Home বিশেষ রচনা বাংলাভাষার লড়াই

বাংলাভাষার লড়াই

কামাল হোসাইন..

আমরা বাংলাদেশী। আমাদের ভাষাও তাই বাংলা। পৃথিবীতে অনেক জাতি-গোষ্ঠী। ওইসব জাতি-গোষ্ঠীর নিজ নিজ আলাদা ভাষাও আছে। সে ভাষায় কথা বলে তারা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। আমরা বাংলাদেশী বলে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মানে মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষায় কথা বলে আমরা আমাদের হৃদয় জুড়াই। কিন্তু জানো? এই ভাষা নিয়ে দারুণ এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র হয়েছিলো।
ষড়যন্ত্র মানে বাংলা ভাষায় কথা বলতে না দেওয়ার পাঁয়তারা। কারা করলো এ ষড়যন্ত্রÑ এ কথা জানতে আমাদের আরো কিছু কথা জানতে হবে।
তা হলোÑ আমাদের এ দেশ একদিন বাংলাদেশ ছিলো না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দেশটি আলাদা একটি লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছিলো।
আমাদের এ ভূ-খণ্ডের নাম ছিলো তখন পূর্ব-পাকিস্তান। পাকিস্তানিরা শাসক ছিলো এ দেশের। তাদের অপর অংশের নাম ছিলো- পশ্চিম পাকিস্তান।
পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝখানে প্রায় হাজার মাইল ভারতের এলাকা। তার উপর পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষেরা ছিলো স্বার্থপর টাইপের। তারাই পাকিস্তানের কর্তা। তারা পূর্ব-পাকিস্তান মানে, বাংলাদেশের মানুষদের মোটেও সহ্য করতে পারতো না। বাংলাদেশে পাট হতো, সেই পাট বিক্রি করে বিদেশ থেকে পাওয়া টাকাগুলো ওরা নিজেদের উন্নয়নে ব্যয় করতো। বাংলাদেশের মানুষ বড় চাকরি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। এমনকি বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষা পর্যন্ত কেড়ে নিতে চাইলো। তাদের ভাষা, তাদের আশা, তাদের চলা, তাদের বলা, স্বপ্ন-সাধ সবকিছুতে ছিলো আমাদের থেকে চরম অমিল।
কারণ, তারা ছিলো উর্দু নামের আলাদা একটা ভাষার মানুষ। যেহেতু তারা শাসক ছিলো, তাই তারা চেয়েছিলো গোটা পাকিস্তানের ভাষা হোক উর্দু। বাংলা নয়, রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু। আর এ ষড়যন্ত্রের মূলে ছিলো পাকিস্তানের সে সময়ের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানেরা।
আর ভাষাই যদি পাল্টে যায়, তাহলে বাংলাভাষীদের কী হবে? তা কি মানা যায়? অসম্ভব। ওদের ওই অনৈতিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শত হাজার কোটি বাঙালি-কণ্ঠ ‘না না না’ বলে তারা যে এটা চায় না তা বুঝিয়ে দিলো। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিলে স্লোগান উঠলো- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’।
মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে এ রকম দাবির আওয়াজে শাসকেরা ভয় পেয়ে গেলো। রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ব্যাপারে তারা আরো কঠোর হলো।
একদিকে শাসকগোষ্ঠীর কঠোর মনোভাব, অন্যদিকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে কোটি কোটি বাঙালির অগ্নিপণ।
১৯৪৭ সাল থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়ে ১৯৫২ সালে তা আরো জোরদার হয়ে ওঠে।
অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি শাসকেরা ১৪৪ ধারা জারি করলো। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা ওদের জারি করা ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি নিলেন।
১০ জন ১০ জন করে একেকটা মিছিল ১৪৪ ধারা ভাঙবেন এ পরিকল্পনা হলো।
তারপর চলে চূড়ান্ত মিছিল। দাবির একাট্টা সঙ্গীত।
সেই দাবির মিছিলে পুলিশ চালালো গুলি। সে গুলিতে ঢাকার রাজপথ রক্তে ভেসে যায়। লাল হয়ে ওঠে পিচঢালা পাকা সড়ক। শহীদ হন আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার।
এটা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হন সফিউর রহমান, আবদুল আওয়াল, কিশোর শহীদ অহিউল্লাহসহ অজ্ঞাত অসংখ্য মানুষ।
২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিতে আহত আবদুস সালাম ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
দুনিয়াজুড়ে এমন ইতিহাস আর কোথাও নেই। ভাষার দাবিতে জীবন দেওয়ার এমন ঘটনা বিরল। আর এ অসামান্য ঘটনা যাতে গোটা বিশ্বের মানুষ উপলব্ধি করতে পারে, সেজন্য জাতিসঙ্ঘ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং ১৮৮ ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাসও হয়।
সেই থেকে সারাবিশ্বে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
এখন আমাদের মহান এ শহীদ দিবস সমগ্র পৃথিবীতে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। এটা আমাদের বাংলা ভাষার জন্য, বাংলাদেশী মানুষের জন্য বিরাট সম্মানের ব্যাপার।
মায়ের ভাষার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের কি কখনো ভোলা যাবে? যাবে না। যতদিন সূর্য পুবদিকে উঠে পশ্চিমে অস্ত যাবে, মানুষ ততদিন এ সকল ভাষাশহীদদের বুকের আবেগ দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে স্মরণ করবে।

SHARE

Leave a Reply