Home স্বাস্থ্য কথা কোষ্ঠকাঠিন্য

কোষ্ঠকাঠিন্য

ডা. এহসানুল কবীর..

এ এক জ্বালা, এ এক যন্ত্রণা! কাউকে তেমন বলাও যায় না। আবার সওয়াও কঠিন। সারাক্ষণ অস্বস্তিকর অবস্থা। শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে, অনুভব করতে পারে। এমন কেন হয়? কবির ভাষায়- কারণ আছে কারণ/ বলতে যে তা বারণ।
তবে কবির বারণ চিকিৎসার বেলায় প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। তাইতো এই রোগটার ওপর আজকের আলোকপাত। কেননা প্রায়শই কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীদের অভিযোগ মোকাবেলা করতে হয়। তাদের অনুরোধ- কিভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে কোষ্ঠতারল্যে পরিণত করা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ। কিন্তু এই কোষ্ঠতারল্যে পরিণত করানোর ব্যাপারটা কিন্তু কখনোই ‘জলবৎ তরলং- অর্থাৎ জলের মতো তরল’ ব্যাপার নয়। কারণ এটা শুধু ওষুদের ওপর নির্ভরশীল নয়, পাশাপাশি কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। সে কথাগুলোই ক্রমশ বর্ণনায় আসবে। তার আগে জানতে হবে আসলে রোগের আসল পরিচয়টা কী।
কোষ্ঠকাঠিন্য কাকে বলে?
বলা হয়ে থাকে যদি সপ্তাহে ৩ বারের কম স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত মলত্যাগ না হয় তবে সেটাকে তখন কোষ্ঠকাঠিন্য বলে ধরে নেয়া হয়। আশা করি কোষ্ঠকাঠিন্য নির্ণয় নিয়ে যাদের এতদিনের বিভিন্ন ভুল ধারণা রয়েছে এই সংজ্ঞার আলোকে তার অপনোদন হবে।
কারণ কী?
অধিকাংশই কারণ অজানা। অর্থাৎ তেমন
কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সেটা
অবশ্য সাময়িক কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে
বেশি প্রযোজ্য। তবে অন্য কারণও থাকতে
পারে। যেমন-
বিকৃত খাদ্যাভ্যাস- সুষম খাবার না খাওয়া, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত প্রোটিন বা শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া, পরিমাণমত পানি পান না করা, বেশি ফাস্টফুড বা মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া ইত্যাদি। আবার নিয়মমাফিক সময়মত না খাওয়া এর আরেকটা কারণ।
কিছু কিছু ওষুধ গ্রহণের কারণে যেমন, ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধ, পেট ব্যথার ওষুধ ইত্যাদি। এগুলো অবশ্য চিকিৎসকেরা রোগের ইতিহাস থেকে শনাক্ত করতে পারেন।
কিছু হরমোনের ঘাটতির কারণে যেমন, থাইরয়েড হরমোন
ডায়াবেটিসের কারণে
কিছু কিছু সার্জিক্যাল সমস্যার কারণে, যা বিশেষজ্ঞ সার্জন দ্বারা শনাক্তকরণ সম্ভবপর।
কোষ্ঠকাঠিন্য শনাক্তকরণের উপায়
এটা শনাক্তকরণের জন্য চিকিৎসকবৃন্দ ৩টি পর্যায়ে অগ্রসর হন।
১.    প্রথমে রোগের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে হবে।
২.    তারপর রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করে দেখতে হতে পারে।
৩.    তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় প্যাথলজি বা অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার হলে সেটা করানো।
প্রথমে রোগীর মলত্যাগের বিস্তারিত ইতিহাস শুনতে হবে অর্থাৎ দিনে কতবার কী পরিমাণ মলত্যাগ করা হয়, তখন ব্যথা অনুভব হয় কি না। এর পাশাপাশি বমি, প্রস্রাবের গণ্ডগোল, মাঝেমাঝে ডায়রিয়া বা আমাশয় হয় কিনা ইত্যাদি জানা প্রয়োজন। এ ছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার মত কোনো ওষুধ খাওয়া হয়েছিল কিনা, ওজন কমছে কিনা, ক্ষুধামন্দা আছে কিনা, মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে কিনা, পরিবারের অন্য কারো এই সমস্যা রয়েছে কিনা, টয়লেট রুচিসম্মত কিনা, কোন মানসিক চাপের মধ্যে আছে কিনা, স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তি ক্রমশ লোপ পাচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ইতিহাস থেকে কারণটা খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা চালানো হয়।
এর পর শারীরিক পরীক্ষার প্রয়োজন হলে তাও করতে হয়। দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগীদের সাধারণত দুর্বলতার চাপ ফুটে ওঠে। শরীর শীর্ণকায় হয়ে যেতে পারে। রক্তশূন্যতাসহ জ্বর, ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি লক্ষণ থাকতে পারে। এ ছাড়া পেটে ব্যথা বা পেট ফুলে যাওয়া, তলপেটে শক্ত শক্ত ভাব অনুভূত হতে পারে। মলদ্বারের ভেতরও পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে যদি মল শক্ত হয়, টয়লেটে বসে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে মলত্যাগ করতে হয়, বেশি সময় মলত্যাগে লাগে, তলপেটে ব্যথা হয়, মল ছোট ছোট আকারে বের হয়Ñ তাহলে ধরেই নেয়া যায় যে লোকটি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন।
আর প্যাথলজি বা অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা? সাধারণত প্রয়োজন পড়ে না। তবে লক্ষণ বুঝে কোষ্ঠকাঠিন্যের জটিল-কঠিন কারণ সন্দেহ হলে কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হয় যা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরাই বুঝতে পারবেন।
এবার চিকিৎসা
চিকিৎসাশাস্ত্রে কোষ্ঠকাঠিন্যের বর্তমান নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘6D’ অর্থাৎ D অক্ষর দিয়ে রোগীকে ৬টি পরামর্শ দিলে এবং রোগী তা মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যাবে। যেমন,
1. Discussion 2. Diet 3. Dissipation 4. Dairy 5. Discipline 6. developed biofeed back অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এগুলো ভেঙেচুরে বাংলায় বললে যে পরামর্শগুলো দাঁড়ায় তাহলো-
১.    নিশ্চয়তা প্রদান অর্থাৎ নিয়মিত পরামর্শমাফিক চললে এটা সম্পূর্ণ ভাল হয়ে যাবে। দুশ্চিন্তার আর কিছু নেই।
২.    খাদ্যাভ্যাস : সহজলভ্য, সহজপাচ্য, সাধারণ খাদ্যে অভ্যস্ত হতে হবে। বিকৃত খাদ্যাভ্যাস পরিহার করতে হবে। খাদ্য সম্পর্কিত কারণগুলো খুঁজে সে মাফিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যাবে।
৩.    ওষুধ-
ক.    মলদ্বার ও তার আশপাশে একটা মলম লাগালে ভাল ফল পাওয়া যায়। মলমটার নাম : ‘Arian cream’ যা খাওয়ার পূর্বে লাগিয়ে খাওয়ার পর টয়লেট করতে হবে। এ রকম দিনে ২ বার করতে হবে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত, এমনকি ১ বছর পর্যন্ত করা লাগতে পারে।
খ.    syrup lactu– ৩ চামচ করে দিনে ৩ বার খেলে তাতেও ভাল ফল পাওয়া যায়। কোষ্ঠকাঠিন্যের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এই মাত্রা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
গ.    Tab, Esogut- দিনে ৩ বার এসবের পাশাপাশি সেবন করলে কারো কারো ক্ষেত্রে আবার ভালো ফল দিতে পারে।
৪.    ডায়েরি সংরক্ষণ করা : ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়ার পূর্বে বর্ণিত মলত্যাগের বিস্তারিত বিবরণ দৈনিক হারে লিপিবদ্ধ করা থাকলে চিকিৎসা প্রদান যথাযথ হবে বলে আশা করা যায়।
৫.    নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষা : নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মলত্যাগে বেগ হোক বা নাই হোক নিয়মিত টয়লেটে বসার অভ্যাস জারি রাখতে পারলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
৬.    নিয়মিত ডাক্তারের ফলো আপে থাকতে হবে। তার পরামর্শের যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যাদের তাদের উপকার হবে।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply