Home গল্প ঝিনুক, জোজো ও পোড়োবাড়ি

ঝিনুক, জোজো ও পোড়োবাড়ি

ঝর্ণা দাশ পুরস্কায়স্থ..

শীতের দিনগুলো বড্ড বাজে আর বিচ্ছিরি। এ সময়টাতে সমাপনী পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা সবই এক সাথে মিছিলের মতো আসে। ঝিনুকের মতো ছোট্ট একটি ছেলে কি এত কিছুর বোঝা নিতে পারে? কিন্তু কেউ সেটা বুঝতে চায় না। বড়রা সবাই বলে- পড়ো, পরীক্ষা দাও, অঙ্ক-ইংরেজিতে ভালো নম্বর তোল। তাই যদি হয়- ঝিনুক খেলবে কখন?
অথচ মা কী খুশিতে রয়েছেন, লেপ-কাঁথা-বালিশ সব বারান্দায় রোদে দিচ্ছেন। সকালে অবশ্য রোদ তেমন কড়া থাকে না, বেলা বাড়লেই ঝাঁঝালো রোদে গরম হতে থাকে বালিশ-কাঁথা-লেপ। মা খুব যত্ন করে বিছানা পেতে রোদ গরম বালিশ-লেপ রাখেন। শুধু কি এই? চালের গুঁড়ো-নারকেল-খোয়াক্ষীর দিয়ে চমৎকার পিঠে তৈরি করেন।
বাবা কত সবজি নিয়ে আসেন বাড়িতে। লাল টুকটুকে টম্যাটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর-পেঁয়াজ কালি। খুব মজাদার খাবার-দাবার হয় বাড়িতে। খেতে বেশ লাগে ঝিনুকের, ঘুমোতে তো ভীষণ ভালো লাগে। লেপের ওমে। কিন্তু দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে পরীক্ষাগুলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই কোথাও ভালো লাগে না ওর। সবেমাত্র সমাপনী পরীক্ষা শেষ হয়েছে, আবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে কেন? যে স্কুলে সে পড়ে সেটা তো বেশ, বাড়ির খুব কাছে। কাছাকাছি ফ্ল্যাটের চেনা ছেলেরা সবাই পড়ে। সবার সঙ্গে তাই খুব ভাব। এমন ভালো লাগার স্কুল ছাড়তে হবে কেন? যে যাই বলুক মা-বাবারা কিন্তু ছোটদের মন বুঝতে পারে না।
অঙ্ক কষতে গিয়ে, ইংরেজি পড়তে গিয়ে বুকের ভেতর ঝিনুকের রাগ হতে থাকে। ভর্তি পরীক্ষার জন্য ফের পড়তে হবে কেন? ছোটদের বুঝি বিশ্রামের দরকার নেই? এই যে এখন ওর শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। মায়ের মোবাইল থেকে টিটো-অন্তুর সঙ্গে কথা বলতে মনটা বড্ড আইটাই করছে, ডিসকভারি চ্যানেলের বাঘ-সিংহ-হাতিদের দেখতে ইচ্ছে করছে- তার কী হবে?
নাহ- সবার আগে ভর্তি পরীক্ষা, ঝিনুক তুমি নামি স্কুলে পরীক্ষা দাও, ভালোভাবে পাস করো, নতুন স্কুলে ভর্তি হও। সুন্দর ভবিষ্যৎ হবে তোমার। ঝিনুক তো ওসব চায় না, ও চায় আনন্দ করতে। বড়মামু যেমন অ্যাবসেন্ড মাইন্ডেড প্রফেসরের মতো সব ভুলে যান কিন্তু হাসিমুখে বলেন- এই ঝিনুক শোন- যা করে আনন্দ পাস, সেটাই করবি।
মামুকে ভীষণ পছন্দ করে ছোটরা কিন্তু আড়ালে বড়রা বলে- তোমার পাগলা মামু। উনি কেমন ধারা পাগল- বুঝে উঠতে পারে না সে। কলেজে পড়ান মামু- একটু আলাভোলা মতো। শীতের সময় শাল খুঁজে না পেয়ে এই তো সেদিন পুরনো ও ছেঁড়াকাঁথা গায়ে দিয়ে কলেজে গেছেন। ছেলেরা নাকি খুব হাসাহাসি করেছে এ নিয়ে। বলেছে, স্যার কাঁথা গায়ে দিয়ে এসেছেন কেন? বড়মামু সহজ গলায় বলেছেন, খুব শীত আজকে। ছেলেরা বলেছে, লেপ গায়ে দিয়ে এলেই তো হতো স্যার। মামু মাথা নেড়ে বলেছেন- তা বেশ হতো।
এমনই বড়মামু। কই- তিনি বাড়িতে এলে তো একবারও পড়ার কথা জিজ্ঞেস করেন না। অ্যাকুরিয়ামের মাছদের এক মনে দেখেন, কত জানা-অজানা গল্প বলেন। ঝিনুক চুপচাপ বসে গল্পগুলো শোনে।
মা বলেন, জানিস তোর মামা কতো বড় স্কলার। দাদাভাই অনেক কিছু জানেন।
ঝিনুক ঝটপট বলে, স্কলার মানে পণ্ডিত তো মা, তবেই বোঝ মা, আমাকে তো মামু কখনই পড়ার কথা বলেন না।
মা গম্ভীর মুখে বলেন, খুব ফাজিল হয়েছ, না? ঠোঁট উল্টায় ঝিনুক। সত্যি কথা বললে বুঝি ফাজিল বলে ডাকে? কী জানি!
