Home প্রবন্ধ কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার বসেছিল মিলনমেলা

কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার বসেছিল মিলনমেলা

জুবায়ের হুসাইন..

অনুভবের ঋতু হেমন্ত। অখণ্ড নীল আকাশ। মিষ্টি সোনা রোদে ফোটে নয়নাভিরাম ছাতিম ফুল। ভোরের কাঁচা কোমল রোদ মৃদু হিমস্পর্শে প্রাণে শিহরণ জাগায়। শিশির ভেজা সকাল, দুপুরে রোদের স্নিগ্ধতা, সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে পাখির কলকাকলি ভিন্নমাত্রিক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। রাতে আকাশ থেকে ঠিকরে পড়ে জোছনার মায়াবী আলো। ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়।
বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যের এমনই একটি সুন্দর সকাল ছিল সেদিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৭ ডিসেম্বর ২০১১ অনুযায়ী ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪১৮, বুধবার। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বসেছিল এক অন্যরকম মিলনমেলা। নবীন-প্রবীণ লেখক, কবি ও সাহিত্যিকরা সেদিন প্রাণ খুলে হেসেছিলেন। হ্যাঁ, ৭ম কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানের কথাই বলছি। সকাল ১০টার পর পরই চারদিক থেকে কবি-সাহিত্যিকদের আগমনে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো মিলনায়তন ও আশপাশের চত্বর। সে ছিল যেন এক ঝলমলে তারার মেলা। ভোলা যায় না সেদিনের সেই আনন্দঘন আয়োজনের কথা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সেদিন লেখা হলো আর একটি অধ্যায়। কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠান মানেইতো এমনি ইতিহাসের এক একটি উজ্জ্বলতম অধ্যায়।
কিশোরকণ্ঠ বাংলাদেশে একটি ব্যতিক্রমী পত্রিকাকেন্দ্রিক ঐতিহ্যিক পরিবার। যে পরিবারের সাথে সংযুক্ত হয়ে গেছে প্রবীণ, মধ্যবয়সী ও তরুণ-কিশোর। এই তিনটি প্রজন্মই কিশোরকন্ঠের লেখক, পাঠক, ভক্ত ও অনুরক্ত। একটি পরিবারে মাসের প্রথমে কিশোরকণ্ঠ প্রবেশ করলেই পড়ে যায় পত্রিকাটি নিয়ে তিন প্রজন্মের কাড়াকাড়ি। কে কার আগে পত্রিকাটি পড়বে, তাই নিয়ে বেধে যায় তুমুল হুল্লোড়। পরিবারের একেবারে ছোট্ট শিশুটি পর্যন্ত, যে সবেমাত্র বর্ণ-পরিচয় নিয়ে খেলা করছে, সেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে কিশোরকণ্ঠের ওপর। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সমগ্র বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা একটি বিরল ও বিস্ময়কর ব্যাপার বৈকি!
মজার ব্যাপার বটে যে, এই তিন প্রজন্মই কিশোরকণ্ঠের লেখক। এটাও ব্যতিক্রমী একটি বিষয়। মূলত কিশোরকণ্ঠের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা থেকেই এ ধরনের আবেগাপ্লুত স্রোতধারা বয়ে চলেছে। এই তিন প্রজন্মকে সাথে নিয়েই কিশোরকণ্ঠ পরিবারের চাঁদের হাট।
যথারীতি পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হলো ঠিক কাটায় কাটায় সকাল ১০টায়। হামদে বারী তা’য়ালা পরিবেশন করে আমন্ত্রিত দর্শক-শ্রোতাদের মাতিয়ে তুললেন ঐতিহ্যবাহী সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গীত শিল্পীরা। কিশোরকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক আতিকুর রহমানের মাঝে মেহমানদের নিয়ে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্পাদনা সহযোগী মাজহারুল ইসলাম গেছেন অনুষ্ঠানের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রধান কবি আল মাহমুদকে আনার জন্য। মাননীয় প্রধান অতিথি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে, আর, মোদাচ্ছির হোসেনকে আনার জন্য গাড়ি পাঠানো হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাশিল্পী দিলারা মেসবাহ ও কবি সোলায়মান আহসান আগেই এসে হাজির হয়েছেন। আরেক পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক কথাশিল্পী আতা সরকারকে মোবাইল করে জানা গেল তিনি একটু পরেই রওনা হবেন অনুষ্ঠানের উদ্দেশে।
মোবাইল করা হলো বিশেষ অতিথিবৃন্দকে। জানা গেল কেউ কেউ ইতোমধ্যেই রওনা দিয়েছেন এবং অন্যরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রথমেই এলেন সময়ের অন্যতম শিশুসাহিত্যিক, নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কবি আবদুল হাই শিকদার। একটা কথা বলে রাখি (চুপি চুপি), কবি আবদুল হাই শিকদারকে কিন্তু কিশোরকণ্ঠই শিশুসাহিত্যিক হিসেবে প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে।
কবি আবদুল হাই শিকদারের পর এলেন কিশোরকণ্ঠের আর একজন অত্যন্ত কাছের মানুষ, বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সাবেক চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক জুবাইদা গুলশান আরা। তার সঙ্গে ছিল তার প্রিয় (এবং আমাদেরও) ফটোগ্রাফার কন্যা। কিশোরকণ্ঠের কোনো অনুষ্ঠানে এভাবেই তারা আগমন করে আসছেন। আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করে রাখতে কার না ইচ্ছা করে!
ইতোমধ্যেই আমন্ত্রিত কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত চাররঙা ঝকঝকে সুন্দর মলাটের আকর্ষণীয় স্যুভেনির, লেখার প্যাড, কলম ও ডেলিগেট কার্ড। একটি ততটাই মনোমুগ্ধকর ফাইল ফোল্ডারের মধ্যে করে এগুলো উপহার দেয়া হয় কিশোরকণ্ঠের সম্মানিত মেহমানদেরকে। সম্মেলন কক্ষের  প্রবেশমুখে একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ব্যস্ত আগত কবি-সাহিত্যিকদের রেজিস্ট্রেশন করানোর কাজে। অভ্যর্থনায় ব্যস্ত অন্যরা। আর অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মধ্যে সহকারী সম্পাদক বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক জুবায়ের হুসাইন ও আনিসুর রহমান আমন্ত্রিতদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক নতুন কিশোরকণ্ঠের সম্পাদক বিশিষ্ট কবি মোশাররফ হোসেন খান মঞ্চে বসে সকল কার্যক্রম তদারকি করছেন।
শুরু হয়ে গেছে আলোচনা পর্ব। তবে অনুষ্ঠানটি যাতে করে একঘেয়েমি হয়ে না যায় সেজন্য মাঝে মাঝেই সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা মনমাতানো সব সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন। এটিও ছিল কিশোরকণ্ঠের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন। আর সবচেয়ে মজার বিষয়টি হলো “কিশোরকণ্ঠ পড়বো, জীবনটাকে গড়বো”Ñ এই মজার গানটি। পুরো হলরুম আনন্দে মেতেছিল যখন গানটি পরিবেশিত হচ্ছিল।
প্রথমেই শুভেচ্ছা বক্তব্য পেশ করেন কিশোরকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক, কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আতিকুর রহমান। এরপর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কবি মোশাররফ হোসেন খান। কিছু পর শুরু হয় বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যের পালা। জনপ্রিয় শিল্পী আবদুর রউফের ঝংকৃত উপস্থাপনায় এবার যে নামটি উপস্থিত সকল দর্শক-শ্রোতার কর্ণকূহরে প্রবেশ করলো, বক্তব্যকে যিনি বিশেষ আর্টে পরিণত করেছেন, বিশেষ করে এই জাতীয় কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলায়, সে নামটি হচ্ছে কবি আবদুল হাই শিকদার। তিনি বললেন, ‘কিশোরকণ্ঠের সাথে আমার সম্পর্ক আত্মা ও আবেগের। এই সম্পর্কের কারণেই কিশোরকণ্ঠের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস কখন কোথায় কীভাবে পড়ে; তার সম্প্রসারণের পারদ কতটা উঠানামা করে, কখন তার উঠানে ফুল ফোটে, পাখি ডাকে, ভোর হয়, দামাল ছেলের মতো বয়ে যায় বাতাস, সে সব খরচ রাখতে আমি সর্বদা কান পেতে থাকি। আর যে কোনো কল্যাণের কথা শুনলেই আমার হৃদয় খুঁজে পায় আরাম।’ কবি আবদুল হাই শিকদার আরো বলেন, ‘আমার বুক ফুলে ওঠে। ফুসফুস ভরে বাতাস নিই। আশার আলো চিক চিক করে চোখে। এত আনন্দের কারণ আছে। আমি বিশ্বাস করি কিশোরকণ্ঠের ভিত্তি মজবুত হওয়ার অর্থ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের শরীর মজবুত হওয়া। কিশোরকণ্ঠ বড় হওয়ার অর্থ বাংলাদেশের আত্মিক শক্তি বেড়ে যাওয়া। কিশোরকণ্ঠের প্রচার বেড়ে যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশে দেশপ্রেমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়া। সৌন্দর্যের প্রতাপ বেড়ে যাওয়া। অমঙ্গলের পতন তরান্বিত হওয়া।’ তার সুললিত কণ্ঠের কথামালা দ্বারা মুগ্ধ করলেন সবাইকে। মুহুর্মুহু করতালিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো পুরো হলরুম।
এবার পালা প্রফেসর জুবাইদা গুলশান আরার। বক্তা হিসেবে তিনিও যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তব্য শোনেন আমন্ত্রিতরা। তিনি বলেন, ‘কিশোরকণ্ঠের সাহিত্য সম্মেলনের শুভ মুহূর্ত আবার ফিরে এসেছে। কিশোরকণ্ঠ নামটি মোটামুটিভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে সব বয়সের মানুষের কাছে, পাঠকের ইচ্ছে এবং সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে হাজির হয় সে। অর্থাৎ সবার সঙ্গেই তার সখ্য। বন্ধুতা। সেই শিশু, যে একদিন ছেলেবেলায় কিশোরকণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল, দীর্ঘ সময়ের স্রোত বেয়ে সে হয়ে উঠেছে যুবক। এমন কি লেখকও। সময়কে ধরে রেখেছে হৃদয়ে। শুধু বৈচিত্র্য বা আনন্দ নয়। কিশোরকণ্ঠ একটি নীরব আন্দোলন। মানসিক বিকাশের। চিন্তার। সহমর্মিতা ও ঐতিহ্য চর্চার মাধ্যম হয়ে সে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে।’
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন তার বক্তব্যে শিশু-কিশোরদেরকে আদর্শ দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজটি আরো দায়িত্বশীলতার সাথে সম্পাদন করার উপর জোর দেন। পাশাপাশি লেখক-কবিদেরকেও সমাজ উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বিসিএসআইআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান তুলে ধরেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিশোরকণ্ঠের সম্মেলনটির গুরুত্বের কথা এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য কিশোরকণ্ঠের সকল লেখক ও কবিসহ সকলকে একযোগে কাজ করার বিষয়টি।
এরই মাঝে সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট শিশুসংগঠক ও শিশুসাহিত্যিক আ. জ. ম. ওবায়েদুল্লাহ। তিনি সম্ভবত কিশোরকণ্ঠের সবকটি সম্মেলনেই অংশগ্রহণ করেছেন। তবে এবার রাস্তায় যানজটের কারণে অনুষ্ঠানে যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারেননি। দেরিতে এলেও তাকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যের পর শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে বলা হয়।
এবার পালা প্রধান অতিথির বক্তব্যের। বাংলাদেশের অন্যতম সফল মানুষ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে, আর, মোদাচ্ছির হোসেন তার বক্তব্যে যেসব বিষয় উপস্থাপন করেন তার সারমর্ম হচ্ছে, ‘আগামী দিনের সুপ্ত ও সৃজনশীল প্রতিভাগুলোকে বিকাশের মাধ্যমে আমাদের দেশ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্যকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাতির জাগ্রত বিবেক লেখক, কবি ও সাহিত্যিকরা ভূমিকা রেখে আসছেন। এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বের পরিধি অনেক। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদেরকে যথার্থভাবে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসা প্রতিটি নাগরিকের একান্ত কর্তব্য। আমি যতদূর জানি, কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন সেই কাজগুলোই করে যাচ্ছে। সপ্তমবারের মতো কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার ২০১১ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি আশা করবো কিশোরকণ্ঠের এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং এর মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে শিশু-কিশোরসহ অভিভাবকবৃন্দ এগিয়ে আসবেন।’
অতঃপর, সেই শুভ মুহূর্তের আগমন। অর্থাৎ, শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এবার কিশোকণ্ঠ যে তিনজন গুণীজনকে সম্মাননা দিচ্ছে, সেই মহান ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়ার পালা। পুরস্কার তুলে দেয়া হলো বিশিষ্ট ব্যাংকার, কথাসাহিত্যিক আতা সরকার, কিশোরকণ্ঠের কারণেই যার শিশুসাহিত্যিক হয়ে ওঠা, কথাশিল্পী দিলারা মেসবাহ ও একাধারে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখে যিনি পাঠকহৃদয়কে জয় করতে সক্ষম হয়েছেন, কবি সোলায়মান আহসানের হাতে। ক্রেস্ট, সম্মাননা পত্রসহ অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে মঞ্চে আসন গ্রহণ করতে না করতেই এলো অনুভূতি প্রকাশের পালা। শুরু কবি সোলায়মান আহসানকে দিয়ে। তিনি অকপটে ব্যক্ত করলেন তার সীমাহীন আনন্দের বিষয়টি। এবং পাঠকদের জন্য আরো বেশি বেশি সুন্দর লেখা উপহার দেয়ার প্রত্যয়ও জানালেন। দিলারা মেসবাহ প্রকাশ করলেন তার আবেগের কথামালা। দিনটিকে তিনি তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন হিসেবে স্মরণ রাখার কথাটি বলতে দ্বিধা করলেন না। পাশাপাশি তার দায়িত্ব যে আরো বৃদ্ধি পেল শিশু-কিশোরদের প্রতি, সে কথাটিও ব্যক্ত করলেন। আতা সরকার যেন ‘তীতুর লেঠেল’ নিয়ে পুনর্বার আবির্ভুত হলেন। শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হয়ে ভূমিকা পালনের তাকিদ দিলেন। তিনি একথাও বললেন যে, তিনি অনেক আগেই কিশোরকণ্ঠের পুরস্কার পেয়ে গেছেন। কেননা, তাঁর সমসাময়িক বা পরের অনেকেই আগেই কিশোরকণ্ঠের সম্মাননা পেয়ে গেছেন।
কথাশিল্পী আতা সরকারের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২৮টি। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। কথাশিল্পী দিলারা মেসবাহর প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় ২৫টি। এর আগে আরও অন্তত আটটি পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এ যাবত তিনটি কিশোর উপন্যাস কিশোরকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। আর কবি সোলায়মান আহসানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। আরো ৩টি গ্রন্থ প্রকাশের পথে। তিনি কয়েকটি সাময়িকীও সম্পাদনা করেছেন। পেয়েছেন দুইটি পুরস্কার ও সম্মাননা।
একে একে সম্মেলনের শেষ পর্যায় চলে এলো। অর্থাৎ সভাপতির বক্তব্যের পালা। শিল্পী আবদুর রউফ ঘোষণা করলেন চিরসবুজের কবি আল মাহমুদের নাম। পুনরায় সবার মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। মাইক্রোফোন তার সামনেই হাজির করা হলো। বসে বসেই তিনি বক্তব্য রাখলেন। কিশোরকণ্ঠের প্রোগ্রামগুলোতে তিনি বরাবরই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার কথামালার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সবাই। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেলেন। যেন গোগ্রাসে গিলতে লাগলেন তার বক্তব্য। সভাপতির বক্তব্যে কবি আল মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো ঐক্য সৃষ্টি। এই ঐক্যের মাধ্যমেই মানুষ উন্নতি লাভ করে। অনেকে বলে বাংলাদেশে কবির সংখ্যা অনেক। কিন্তু আমি বলবো আমাদের কবির বড় অভাব। প্রকৃত কবির সঙ্কট বিরাজ করছে আমাদের সমাজে। তা না হলে বাংলাদেশ এত পিছনে পড়ে থাকত না। আমাদেরকে তাই লেখক ও কবি তৈরির কাজ জোরালোভাবে করতে হবে। তবেই সম্ভব হবে শৃঙ্খলিত এ জাতিকে মুক্ত করা। বিজয়ের এই মাসে কিশোরকণ্ঠের এই আয়োজন যেন তারই শুভ সূচনা হয়।’
সবার হাতে লাঞ্চের প্যাকেট তুলে দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের বিদায় জানাতে সত্যিই বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আবার হয়তো ২০১৩ সালের কোনো এক শুভ মুহূর্তে বসবে কিশোরকণ্ঠের এই আয়োজন। সেদিন এভাবে পরস্পরে মিলিত হতে পারবেন তার তো নিশ্চয়তা নেই। তাই বিদায়ের ক্ষণটি বেদনাময় হয়ে উঠলো। তবে কিশোরকণ্ঠের লেখক সম্মেলন থেকে সকলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে যান। শেষ হয় একটি বহু প্রত্যাশিত আনন্দ ও স্বপ্নপূরণের দিনের। এই দিনটির জন্য কত না অপেক্ষা, কত না টেনশন কাজ করেছিল মনের মধ্যে। সম্মেলন উপলক্ষে চাররঙা স্মারক বের হবে; এ জন্য লেখা ও বাণী কালেকশনের তোড়জোড়, লেখকদেরকে ফোনের পর ফোন দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা, শিল্পী হামিদুল ইসলাম ভাইকে দিয়ে তার কাভার ও ইলাস্ট্রেশন করানো, মনির ভাইকে দিয়ে রাত জেগে মেকাপ করানোÑ সবকিছুই চলেছে বেশ উৎসাহের সাথেই। স্মারকের আউটপুট দেয়ার অল্প আগে  সাজজাদ হোসাইন খান গল্প দিয়েছিলেন। আজ দিই, কাল দেব করতে করতে তিনি আমাদেরকে একপ্রকার চিন্তায়ই ফেলে দিয়েছিলেন। যথাদ্রুত সম্ভব কম্পোজ করে সেটাকে মেকাপে ফেলা হয়েছে।
কিশোরকণ্ঠের এ সম্মেলন শুধু একটি সম্মেলনই নয় বরং এ সম্মেলন যেন শিশু-কিশোরসহ সকল লেখক-কবি-সাহিত্যিকের এক মিলনমেলা, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের মেলবন্ধন। আর কিশোরকণ্ঠ তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতি ততটাই আন্তরিক। শুধু তাই নয়, প্রাণান্তকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। ছোটদের একটি মাসিক পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আজ জাতির যে আশা-প্রত্যাশা দানা বেঁধে উঠেছে, তার প্রতিও কিশোরকণ্ঠ শ্রদ্ধাশীল। তাই আজকের এই আনন্দ ও স্বপ্ন-পূরণের দিনে কিশোরকণ্ঠ আরো বেশি প্রত্যয়ী, আরো অধিক স্বপ্নচারী। মিলনমেলার এই ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ এবং তা হবে আরো ঝলমলে, চাঁদনী রাতের উপছে পড়া জোছনার মতো।

SHARE

2 COMMENTS

  1. অনেক খুশি লাগল এ অনুষ্ঠানের কথা জেনে। কিশোরকণ্ঠ সত্যিকারভাবে কিশোরদের কন্ঠ হয়ে উঠুক, সাহসী হয়ে উঠুক। লেখক তৈরির কারিগর হোক কিশোরকন্ঠ।
    এ সংবাদে অনেকেই আগ্রহী হবে কিশোরকন্ঠ পড়তে ও লিখতে। আমিও হলাম। সবাইকে ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা।

Leave a Reply to আব্দুল আজিজ Cancel reply