Home নিয়মিত এলিয়েন

এলিয়েন

আহমেদ বায়েজীদ

‘সম্মানিত সুধীমণ্ডলী!’ উপস্থাপকের ভড়াট কণ্ঠে দর্শকের মৃদু গুঞ্জন থেমে গেল। সবার মনোযোগ কেড়ে নিল লাউড স্পিকার। ‘আমরা আমাদের সেমিনারের কার্যক্রম এখনই শুরু করতে যাচ্ছি। আপনারা জানেন আমাদের আজকের সেমিনারের বিষয় ‘এলিয়েন গবেষণা ও আমাদের সাফল্য’- এ বিষয়ে আজকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশ্বখ্যাত মহাকাশ বিজ্ঞানী, জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদের সভাপতি ড. এডমন্ড কুসি। আমি সম্মানিত স্যারকে মঞ্চে এসে প্রবন্ধ উপস্থাপন করার অনুরোধ করছি।
ঘোষণা শেষ হতে দর্শকদের তুমুল করতালির মধ্যে মঞ্চে এলেন ড. এডমন্ড কুসি। দর্শকরা বিপুল আগ্রহে অপোক্ষা করছেন তার আজকের প্রবন্ধের জন্য। ড. কুসি দেশের জ্যেষ্ঠতম বিজ্ঞানী। দীর্ঘ  দশ বছর ধরে এলিয়েন নিয়ে গবেষণা করছেন। এলিয়েন গবেষণায় ড. কুসিই বিশ্বের সফলতম বিজ্ঞানী। ইতোমধ্যে তার বেশ কিছু প্রকাশিত গবেষণায় এলিয়েনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তাই আজকের সেমিনার নিয়ে বিজ্ঞানপিপাসু থেকে সাধারণ মানুষ সবারই ব্যাপক কৌতূহল। অনেকেই ধারণা করছেন আজকে সেমিনারে ড. কুসি এলিয়েন নিয়ে চূড়ান্ত কোন ঘোষণা দেবেন। এবং সেটা হতে পারে এলিয়েনের অস্তিত্ব প্রমাণ হওয়ার ঘোষণা। কেউ কেউ আবার বলছেন ড. কুসি এলিয়েন বা মহাজাগতিক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন এবং আজকেই তিনি এ কথা জনসমে প্রকাশ করবেন।
দীর্ঘদিন থেকেই বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এলিয়েনের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কেউ কেউ এলিয়েন থাকার অনেক প্রমাণও হাজির করেছেন। তবে ড. কুসি গবেষণা করছেন অনেকটা নীরবে। আগেভাগেই কোন কথা প্রকাশ করতে তিনি রাজি হন না। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ওয়েব সাইট বা পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখা থেকে সবাই ধারণা করছে ড. কুসি হয়তো এলিয়েন গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছেন। তাই আজকের সেমিনারে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দেশ-বিদেশের সব খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও হাজির হয়েছেন।
ড. এডমন্ড কুসি ডায়াসে উঠতেই কয়েক শ’ ক্যামেরার ফাশ জ্বলে উঠলো এক সাথে। সংবাদ কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তার ছবি উঠাতে। দর্শকরা আবারও করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন। ‘সম্মানিত উপস্থিতি, সুপ্রভাত সকলকে’ লাউড স্পিকারে ড. কুসির কণ্ঠ ভেসে এলো। মুহূর্তে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো অডিটোরিয়ামে। সবই এক মনে কান পেতে শুনতে লাগলো ড. কুসির বক্তব্য। কেউ যেন একটা শব্দও মিস করতে চায় না। ড. কুসি পড়তে থাকেন তার প্রবন্ধ। শুরুতে এলিয়েনের পরিচিতিমূলক কথা এরপর একে একে এলিয়েন গবেষণার প্রোপট, বিশ্বে এলিয়েন গবেষণার শুরু, বর্তমান অগ্রগতির কথা বলে গেলেন। এরপর তার নিজের এলিয়েন গবেষণার ইতিহাস তুলে ধরলেন। কিছুটা দ্রুতগতি আর অস্থিরভাবে প্রবন্ধ পাঠ করতে লাগলেন তিনি। এয়ারকন্ডিশনেড অডিটরিয়ামেও তার কপালে ঘাম জমতে লাগলো। কতক্ষণ পর পর টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে লাগলেন ড. কুসি। উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে যারা ড. কুসিকে ঘনিষ্ঠভাবে জানেন তাদের কাছে বিষয়টি খটকা লাগলো। তার মত ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের লোক আজ হঠাৎ এমন করছে কেন। কেউ কেউ ভাবলেন হয়তো কোন মানসিক দুশ্চিন্তায় আছেন।
এবার পড়া থামিয়ে এক গ্লাস পানি পান করেন ড. কুসি। কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে আবার প্রবন্ধ পাঠ শুরু করেন। এ পর্যায়ে তিনি প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তুতে চলে এসেছেন। একটির পর একটি লাইন পড়তে থাকেন ড. কুসি আর উপস্থিত লোকদের কপালে ভাঁজ পড়ে তার কথা শুনে। মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু হয় হল জুড়ে। কারো মুখে কোন কথা না থাকলেও চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সবাই অবাক হচ্ছে ড. কুসির বক্তব্য শুনে। যেন চরম অপ্রত্যাশিত কিছু শুনছে সবাই। মঞ্চে বসা বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা কানাকানি শুরু করে দিলেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টা বিশ মিনিট সময় নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ শেষ করেন ড. কুসি। প্রবন্ধের শেষ দিকের কথাগুলো ছিলো এরকম- ‘আপনারা জানেন আমি দীর্ঘ দশ বছর ধরে এলিয়েন বা মহাজাগতিক প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা করছি। এলিয়েনের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমি সব রকমের চেষ্টা চালিয়েছি। পাশাপাশি আমার সহযোগী অন্যান্য বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ নিখুঁতভাবে যাচাই বাছাই করেছি। সব কিছুর পরেই আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে আসলে এলিয়েন বলে কিছু নেই। এলিয়েন হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক প্রসূত কল্পনা মাত্র। এলিয়েনের অস্তিত্ব শুধুমাত্র গল্প-উপন্যাসেই রয়েছে, আসলে বাস্তবে এর কোন ভিত্তি নেই। তাই এলিয়েন নিয়ে গবেষণা করা শুধুই পণ্ডশ্রম। এ বিষয়ে গবেষণা করে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। তাই আমি আজ থেকে আমার এলিয়েন গবেষেণার সমাপ্তি ঘোষণা করছি। আমার অন্যান্য বিজ্ঞানী বন্ধুদেরও বলছি আপনারাও এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করুন।’
উপস্থিত সকলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরেছে।  বিশেষ করে মঞ্চে বসা দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা, তারা কিছুতেই ভাবতে পারেনি যে ড. কুসি এরকম একটি বক্তব্য  দেবেন। একজন তো উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেলেন। বাকি সবাই গম্ভীর হয়ে বসে আছে। কেউ কোন কথা বলছে না। দর্শকদের মধ্যে শুরু হল গুঞ্জন। এদিকে ড. কুসি বক্তব্য শেষ করেই বের হয়ে গেলেন অডিটোরিয়াম থেকে। তার পিছু পিছু ছুটলো সাংবাদিকরা। গাড়িতে ওঠার আগে ঘিরে ধরলো তাকে। গাড়ির খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ড. কুসি শুধু বললো- আমি যা বলার আমার প্রবন্ধে বলেছি, নতুন করে কিছু বলার নেই। বলেই উঠে পড়লো গাড়িতে।
‘ধন্যবাদ ড. এডমন্ড কুসি।’ পরিচিত সেই কন্ঠস্বরে তন্দ্রাভাব কেটে গেল ড. কুসির। নিজের স্টাডি রুমের রিভলবিং চেয়ারে আধশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে অস্থিরভাবে এদিক ওদিক তাকালেন তিনি। কন্ঠস্বর শুনেই বুঝতে পারছেন কে কথা বলছে। গত কয়েক দিনে তার সাথে অনেকবার কথা বলেছে এই কণ্ঠ।
‘কোথায়… কোথায় আপনি?’
‘আমি আপনার কাছেই আছি। আপনি চিন্তিত হবেন না। আমাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ বললো সেই কন্ঠস্বর।
‘আমার নাতনি জারা কোথায়?’ আবার প্রশ্ন করলেন ড. কুসি।
‘সে আমাদের দায়িত্বে আছে এবং ভালো আছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আর হ্যাঁ সে কিন্তু জানে না যে তার জীবনে এই কয়েকটা দিন কিভাবে কেটেছে। সে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।’
‘আমি তো আপনাদের কথামত কাজ করেছি।’ ড. কুসি আবার বললেন। ‘তাহলে ওকে আটকে রেখেছেন কেন? ছেড়ে দিন জারাকে।’
‘হ্যাঁ, আপনি আমাদের কথামত কাজ করেছেন; তবে আরেকটু কাজ বাকি আছে- আপনার ল্যাবরেটরি থেকে আপনার এলিয়েন গবেষণার সকল তথ্য প্রমাণ নষ্ট করে দিতে হবে। তারপরই আমরা আপনার নাতনিকে ছেড়ে দেব।’
‘আচ্ছা আপনারা এ কাজ কেন করছেন, কী লাভ এতে?’ ড. কুসি বললেন।
‘কারণটা আপনাকে আগেই বলেছি, আমরা চাই না পৃথিবীর মানুষ আমাদের পরিচয় জানুক। তাদের কাছে আমরা শুধু কল্পনার বিষয় হয়েই থাকবো।’ বললো সেই কণ্ঠ।
ড. কুসি বললেন, ‘কিন্তু আমার মুখ না হয় আপনারা বন্ধ করলেন, আর সব বিজ্ঞানীরা! তারা তো একদিন এলিয়েনের পরিচয় ঠিকই বের করে ফেলবে।’
‘সবার মুখই বন্ধ করা হবে। এভাবে না হলে অন্য পদ্ধতিতে। তারপরও পৃথিবীর মানুষকে কখনোই জানতে দেয়া হবে না এলিয়েন সম্পর্কে। যাই হোক আপনি আপনার পরবর্তী দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করুন। আপনার কাজ শেষ হলে আপনার নাতনিকে তার ঘরেই দেখতে পাবেন। বিদায় ড. কুসি, বিদায়।’

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply