Home প্রচ্ছদ রচনা বিজয়ের কথা

বিজয়ের কথা

জয়নুল আবেদীন আজাদ..

যখন বিজয়ের কথা বলি- তখন প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ আসে, আসে ত্যাগ-তিতিক্ষার কথাও। কারণ বিজয় আপনাতেই আসে না, অর্জন করতে হয়। যে বিজয় যত বড়, তার অর্জনও তত কষ্টসাধ্য। বন্ধুরা, ‘বিজয়’ এমন একটি শব্দ যার সাথে আমরা ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। স্কুলজীবনে আমরা অনেকেই প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছি, আবার খেলার মাঠে চেষ্টা করেছি চ্যাম্পিয়ন হতে। এসব প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে আমরা প্রাণ খুলে হাসতাম, আর পরাজিত হলে মলিন হয়ে যেত আমাদের মুখ। জয়-পরাজয়ের এই প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষকেরা, গুরুজনেরা চমৎকার কিছু কথা বলতেন, পথ চলার পাথেয় দিতেন। তারা বলতেন, ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার।’ বলতেন, ব্যর্থতার মধ্যেও লুকিয়ে আছে সফলতার ভিত্তি। আসলে জীবনে তো প্রতিযোগিতা একটি মাত্র নয়। আর সব প্রতিযোগিতায় সবাই তো প্রথম হতে পারে না। তাই কোনো প্রতিযোগিতায় কেউ পরাজিত হলে হতাশ না হয়ে তার উচিত হবে নতুন উদ্যমে নতুন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। হয়তো এবার বিজয় তার জন্য অপেক্ষা করছে। এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে পারি রবার্ট ব্রুসের কথা। বারবার ব্যর্থতার পরও সাহস ও প্রতিযোতিার মনোভাব অবশেষে তাকে বিজয়ী করেছিল। এমন বার্তায় আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষণীয় বিষয়।
বিজয়ের জন্য আমরা যে প্রতিযোগিতা করি তার রূপ এক রকম নয়। ব্যক্তির প্রতিযোগিতা এক রকম, দেশ ও জাতির প্রতিযোগিতা আবার অন্য রকম। এই যে ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় দিবস পালন করি, তার মর্মটা কেমন? বিজয় দিবস কি শুধু একটি অনুষ্ঠান, বিজয় দিবস কি শুধু আনন্দের দিন? এই বিজয় দিবসের সাথে জড়িয়ে আছে জাতির স্বপ্ন, জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা। আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হলে মানুষ সুখী হয়, আর স্বপ্ন পূরণ হলে মানুষ বড় হয়। আমাদের যে বিজয় দিবস তা যেমন মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বিষয় ছিল, তেমনি ছিল জাতির স্বপ্নের বিষয়ও। পাকিস্তান আমলে আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক। স্বাধীন দেশের নাগরিক হলেও আমরা তখন স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারছিলাম না। এর কারণ ছিল শাসকদের ভুল সিদ্ধান্ত ও অন্যায় আচরণ। শাসকদের দমন-পীড়নের কৌশল তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে জন্ম দেয় দ্রোহের। যার উজ্জ্বল উদাহরণ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ এবং অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর। ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছি, ২৬ মার্চ আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছি এবং দীর্ঘ ৯ মাস রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করেছি কাক্সিক্ষত বিজয়।
১৬ ডিসেম্বর আমরা ভৌগোলিক বিজয় অর্জন করেছি জনগণের স্বপ্ন পূরণের জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের এই স্বপ্নপূরণের সংগ্রামটাই হলো আমাদের জাতীয় সংগ্রাম। দীর্ঘ ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় এই সংগ্রামে আমরা এখনো সফল হতে পারিনি। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে আমরা এখনো পৌঁছুতে পারিনি। আর জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার স্বপ্ন থেকে আমরা এখনো বহু দূরে।
তবে কোনো স্বাধীন জাতির নাগরিক স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রা থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। যখন জাতির সব সদস্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হবে তখন হয়তো আমরা যেতে পারবো স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি। স্বপ্ন পূরণের জন্য যোগ্যতা অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, ধর্ম-দর্শন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, মিডিয়া সর্বক্ষেত্রেই আমাদের যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে হবে। আর যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে বিশ্বমানের প্রতি।
বিশ্বসভ্যতায় বিজয় অর্জনের যে অভিযাত্রা, তার আবার আছে তিন কাল। অতীতে আমরা সংগ্রামমুখর ছিলাম, তবে যোগ্যতার সঙ্কট ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বেশি দূর এগোতে পারিনি। তাই আমাদের বর্তমান কালটা নিজেদের পরিগঠনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের গঠনের ব্যাপারে বর্তমান সময়টা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎটা হয়তো উজ্জ্বল হবে। কিন্তু নিজেদের আমরা কিভাবে গঠন করবো? গঠন প্রসঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা চলে আসে। তবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও যে সত্যটি আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, নৈতিক গুণে পিছিয়ে থাকলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রাগ্রসরতা মানব সমাজকে কাক্সিক্ষত সুখ-শান্তি উপহার দিতে পারে না।
তাই একই সাথে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিক মানও অর্জন করতে হবে আমাদের- যার নির্দেশনা আমরা পাই পবিত্র ধর্মগ্রন্থে। আমরা যদি আসলেই বিজয় চাই তাহলে আমাদের যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে হবে। যোগ্যতা এবং যোগ্যতাই জীবন ও সমাজ গঠনে এবং বিশ্বে সম্মান অর্জনের অভিযাত্রায় আমাদের উপহার দিতে পারে কাক্সিক্ষত বিজয়।

SHARE

Leave a Reply