রাত ৯টা বাজে এখন। এবার ওর পড়া শেষ। এখন ও ইচ্ছে করলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। গ্রিলে হাত রেখে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক রাস্তার দিকে। কতো লোক, কতো প্রাইভেট কার, রিকশা যাচ্ছে আসছে। সামনের বাড়িগুলো থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে, টিভির উঁচু আওয়াজ কানে এসে বাজে। খুব আনন্দ হচ্ছে সামনের বাড়িতে। বেলুন, রঙিন কাগজের শিকল সব কিছু দেখতে পাচ্ছে ঝিনুক।
ঠিক তার পাশটাই অন্ধকার। দোতলা পর্যন্ত বানানো হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ইটগুলোতে শ্যাওলা ধরেছে, বাড়ির পাশে-ভেতরে অনেক আগাছা, দিনের বেলা দেখতে পেয়েছে ঝিনুক। এখন এই রাতের বেলা ওখানে ঘুরঘুট্টি আঁধার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পাড়ার ছেলেরা বলে- পোড়োবাড়ি। এ বাড়িতে লুকোচুরি খেলতে দারুণ লাগে। সহজে কেউ খুঁজে পায় না।
মা বলেন, পোড়োবাড়ি কিরে? যে বাড়ি ফেলে রাখে- সাপ-খোপ থাকে, ভূতেরা আস্তানা গাড়ে, পেত্নীরা খিক খিক করে হাসে, রাতের বেলা কান্না শোনা যায়, ঢিল ছোড়ার আওয়াজ শোনা যায় কখনও কখনও।
মামু তো আর ওদের বাড়ি থাকেন না, মাঝেমধ্যে আসেন, এ কথা শুনে বললেন, এসব কথা ঝিনুককে কেন বলছিস রে মিমি? ভূত বলে আদৌ কিছু আছে নাকি?
সত্যি কি ভূত বলে কিছু নেই? তাহলে এত যে ভূতের গল্প, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে কিংবা একা বাড়িতে থাকলে যে বিদঘুটে সব আওয়াজ হয়, সারা শরীরে কাঁটা দেয়, শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম নামতে থাকে- ওসব কী?
