Home প্রচ্ছদ রচনা শীত আমাদের অতিথি

শীত আমাদের অতিথি

জাকির আবু জাফর..

শীতের কি কোনো দেশ আছে? ঘর বাড়ি? অথবা ঠিকানা-ঠুকানা কিছু? যদি থাকে, কোথায় সে দেশ, সে বাড়ি, সে ঠিকানা? কেউ কি জানে? কে জানে? না বোধহয়। জানে না কেউ। তাহলে শীত কি উদ্বাস্তু? অথবা যাযাবর? অথবা আমাদের সবহারা মানুষের মতো? তাও জানে না মানুষ! তবে? তবে আর কী, আমরা শীতকে কিভাবে গ্রহণ করবো, এই তো? গ্রহণ করবো অতিথি হিসেবে। শীত আমাদের মেহমান। তার ঠিকানা জানি না আমরা, চিনি না তার দেশকাল। তার বাড়ি। কিন্তু সে প্রতিবছর বেড়াতে আসে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে। আসে হিমালয় পর্বত থেকে। হেমন্তের সোনালি ডানায় ভর করে আসে সে। আসে হিমেল হাওয়া সাথে নিয়ে। আসে কুয়াশার রহস্যময় চাদর ছড়িয়ে।
কখন আসে শীত? এ প্রশ্নের জবাব আমাদের সবার জানা। পৌষ-মাঘ এ দু’মাসকে শীত বাহন করেছে। ইংরেজি ডিসেম্বর-জানুয়ারি। কখনো কখনো নভেম্বরের শেষাশেষি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত দীর্ঘ হয় শীতের অবস্থান। হেমন্ত থেকেই মূলত শীতের আবহ শুরু। হেমন্তের শিশির কণা সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের। ছাতিম ফুলের গন্ধ যখন রাতের বাতাসে ভেসে বেড়ায় তখন রাত খানিকটা হিমেল হয়ে ওঠে। ফুলের সৌরভ যেনো বলে, ‘হে বন্ধুরা! শীত আসছে তোমাদের দুয়ারে।’ এভাবে দেখতে দেখতে এসে পড়ে শীতের রজনী।
বাংলাদেশ তার শরীরে সবুজের আশ্চর্য আনন্দ জাগিয়ে রেখেছে। এ আনন্দ একেক ঋতুতে একেক রকম হয়ে যায়। রূপ পরিবর্তন করে। কখনো হালকা সবুজ। কখনো গাঢ় আবার কখনো কালচে সবুজ। বসন্তে সবুজ থাকে হালকা। বর্ষায় গাঢ় সবুজ। এ সবুজ শরৎ হেমন্ত পার হয়ে শীত পর্যন্ত থাকে। শীতে বাংলাদেশের সবুজ কালচে হয়ে যায়। গাছের পাতাগুলো ধীরে হলুদ হতে থাকে। হলুদ হতে হতে এক সময় ঝরে যায়। তারপরই আসে ঋতুরাজ বসন্ত। তখন গাছে গাছে নতুন পাতা। নতুন পাতার গায়ে থাকে হালকা সবুজ। এভাবে ঋতু বৈচিত্র্যের সাথে বিচিত্রময় হয়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য।
ছয়টি ঋতুর মধ্যে শীত ঋতুটা একদমই আলাদা। আলাদা নানান বৈশিষ্ট্যের গুণে। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঠাণ্ডা। শীত ঋতু আমাদের শীত এনে দেয়। গায়ে অতিরিক্ত কাপড় তুলে দেয় সকলের। রাতে কম্বল কিংবা লেপের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। শীতের ভয়ে আমরা সকলেই মোটা কাপড় জড়িয়ে রাখি গায়ে। তবে এসব কাপড় জড়ালে দারুন আরামের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। কম্বল অথবা লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে অনেক আরাম। ঘুম হয় বেশ। ঘুমের তৃপ্তি দেবার