Home নিয়মিত বাংলার প্রাচীন মসজিদ

বাংলার প্রাচীন মসজিদ

এস এম আনিসুর রহমান……

ত্রময়োদশ শতাব্দীর প্রথ ভাগে সেন বংশের সর্বশেষ নৃপতি লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম বিজয়ের পর থেকে দিল্লির অধীনে গভর্নররা বাংলা শাসন করেন। তুঘলক বংশের পতনের পর বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র এবং আরব ভৌগোলিক বিবরণ থেকে জানা যায় যে ত্রয়োদশ শতাব্দীর বহু আগে থেকে বাংলায় মুসলমানদের আগমন ঘটে। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে এসেছেন এমন অনেক ওলি-আওলিয়া, পীর-দরবেশ এবং সুফি-সাধক এবং তাদের দাওয়াতি মিশনকে পরিচালিত করতে তৎসংশ্লিষ্ট জায়গায় নির্মাণ করেছেন নান্দনিক অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, দীঘি ইত্যাদি। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো মসজিদ যা মুসলিম সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। এমনই কিছু নান্দনিক মসজিদের ইতিকথা নিয়েই আজকের এই লেখা।
মসজিদ শব্দটি আরবি এর বাংলা অর্থ হলো সিজদাহ্ দেয়ার জায়গা, যেখানে সিজদাহ্ দেয়া হয়, উপাসনা গৃহ, প্রার্থনালয় ইত্যাদি। মসজিদ মুসলমানদের নিকট সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান, এখানে বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপরায়ণ মুসলমানেরা তাদের মহান রবের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে থাকে। আমাদের নবীজির (সা) সময় অবশ্যই মসজিদ ছিল রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল, মসজিদে বসেই প্রিয় নবীজি (সা) রাষ্ট্রের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বর্তমানে আমাদের দেশেও মসজিদকে কেন্দ্র করে অনেক সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, মাদরাসা-মক্তব, পাঠাগার, ইয়াতিমখানা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এবার পরিচয় করিয়ে দিই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক কিছু মসজিদের সাথে যা শত-শত বছর ধরে বাংলার মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন বহন করে আছে।
বায়তুল মোকাররম মসজিদ, ঢাকা
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের নগরী। ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে বাংলাদশের সর্ববৃহৎ মসজিদ স্থাপিত হয়েছে যার নাম বায়তুল মোকাররম। বায়তুল মোকাররম শব্দটি আরবি এর অর্থ পবিত্র গৃহ, পবিত্রতম ঘর ইত্যাদি। বায়তুল মোকাররম মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে তদানীন্তন সরকার ৮.৩০ একর জমি বরাদ্দ দেয়। মসজিদের আয়তন ৬০ হাজার বর্গফুট। বাইরে থেকে দেখলে মসজিদকে কাবার মডেলের মত মনে হবে, মসজিদটি প্রধানত ৮ তলা, নিচতলায় বিপণিবিতান ও গুদামঘর, প্রথম তলা থেকে ষষ্ঠ তলা ভবন ইমারত। কিন্তু মসজিদের সাধারণত ব্যবহৃত হচ্ছে ৬তলা মুসল্লিরা যে জায়গা বায়তুল মোকাররম মসজিদের জন্য ব্যবহার করে থাকেন তা হলো ১ লাখ ২৫ হাজার ৬২ বর্গফুট এলাকায়। মসজিদের প্রবেশপথটি রাস্তা থেকে ৯৯ ফুট উঁচুতে। ১৯৬০ সালে ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৬৩ সালে মসজিদের প্রথম পর্বের নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার প্রথম জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আর তারাবিহ নামাজ অনুষ্ঠিত হয় ২৬ জানুয়ারি শনিবার। মসজিদের প্রথম খতিব ছিলেন মাওলানা আবদুর রহমান (রহ) তিনি ১৯৬৩ সালে মসজিদের