বড়মামু যতই আলাভোলা হোন না কেন- সবার ভাষায় স্কলার মানে পণ্ডিত, তাকে কি সবে সমাপনী পরীক্ষা দেয়া ঝিনুক প্রশ্ন করতে পারে- কী বলেন বড়মামা- ভূত নেই? হুঁ বললেই হলো।
কোন কিছু বলতে গেলেই মা বলেন, মনে রেখ ঝিনুক, দু’তিন বছর থেকে ভালো ভালো স্কুল থেকে ফরম আনছি, ভর্তি পরীক্ষা দেওয়াচ্ছি- তুমি কিন্তু পাস করতে পারছ না, মনে রেখ সে কথা।
হ্যাঁ, সবই মনে আছে ওর। বড়মামুর কথাই মেনে নিল সে। তিনি কত কিছু জানেন, ওর কথা না মেনে উপায় নেই। কিন্তু ওরা যখন মেঘলা দিনে কিংবা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিনে লুকোচুরি খেলে তখন একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত ছুটোছুটি করে একে অপরকে খুঁজে পায় না- তখন আচমকা মুখ ফসকে বের হয়ে যায়- এই স্কাউন্ড্রেল জোজা- কোথায় লুকিয়েছিস ত্ইু? বের হ শিগগির। টিটো তো মাঝে মাঝে বকুনির ঝড় বইয়ে দেয়,- এই গাধা, এই ডাকাত জোজো- এক্ষুনি বের না হলে তোর একদিন কি আমার একদিন।
পর মুহূর্তে বন্ধুরা একে অন্যের মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। কাকে বকছে টিটো, ঝিনুক, কল্প ওরা? ও তো নেই, মাস চারেক আগে এক অ্যাকসিডেন্টে সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।
কী অদ্ভুত সেই দিনটি! ভাদ্র মাস- কী প্যাঁচপ্যাঁচে গরম। ঘেমে-নেয়ে উঠেছে ক্লাস ফাইভের ছেলেরা। মাথার ওপরের ফ্যানটা অমন ঘটাঙ ঘট, ঘটাঙ ঘট করে ঘুরে। যেন চলতেই চায় না। সুইচ টিপলেও যে কে সেই। একে ইংরেজি ক্লাস তাই গা পোড়ানো গরম, ছেলেরা চ্যাঁচামেচি করে,- স্যার ছুটি দিয়ে দেন।
– স্যার, নতুন ফ্যান দিতে বলেন না হেড স্যারকে, এটা তো চলেই না।
স্যার হুঙ্কার দিয়ে- চুপ চুপ, চ্যাঁচামেচি করো না- স্ট্যান্ড আপ, ইয়ু স্ট্যান্ড আপ- বলার সাথে সাথে কান ফাটানো এক আওয়াজ, সাথে সাথে কচি গলার আর্তচিৎকার।
এল প্যাটার্নের স্কুল ঘরের মাঝামাঝি দু’টি কামরা ক্লাস ফাইভের। এ সেকশন আর বি সেকশন। এ সেকশনের ক্লাসে গোটা স্কুল ভেঙে পড়ে। আশ্চর্য এক কাণ্ড ঘটেছে, যা কোনো দিনও হয়নি- ফ্যানটি ছাদ থেকে খুলে ছিটকে পড়েছে। থার্ড বয় জোজোর মাথার ওপর। চিৎপাত হয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে ও, রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে।
এরপর চিৎপাত-চ্যাঁচামেচি, জোজোর বাড়িতে খবর দেয়া, ওকে নিয়ে ক্লিনিকে যাওয়া- তিন ঘণ্টার ভেতর পৃথিবীটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। মেলাতে নাগরদোলায় চড়তে গেলে মাথার ভেতরটা যেমন ফাঁকা হয়ে যায়, ঝিনুকের সেদিন ঠিক তেমনই মনে হয়েছিল।
প্রিয়বন্ধু জোজো সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে। আজও মাঝে মাঝে ঝিনুকের ভুল হয়। খেলতে গিয়ে জোজো নাম ধরে বার বার ডেকে ওঠে। উৎসবের দিনে ভুল করে জোজোকে ফোন করতে ফোনের রিসিভার তোলে। বুকের ভেতরটাও একেক সময় ভীষণ কষ্ট হয়। চোখ ভিজে যায়।
সময়ে নাকি সব সয়ে যায়। চার মাসে একটু একটু করে প্রায় ভুলতে বসেছে জোজোকে। তবে ঘর গোছাতে গিয়ে বইয়ের ধুলো ঝেড়ে তাকে সাজাতে গিয়ে জোজোর উপহার দেয়া বইগুলোতে যখন ওর হাতের লেখা দেখে তখন নতুন করে বুকের ভেতরটাতে একটানা কষ্টের ঝড় বইতে থাকে।
তবে মা সান্ত্বনা দিয়ে ছেলেকে বোঝান, যে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে তো ফিরে আসে না। এটা বুঝতে হবে। তুমি সব সময় ওর জন্য প্রার্থনা করো ঝিনুক।
হরলিকস তৈরি করতে করতে কিচেন থেক চেঁচিয়ে ওঠেন মা- কী রে ঝিনু, পড়া শুনছি না কেন? কী করছিস? অঙ্ক কষেছিস?