জন্য শীতরাত বেশ দীর্ঘ হয়ে যায়। লম্বা রাতে লম্বা ঘুম। আহ্ কী আনন্দ! মাঝে মাঝে ঘুমাতে ঘুমাতে পিঠে ব্যথা হয়ে যায়। ব্যথা হয় ঠিক কিন্তু লেপ কম্বল ছেড়ে বিছানা থেকে উঠতে কি আর ইচ্ছে করে? মোটেই ইচ্ছে করে না। শরীর বলে উঠে যাও। মন বলে নাহ্। আর খানিকক্ষণ। এই অল্প কিছুক্ষণ। তারপরই উঠে যাবো। এভাবে উঠি উঠি করে আরো দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকার আনন্দ শুধু শীতকালেই অনুভব করা যায়।
শীতের সকাল মানেই অন্যরকম দৃশ্য। অন্য আনন্দের সুখ। যদিও সকালে ঠাণ্ডার কামড়টা বেড়ে যায়। তবুও আরাম। চারদিকে কুয়াশার বিস্তীর্ণ চাদর। বিশেষ করে বাংলাদেশেল সবুজ গাঁয়ে কুয়াশার দৃশ্য আশ্চর্যজনক দেখায়। ঘন কুয়াশায় ডুবে থাকে সারা গ্রাম। কোথাও কিছু দেখার উপায় নেই। ঘরবাড়ি গ্রাম, জলাশয়, বাঁশঝাড় এবং বিশাল প্রান্তর জুড়ে কুয়াশা আর কুয়াশা। গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া কুয়াশার শব্দ। খুব মজার। বনের ভেতর ঢুকলে মনে হয় বুঝি বৃষ্টি ঝরছে। চতুর্দিকে টুপটাপ ধীর শব্দের নীরব পতন। মনের সাথে কুয়াশার গুঁড়ি লেগে যায়। জামার ওপর বরফ কুচির মতো জমে থাকে কুয়াশার শিশুরা। পাজামা প্যান্ট অথবা লুঙ্গি যা-ই থাকুক পরনে সেও ভিজে যায়। ঘাসের ডগার মতো চোখের ভ্রƒর ওপর কুয়াশা জমে গেলে তার আনন্দ সত্যিই অন্য রকম। এ অন্য আনন্দকে উদ্যাপন করার আকাক্সক্ষা থাকলে শহরের মানুষদের গ্রামে যেতে হয়। দেখতে হবে গ্রামের নিরিবিলি প্রকৃতির শান্ত সবুজে কিভাবে উড়ে যায় কুয়াশার সাদা পর্দা।
কুয়াশায় ভিজে থাকা ভোরে ধোয়া ওঠা ভাপা পিঠার শরীরে কাপড় দিলে কেমন লাগবে এবার ভাবা যাক। আহারে সুখ! আহারে আনন্দ! হা করলে মুখ থেকে বেবোয় ধোয়া। আবার ভাপা পিঠার দেহ থেকেও ধোয়ার ওড়াউড়ি! আহ্! কী এক দৃশ্যগো বন্ধু! মনটা চলে যায় সেই আনন্দময় ভোরের কুয়াশাময় সকালে। সেই গ্রামে যেখানে মাঠে মাঠে কাটা ধানের নাড়ায় জমে থাকে কুয়াশারা। যেখানে রসের হাঁড়ি ঝুলছে খেজুর গাছের মাথায়। কাঁচা রসের স্বাদ নেবার লোভ কি করে দমন করা যায়? মানুষ খেজুর রস খায়। পাখিরাও খায়। পাখিদের রস খাওয়ার দৃশ্যটা আশ্চর্যময় আনন্দের। কিন্তু মানুষের মতো কাঁচারসের শিরনি খাওয়ার ভাগ্য পাখিদের নেই। তবে মানুষের রসে তারা ভাগ বসায় এটাই আনন্দ পাখিদের।
কলাপাতার দীর্ঘ পিঠে যখন ঝরে কুয়াশা তখন তাকে বৃষ্টিই মনে হয়। মনে হয় গুঁড়ি বৃষ্টিরা জমে জমে ধুয়ে দেয় পাতার শরীর। ডুমুর অথবা চালতা কিংবা সেগুন পাতার পিঠও একই রকম ধুয়ে যায়। এসব দৃশ্য নিয়েই সমৃদ্ধ আমার বাংলাদেশ।
খোলা মাঠে কুয়াশার খেলা আরো আনন্দময়। বিশাল মাঠকে মনে হয় কুয়াশার বিশাল দীঘি। যেনো উপরে নীচে কেবলই কুয়াশার জমে থাকা। আকাশ এবং জমিন বলে কিছুই বুঝি নেই। সবকিছু ঢেকে রাজত্ব কায়েম করে কুয়াশা সকাল। পাখিদের ওড়াউড়ি নেই কোথাও। মানুষের চলাচল খুবই কম। কিছু কিছু রাখাল গরু অথবা মেষের পাল নিয়ে এগিয়ে যায় অতি ধীরে। কুয়াশার সাদা দেয়াল ভেঙে ভেঙে গরু মেষ ছুটে চলে চরের দিকে। এইতো আমার বাংলাদেশ। এই তো আমার বাংলাদেশের গ্রাম। এইতো আমার গ্রামের শীতসকালের প্রাণময় দৃশ্য।
আমরা যারা নগরবাসী আমাদের শীতসকাল কুয়াশায় তেমন করে ঢাকে না। ইট-পাথরের দালান-কোঠায় এতটা ঠাসাঠাসি, এখানে কুয়াশা নামার জায়গা কই? কুয়াশারা আনন্দ করবে কিভাবে? কিভাবে ঝরবে কুয়াশার গুঁড়ি? মাঝে মাঝে কিছু কুয়াশা নামে বটে। কিন্তু সে কুয়াশা গ্রামের কুয়াশার মতো স্বচ্ছল নয়। স্বচ্ছও নয়। নগরের ধুলাবালি মেশানো একধরনের ধোঁয়ার মতো কুয়াশাগুলো নি®প্রাণ। শীতও ক্ষীণ হয়ে প্রবেশ করে শহরে। মাত্র ক’টি দিন শীত নামে এখানে। কিন্তু শহরের মানুষের শীতের আয়োজন অনেক বেশি। অনেক রকম সুযোগ সুবিধা। গরম কাপড়-চোপড় মেলে সহজেই। কুয়াশা শীত ঠেকানোর পদ্ধতিও সহজ। তবু শহরে শীত নামে কম। অবশ্য শহরে যারা গরিব-দুখী-অসহায় মানুষ তাদের জন্য সবকিছুই কঠিন। শীতও বেশ চেপে বসে তাদের ওপর।
শীতে বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টির অনুপস্থিতি অন্যরকম আনন্দের বটে। মাঠ ঘাট শুকনো থাকে। রাস্তায় চলাচলে সুবিধা। গৃহহীন মানুষগুলো গায়ে খানিকটা গরম কাপড় জড়িয়ে ফুটপাত অথবা গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। বৃষ্টির যন্ত্রণা হলে এদের কী যে দুর্দশা হতো তা কি ভাষায় প্রকাশ করা চলে!
শীত ঋতুতে সবজির উপস্থিতি থাকে বেশ সুখময়। খাওয়া দাওয়া দারুন জমে। পিঠা পায়েস ছাড়াও নানান খাবার শীত উপহার দেয় আমাদের। গ্রামে গ্রামে নানা মেলা বসে এই শীত ঋতুতেই। মেলায় আয়োজন থাকে বিভিন্ন প্রদর্শনীর। নানারকম খেলনা থাকে। থাকে পিঠাপুলির জোগান।
শীতে আমাদের শরীরের একটু বাড়তি যতœ নিতে হয়। লোশন-ক্রিম মেখে ত্বকের শুষ্কতা থেকে রক্ষা পেতে হয়।
শীতঋতু অনেকের প্রিয় ঋতু। অনেকে অপেক্ষা করে শীতের জন্য। শীত আসলে পোশাকের নতুন ধরন তাদের আনন্দ দেয়। গল্পের আসর কবিতার আসর অথবা গানের অনুষ্ঠান জমানো সহজ হয়। সহজ হয় বিয়ে শাদির আনুষ্ঠানিকতা।
শীত আসে আমাদের প্রকৃতিকে বদল করে দিতে। নতুন করে প্রকৃতিকে সাজিয়ে দেবার পূর্বপ্রস্তুতি হলো শীত। শীতের হাত পুরনো পাতা ঝরিয়ে দিলেই নতুন পাতা নিয়ে আসে বসন্ত। তারপরই চলে যায় শীত। চলে যায় অন্য কোনো দেশে। অন্য কোনো নদীর কূলে। কিছুদিনের অতিথি। বেড়িয়ে ফিরে যায়। শীতকে বিদায় দিয়ে আমরাও বরণ করি বসন্তের আনন্দকে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to jakir Cancel reply