Home ভ্রমণ সেন্টমার্টিনের টানে

সেন্টমার্টিনের টানে

আলফাজ হোসেন..

সেন্টমার্টিনের গল্প প্রথমে শুনেছিলাম বন্ধু শাহীনের কাছে। এর আগে সেন্টমার্টিনের কথা শুনেনি তা নয়। কিন্তু সেই শোনা আর শাহীনের কাছ থেকে শোনা ছিল একেবারে ভিন্ন। কেননা শাহীনের কাছ থেকে যখন শুনছিলাম তখন মনে হয়েছিল যে শাহীনের সাথে সাথে আমিও সেন্টমার্টিনে আছি। শাহীনের গোছানো কথায় অজানা জায়গা সেন্টমার্টিনের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। ঠিক এমন সময় আমাদের অফিস কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হচ্ছিল কোথায় এবারের ট্যুরে যাওয়া যায়। তখনই শুরু করে দিলাম কিভাবে আমার দলে লোক ভেড়ানো যায়। চেষ্টা শুরু এবং অফিসের সবচেয়ে সিনিয়র দাদা (ও থুক্কু দাদা বললে নাকি উনার তারুণ্য লোপ পায় পায় ভাব। আর ট্যুর তো হলো তারুণ্যের বহিঃপ্রকাশ। তাই আমিও উনাকে দাদা সম্বোধন করতে চাই না, তার তারুণ্য দীর্ঘজীবী হোক) আবুল কালাম খানকে আমার থেকেও বেশি আগ্রহী বলে মনে হলো এবং আমি অফিসের সবচেয়ে জুনিয়র, কালাম ভাই সবচেয়ে সিনিয়রÑ এই সুবিধাতে অধিকাংশকে আমাদের দলে ভেড়াতে পেরেছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা হলো আনিস ভাই ও জুবায়ের ভাই আমাদের পক্ষে ছিলেন।
সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিন যাওয়ার দিন ধার্য হলো ১৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত ৮টায়। একটা কথা চুপে চুপে বলে রাখি, আমার জীবনে সবচেয়ে বহুল আনন্দের ঘটনা এই সেন্টমার্টিন যাওয়া। স্কুল-কলেজ জীবনে অনেকবার ট্যুরে গেছি। কিন্তু এত আয়োজন আর মানসিক প্রফুল্লতা নিয়ে ট্যুরটা ছিল সত্যি আনন্দময়!
শুরু হয়ে গেল ট্যুরের আয়োজন। টি-শার্ট, ট্রাউজার অফিস থেকে দেয়া হলো এবং অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ট্যুরের যাত্রা শুরু। প্রথমে ভেবেছিলাম ১৭ জনের টিম, এখানে হানিফ বাসের টিকেট কেটে কিভাবে আনন্দ হবে। কিন্তু এটা জানতাম না যে এই বাসে যারা ঢাকা থেকে যান তারা প্রায় সবাই সেন্টমার্টিনে যাওয়ার জন্যই যান। আমরা রাত ৮টার আগে রণসাজে (!) সজ্জিত হয়ে হানিফ কাউন্টারে এলাম। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকায় বাস সময়মতো এসে পৌঁছল না। তাতে কী? মনের ভেতরে যে আনন্দের মিছিল (যা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাওয়ার মতো অবস্থা) তা যেন পুরোপুরি প্রকাশ পেল যখন দেরি করে বাস এসে পৌঁছাল কাউন্টারে। সবাই তড়িঘড়ি করে বাসে চড়ে বসলাম। মনে হচ্ছিল আমাদের সিট যেন কেউ আগে থেকে নিয়ে নিচ্ছে। পরে বাসে উঠে লাফালাফি শুরু করে দিলাম (মনে হলো যেন সবাই হার না মানা খেলোয়াড়)।
রাতের খাবার বাসের ভেতরে খাওয়া হলো। রাস্তায় রাতে দুইবার বিরতি নিয়ে সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে আমাদের টেকনাফে কিয়ারী সিন্দবাদের যাত্রিছাউনির সামনে নামিয়ে দিল। নামার পরে দেখলাম হাজার রঙের পোশাকে বিভিন্ন মানুষ সবাই এসেছে আল্লাহর অপার মহিমায় গড়া পাহাড়, সাগর, নীল পানি, অপার প্রকৃতি দেখার জন্য, যা দেখে আল্লাহর গুণগান গাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আমার জীবনে এই প্রথম পাহাড় দেখা! পাহাড় এতটা মায়াময় হয় আমার আগে জানা ছিল না। তাই আবেগে চিৎকার দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল এই বলে যে আল্লাহ এত সুন্দর করে এই পৃথিবী তৈরি করেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করছেন, কোথায় কী দিতে হবে, কিভাবে রাখতে হবে যেন তার শক্তিশালী অপারেটিং সিস্টেম আগে থেকেই ইন্সটল করে রাখা।