মা হরলিকস-বিস্কিট নিয়ে আসেন।
স্নিগ্ধ সুরে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার মাত্র তিন দিন বাকি। এ ক’দিন ভালো করে পড়ে নাও। তারপর তো শুধু ছুটি আর ছুটি।
মা আর ছেলে মিলে প্রাণখুলে হাসে।

দুই.
বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন একটু আগে। মা আলুর চপ তৈরি করেছেন। পেঁয়াজ-সর্ষের তেল-চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখেছেন, সেই ভোর রাত থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে। মাঘ মাস, এমনিতেই শীত জাঁকিয়ে বসেছে, এর মাঝে বৃষ্টি। সারাদিন আকাশ ছিল মনমরা। এসব দিনে ঝিনুকের এমনিই মন খারাপ হয়ে যায়। স্কুল থেকে ফিরে খেয়েই লেপের নিচে ঢুকে পড়েছে। বাবার ফিরে আসার আওয়াজ পেয়ে উঠে পড়েছে।
ডাইনিং টেবিলে বড় প্লেটে সাজানো আলুর চপ, কাচের বড় বাটিতে মুড়িমাখা।
ওয়াও বলেই চপ হাতে নেয় ঝিনুক। এমন সময় ফোন আসে ছোটমাসীর। ওর ছোট্ট ছেলে দীপ্তর নাকি হাই টেম্পারেচার। ব্যস, সব আনন্দ কর্পূরের মতো এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
মা-বাবা তৈরি হলেন ঝিকাতলা মাসীর বাসায় যাবার জন্য।
মা বারবার বললেন, খবরদার ঝিনুক, ডোরবেল বাজলেও দরজা খুলবে না, বুঝলে? বেশি দেরি হবে না আমাদের। দীপ্তকে দেখেই চলে আসব।
একা বাড়িতে বসে খুব রাগ হয় দীপ্তর ওপর। কী যে এক হাড়গিলার মতো ছেলে হয়েছে মাসীর। সব সময় জ্বর, কাশি, একটা না একটা লেগেই আছে ওর। মুখে আবার খই ফোটায়, – ও নাকি জিমে যাবে, ব্যায়াম করবে। বড় হলে ওর বাইসেপ হবে নাকি ইয়া মোটা। ও মি. বাংলাদেশ হবে।
ফিক করে হেসে ফেলে ঝিনুক। ওর চেয়ে দুই বছরের ছোট দীপ্ত। মুখে কথার তুবড়ি ফোটায়। দু’দিন পর পর অসুখে-বিসুখে বিছানার সাথে মিশে যায়। ফল দুধ-স্যুপ খেয়ে যে-ই না একটু চনমনে হয়ে ওঠে- তখনই আবার বকবকানি শুরু হয় ওর।
মাসী ধমক দেয়, এবার থাম তো, আর বড়াই করতে হবে না।
এবার কী করবে ঝিনুক? ভর্তি পরীক্ষার পড়া শেষ, নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে। সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরে, মনটা ওর একেবারে খারাপ করে দিয়েছে।
এখন মন খারাপের রাত। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় সে। চারদিকে আলোয় আলো, স্ট্রিট লাইটগুলো ভিজতে ভিজতে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
মা যাবার সময় বলে গেছে, ভয় পাবার কিছু নেই। চারপাশে লোকজন। মামু তো বললই একদিন ভূত-পেত্নী বলতে কিছু নেই।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সেই পোড়োবাড়িটাতে ফের চোখ পড়ে।
টাকার জন্য মালিক অর্ধেক তৈরি করে ফেলে রেখেছেন। হাতে টাকা এলে বাড়ি তৈরি শেষ করবেন। এটা পোড়োবাড়ি নয়।
মায়ের বলা কথাটি কানে ঝমঝম করে বাজে,- ভূত বলে কিছু নেই।
একমুঠো হিম হিম হাওয়া ছুঁয়ে যায় ঝিনুককে। ফিসফিস করে কানে কেউ যেন বলে, ভূত আছে, ভূত আছে ঝিনু।
ঝিনুকের সারা শরীর কেঁপে ওঠে। কে বলল কথা? খুব চেনা চেনা গলা। জোজো নয়তো! নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করে ওর।
মাঘ মাসের হিমেল এই বৃষ্টিঝরা রাতে কেন ওর বারবার জোজোর কথা মনে হচ্ছে? কেন দেখতে না চাইলেও অন্ধকার ঘেরা তিন তলা বাড়ির দিকে চোখ যাচ্ছে বার বার?
মা-বাবা কেন ফিরছেন না? রাত তো কম হয়নি। ৯টা পঞ্চাশ মিনিট। আর একটু পরেই ১০টা বাজবে। শীতের রাত ১০টা কি কম?
একবার অবশ্য মা মোবাইলে কথা বলেছেন, ভয় পাচ্ছ না তো ঝিনুক?
কিছুতেই হারতে চায় না ও। গলার স্বরে রাজ্যের সাহস এনে বলেছে, আমি কি কিড্ রয়ে গেছি। অনেক বড় হয়েছি। ওপাশ থেকে মায়ের খুশির হাসি শোনা গেছে।
আবার চোখ যায় আঁধারে ডুবে থাকা সেই বাড়ির দিকে। ঝলসে ওঠা বিদ্যুতের ক্ষণিক আলোয় সে দেখে, ঝকমকে মোড়কের রঙিন বই। রিকশা-গাড়ি-রাস্তায় চলাচল করা মানুষের মাথার ওপর দিয়ে শূন্যে ভাসতে ভাসতে পাঁচ-ছয়টি বই এসে ব্যালকনিতে আছড়ে পড়ে।
এই বইগুলো তো পড়া হয়নি ঝিনুকের। কল্পবিজ্ঞানের গল্প। চেয়েছিল জোজোর কাছে। সারা শরীর থিরথিরি কাঁপতে থাকে ওর। চেনা সেই গলা, ফিসফিস করে বলে, তুই চেয়েছিলি ঝিনুক। দিতে পারিনি, তার আগেই যে তোদের ছেড়ে চলে এসেছি।
সারা শরীর বিনবিনে ঘামে ভিজে যায় ঝিনুকের। চোখের সামনে বইগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। ওর ছোট্ট বুকের ভেতরে একরাশ কান্না থই থই করে ওঠে।
এলাকার বাতি হঠাৎ নিভে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বাতি জ্বলে ওঠে না। ক’দিন থেকে জেনারেটর খারাপ হয়ে আছে। ঝিনুকের সারা শরীর বরফের মতো শক্ত হয়ে আসে। কেউ যেন কোমল দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ওকে, ভয় পাচ্ছিস ঝিনু? একদম ভয় পাবিনে।
খেলায় যেমন হয় ঠিক তেমনই।
এরপরই কী হলো, চারপাশের ঘন আঁধারের মাঝে শোনা যায় চাপা গলার কান্না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেউ যেন কাঁদে।
Ñ সত্যি বলছি ঝিনু। আমি কল্প, টিটো আর তোকে ছেড়ে যেতে চাইনি। স্কুলের ফ্যানগুলো কেন সারায় না রে! হাও মাও করে কাঁদতে থাকে ঝিনুক। ঠিক ওর বয়সী কাউকে জড়িয়ে সে কাঁদে, কাঁদতেই থাকে। এক সময় ঝপ করে বাতি জ্বলে ওঠে। বোকার মতো চারপাশে তাকায় ঝিনুক। কেউ নেই, কিছু নেই।
ডোরবেল জলতরঙ্গ সুরে বাজে। দরজা খুলে দিতেই মা জড়িয়ে ধরেন ওকে। বড্ড দেরি হয়ে গেল রে, এতো জ্যাম রাস্তায়!
ঝিনুক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, কী রে কাঁদছিলি নাকি? ভয় পেয়েছিস? দুর বোকা, তুই তো আর কিড নোস্। অনেক বড় ছেলে।
নিজের ঘরে এসে আয়নায় মুখ দেখে ঝিনুক। সারা মুখ কান্নায় ভেজা।
সব কী স্বপ্ন! কাকে জড়িয়ে ধরে অন্ধকারে সে কাঁদল? কেউ কি ছিল না? সব কি ওর মনের ভুল? তাহলে বইগুলো? ঝকঝকে মোড়কের বইগুলো যেন হাসছে।
মা খেতে ডাকছেন,- ঝিনু, ও ঝিনু- খেতে এসো শিগগির।
ঝিনুক তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে। প্রিয় বন্ধুকে নাম ধরে ডেকে যায়,- জোজো, জোজো-

SHARE

Leave a Reply