খতিব হন। বর্তমানে প্রফেসর মাওলানা মো: সালাহউদ্দিন খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদে একজন খতিব, তিনজন ইমাম, দু’জন মুয়াজ্জিন, ২০ জন খাদেম, একজন মাইক অপারেটর ও ৫ জন গার্ড দিয়ে দৈনিন্দন কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। অসংখ্যা ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি পার হয়ে এক গম্বুজবিশিষ্ট পর্চের উঠতে হয়। দ্বিতল মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এই ইমারতের অনুপম সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধান পর্চেল উচ্চতা ৯০ ফুট এবং এখানে আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণাবলি (সিফাত) উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রধান প্রার্থনাগারটি অসংখ্য গোলাকার স্তম্ভ দ্বারা সৃষ্টি কেবলা প্রাচীর একটি সুন্দর নকশাকৃত অবতল মেহরাব এবং মিনার আছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন।
বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ, খুলনা
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতানি ইমারতের নিদর্শন রয়েছে বাগেরহাটে। সাধারণভাবে এটি ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। সুলতান প্রথম মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে সাধন সৈনিক খান জাহান আলী সুন্দরবন অঞ্চলে আগমন করে বসতি স্থাপন করেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। বাগেরহাটে তাঁর অসামান্য কীর্তিসমূহ তাঁর কৃতিত্ব ও অসামান্যের প্রভাব প্রতিপত্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বাগেরহাটে জনশ্রুতি আছে যে, ৩৬০টি দীঘি এবং ৩৬০টি মসজিদ তিনি নির্মাণ করেন। ৩৬০টি মসজিদ যে তিনি নির্মাণ করেন, এ কথা সঠিকভাবে বলা যাবে না, তবে তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা খুলনা ও যশোরজুড়ে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন তা দেখে মনে হয় যে এই সময়ে অর্থাৎ পঞ্চদশ শতাব্দীতে অসংখ্য ইটের তৈরি অলঙ্কৃত মসজিদ স্থাপিত হয়। বহু কীর্তিই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং এগুলো এখনও কালের সাক্ষী হিসেবে অক্ষত রয়েছে তা স্থাপত্যশৈলীর এক অনুপম নিদর্শন বলা যায়। বাগেরহাট ছিলো খলিফাতাবাদ এবং এখানে খানজাহান আলীর প্রধান শাসনকেন্দ্র ছিলো। তাঁর মাজারে রক্ষিত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। সুতরাং তার আগে তিনি ষাটগম্বুজ এবং এর আশপাশে অসংখ্য মসজিদ ও বিভিন্ন ইমারত স্থাপিত করেন। ঘোড়া দীঘির পূর্ব দিকে ষাঠগম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের সুলতানি স্থাপত্যের অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। মসজিদটি আয়তনে পূর্ব-পশ্চিমে ২০৮ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ ফুট। সম্পূর্ণ পোড়ামাটির ইটের তৈরি এই বিশালকার মসজিদটি দেয়াল ৯ ফুট পুরু। এর চার কোনায় রয়েছে চারটি গোলাকার বুরুজগুলো দুই ধাপে নির্মিত এবং ওপরে ছোট গম্বুজাকৃতির স্তরে উঠার জন্য পেঁচানো সিঁড়ি রয়েছে মসজিদটির সম্মুখের বক্সাকার কার্নিশ সহজেই নজরে পড়ে। মধ্যভাগে পোড়ম্যান্ট ধরনের ত্রিভুজাকারে নকশা রয়েছে। অভ্যন্তরে অসংখ্য পাথরের স্তম্ভ দিয়ে মসজিদটির ছাদ নির্মিত হয়েছে। ৬ সারি স্তম্ভ মসজিদটিকে পূর্ব-পশ্চিমে ৭টি ভাগে ভাগ করছে। প্রতি সারিত ১০টি পাথরে খোদাই করা স্তম্ভ দেখা যাবে। উত্তর- দক্ষিণে মসজিদটি ১১ ভাগে বিভক্ত মোট ১০৬ স্তম্ভ মসজিদের রয়েছে এবং সে দিক থেকে বিচার করলে এই মসজিদকে ষাট খাম্বা (স্তম্ভ) বিশিষ্ট মসজিদ বলা উচিত। এই স্তম্ভগুলোর উপরে মসজিদের গম্বুজ ও চারচালা নির্মিত হয়েছ গম্বুজ নির্মাণরীতি হচ্ছে পেনডেনটিভ। মসজিদের মধ্যভাগে একটি বড় সারি প্রধান মেহরাবের দিকে চলে গেছে। এই সারিটিতে মোট ৭টি চাল ধরনের ছাদ রয়েছে। এই সারির উভয় পাশে অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণে একটি অর্থাৎ মোট ৭০টি গম্বুজ দেখা যাবে। গম্বুজগুলো আকারে ক্ষুদ্র এবং কোনো প্রকার ড্রাম ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ইমারতে ৬০টি স্থলে ৭০টি গম্বুজ এবং ৭টি চালা ছাদ ছিলো। ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রবেশের জন্য পূর্ব দিকে থেকে মোট ১১টি খিলানপথ রয়েছে খিলানগুলো কৌণিক আকারে। পশ্চিম দিকে ১০টি মেহরাব নির্মিত হয় এবং অপর একটি মেহরাবের স্থানে একটি পশ্চাৎপথ দেখা যাবে। উল্লেখ্য, মেহরাবগুলো অর্ধবৃত্তাকার অবতল অর্থাৎ দেয়ালের মধ্যে খাঁজ করে নির্মিত। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি পার্শ্ববর্তী মেহরাব অপেক্ষা আকারে বড় এবং পাথরের তৈরি। ইটের ও পাথরের মেহরাবগুলো বিভিন্ন ধরনের লাতা-পাতা, ফল-ফুল ও জ্যামিতিক নকশা উৎকীর্ণ করা হয়েছে। চারচালা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, সম্ভবত এই মসজিদেই সর্বপ্রথম বাংলার চালাঘরের অনুকরণে ৭টি চারচাল ছাদ নির্মিত হয়। বাগেরহাটের সর্ববৃহৎ মসজিদের চারপাশে একটি বেষ্টনী প্রাচীর ছিলো এবং পূর্ব দিকে খিলান সংবলিত সুউচ্চ প্রবেশ তোরণ এখনও অক্ষত অবস্থায় আছে। তথাকথিত ষাটগম্বুজ মসজিদটির বিশালত্ব দেখে অনেকে একে দরবারকক্ষ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু মসজিদের সকল উপকরণ লিওয়ান, মেম্বার, মেহরাব প্রভৃতি থাকা এটি অবশ্য একটি মসজিদ। তবে মসজিদ সামাজিক ও প্রশাসনিক কাজেও ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত খান জাহান এখানে তাঁর কর্মচারীদের নিয়ে সভা করতেন। এই অপূর্ব সুন্দর মসজিদটি সুলতানি আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মসজিদ যাতে তুগলকীয় স্থাপত্যরীতির প্রভাব পড়েছিলো। বহুগম্বুজ বিশিষ্ট বিশালকার মসজিদ হিসেবে এবং স্থাপত্যিকে ও অলঙ্করণ দিয়ে বাগেরহাটের তথাকথিত ষাটগম্বুজ মসজিদটি খান জাহানের অমর কীর্তি। বর্তমানে মসজিদটি Unesco কর্তৃক World Heritage এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বায়তুল আমান মসজিদ, বরিশাল
বাংলাদশের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদটি বরিশালে প্রতিষ্ঠিত। এটা বরিশাল শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর নামক স্থানে অবস্থিত। এটি তৈরি করতে ২১০ মিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়। মসজিদটি নির্মাণে সবচেয়ে নান্দনিক পাথর, বাহারি রঙের আলো ব্যবহার করে সুসজ্জিত করা হয়েছে। মসজিদটিতে একটি Speaker Bose আছে যার মাধ্যমে আজানের সুমধুর সুর ভেসে আসে। মসজিদের বৃহৎ জায়গাজুড়ে একটি মাদরাসা, ঈদগাহ, পুকুর এবং একটি বাহারি ফুলের বাগান আছে, যা মসজিদের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে তোলে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। মহিলাদের নামাজের জন্য মসজিদে আলাদা জায়গাও রাখা হয়েছে।
দরসবাড়ি মসজিদ ও মাদরাসা, রাজশাহী
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফিরোজপুর এলাকা প্রাচীন গৌড়ের অংশ বিশেষ। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হয়ে গেলে এই অঞ্চলে সুলতানি আমলের কতিপয় আকর্ষণীয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত মসজিদ রয়ে যায়। এই সমস্ত সুন্দর ইমারতগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে দরসবাড়ি মসজিদ ও মাদরাসা। দরস কথার অর্থ মুখস্থ করা এবং এ থেকে মনে করা হয় এ অঞ্চলে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। আয়তকার এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৯৮ ফুট এবং প্রস্থ ৫৭ ফুট। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো মসজিদটির উত্তর ও দক্ষিণে একটি মধ্যসারি বা নেভ দ্বারা বিভক্ত। এই অংশটি ৩টি চারচালা ছাদ দ্বারা আবৃত। এর দুই পাশের উত্তর ও দক্ষিণে দিকের অংশ দুটি স্তম্ভসারি দ্বারা তিনটি আইলে বিভক্ত, প্রত্যেকটি আইলে তিনটি করে মোট ৯টি এবং উভয় দিকে মোট ১৮টি ক্ষুদ্র গম্বুজ দ্বারা ছাদ নির্মিত। দরসবাড়ির মসজিদের চার কোনায় চারটি বুরুজ ছিলো এবং সম্মুখে বারান্দার দু’পাশে দু’টিসহ সর্বোমোট ৬টি কারুকার্যমণ্ডিত বুরুজ ছিলো। বারান্দাটির সম্মুখে ৭টি কৌণিক খিলান সংবলিত প্রবেশপথ ছিলো। মধ্যস্থলে চারচালা এবং দুইপাশে তিনটি করে গম্বুজ ছিলো, মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য ৭টি প্রবেশপথ কেবলা প্রাচীরের ৭টি মেহরাবের দিকে চলে গেছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে মসজিদে প্রবেশের জন্য ৩টি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদের প্রধান মেহরাবটি অন্যান্য মেহরাব অপেক্ষা বড় এবং সব মেহরাবই অবতলাকৃতি। মেহরাব ইটের তৈরি এবং কারুকার্যমণ্ডিত। এগুলোর উপরে অর্ধগোলাকার পোড়ামাটির ফলক মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। কারুকার্য অত্যন্ত উঁচুমানের এবং লতা-পাতা, ফুল-ফলের বিন্যাস দেখা যাবে।
চট্টগ্রাম জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আন্দারকেল্লার টিলার ওপর মুঘল আমলের একটি চমৎকার মসজিদ দর্শকদের আকর্ষণ করে। ১৬৬৮ খিষ্ট্রাব্দে নবাব শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খান আয়তকার এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঢাকার বাইরে অসংখ্য শায়েস্তখানি স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মসজিদের অনুরূপ চট্টগ্রামের জামে মসজিদ স্থাপিত। উল্লেখ্য যে, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বে শায়েস্তা খান আরাকানিদের পরাজিত করে ১৬৬৬ খিষ্ট্রাব্দে মুঘল সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ রাখা হয়। এবং সেখানে একটি দুর্গ (আন্দারকেল্লা ) এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মসজিদটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে তিন অংশে বিভক্ত এই ইমারতের মধ্যভাগ গম্বুজ এবং দুই পাশের স্থান ক্রসভল্ট দ্বারা আবৃত। শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমিদ খানের প্রত্যাবর্তনের পর এই মসজিদটি ক্রমশ ভগ্নপ্রাপ্ত হতে থাকে এবং পরবর্তী পর্যায়ে ব্রিটিশরা মসজিদটিকে অস্ত্রাগারে রূপান্তরিত করে। স্থানীয় মুসলমানদের বিশেষ করে মৌলভী হামিদ উল্লাহ খানের ঐকান্তিক চেষ্টায় এই ইমারতটি তার পূর্ববর্তী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরে পায়।
আটিয়া মসজিদ, টাঙ্গাইল
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে টাঙ্গাইলের আটিয়া একটি অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত মসজিদ নির্মিত হয়। শিলালিপি অনুযায়ী সৈয়দ খান পন্নী ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে সুফি সাধক পীর আলি শাহেনশাহ বাবা কাম্বীরির সম্মানে এই মসজিদ নির্মাণ ৪০ পরিমাপের এই মসজিদটি আসলে এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতি যা´করেন। ৬৯ সুলতানি আমলে বহুল প্রচলিত ছিলো। কিন্তু পূর্ব দিকে বারান্দা থাকায় মসজিদটি আয়তকার দেখায়। মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব খুবই কম ছিলো বলে মনে হয় মসজিদটিতে, কারণ গম্বুজ ও খিলানের আকৃতি পোড়ামাটির অলঙ্করণ কলসচূড়া এবং সর্বোপরি বক্রাকার কার্নিশ সুলতানি স্থাপত্যরীতির পরিচায়ক। বারান্দায় ৩টি গম্বুজ রয়েছে এবং ড্রামের ওপর নির্মিত হওয়ায় বেশ আকর্ষণীয় রূপ ধারণ করেছে। প্রাক-মুঘল যুগের মসজিদের অবশ্য ড্রামের ব্যবহার কম ছিলো। পূর্ব দিকের ৩টি খিলানপথ ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ২টি করে প্রবেশপথ আছে। কেবলা প্রাচীরে ৩টি অলঙ্কৃত মেহরাব অভ্যন্তরে গাম্ভীর্য বৃদ্ধি করেছে। সামনের দেয়ালটি নিখুঁতভাবে ফ্যানেল দ্বারা বিভক্ত এবং প্রতিটি ফ্যানেল লতা-পাতা ও ফুলের নকশা দ্বারা খোদিত।
এগারসিন্ধু সাদীর মসজিদ, ময়মনসিংহ
মুঘল আমলে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কতিপয় মসজিদ স্থাপিত হয়। ১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের আমলে সাদী নামক এক ব্যক্তি একটি অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার মসজিদটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি এবং প্রাক-মুঘল যুগের পোড়ামাটির বা দোরাকোটা অলঙ্করণ দেখা যায়। ২৭ বর্গফুট পরিমাপের এই মসজিদটির চারপাশে চারটি বুরুজ আছে এবং বুরুজগুলো ছোট গম্বুজ দ্বারা আবৃত। বক্রাকার কার্নিশ প্রাক-মুঘল যুগের ইমারতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পূর্ব দিক থেকে ৩টা খিলানপথ দিয়ে এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে একটি করে প্রবেশপথ সৃষ্টি করা হয়েছে। বহুপত্র বিশিষ্ট পূর্ব দিকের প্রধান খিলানপথটি খুবই আকর্ষণীয়।

বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এদেশের এমনি হাজারো প্রতœতত্ত্ব নিদর্শনের সাথে মিশে আছে আমাদের অতীত ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল স্বাক্ষর যে নিদর্শন আজো আমাদের ডেকে ফেরে নুতন সভ্যতা বিনির্মাণের। এদেশের মসজিদ থেকে সেই আহবানের সুর ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আন্দোলিত করে প্রতিটি মুসলিমের তৃষিত অন্তর তন্ময় হয়ে ছুটে চলে মসজিদের পানে শির নত করে দেয় মহান প্রভুর দরবারে। এই চিত্রটিই কবি কায়কোবাদ কবিতার ভাষায় লিখেছেন :
‘কে ঐ শুনালো মোরে আযানের ধ্বনি, মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইলো প্রাণ নাচিল ধমনী কি মধুর! আযানের ধ্বনি।’
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন :
‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন কবর থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’
তাই এসো বন্ধুরা, আমরা আমাদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনি, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও লালন করি। বিনির্মাণ করি নতুন আরেক গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা যা প্রেরণা জোগাবে অনাগত ভবিষ্যতের।

SHARE

Leave a Reply