সকাল ৯টার সময় সাগরের বুক চিরে চলতে থাকে কেয়ারী সিন্দবাদ। নদী পেরিয়ে এসে পৌঁছাল সাগরে, এ যে অন্য রকম আমেজ! যে বাহনটি ছিল ধীর, স্থির অচঞ্চল! সেই বাহনটি যখনই সাগরের মমতার পরশ পেল, হয়ে উঠলো তরঙ্গায়িত। ঠিক কলাগাছের খোল যেভাবে ভাসতে থাকে, সাগরের বুকে আমরাও সেভাবে দোল খেতে লাগলাম। এটা কী! প্রচুর বাতাস, পানি নীল এবং স্বচ্ছ উহ! না দেখলে এমন ভালোবাসা সাগরের তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অনেক দূর থেকে মাছির মতো কালো কী যেন দেখা যায়। প্রশ্ন করলে কেউ বললো যে ওটাই নাকি সেই স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ওটা যদি সেন্টমার্টিন হয়, এত ছোট কেন? আরে না অনেক দূরে তো তাই এমন দেখায়। কাছে গেলে আরো ভাল লাগবে। এক সাথে ৪টা জাহাজ আগ পিছ করে চলছে।
আমরা ১২টা ২০ মিনিটে দ্বীপে এসে পৌঁছলাম। বলাবাহুল্য এই টেকনাফ থেকে যে জাহাজগুলো সেন্টমার্টিনে আসা-যাওয়া করে তার মধ্যে শক্তিশালী ইঞ্জিন হলো এই কেয়ারী সিন্দবাদের। এটা অবশ্য লোক মুখে শোনা। আসলে শক্তিশালী কি না জানি না কিন্তু সবাইকে পেছনে রেখে আমার স্বপ্নের গন্তব্যে আগে পৌঁছে দেয়ার জন্য কিয়ারী সিন্দবাদকে অসংখ্য ধন্যবাদ। দ্বীপের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলাম হাজারো নারিকেলগাছ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এত দিন হাতছানি দিয়ে ডাকা মায়াময়, ভালোবাসাময় স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন। নারিকেলগাছ দেখে মনে পড়ে গেল এর তো অপর নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। এর অবস্থান সম্পর্কে বলা হয় এইভাবে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত।
আগে থেকেই হোটেল ভাড়া করা ছিল। জাহাজ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে হোটেল খুঁজে বের করতে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। আমাদের হোটেলের নাম ছিল ময়নামতি রিসোর্ট। এখানে সিদ্ধান্ত মোতাবেক এসে যার যার পছন্দের রুমে চলে গেলেন। গোসল, নামাজ, খাওয়া সেরে এখন একটু রেস্টের প্রয়োজন। কিন্তু কে মানে কার কথা! রেস্ট বাদ, এখন চল বিচে যেত হবে। অধিকাংশ বাদ সাধলো। এখন বিচে হাঁটাহাঁটি করে বিকেলে ফুটবল খেলা হবে। অনেকেই বললেন, খেলার আগে প্র্যাকটিস না করলে হয় নাকি! চলে এলাম বিচে, দেখলাম সাগরকে খুব কাছ থেকে। মনে হলো সাগরকে কাছে যখন পেলাম একটা কথা জিজ্ঞাসা করেই ফেলি- ‘কোন্ সে যন্ত্রণায় অস্থির অধীর হয়ে মাঝে মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, স্টর্ম, সাইক্লোন, সুনামি, নার্গিস ইত্যাদি উপহারসামগ্রী দিয়ে বিশ্ববাসীকে সিক্ত কর। নাকি মনুষ্য সমাজকে অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, সন্ত্রাস, শোষণ, নিপীড়ন থেকে নিবৃত্ত ও সতর্ক হওয়ার জন্য কারো ইশারায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে কোনো শক্তির অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে থাক মাঝে মধ্যে।’ আরো অনেক প্রশ্ন মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল। যখনই সামনের দিকে তাকালাম, দেখলাম তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ঢেউ আমাকে কিছু বলার জন্য তেড়ে আসছে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রশ্ন করার বাতুলতা বাদ দিয়ে মানে মানে কেটে পড়লাম।
স্বচ্ছ পানি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলাম। বড় বড় ঢেউকে দেখলাম বড় বড় পাথর গিলে খেতে। মনে হলো এই পাথরগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে এই দ্বীপটাকে এবং বাঁচিয়ে রাখবে যুগ যুগ ধরে। দেখলাম প্রকৃতির খুব কাছাকাছি এসে অনেক মানুষ প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে। আল্লাহ পাক কিভাবে পৃথিবীকে হেফাজত করেন তা সেন্টমার্টিনে এসে সাগরের ঢেউ, পাহাড়, পাথর আর এখানকার সহজ সরল মানুষগুলোকে না দেখলে বোঝা আসলেই কঠিন ছিল। এই জন্য পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করতে, দেখতে বলেছেন তাঁর (আল্লাহ) নিয়ামত যা মানুষের শিক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং বেশি বেশি করে আল্লাহ সুবহানাহুতাআলার শুকরিয়াহ আদায় করার কথা বলা হয়েছে। এখন আমরা জেনে নিই এই সেন্টমার্টিন সম্পর্কে কিছু তথ্যÑ
উৎপত্তি
প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ বছর আগে এখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ-ভারত সরকারের কাছ থেকে জমিদার তোরা আলী সিকদার মাত্র ৮৮ টাকার বিনিময়ে কিনে নেন এই দ্বীপ। তিনি আবার একই দামে তার ভায়রা মোহাম্মদ ইব্রাহীমের কাছে বিক্রিও করে দেন। বর্তমানে এখানে প্রায় দশ হাজার লোক বসবাস করে। সেন্টমার্টিনের প্রাচীন নাম ছিল জাজিরা। স্থানীয় লোকদের মতে আরব বণিকেরা দিয়েছিলেন এই নাম। প্রচুর নারিকেল উৎপাদনের কারণে পরবর্তীকালে জাজিরা স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে নারিকেল জিঞ্জিরা বলেই পরিচিতি পায়। আবার লোককথা আছে, এই দ্বীপে মানুষের বসবাস শুরুর আগে জিনদের বসবাস ছিল, যা জিঞ্জিরা নামকরণের পেছনের কারণ। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজরা একে সেন্টমার্টিন নামে অভিহিত করে বলে জানা যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। এগুলোকে ধরলে এর আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গ কিলোমিটার। এ দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। দ্বীপটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত অগণিত শিলাস্তূপ আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের গড় উচ্চতা ৩.৬ মিটার। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর।
ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় দক্ষিণ পাড়া এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সঙ্কীর্ণ লেজের মতো এলাকা। এবং সঙ্কীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। দ্বীপের দক্ষিণে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের ছোট দ্বীপ আছে যা স্থানীয়ভাবে ছেড়াদিয়া বা সিরাদিয়া নামে পরিচিত। এটি একটি জনশূন্য দ্বীপ। ভাটার সময় এই দ্বীপে হেঁটে যাওয়া যায়। তবে জোয়ারের সময় নৌকা প্রয়োজন হয়।
ভূ-প্রকৃতি
সেন্টমার্টিন দ্বীপটির ভূ-প্রকৃতি প্রধানত সমতল। তবে কিছু কিছু বালিয়াড়ি দেখা যায়। এ দ্বীপটির প্রধান গঠন উপাদান হলো চুনাপাথর। দ্বীপটির উত্তর পাড়া এবং দক্ষিণ পাড়া দু’জায়গারই প্রায় মাঝখানে জলাভূমি আছে। এগুলো মিঠা পানিসমৃদ্ধ এবং ফসল উৎপাদনে সহায়ক। দ্বীপটিতে কিছু কৃষি উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
প্রাণিবৈচিত্র্য
সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১শ’ ৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১শ’ ৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তবীজি উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিতি  অ্যালগি  এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্টমার্টিনে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি  বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ ছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্ন্যাসী শিল কাঁকড়া, লবস্টার ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল, রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ, উড়–ক্কু মাছ ইত্যাদি। সামুদ্রিক কচ্ছপের (গ্রিন টার্টল ও অলিভ টার্টল প্রজাতি) ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে জায়গাটি খ্যাত।
উদ্ভিদবৈচিত্র্য
দ্বীপে কেওড়া বন ছাড়া প্রাকৃতিক বন বলতে যা বোঝায় তা নেই। দক্ষিণ দিকে কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে। অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে কেয়া, শ্যাওড়া, সাগরলতা, বাইন গাছ ইত্যাদি।
অধিবাসী
প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ বছর আগে এখানে লোকবসতি শুরু হয়। বর্তমানে এখানে সাত হাজারেরও বেশি লোক বসবাস করে। দ্বীপের লোকসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। পর্যটক ও হোটেল ব্যবসায়ীরাই প্রধানত তাদের কাছ থেকে মাছ কেনেন। ছোট মাছ পাটিতে বিছিয়ে, পিটকালা মাছ বালুতে বিছিয়ে এবং বড় জাতের মাছ পেট বরাবর ফেড়ে মাচায় শুকানো হয়। এ ছাড়াও দ্বীপবাসী অনেকে মাছ, নারিকেল, পেজালা এবং ঝিনুক ব্যবসা করে। ছোট ছোট শিশুরা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত শৈবাল পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে থাকে। সম্পূর্ণ সেন্টমার্টিন দ্বীপেই প্রচুর নারিকেল এবং ডাব বিক্রি হয়।
পর্যটন স্পট
দ্বীপটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন ৪টি জাহাজ বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড টেকনাফ হতে আসা-যাওয়া করে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে বর্তমানে অনেকগুলো ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। একটি সরকারি ডাকবাংলো আছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।

