Home জেলা পরিচিতি ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সুনামগঞ্জ

ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সুনামগঞ্জ

বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোলঘেষে সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থান। মৎস্য, পাথর, বালু ও ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ। হাওর-বাওর বেষ্টিত দুর্গম যোগাযোগের এ জনপদের পশ্চাৎপদ অধিবাসীদের চাহিদা পূরণের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা হচ্ছে।
নামকরণ : ‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামক উক্ত মোগল সৈন্যের কোনো এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসাবে দান করা হয়। তাঁর দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তাঁরই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল।
প্রাচীন ইতিহাস : অসংখ্য কিংবদন্তী এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও তথ্যাবলিতে সমৃদ্ধ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল এককালে একটি সাগরের বুকে নিমজ্জিত ছিল যা কালে কালে পলি ভরাটজনিত কারণে ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সূত্র ধরে ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান : সুনামগঞ্জ জেলার উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে হবিগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা এবং পশ্চিমে নেত্রকোন জেলা। জেলাটি ২৪ডিগ্রী৩৪’ থেকে ২৫ডিগ্রী১’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০ডিগ্রী৫৬’ থেকে ৯১ডিগ্রী৪৯’ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
শিল্প ও বাণিজ্য : সুনামগঞ্জ জেলা শিল্প ও বাণিজ্যে একটি অনগ্রসর জেলা। অন্যান্য জেলার শিল্প ও বাণিজ্য উন্নয়নে এ জেলা প্রধানত কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। তার মধ্যে বালি, পাথর, কয়লা, চুনাপাথর ইত্যাদি প্রধান। এ জেলায় কাঁচামাল চুনাপাথরের উপর ভিত্তি করে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ও লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি নামে দু’টি বিখ্যাত সিমেন্ট কারাখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া এ জেলায় বিভিন্ন আকৃতির (বোল্ডার, পেবল, কোবল, সেন্ড, সিল্ট ইত্যাদি আকৃতির) মিনারেল সমৃদ্ধ পাথর কোয়ারী রয়েছে। তার মধ্যে ফাজিলপুর, ধোপাজান, চেলা নদী ও মরা চেলা নদী, খাসিয়ামারা, চিলাউড়ি গোজাউড়ি চিলাই ভোলাখালি ইত্যাদি অন্যতম। এই সব পাথর কোয়ারী হতে বিভিন্ন আকৃতির পাথর বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে। এখানে আছে টেকেরঘাটের বড়ছড়া কয়লা আমদানির ব্যবসা কেন্দ্র।
ভাষা ও সংস্কৃতি : সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে প্রাচীন চর্যাপদের ভাষার মিল পরিলক্ষিত হয়। এ জেলার জনগণ সাধারণত বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তবে জগন্নাথপুর, ছাতক, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় জনগণ নিজেদের মধ্যে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। অন্যান্য উপজেলায় বিভিন্ন অঞ্চল যেমন সিলেট অঞ্চল, ময়মনসিংহ অঞ্চল,কুুমিল্লা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। সুনামগঞ্জ জেলার অধিবাসীরা সাহিত্য চর্চায় সিলেট বিভাগের পথিকৃৎ। শুধু বাংলা ভাষাতেই নয় এ জেলার অধিবাসীরা মোট সাতটি বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য রেখেছেন। পনের’শ শতাব্দি থেকে শুরু এ যাবৎ সুনামগঞ্জবাসীরা যে সমস্ত ভাষায় সাহিত্য রচনা করে গেছেন, সেগুলো হলো- ১. সংস্কৃত ২. বাংলা ৩. সিলেটি নাগরী ৪. আরবি ৫. ফার্সি ৬. উর্দু ও ৭. ইংরেজি।
খনিজ সম্পদ : চুনাপাথরের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার রয়েছে এ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাটে। সিমেন্ট শিল্পের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই চুনাপাথরকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীণ আবহে পাহাড়ী খনি অঞ্চল। এই অঞ্চলটি বহুকাল থেকে ভূ-তাত্ত্বিক এবং ভূ-কাঠামোগত কারণে হাইড্রোকার্বনের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকে সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার উপজেলার টেংরাটিলায় একটি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে নাইকো গ্যাস কোম্পানি গ্যাস উত্তোলনে যায় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে দুর্ঘটনাবশত সেখানে একটি বড় আকারে ব্লো আউট হয়। এতে সরকারের সাথে নাইকো গ্যাস কোম্পানীর ক্ষতিপূরণের মামলা হয়। ফলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে গ্যাস ফিল্ডটি পরিত্যাক্ত হয়।
দর্শনীয় স্থান
টাঙ্গুয়ার হাওর : টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রুপ জলমহালগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলাস্থিত জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ মিঠা পানির এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার এলাকা। ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া, জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে সারি সারি হিজল-করচ শোভিত, পাখিদের কলকাকলি মুখরিত টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম। বর্তমানে মোট জলমহাল সংখ্যা ৫১টি এবং মোট আয়তন ৬,৯১২.২০ একর।
হাছনরাজা মিউজিয়াম : সুনামগঞ্জ পৌরসভা এলাকার তেঘরিয়ায় সুরমা নদীর কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে হাছনরাজার স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। এ বাড়িটি একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এ সাধকের ব্যবহৃত কুর্তা, খড়ম, তরবারি, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই ও নিজের হাতের লেখা কবিতার ও গানের পান্ডুলিপি আজও বহু দর্শনার্থীর আবেগ আপ্লুত করে।
লাউড়ের গড় : প্রাচীন লাউর রাজ্যের স্মৃতি বহন করছে ভারত বাংলাদেশের সীমান্তের এই এলাকা। সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশে খুব কাছ থেকে দেখা যাবে স্তরে স্তরে সাজানো পাহাড় শ্রেণী।
ডলুরা শহীদদের সমাধি সৌধ : যেখানে গেলে মুহূর্তেই ৪৮ জন মহান শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় অন্তত চোখে ভাসে তার নাম ডলুরা। পাহাড়ের পাদদেশে চলতি নদীর তীরে লুকায়িত আছে সেই একাত্তরের রক্তত্যাগ সংগ্রামের স্মৃতি চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধে সীমান্তবর্তী ডলুরা ছিল সুনামগঞ্জের অন্যতম রণাঙ্গন। এই রণাঙ্গনটি ছিল ৪ নম্বর বালাট সেক্টরের অধীন। ১৯৭৩ সালে ৪৮ জন শহীদের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ডলুরা শহীদ মাজার।

SHARE

Leave a Reply