Home স্বাস্থ্য কথা ছি: কী লজ্জা!

ছি: কী লজ্জা!

ডা: এহসানুল কবীর..

হ্যাঁ  লজ্জার কথাই তো। কিশোরবেলাতেও যদি কেউ ঘুমানোর সময় বিছানায় প্রস্রাব করে তবে তো লজ্জা পেতেই হবে।
লজ্জা পেতে হবে আত্মীয় স্বজনের কাছে, লজ্জা পেতে হবে বন্ধুদের কাছেও। নিজেকে ভীষণ দোষী মনে হয় তখন।
তবে এ দোষ কি নিজের ইচ্ছার, নাকি নিজের শরীরের? যে কোনো একটা অথবা দুটোই হতে পারে। চিন্তার কিছু নেই, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় রয়েছে। সেগুলো ধীরে ধীরে বলব। তার আগে আরেকটা কথা বলে নেয়া ভালো যে, এই বিব্রতকর অবস্থা যে শুধু শিশু-কিশোরদের বেলায় ঘটবে এমন কোনো কথা নেই। বড়রাও এ রকম লজ্জায় মাঝে মধ্যে পড়তে পারেন।
সাধারণত বিছানায় প্রস্রাব করা শিশুদের কাজ হলেও ৫ বছর বয়স পর্যন্ত এটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু এই বয়সের পরও যদি তা অব্যাহত থাকে তাহলে ভাবনার বিষয়। শতকরা ১৫ ভাগ শিশু-কিশোরদের বেলায় এই সমস্যা দেখা যায়। আবার ০.৫-১% ক্ষেত্রে তরুণদের এই সমস্যা থাকতে পারে।
তাহলে দেখা যাক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই সমস্যাকে কিভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটা এক ধরনের রোগ যাকে বলা হয় এনুরেসিস (ঊহঁৎবংরং)। এনুরেসিস মানে হলো নিজের অজ্ঞাতে অসময়ে ভুল জায়গায় প্রস্রাব হয়ে যাওয়া। সাধারণত এ ঘটনা বেশি রাতেই ঘটে থাকে। তাই মেডিক্যালের ভাষায় এটাকে বলা হয় নকচারনাল এনুরেসিস (ঘড়পঃঁৎহধষ ঊহঁৎবংরং)। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়।
কেন এমন হয়?
১. প্রথমেই বলতে হয় বংশগত কারণে। দেখা গেছে যদি পিতা-মাতা দু’জনেরই ছোটবেলায় এরকম হওয়ার ঘটনা থাকে তবে তাদের সন্তানদের ৭৭% ক্ষেত্রে এমন হতে পারে। আবার যদি বাবা-মা যে কোনো একজনের এমন থাকে তবে ৪৩% ক্ষেত্রে সন্তানদের এটা হতে পারে।
আবার বাবা-মা কারোরই এমন না থাকলেও তাদের সন্তান ১.৫% ক্ষেত্রে এটা হতে পারে। এমনকি যমজদের যেকোনো একজনের হলে আরেকজনের হবার সম্ভাবনা ৭০%।
২. ক্রটিপূর্ণ নিদ্রার কারণে : দেখা গেছে এরা যখন ঘুমায় তখন গভীর নিদ্রায় চলে যায় এবং ঘুমের যে কোনো মূহূর্তে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলে কিন্তু টেরও পায় না। আবার এমনকি তাদেরকে ঘুম থেকে জাগানোটাও বেশ কঠিন হয়।
৩. মনস্তাত্ত্বিক কারণে। মানসিক চাপ বা বিষণœতা, অস্থিরতা, পিতামাতার সাথে অসম সম্পর্ক, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি কারণে হতে পারে।
৪. শারীরিক ত্রুটি বা দুর্বলতার কারণে। যদি মস্তিষ্ক গঠনে পূর্ণতা পেতে দেরি হয় বিভিন্ন কারণে তাহলে সেখানে অবস্থিত মূত্র নিঃসরণ কেন্দ্রের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আবার যদি প্রস্রাবের রাস্তায় যে কোনো জায়গায় জন্মগত ত্রুটি থাকে তখনও এ সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া প্রস্রাবের ইনফেশকন থাকলেও এমন হতে পারে। ৫% ক্ষেত্রে এ রকম শারীরিক ত্রুটির কারণে বিছানায় প্রস্রাব হয়ে যেতে পারে।
৫. অতিরিক্ত পানি পান করলেও এমনটি হতে পারে।
রোগ নিরূপণের উপায়
এ রোগের চিকিৎসা প্রদানের আগে ভালোভাবে ইতিহাস জেনে নেয়াটা খুবই জরুরি। কেননা অবস্থা বুঝেই ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর জন্মের থেকে পূর্ণ ইতিহাস জানতে হবে যে কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কি না অথবা কবে থেকে কতদিনের সমস্যা। বংশ বা পারিবারিক ইতিহাস, আচরণগত বা মানসিক সমস্যা আছে কি না। পানি পানের অভ্যাস কেমন। প্রস্রাবে জ্বালা-পোড়া আছে কি না। তারপর শারীরিক পর্যবেক্ষণ করেও দেখতে হবে, সেখানেও কিছু রোগের যোগসূত্র পাওয়া যেতে পারে। এরপর চিকিৎসকগণ প্রয়োজনবোধ করলে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরামর্শও দিতে পারেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
১.    প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট ও কালচার করা যেতে পারে যদি কারণ হিসেবে প্রস্রাবের ইনফেকশন সন্দেহ হয়।
২.    প্রস্রাবের স্পেসিফিক গ্র্যাভিটিও করা হয় যা বিভিন্ন রোগের কারণে কমে গিয়ে এ প্রস্রার সৃষ্টি করে।
৩.    রক্তের ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, ইলেকট্রোলাইটস, এডিএইচ লেভেল ইত্যাদি পরীক্ষাও প্রয়োজনে করা যেতে পারে যাতে কিডনি বা রেচনতন্ত্রে কার্যকারিতা নিরূপিত হয়।
৪.    আলট্রাসনোগ্রাম করেও কিডনি বা রেচনতন্ত্রের গঠন প্রণালীর ত্রুটি আছে কি না সেটাও দেখা যেতে পারে।
এবার চিকিৎসা
এ রোগের চিকিৎসা দু’ভাবে করা যায় অথবা যৌথভাবে।
ক) ওষুধ দিয়ে
খ) ওষুধ ছাড়া
ওষুধ ছাড়াই চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা দূরীভূত হয়ে যায়। যেমন :
১. প্রথমেই অভিভাবককে দৃঢ় আস্থার সাথে আশ্বস্ত করা যে এটা কোনো ব্যাপার নয়। শারীরিক ত্রুটি না থাকলে কিছু নিয়ম কানুন মানলে সময়ের ব্যবধানে এ সঙ্কট উতরানো সম্ভব। এ জন্য রোগীকে কাজে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মূত্রত্যাগ করে মূত্রথলি খালি করা।
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাসে উৎসাহিত করা।
একটা চার্ট সংরক্ষণ করা যেতে পারে যে এক মাসে কতবার এমন হয়েছে এবং উত্তরোত্তর উন্নতি সাধনের প্রচেষ্টা।
এর জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে যথাসম্ভব বিরত রাখা।
২. মূত্রথলির ব্লাডার নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম। এটা যেভাবে করা যায় তাহলোÑ
যতক্ষণ পারা যায় প্রস্রাব ধরে রাখার অনুশীলন।
প্রস্রাব করার সময় মাঝে মাঝে বন্ধ করে আবার করা।
ঘুমানোর আগে ও ঘুম থেকে উঠে টয়লেট সেরে নেয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
রাতে বিছানায় শুয়ে ১ থেকে ৫০ পর্যন্ত গণনা করে টয়লেটে যাওয়া এবং টয়লেট থেকে ফিরে এসে আবার একই নিয়মে টয়লেটে গমন। এভাবে ৫ থেকে ১০ বার অনুশীলন করলেও ভালো ফল পাওয়া যায় ৩০-৪০% ক্ষেত্রে।
৩. ব্যবহারিক ও আচরণগত কিছু পরিবর্তন আনা। যেমন
এটার জন্য তাকে কটুকথা বা তিক্ত সমালোচনা না করা।
পরিমিত ও সময়মতো পানি পান করা। অর্থাৎ তার চাহিদা অনুযায়ী মোট পানির পরিমাণের ৪০% সকালে, ৪০% দুপুরে ও ২০% সন্ধ্যায় পান করা উচিত। এভাবেও সমস্যার সমাধান হতে পারে।
৪. অ্যালার্মের ব্যবস্থা : রাতে মাঝে মাঝে ঘুম থেকে জেগে প্রস্রাব করানোর ব্যবস্থা করলে ৭০% ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। সে জন্য একটা অ্যালার্মের ব্যবস্থা রাখলে ঘুম থেকে উঠতে সুবিধা হয়। অবশ্য রোগীকে সেভাবে নির্দেশ মানার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
এখন আসি ওষুধের কথায়। অবশ্য এসব প্রচলিত ওষুধ নির্দিষ্ট এ রোগের জন্য না হলেও শরীরের প্রস্রাব তৈরির হরমোনকে নিরুৎসাহিত করে প্রকৃতপক্ষে কম প্রস্রাব তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফলে কিছুটা হলেও ফল পাওয়া যায়। যেমন ইমিপ্রামিন (ঞধন, ঢ়রহড়ৎ ২৫সম) একটা করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ৩-৬ মাস পর্যন্ত। এতে ৩০-৬০% কাজ হয়। আবার ডেসমোপ্রেসিন গ্রুপের ওষুধও একই কাজ করে। তবে সাফল্য অদূর ভবিষ্যতে ২৫%। তো আর কী। যারা এতদিন লজ্জার চাদরে মুড়ে ছিলে, সেই চাদর ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে আলোর পথে। সামান্য নীতিমালা মেনে শরিক হতে হবে তাদের দলে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে আমি তোমাদেরই একজন।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

SHARE

3 COMMENTS

Leave a Reply