আবার ফিরে আসি ভ্রমণের কথায়। বিকেলে ছবি তোলা। পানিতে গোসল করা। এর পর ফুটবল খেলা। দুই দলের মধ্যে তুমুল লড়াই শেষে ফলাফল হলো- বিবাহিতরা হেরে যায়। মজার ব্যাপার হল অনেক দিন কেউ খেলার সাথে সম্পর্ক না থাকায় অন্য রকম আনন্দ পাচ্ছিলাম।
সন্ধ্যায় সূর্য ডুবা দেখা যেন আরেক আনন্দের বিষয়। সবকিছু যেন আমরা এখানে এসেছি বলে এমন অপরূপ সাজে সেজেছে। মাগরিবের পর একটু রেস্ট নিয়ে আবার কিছু কেনাকাটা করার জন্য বের হলাম। রাতে খেয়ে আবার সাগরের তীরে গেলাম এবং দেখলাম সাগরের সেই চির যৌবন পানি অনেক দূরে চলে গেছে এবং আরো হিংস্রতায় পরিণত হয়েছে। এবং বড় বড় পাথর জেগে উঠেছে। বালুতে পা দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিলেই জোনাকি পোকার মত আলো জ্বলে ওঠে। আমরা এক মজার খেলায় মেতে উঠলাম। আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে অনেকটা আলো আলো করে ফেললাম। আসলে বালুর ভেতরে এমন আলো হয় সেন্টমার্টিন না গেলে জানতাম না।
রাত ১১টার দিকে সবাই যে যার মত ঘুমিয়ে পড়লেন। সকালে উঠে ফজরের নামাজের পর আবার অন্য বিচে গেলাম। সকাল ৮টার আগে নাস্তা সেরে ট্রলারে করে ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ট্রলারে যখন আমরা যাচ্ছিলাম তখন বড় বড় পাথর চকচকে পানিতে দেখা যাচ্ছিল। মাছ, কচ্ছপ, উড়–ক্কু মাছ দেখে খুব মজা পাচ্ছিলাম। বড় বড় ঢেউ এসে আমাদের ট্রলারটা উলটে যাবে এমন ভাব হচ্ছে। ভয়ে এই সময়ে সবাই চিৎকার করে উঠছে। অবশেষে ২ ঘণ্টা ট্রলারে থাকার পর ছেঁড়াদ্বীপে এসে পৌঁছলাম। মাঝি এক রাশ প্রবালের মাঝে তার নৌকা থামালেন। বেশ কসরত করে প্রবালের ওপর পা ফেলে মূল দ্বীপে এসে দাঁড়ালাম। শুনেছি সেন্টমার্টিন দ্বীপের আদিম রূপ হলো ছেঁড়াদ্বীপ। ছেঁড়াদ্বীপ দেখে বোঝা যায় যে সেন্টমার্টিন কিভাবে তৈরি হয়েছে। এই দ্বীপে দেখলাম বালু বা মাটি নেই (বা আমি দেখতে পাইনি)। দ্বীপের চারপাশটা (সম্ভবত পুরোটাই) কালো প্রবাল দিয়ে ঘেরা। মাঝে রাশি রাশি শামুক-ঝিনুকের গুঁড়ো বালির মতো বিছানো। এর মাঝেই আবার কেয়া বন। কেয়াগাছের পাতা লম্বা লম্বা সরু সরু ঘাসের মতো, অনেকটা সুন্দরবনের গোলপাতার মতো, গাঢ় সবুজ রঙের। প্রবালের রূপ যে কত রকম হতে পারে সেটা এখানে এসে বুঝলাম। কালো, সাদা, হলুদ, ছাই। কোনো কোনো জায়গায় বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে বড় বড় প্রবাল। অনেকটা টেবিলের মতো। গোল, ওপরটা চাঁছা। কোথাও কোথাও প্রবালের মাঝে পুকুরের মতো পানি জমে আছে। ওখানে আবার ছোট ছোট বেলে মাছের মতো কী মাছ (নাকি মাছের পোনা) যেন কিলবিল করছে। কিছু জায়গায় দেখলাম ছোট ছোট শালিকের মতো পাখি মাছ ধরছে। ঝিনুকের গুঁড়ার বালুর মাঝেও নানা রকম ডিজাইন দেখলাম। সেন্টমার্টিন আর ছেঁড়াদ্বীপের সংযোগ রেখাটাও সুন্দর। মাঝে ঝিনুকের গুঁড়া আর দুই পাশে কালো কালো প্রবাল। প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে দিয়েছে পথ। মাঝে কেয়া বনের দ্বীপ। এটা হয়তো মানুষের করা। কারণ সাইন বোর্ড দেখলামÑ সংরক্ষিত এলাকা। এই পথটা শেষ হয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সেখানকার বাড়ি ঘর এপাশ থেকেই দেখলাম।
অনেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম ছেঁড়াদ্বীপ থেকে আমরা হেঁটে সেন্টমার্টিন যাব। দেখলাম আমাদের পক্ষে লোক বেশি। ভাটা থাকায় আমরা ৯ জন দল বেঁধে চলে এলাম। প্রতিদিন সকাল ১১টা ১২টার মধ্যে ৪ জাহাজ বোঝাই ১২০০-১৫০০ পর্যটক নামেন দ্বীপটিতে। অল্প সংখ্যক রাতযাপন করেন, বাকিরা ফিরতি ফেরিতে আবার ফিরে যান বিকেল নাগাদ। হাতে সময় থাকে কয়েকঘণ্টা, খাবার দাবারের সময় বাদ দিলে খুবই সামান্য সময় দ্বীপটিকে দেখার জন্য, বোঝার জন্য। তবু তারা আসেন, সাথে নিয়ে আসেন নগরজীবনের প্রাত্যহিক স্বার্থপরতাকে, প্রতিবেশীকে জানতে-বুঝতে না চাইবার প্রবণতাকে, অর্থের বিনিময়ে সব কিছু নিজের মনে করার অভ্যাসকে। তারপর ৩-৪ ঘণ্টায় ভঙ্গুর দ্বিপটির ওপর চলে একরকমের অত্যাচার, যা সইবার মত, বইবার মত ক্ষমতা তার নেই। মানুষের অত্যাচারে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে অনেক প্রজাতির কাঁকড়া, একটি ছোট্ট বিচে ৮০০ মানুষ প্রতিদিন দাপাদাপি করলে তাদের আর বেঁচে থাকা সম্ভব? বিলীন হয়েছে অনেক প্রজাতির অদ্ভুত সুন্দর সব শামুক ঝিনুক, সমুদ্রের শশা বলে পরিচিত প্রাণীটি প্রায় বিলীন হবার পথে, নতুন করে অয়েস্টারের বংশবিস্তার বলতে গেলে হচ্ছেই না, লিমপেট দেখেছি খুব কম, বার্নাকলও নতুন কলোনি করছে বলে মনে হল না, স্টারফিশ খুবই কম দেখা যাচ্ছে, সি অরচিনের দেখাও প্রায় মেলে না, পাথরের খাঁজে ব্রেন কোরাল দেখা যাবে তাতো আর আশাই করি না- ওরা স্থান নিয়েছে শৌখিন মানুষের ড্রইং রুমে। ছেঁড়াদ্বীপের অসম্ভব সুন্দর নিঃসর্গ আজ আর নেই। আমার মনে হয় এই দ্বীপটাকে বাঁচাতে পর্যটকদের নিচের নিয়ম মেনে চলা উচিত :
×    সেখান থেকে যে কোনো রকম প্রাণী-উদ্ভিদ সংগ্রহ করা থেকে সবাই বিরত থাকা
×    ছেঁড়াদ্বীপে স্নর্কলিং না করা
×    নৌকা নিয়ে প্রবাল দ্বীপে না যাওয়া
×    বিচে দাপাদাপি না করা
×    কাছিমের ডিম পাড়া দেখতে না যাওয়া, জীবনে বহু কিছুই দেখিনি, এটি না দেখলেও আমাদের জীবন বৃথা হয়ে যাবে না
×    কক্সবাজার থেকে প্রবাল না কেনা
হোটেলে পৌঁছতে প্রায় দুপুর ১২টা বেজে যায়। ৩টা ৩০ মিনিটে আবার জাহাজ ছেড়ে চলে যাবে। তাই ফেরার জন্য তড়িঘড়ি শুরু হয়ে গেল। গোসল, নামাজ, খাওয়া সেরে গুছিয়ে আবার বাজারে চলে গেলাম। তখন প্রায় ২টা ৩০ মিনিট। বাজারে এসে আবার কেনা কাটা শুরু।
দেখলাম বেশির ভাগ মানুষ বিভিন্ন শুঁটকি মাছ কেনাকাটা করছে। আর এই বাজারটাই যেন শুঁটকির জন্য বিখ্যাত। এইভাবে সময় শেষ হয়ে গেল জাহাজে সবাই উঠে গেলাম। জাহাজ ছেড়ে দিলো। মনের মাঝে কোথায় যেন শূন্যতা লক্ষ্য করলাম। মনে হচ্ছে কী যেন রেখে যাচ্ছি। জাহাজের আওয়াজটা যেন বিচ্ছিরি লাগছিল। আসার পথে সাদা-পাখি যেন টেনে ধরতে চাইছে। তারা এমনভাবে উড়ে আসছিল যে মনে হচ্ছিল আমাদের যেতে নিষেধ করছে। তারপরও চলে আসতে হলো। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের হাতছানি থেকে মনটাকে স্থির করতে না পারলেও বাস্তবতার কারণে ফিরে আসতে হয়েছিল। প্রকৃতির এত কাছাকাছি গিয়ে নির্জনতা ও প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করার সুযোগ আর কখনও হবে কি না জানি না। তবে আল্লাহর কাছে দোয়া- আমাদের দেশের এই সম্পদ চিরদিন আমাদের হয়ে থাকুক। আমিন।

SHARE

Leave a Reply