির ফাঁদে পা দিতাম না। তাছাড়া বিকেলবেলা মা তো টের পাবেনই, তখন কী জবাব দেবো? না বলে নিলেও মা টুকটাক পয়সা দিতে চান না সে-ও এক ঝামেলা। যাক মনে মনে বলছি যা থাকে কপালে বিকেলের চিন্তা বিকেল বেলা। হয়তো টের নাও পেতে পারে। অনেক সময় আঁচল খুলে পয়সা এমনিতেও পড়ে যায়। একবার নদীর ঘাটে যাওয়ার সময় মায়ের আঁচল খসে আড়াই টাকা পড়ে গিয়েছিল। সে টাকা তো আমিই খুঁজে দিয়েছিলাম। সেটা থেকে না হয় আমার ভাগের আটআনা নিয়ে নিয়েছি বলব।
দুপুরবেলা খেতে বসেছি। মা তেমন কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না; কেবল স্কুলে গিয়েছিলাম কি না, কয়টা ঘণ্টা হলো এসব কথাই বললেন। না হু না হু করে অল্প কথায় উত্তর দিয়ে আমিই স্বেচ্ছায় বলে ফেললাম, মা ধান ভানার সময় তোমার আঁচল থেকে একটা আধুলি খুলে নিয়েছি। মা শান্তভাবে বললেন, পয়সা দিয়ে কী করেছিস?
দইওয়ালা এসেছিল, তাই সন্দেশ খেয়েছি। অন্য দিনের মত মা রাগ করলেন না, বরং সত্য কথা বলার জন্য মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। যাক, সত্যটুকু না বলে মনে মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। এখন থেকে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করলাম, যা-করব, বলে কয়ে করব, তাহলে মানসিক যাতনা পেতে হবে না।
একবার হাদীস শরীফ পড়তে গিয়ে একটা হাদীসের কথা মনে হলো।
মহানবী (সা)কে একজন সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! পাপ কী? মহানবী (সা) উত্তরে বললেন, যা দ্বারা তোমার অন্তর লোকলজ্জায় বিড়ম্বিত হয় অর্থাৎ যার কারণে অন্তর ভয়ে কম্পমান হয় ও দ্বিধাগ্রস্ত হয় তাই পাপ।
মহানবী (সা)-এর হাদীসখানা পড়ে মনে মনে তওবা করছি, আর এমন কোনো কাজ করব না; যাতে অন্তর লজ্জিত হয় তা ছোট হোক অথবা বড় হোক। মায়ের কাছে হাদীসের কাহিনীটাও খুলে বললাম। হাদীসের বাণী শুনে মা আদরে আমার কপাল চুমুতে ভরে দিলেন। আমি কৈশোরের সে লজ্জার কথা কোনো দিন ভুলতে পারব না। সামান্য মিষ্টি একটা সন্দেশ খেয়ে যতটুকু আরাম ও আনন্দ পেয়েছিলাম এবার পাপমুক্ত হয়ে আনন্দ পাচ্ছি তা থেকে শতেক গুণ, হাজার গুণ। এই অপার আনন্দ পরিমাপ করব কী দিয়ে?

SHARE

4 COMMENTS

  1. Very nice. At the time of reading of this story I also go to my nostalgia. Really excellent! In our childhood we did many simple events like it. Now when we remember the events we find much pleasure and wish to go back to our childhood again.

Leave a Reply