Home উপন্যাস স্বপ্ন সাথীর হাত ধরে

স্বপ্ন সাথীর হাত ধরে

জুবাইদা গুলশান আরা….

আমাদের রাইয়ানের নামটা বেশ লম্বা চওড়া হলেও মানুষটা সে ছোট্টো একরত্তি। মাত্র সাত বছর বয়স হলো। পড়ে কাস টু অর্থাৎ স্ট্যান্ডার্ড টু’তে। কথা বলতে খুব ভালোবাসে। কলোনির বড় বাড়িতে থাকে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে পথ চলতে সবার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেয় সে।
আম-জামওয়ালা, ঝাড়–-ফেরিওয়ালা, এমনকি ট্রাফিক পুলিশকেও ডেকে ডেকে খবর নেয় সে।
আম্মা মাঝে মাঝে বলেন,- যাকে দেখিস তাকেই ভাই ভাই বলে ডাকতে শুরু করিস কেন বলতো? রাইয়ান বল খেলতে খেলতে বলে,
– দাদী বলেছেন, সবাইকে আপন বলে ডাকতে হয়। তাই না দাদী? দাদী একটু হকচকিয়ে যান বৈকি! আস্তে আস্তে বলেন হ্যাঁ, তা … সবার সঙ্গে ভাল করে কথা বলতে কোথা কী খারাপ?
– না, মা, সে তো ঠিক কথা। কিন্তু আপনার নাতি যে এখন মুরগিওয়ালা, কাঁঠালওয়ালা তাদের ডেকে বসে আছে! ওরা দরজায় দাঁড়িয়ে বলছে, ছোটো খোকা ডাক দিয়েছে। এখন কী করবেন করেন!
তো, মাঝে মধ্যেই এরকম মজার মজার কাণ্ড ঘটায় রাইয়ান।

আব্বুর অফিস যেদিন না থাকে সেদিন খুব মজা হয়। যদি বৃষ্টি আসে, আব্বুর সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা যায়। রবিনও একই সঙ্গে পড়ে। কাছেই থাকে।
দুইজনে কাগজ দিয়ে ঘুড়ি, নৌকা, অ্যারোপ্লেন বানায়। গোসলখানায় বাথটাবে নৌকা বানিয়ে ভাসিয়ে দেয়।

সেদিন সকালে আব্বুর সঙ্গে খোলা রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়ে রাইয়ান অবাক হয়ে গেল। সারা পথঘাট সুনসান। কেবল সকালে যারা হাঁটতে বেরোয় তারা হেঁটে যাচ্ছেন। ওপরে তাকিয়ে দেখে, শুধু সারি সারি বাড়ি আর বাড়ি। খুব আস্তে দু-একটা রিকশা অথবা গাড়ি চলে যাচ্ছে, ছেলের হাতটা মুঠোয় ধরে আব্বা বললেন, এই তোদের বিরাট ঢাকা শহর চিনতে পারিস? সত্যি সত্যি চেনা যায় না। ধুলো নেই, ভিড় নেই, গোলমাল নেই।
মোড়ের ওপরে মস্ত বড় ঝিরঝিরে পাতা দোলানো কৃষ্ণচূড়া গাছ যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসলো একটু।
– শহরের মানুষেরা সব কোথায় আব্বু? সরল কৌতূহলে জানতে চায় রাইয়ান।
– সবাই তো সারাদিন কাজ করে, দৌড়াদৌড়ি করে! এখন সবাই ঘুমোচ্ছে।
– ইস কী নিঝুম চারদিক। এক ঝাপটা বাতাস এসে রাইয়ানের চুলটা এলোমেলো করে দিয়ে গেল।
ছোটে ছোটো কেড্স স্যু পরা পায়ে আব্বুর পাশে পাশে হাঁটে রাইয়ান। খুব ভালো লাগে তার। দাদীর কথা মনে হয়। কিন্তু দাদী এখন কুরআন শরীফ পড়ছেন। আম্মাও উঠে টুকটাক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। রাইয়ান স্কুলে যাবে। আব্বু অফিসে যাবেন, কত কাজ!
আকাশ দিয়ে একটা অ্যারোপ্লেন ভেসে যাচ্ছে। রাইয়ান বলে,
– আব্বু, মানুষ প্লেন চালাতে শিখলো কেমন করে?
– ইচ্ছে হয়েছিলো পাখির মতো উড়বে। তারপর দুই ভাই উইলভার আর অলিভার রাইট, কত যে চেষ্টা আর সাধনা করে উড়তে চেষ্টা করেছিলো! সে সব কথা আর একটু বড় হলে বলবো। কেমন?
– রিকশাওয়ালা ভাই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে স্কুলে যায় আব্বু। খুশি মুখে বলে রাইয়ান।
– সে কী! ওকে না বারবার বলা হয়েছে, সাবধানে, আস্তে আস্তে নিয়ে যাবে তোকে? ওকে তাহলে বকা দিতে হবে দেখছি!
– না, না, আমাকে বলে কী ভাইয়া ওঠেন, ঠিক শক্ত হইয়া বসেন, দেখেন আপনারে আমি উড়াইয়া লইয়া যামু!
এবার দু’জনেই হাসে। বাবা বলেন- হুঁ বুঝেছি রিকশা নয়, ওটা পঙ্খিরাজ ঘোড়া। উড়ে চলে যায়। না রাইয়ান? হা, হা, হা…!
আকাশটা খানিকটা পরিষ্কার হয়ে আসছে এখন। রোদের আভাস ফুটে উঠছে। বাড়ি ফেরার পথে আব্বার হাত ধরে রাইয়ান জানতে চায় – আব্বু, তুমি যে বললে, ইচ্ছে করলে মানুষ সব পারে?
– হ্যাঁ পারেই তো। তাই কী হল?
– না, আমি যদি মেঘের দেশে মেঘের হাত ধরে আকাশে উড়তে চাই, তা হলে পারবো?
– মুশকিলে ফেললি তো! বড় কঠিন প্রশ্ন। মানুষ মেঘের দেশে যেতে চায় বলেই তো অ্যারোপ্লেন আবিষ্কার করেছে। তুই যদি পাইলট, মানে বৈমানিক হোস, তাহলেই আকাশে ভেসে ভেসে মেঘের সাথে যেতে পারবি। বুঝতে পেরেছিস?
– আর, যদি পাখি হতে চাই, তাহলে?
– তাহলে তাহলে, আচ্ছা ভেবে দেখবো তখন রাইয়ান সাহেব কী করবেন। ঠিক আছে? এখন চল বাসায় যাওয়া থাক।
বাসায় ফিরে হাসতে থাকেন রাইয়ানের আব্বা। দাদীকে আর আম্মাকে ডেকে বলেন,
– শুনছো, যে রকম খোলা আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন তোমার আদরের রাইয়ানের! আমার তো শুনে দারুণ ক্ষিধে পেয়ে গেল। দাও দাও তাড়াতাড়ি নাশতা দাও। মেঘের হাত ধরে মেঘের দেশে যাওয়ার জন্য, পাখিদের সঙ্গে ডানা মেলে আকাশে ওড়ার আয়োজন করতে হবে না?

রাইয়ানের স্কুল টাইম এগারোটা থেকে আড়াইটা। আব্বার অফিস থাকে, তাই পাড়ার কাছেই এক রিকশাওয়ালাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে রাইয়ানকে স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য। তো সকালবেলা বেড়িয়ে হোমটাস্ক করে, ঠিক সময়মতো রেডি হয়ে যায় রাইয়ান। সাদা শার্ট, নেভি ব্লু প্যান্ট, নীল সাদা কেডস জুতো, গলায় বো টাই লাগানো। পিঠে বইয়ের ব্যাগ। ছবি আঁকার সময়ে বাবার সাথে বেড়ানোর সময়ে যতো স্বপ্ন তৈরি করে মনে মনে, স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়েও সে সব স্বপ্ন ভোলে না রাইয়ান। ভাবে, একদিন মেঘের হাত ধরে সে বেড়াতে যাবেই।

সকালবেলায় ঝকঝকে রোদ্দুরে স্কুলে পৌঁছেছিলো রাইয়ান। বিকেলবেলা সেটা হলা না। বিকেল তিনটায় বেরিয়ে দেখে তাদের বাঁধা রিকশাওয়ালা মফিজ ঠিক এসে অপেক্ষা করছে। রোদ্দুরের ঝাঁঝালো গরম উধাও হয়ে গেছে। আর আকাশজুড়ে কালো মেঘ ভারী হয়ে আছে।
– আসছেন বাবু ভাই? আসেন ঠিক কইরা বসেন! রাইয়ানকে বসিয়ে দিলো মফিজ। প্লাস্টিকের পর্দাটাও একদিক থেকে বাড়িয়ে এনে তৈরি করে রাখলো। এ-পাশ ও-পাশ গুঁজে দিতে না দিতেই ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আষাঢ় মাস পড়েছে, বৃষ্টি তো হবেই। পাশাপাশি আরো কয়েকটা রিকশা ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেতে এসেছে। হাত নেড়ে দু-এক জনকে বিদায় জানালো রাইয়ান। মনে একটু অভিমান। আজই কি আম্মার বন্ধুকে দেখতে যেতে হল? রাইয়ানের বুঝি কষ্ট হয় না, ভয় করে না? ব্যাগটা কাঁধের থেকে নামিয়ে হাঁটুর ওপরে দিয়ে দিয়েছে মফিজ। খুব সাবধানে এবার রিকশা চালিয়ে নিলো। বাড়ি খুব দূরে নয় রাইয়ানদের। মতিঝিল সরকারি অফিসার্স কলোনির বাসায় থাকে ওরা। কিন্তু যেভাবে বৃষ্টি ওদের ঝেঁপে ধরলো, মনে হল খুব সহজে বাসায় পৌঁছানো যাবে না।
– ভাইয়া ডরাইয়েন না, এইতে আইসা পড়ছি।’ মুখ ফিরিয়ে রাইয়ানকে সাহস দিলো রিকশাওয়ালা।
আসলে বৃষ্টি ক্রমেই বাড়ছে। শিশু নিকেতন স্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, আইডিয়াল স্কুল, সব কাছাকাছি হওয়ায় ছুটির সময় এলাকায় বড্ড ভিড় আর যানজট হয়ে যায়। ট্রাফিক পুলিশ একটা ওয়াটার প্রুফ রেইনকোট গায়ে দিয়েছে। মাথায় টুপি। তবুও তার মাথা ভিজে যাচ্ছে। থেকে থেকে রিকশার ওপরে এসে হাতের লাঠিটা ঠুকছে ট্রাফিক ভাই। এই সরাও, সরাও … এই ঠেলাগাড়ি … ঐদিকে যাও… ছটফটে পায়ে হন্তদন্ত হয়ে এদিকে ওদিকে ছুটছে ট্রাফিক পুলিশ। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভারী বৃষ্টিতে চারপাশটা ধোঁয়াটে, আবছা দেখাচ্ছে। রাস্তাঘাট সব যেন অচেনা হয়ে গেছে। রিকশাওয়ালা ঝমঝমানো বৃষ্টিতে মাথায় গামছা খুলে চিপে আবার বেঁধে নিলো। বৃষ্টি তাতে আটকাচ্ছে না। আচম্কা গুম গুম করে মেঘ ডেকে উঠলো।
নিজের কথা ভুলে রাইয়ান ফুলের মতো মুখটা বাড়িয়ে বাইরে তাকলো। ভয় করার মতো বৃষ্টির জোর ঝাপটায় রিকশাটা দুলছে এপাশ ওপাশে। রাস্তার মাঝখানে স্পিড ব্রেকারের বেড়ায় রিকশা ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু গোটা রাস্তাটা জুড়ে গাড়ি, রিকশা, ভ্যানগাড়ির ঠাসাঠাসি ভিড়ে বেরোবার পথ পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে পানি জমে রাস্তাটা হয়ে উঠেছে নদীর মতো। বিরাট এক পানির চাদরে সব কিছু ঢেকে গেছে। পানির মধ্যে রিকশার চাকা একটুখানি মাত্র বাইরে। মাথার ওপরে নামছে অন্ধকার। কে বলবে এখন মাত্র বিকেল চারটা বাজে। মনে হচ্ছে কোনো এক অচিনপুরে আটকা পড়ে গেছে সবাই। রিকশাওয়ালার ব্রেক ধরা হাতের আঙুলের গাঁটগুলো ঠাণ্ডায় সাদা হয়ে গেছে। কষ্ট করে পানি ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে রিকশাটা। শেষ অবধি একসময় সাত সাগর পাড়ি দিয়ে বাসার গেটে পৌঁছানো গেল।
– না না, নাইমো না ভাইজান, আমি আইতাছি। পর্দা সরিয়ে বইয়ের ব্যাগটা নামিয়ে বারান্দায় রেখে এসে জোরসে বেল বাজিয়ে জানান দিলো মফিজ।
তারপর সাবধানে রাইয়ানকে পর্দা তুলে দুই হাতে উঁচু করে ধরে বের করে এনে সিঁড়ির ওপরে দাঁড় করিয়ে দিলো মফিজ। দরজা খুলে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসেন রাইয়ানের আম্মা আর দাদী। ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অবাক হয়ে বলেন,
– কই খুব ভিজিসনি তো? ভেজা বাতাসে গায়ের পাশে একটু একটু ভেজা হাতে তোয়ালে ছোঁয়ালেন দাদী। রাইয়ান খুশি মুখে বললো, না আম্মা রিকশাওয়ালা ভাই আমাকে খুব সাবধানে নিয়ে এসেছে।
– সত্যি। বড় ভালো লোক। আমরা তো ভয়ে মরি, কোথায় আটকা পড়ে গেলি তোরা। দাঁড়া তোর আব্বা ফোন ধরে আছে, জানিয়ে দিই।
দাদী বুয়ার হাতে একটা শুকনো কাপড় দিয়ে বলেন, পুরো বৃষ্টিটা ওর ওপর দিয়ে গেছে। ওকে বল গা-মাথা মুছে নিক। এক পেয়ালা চা দিতে হয়। অনেক কষ্ট করেছে বেচারা! রিকশা নিয়ে বেরোনোর সময় মফিজের হাতে একটা একশ টাকার নোট দিলেন দাদী। বললেন,
-বাড়ি গিয়ে হাতে-পায়ে সরষের তেল মেখে নিও। জ্বর টর না হলে বাঁচি।
– জে না দাদী! আমাগো এত সহজে জ্বর হয় না। আইচ্ছা আসি, সেলামালেকুম আম্মা।

রাইয়ানের চাচাতো ভাইবোনেরা এলে বাড়ি হুল্লোড়ে ভরে ওঠে। সারা ঘরে ছড়ানো খেলনা, অ্যারোপ্লেন, গাড়ি। অল্প ক’দিন হল আব্বা তাকে এনে দিয়েছে মজার টেলিফোন সেট, যার অন্য নাম কম্পিউটার টেলিফোন। এক একটা চাবি টিপলে এক একটা কাণ্ড ঘটে। গান, কবিতা, অঙ্কের সংখ্যা, সেই সঙ্গে হুড় হুড় করে যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ শুরু হয়ে অবাক করে দেয়। কী নয়? রাইয়ানও তার টেলিফোনকে দারুণ ভালোবাসে। সে মনে মনে ঠিক করেছে বড় হয়ে এই রকম মজার কম্পিউটার খেলনা বানাবে।
– অর্থাৎ, তোর ইচ্ছে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। এই তো? দেখেছেন আম্মা, আপনার নাতি এখন থেকেই বড় হয়ে কী হবে তা ঠিক করতে শুরু করেছে।
– যুগটাই যে এরকম দৌড়ে দৌড়ে চলেছে বৌমা! ওদের আর দোষ কী? ছোটবেলা থেকেই কেউ বা পাইলট হবে, কেউ বা ডাক্তার, কেউ বা পণ্ডিত, সব কিছু প্লান করে রাখে।
সত্যি বলতে কী, রাইয়ানও বাবার সঙ্গে বসে কম্পিউটার টুকটাক চালায়। ভালো করে না জানলেও সার্চ করে বের করা শিখেছে। তার আব্বা নিজে ইঞ্জিনিয়ার, কাজেই ছেলেকে একটানা মেশিন নিজে খেলা করতে দেন না। বলেন,
এমনিতেই ওরা বাইরে বের হয়ে খেলধুলা করতে পারে না। মেশিন নিয়ে বসে থাকতে থাকতে ভুলেই যাবে যে আসল আনন্দ মেশিনে নয়, বিরাট দুনিয়ার খোলামেলা আয়োজনে।
ছেলের সঙ্গে সুযোগ পেলেই ঘরের মধ্যে বল নিয়ে লোফালুফি আর পিং পং বল নিয়ে খেলা জুড়ে দেয় রাইয়ানের আব্বা। দু-একটি গ্লাস বাটিও ভাঙে খেলতে খেলতে, তবে তাতে আনন্দের কমতি পড়ে না। আব্বু হেসে বলেন,
– কী করবো বল? বাইরে খোলামেলা খেলার জায়গা কম,  ওদিকে আমাদেরও কাজের চাপে সময় কম। কাজেই ঘরের ভেতরেই খেলার মজাটা জোগাড় করে নিই।

রাইয়ানদের বন্ধুরা মাঝে মধ্যে একে অন্যের বাড়ি অথবা শিশুপার্কেও যায় বেড়াতে। কিন্তু সারা বছর কাস টেস্ট, হোম ওয়ার্ক লেগেই আছে। রাইয়ানের আম্মা আর রনির আম্মা মাঝে মধ্যে ওদের ছবি আকার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যান। স্বাধীনতার যুদ্ধ কেমন করে হয়েছিল সেসব কাহিনীও ছোটরা জানে। তবু ওদের সব কিছুই আটোসাঁটো অবস্থা।
একুশের মেলায় কেনা অঢেল বই দিয়ে ওদের আম্মারা গড়ে দিয়েছেন বইয়ের রাজ্য। এরই মধ্যে কাসের লেখায় ছোটোদের মনের কথা কত কিছু যে বেরিয়ে আসে, তা দেখে বড়োরা অবাক না হয়ে পারেন না। এত কিছু দেখা আর শেখানোর পরে, রাইয়ান তার ছোটো হাতে লেখার খাতায় লিখেছে, আমি বড় হয়ে রিকশা চালাতে শিখতে চাই।
সবাইকে নিয়ে বিরাট শহরে ঘুরে ঘুরে বেড়াবো। ছোটোদের বৃষ্টিতে কষ্ট হতে দেবো না, ঠিক আমার রিকশাওয়ালা মফিজ ভাইয়ের মতো যেমন, আমার একটুও কষ্ট হয় না। কাস টিচার তো খুব অবাক। এই মাত্র কয়েকদিন আগে যে ছেলে কম্পিউটার টেকনোলজি শিখবে, বাবার মতো ইঞ্জিনিয়ার হবে বলে ঠিক করেছিলো, সে হঠাৎ রিকশা চালাতে আগ্রহী হয়ে উঠলো কেন?
টিচারের সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টা হালকা করে দিলেন রাইয়ানের আব্বা। কয়েকদিন আগের বৃষ্টির দিনের ঘটনা বর্ণনা করে বললেন,
– আসলে ঐ রকম একটা বিপদের মধ্যে তুমুল বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া শহরে যানজট সামলে ছোট্টো শিশুকে একটুও কষ্ট না দিয়ে, একটুও ভিজতে না দিয়ে, আমাদের রিকশাওয়ালা তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। একটুও বিরক্ত হয়নি। মানুষ হিসেবে তার এ ব্যবহার দেখে আমরা তাকে প্রশংসা করেছি, বকশিসও দিয়েছি। কিন্তু সে বকশিসের জন্য কাজটা করেনি, করেছে স্নেহ-মমতার জন্য। এটা হয়তো রাইয়ানের কচি মনে দারুণ ছাপ ফেলেছে। বড় হয়ে রাইয়ান হয়তো আর এমন কথা ভাববে না। কিন্তু আজকে তার ছোট্টো মন একজন ভাল মানুষকে সম্মান দিয়েছে ম্যাডাম, এতে আমি খুব খুশি।
তো, ভেবে দেখলে বোঝা যায়, ছোটদের মনের মধ্যে কত আজব ভাবনা যে জাগে, তা বলার নয়। মাত্র সাত বছর বয়স হলে কী হবে, রাইয়ানের মাথায় সারাক্ষণ কত যে নতুন আইডিয়া গিজগিজ করছে, তার লেখাজোখা নেই। তাদের বাসার সামনে মাটির মধ্যে মস্ত মস্ত বাঁশ লাগিয়ে কলোনির মানুষেরা কাপড় শুকানোর দড়ি লাগিয়েছে। রাইয়ান আর রবিনের মনে হল, টারজানের মতো এপার ওপার যাবার চেষ্টা করলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। দু’জনে বল খেলা ফেলে রেখে বাঁশের কাছে গিয়ে হাজির। দড়িটা মোটা আর টান টান করে বাঁধা। খুব মজবুত। মোড়া নিয়ে তার ওপরে দাঁড়ায় রবিন। রাইয়ান পাশেই দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করতে তৈরি ।===
মাথার ওপরে দড়িটা দু’হাতে শক্ত করে ধরে ঝুল খেলো রবিন। ঝুলতে ঝুলতে ওপাশে পৌঁছে খুশিতে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। আমি টারজান। টারজান। … রাইয়ান ত্ইু এবার দড়িতে লাফিয়ে ওঠ। হ্যাঁ … হ্যাঁ শক্ত করে ধর। এবার চলে আয়। হু..উ…স…! সব ঠিকঠাকই চলছিলো। কিন্তু বেরসিক দড়িটা এমন কাণ্ড করবে, তা ওরা বুঝতে পারেনি। মড় মড় শব্দ করে বাঁশ আর দড়ি একসঙ্গেই ভেঙে পড়লো। সেই সঙ্গে ধপাস করে পড়লো দুই বন্ধু। ভাগ্যিস নিচে ঘাস জমি রয়েছে, তাই আছড়ে পড়েই গড়াগড়ি খেয়ে উঠলো। না, খুব চোট লাগেনি বটে, তবে শব্দ পেয়ে আশপাশ গাছ থেকে কাকেরা ভীষণ চেঁচামেচি জুড়ে দিলো। দাদী, আম্মা গেট থেকে দারোয়ান ভাই, … সবাই ছুটে এলো। ভয়ে আঁতকে উঠলেন বড়োরা। দু’জনকে টেনে তুললেন। ওপরের জানালা থেকে নিচে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন প্রতিবেশীরা। চোখের পানি মুছতে মুছতে দাদীর হাত ধরে বাড়িতে ঢুকে পড়লো দুই বন্ধু। আম্মা আর কিছু বললেন না। এমনিতেই লজ্জায় আর দুঃখে মুষড়ে পড়েছে ছেলেরা। বকা ঝকা দিয়ে আর কী হবে। দড়িটা তো মোটাই ছিলো কিন্তু বাঁশের খুঁটি দুটো দু’জনের ভার নিতে পারেনি। সে তো আর ছোটোদের দোষ নয়। আদর করে বসিয়ে গরম হরলিকস আর হালুয়া খাইয়ে রবিনকে বাসায় পৌঁছাতে পাঠালেন রাইয়ানের আম্মা। ওদের বাসা এই কম্পাউন্ডের মধ্যে একটু দূরে। ফোনে রবিনের মাকে সব জানিয়ে রাইয়ানের আম্মা বললেন,
– কিছু বলবেন না আপা। ওদের এমনিতেই মন খারাপ। তেমন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারপর দুই আম্মাই টেলিফোনে একসঙ্গে হেসে উঠলেন।

স্কুলে রিডিং পড়া আর হাতের লেখার কাসটা সবাই ভালোবাসে। টিচার সৌরভ স্যার হাত উঁচিয়ে বলেন, হ্যাঁ এবার একসঙ্গে বলো, আই লাভ বাংলাদেশ। আই লাভ মাই মাদার, আই লাভ মাই ফাদার, আই লাভ মাই কান্ট্রি…
টিচার টিচারই আই লাভ মাই দাদি। বলবো না স্যার?
– হ্যাঁ, অবশ্যই বলবে। দাদির কথা ভুললে চলবে না। তবে এখন বই-খাতা ব্যাগে ভরে নাও। আমরা সব ফুটবল খেলা শিখতে যাচ্ছি।
– হুররে…! আনন্দে চিৎকার করতে করতে মাঠে দৌড়ালো রায়ইয়ান আর রবিনরা।

ছুটির দিনে মাঝে মাঝে রাইয়ানদের স্কুলে খেলার উৎসব জমে ওঠে। বড় কাসের ছেলেরা খেলা প্র্যাকটিস করে আর ছোটোরাও তাতে দৌড়াদৌড়ি করে অংশ নেয়। একদিন ঘটে গেল একটা অদ্ভুত ঘটনা। সে দিনও  স্কুলের মাঠে প্রতিযোগিতা ছিলো। সাধারণত আব্বা সময় পান না বলে রাইয়ান খুব বেশিক্ষণ খেলায় মেতে থাকতে পারে না। আব্বা এলেই চলে যেতে হয়। কিন্তু সেদিন ঘটলো উল্টোটা। খেলার মাঠে   ছোটাছুটির ফাঁকে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল রাইয়ান।
এক সময় দেখলো একটা লোক অনেকগুলো কবুতর নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কী সুন্দর কবুতরগুলো! গলা ফুলিয়ে ডাকছে আর ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখছে। উজ্জ্বল চোখগুলো যেন হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। রাইয়ানের হঠাৎ কী হলো! রাইয়ান হাঁটতে শুরু করলো পাখিওয়ালার  পেছনে পেছনে। পাখিওয়ালার সঙ্গে সঙ্গে এক মনে পাখিগুলো দেখতে দেখতে চলেছে রাইয়ান। এক সঙ্গে চলতে চলতে বড় রাস্তা ছেড়ে গলির পথ ধরলো লোকটা। রাইয়ানও কী এক অবাক করা ঘোরে চলেছে। দুপুরের রোদ্দুর যখন গনগনে হয়ে উঠলো তখন লোকটা রাস্তার পাশে বসলো। কোমরের গামছা খুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে সে। রাইয়ান মুখে আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে বললো,
– আমাকে একটা পাখি দেবেন?
– পাখি? মানে কবুতর? দিমুনা কেন? ট্যাকা দিলেই দিমু। ট্যাকা আছে?
রাইয়ান মাথা নাড়লো।
-পাখি দিয়ে কী করবেন?
কেন পুষবো! আবদার করলো রাইয়ান। এতক্ষণে তার খেয়াল হয় যে, তার কাছে তো পয়সা নেই।
– তয় ক্যামনে তোমারে পাখি দিমু বাবা? যান আম্মার কাছ থন পয়সা আনেন গিয়ে, বাসা কোন হানে?
বাসা? বাসার কথা মনে পড়তেই বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠলো রাইয়ানের। ঐ তো, রাস্তাটা পার হয়ে দাঁড়ালেই রবিনকে খেলতে দেখবে। এক ছুটে স্কুলে ঢুকে রবিনকে বলবে তোর কাছে দশ টাকা আছে? ঐ দ্যাখ কী সুন্দর কবুতর, কিন্তু পেছনে ফিরে পরিচিত স্কুলের গেটটা তো দেখতে পাচ্ছে না রাইয়ান? তবে কি স্কুল থেকে দূরে চলে এসেছে? রাইয়ানের থমকে যাওয়া দেখে পাখিওয়ালা বললো, বাবু তুমি তো আমার পিছে পিছে হাঁটতাছো। অনেক সময় লাগত! আমি মনে করছি  তোমার বাড়ি বুঝি এই হানে। তাই আইতাছো। যাও, যাও ভাইডি, বাড়িতে ফিইরা যাও। নাইলে স্কুলে যাও। লোকটা উঠে তার পাখি নিয়ে চলতে শুরু করলো। রাইয়ান কী করবে এখন? মাথার ওপরে গনগনে রোদ্দুর। পাখিওয়ালার  পেছনে পেছনে কত রাস্তা হেঁটেছে সে? এসব রাস্তা তো সে চেনেও না। খালি অবাক চোখে দেখতে দেখতে হাঁটতে হাঁটতে… কোথায় এসেছে রাইয়ান? কবুতরের বাক বাকুম শব্দ তো শোনাও যাচ্ছে না। খুব তেষ্টা পেয়েছে রাইয়ানের। সামনে একটা বড় সড় গলি। সেদিকে যেয়ে মুখ বাড়ায় রাইয়ান। এই রাস্তা ধরে গেলে ঠিক স্কুলের রাস্তাটা খুঁজে পাবে রাইয়ান। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে এতক্ষণে। কানের মধ্যে কেমন ভোঁ ভোঁ করছে। একটা ছোটো ছেলেকে ওভাবে এলোমেলো হাঁটতে দেখে দু-একজন অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। সত্যিই তো সব কিছুই অচেনা তার কাছে। কিন্তু অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে আম্মু নিষেধ করেছে। গলিটার দু’ পাশে বিরাট বিরাট বাড়ি। সামনে একটা খাবার দোকান। একটা লোক মোবাইলে কথা বলতে বলতে তাকে দেখলো। লোকটাকে কি বলবে রাইয়ান, ‘আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি, আমাকে একটু পানি দেবেন?’ রাইয়ান আম্মুর মোবাইল নম্বরটা ভাবতে চেষ্টা করলো। জিরো ওয়ান এইট ওয়ান… না; পরের সংখ্যাগুলো মনে পড়ছে না যে! হঠাৎ ভীষণ কান্না পায় তার। আব্বা বলেছিলো, পথ হারালে বা ভয় পেলে ট্রাফিক পুলিশকে গিয়ে বললে তিনি তোমাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু এখানে তো ট্রাফিক পুলিশ নেই। শুধু বাড়ি আর বড় বড় রাস্তা দিযে হুঁস হুঁস করে গাড়ি ঘোড়া চলে যাচ্ছে। ধা ধা করা দুপুরে রাস্তায় ভিড়ও কমে এসেছে। ও দিকে রাইয়ান রোদ্রের দিকে তাকাতে পারছে না। চোখের সামনে কেমন যেন ঝিলমিল করছে কুয়াশার মতো। রাইয়ান লম্বা সিঁড়িটার নিচে দাঁড় করানো এক ভ্যানগাড়ির ছায়ায় আস্তে আস্তে শুয়ে পড়লো। তখনও সূর্যটা আগুন গরম রোদ্দুর ছুড়েই যাচ্ছে।

রাইয়ানকে নিয়ে সারা স্কুল, পরিচিত বাসা, বন্ধু-বান্ধবদের সবাই পাগলপাড়া হয়ে গেল। ছেলে ধরারা কিডন্যাপ করেছে?
– ওতো তোমার সঙ্গেই ছিলো রবিন! তুমি দেখনি ও কোথায় গেল? কার সাথে গেল?
– না আন্টি, আমরা সবাই খেলছিলাম। রিকশাওয়ালা ভাই এসে খোঁজ করতে তখন ওকে ডাকতে গিয়ে দেখি, ও কোথাও নেই।’ রবিন কাঁদতে শুরু করলো।
এলাকায় মাইকিং শুরু হল- ছেলে হারাইয়াছে… বয়স সাত বছর, নাম রাইয়ান, মতিঝিল লিটল স্কলারস স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র… পরনে সাদা শার্ট… পুলিশ পেট্রোল বাহিনীকে জানানো হল। তারাও ওয়াকি টকিতে এ খবর ছড়িয়ে দিলেন। রাউন্ডে বেরিয়ে রাইয়ানকে খুঁজতে লাগলেন তারা। রাইয়ানের আব্বা আর এক চাচা বেরোলেন গাড়ি নিয়ে …
– ছেলেটার কাছে মোবাইল থাকলে হদিস করা যেতো।
– আমরা ছোটো মানুষের হাতে মোবাইল ইচ্ছে করেই দিইনি। ওতো কখনও কোথাও না বলে যায় না! এখন কেউ যদি ধরে নিয়ে যায় তাহলে যে কী হবে? কেঁদে ফেললেন রাইয়ানের বাবা।

বিকেলবেলা ঘনিয়ে আসছে। ছুটির দিন বলে বেশি দোকানপাটের দরজা খোলেনি। খাবার দোকানের সামনে সিঁড়ির উঁচু উঁচু ধাপগুলোর একটায় কুঁকড়ে মুকড়ে শুয়ে থাকা ছোটো ছেলেটির দিকে কারো তেমন খেয়ালও হয়নি। এমনি সময় চোখে পড়লো। দুপুরের পর থেকে বাসায় গিয়ে খবর দিয়েছিলো মফিজÑ আমি রিকশা লইয়া গেছিলাম। কিন্তু দেহি কতক পোলাপান খেলতাছে। কিন্তু আমাগো রাইয়ান ভাইয়ারে কোনো হানে পাই নাই! হাতের তালুতে চোখ মুছতে থাকে মফিজ। তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে ওঠেন রাইয়ানের আম্মা। কী বলছো তুমি? পাওনি মানে?
ব্যাপার হল, ছুটির দিনে বাবার হোন্ডায় চড়েই যায় রাইয়ান। মফিজকে তো আজ বলাও হয়নি ওকে আনতে। তাহলে ও স্কুলে গেল কেন? তবে কি রাইয়ানকে বাসায় পৌঁছানোর নাম করে ও তাকে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে? যে সব লোক ভালো ভালো বাচ্চাকে কিডন্যাপ করে, তাদের সঙ্গে বুদ্ধি করে মফিজই ওকে ধরিয়ে দিয়েছে। রাইয়ান তো মফিজ ভাই বলতে অজ্ঞান। মফিজের সঙ্গে রিকশায় বসতে কোনো অনিচ্ছা হবে না তার।
এসব খারাপ চিন্তাকে দূর করে দিলেও পুরোপুরি সন্দেহ যাচ্ছে না তো। কিন্তু না জেনে শুনে একটা লোকের নামে এসব ভাবাও তো অন্যায়। ওদিকে চারদিকে তাকে খোঁজা হচ্ছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে। তোলপাড় কাণ্ড চলছে। রাইয়ানের আম্মা বিছানায় পড়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অস্থির। অন্য ছেলেদের অভিভাবকরাও অনেকে এদিক ওদিক খোঁজখবর নিচ্ছেন।

মফিজের বুক ফেটে কান্না আসছিলো, কয়েক বছর আগে গ্রামে পুকুরে ডুবে তার পাঁচ বছরের ছেলেটি মারা যায়। সেই শোকে গ্রাম ছাড়ে মফিজ। সঙ্গে তার বউ আর ছোটো মেয়েটা। ঢাকায় তারা মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে রাইয়ানকে আনা-নেয়ার কাজটা সে খুব যতœ করেই করে। হঠাৎ করে কী ঘটনা ঘটে গেল এমন করে? রিকশা নিয়ে গলি গলি খুঁজে বেড়াচ্ছে মফিজ। বাসায় গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বাইরে বসে ছিলো অনেকক্ষণ। চোখ দিয়ে পানি পড়ে ভেসে যাচ্ছিলো। শুধু মনে হচ্ছিলো তাকে আজ রাইয়ানের আম্মা স্কুলে যেতে বলেননি! কারণ আজ তার আব্বা অফিসের মিটিংয়ে যাওয়ার সময় ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। মিটিং শেষ হলে ফেরার সময় বাসায় নিয়ে যাবে। কিন্তু মফিজ মাঝে মধ্যে ফাঁকা থাকলে স্কুলটা ঘুরে যায়। কখনও বা ছায়াভরা বড় সেগুন গাছটার নিচে রিকশা রেখে ছেলেদের খেলা দেখে আর ঝিমোয়। আজও বেলা একটায় স্কুলের সামনে দিয়ে যেতে যেতে একটু দাঁড়িয়ে ছিলো সে। দু’বার বেলও দিয়েছিলো। কিন্তু রাইয়ান দৌড়ে আসেনি, বলেনি,
– মফিজ ভাই, আমি আব্বু এলে তার সঙ্গে যাবো। তুমি চলে যাও।
পরে আবার ফেরার পথে যখন খোঁজ করলো তখন দারোয়ান বললো, সে তো অনেকক্ষণ ধরেই রাইয়ানকে খেলতে দেখেনি। তাহলে বোধ হয় চলে গেছে। রাইয়ানদের বাসার সামনে একটু দাঁড়িয়ে তাকে দেখে যাওয়ার জন্য যেতেই তার আব্বা আম্মা দৌড়ে এসে জানতে চান রাইয়ান কোথায়?
– হে কথা তো আমি জানি না স্যার! আইজতো আমারে আনতে কন নাই! আমি এমনে যাইতে যাইতে স্কুলের পোলাপানগো খেলা দেখতে খাড়াইছিলাম। রাইয়ান ভাইরে না দেইখ্যা জিগাইলাম, রাইয়ান ভাই কোথায়? দাড়োয়ান কইলো,
– কী বলছো তুমি মফিজ? কথাটা শেষ করার আগেই চিৎকার করে ওঠেন রাইয়ানের আম্মা। কাঁদতে শুরু করেন তিনি, রাইয়ানের দাদী বলেন,
– ওর আব্বার ওকে আনার কথা। অফিসের মিটিং শেষে গিয়ে দেখে রাইয়ান কোথাও নেই। আমরা ভেবেছি তুমি ওকে নিয়ে আসছো।
– জেনা আম্মা … আমার তো তারে আইজ আননের কথা আছিলো না! আমি এমনেই ভাইয়ারে দেখতে গেছি, যদি দরকার হয়।
– বিনা কারণে তুমি স্কুলে   দেখতেই বা গেলে কেন? হঠাৎ রাইয়ানের আব্বা কঠোর গলায় বলে ওঠেন। তার কথা শুনে চমকে ওঠে সবাই। তবে কি রাইয়ানের আব্বা খারাপ কিছু ভাবছেন তার সম্বন্ধে? সে আর্ত স্বরে বলে, আমি শুধু দেখতে গেছিলাম স্যার! মাঝে মাঝে খেলাধুলা দ্যাখতে ভালো লাগে…
চোখ মুছে মফিজ তাকায়। কান্নায় ভেজা গলায় বলে, আমি যাইতাছি স্যার, আমি খুঁইজ্যা আনুম ভাইয়াকে… ধড়ফড় করে উঠে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। ঢাকা শহরের সব রাস্তা, সব গলি সব চোর ছ্যঁচড়ের আস্তানা খুঁজবে মফিজ। পান্থপথ, ফকিরাপুল, মতিঝিলের বড় বড় বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে অজগরের মতো বিরাট রাস্তা যার কোনো কূল কিনারা নেই, সব, সব খুঁজে দেখবে। রোদের তাপ, ভিড় ক্রমে বাড়ছে। এই মানুষের ভিড়ের দিকে এর আগে কখনও এমন করে দেখেনি মফিজ। হাজার হাজার ভাবনা মাথায় নিয়ে চলতে চলতে এক সময় মনে  হল তার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। মনে পড়লো রিকশা নিয়ে বেরোনোর সময় একটা বনরুটি চিবিয়ে পানি মুখে দিয়ে বেরিয়েছিলো। তারপর সারাটা দিন চক্কর দিচ্ছে সারা শহরে। ক’টা বাজে এখন?
– ফিইরা যাই। কিন্তু কী মুখ লইয়া যামু? রাইয়ান বাবুরে যদি কেউ ভুলাইয়া লইয়া গিয়া থাকে, হ্যাগো কোনোহানে আমি পোড়া কপাইল্যা মফিজ খুঁইজা পামু? মাইনষে অহন খুব মন্দ হইয়া গেছে। শিশুবাচ্চাগো ধইরা লইয়া যায়। তার চাইয়া পুলিশের কাছে যাইয়া কই, হাতে পায়ে ধরি গিয়া। কিন্তু পুলিশ? পুলিশ যদি আমারেই সন্দেহ করে? হাজতে পাঠায়? ওরে বাবা, আগে রাইয়ান ভাইয়াগো বাসায় যাই। এতক্ষণে পুলিশতো তারে খুঁইজা পাইতেও পারে। ভাবতে ভাবতে রিকশা ঘোরায় মফিজ। সামনে একটা বড় খাওয়ার দোকান, তার মনে হয় একটু পানি খাওয়া দরকার। এগিয়ে যায় রিকশা নিয়ে। একটা ছেলে মানুষ কর্মচারী সিঁড়ির নিচে উবু হয়ে কী যেন ঠেলছে। বলছে, উডেন উডেন না! এই ছ্যামড়া … আচমকা মফিজ থমকে দাঁড়িয়ে যায়। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। সিঁড়ির গায়ে লাগনো ভ্যানগাড়ির নিচে কাকে ঠেলছে ছেলেটা? আরে! আরে!
– এই! এই ওই রহম ঠ্যালবা না ওই ছ্যামড়া আ, আ গুঙরে উঠলো মফিজ। চিলের মতো দৌড়ে গেল সে দিকে- আরে! রাইয়ান ভাইজান… ভাইজান সারা গায়ে জ্বরের তাপ শরীরটা কাঁপছে থর থর করে। তাকে সাপটে বুকে জড়িয়ে ধরলো মফিজ। গালের সঙ্গে গাল ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে বললো, – ভাইজান কার লগে, কেমন এই পান্থপথে আইলা ভাইয়া.. থাউক যা এই ভাই আমার লগে একটুক ধইরা লইবেন বাচ্চাডারে?
দোকানের মালিক বেরিয়ে এসে বললেন, এ ছেলে তো সেই বারোটা-একটার দিক থেকে এখানে শুয়ে আছে। ভাবছি, এক সময় উইঠ্যা বাড়িত যাইবো গিয়া। বুঝি নাই যে… যাকগে, ওই কালাম তুই একটু সঙ্গে যা। পোলাটা তো বেহুঁশের মতন। একা রিকশাওয়ালা নিতে পারবো না। যাইবেন কই?
– মতিঝিল কোয়ার্টার গলি আছে না?
– হ, ঐ কালাম যা বাবা, একটু সাহায্য কর।
রিকশার নাম্বার, ঠিকানা, মফিজের পরিচয় সব লিখে নিলেন দোকানের মালিক। ফোন মফিজ জানে না। নিজের নম্বর দিয়ে বললেন, ছেলেটাকে পৌঁছাইয়া আমারে জানাইবেন।’ কালাম সিটে বসে ঘাড়ে হেলান দিয়ে আধাশোয়া করে ধরে নিলো রাইয়ানকে। খুব সাবধানে রিকশা চালাতে চালাতে বারবার ফিরে রাইয়ানকে দেখতে লাগলো মফিজ- ভাইয়া কোন ভয় নাই আমরা অহনই পৌঁছাইয়া যামু। আল্লাহই বাঁচাইছে না? আর ডর নাই!

ছেলেকে কোলে নিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকেন রাইয়ানের মা।
একটু আগে থানা থেকে দু’জন পুলিশ অফিসার এসেছেন। তারা কথা বলছেন মফিজের সঙ্গে, কালামের সঙ্গে। কালামের মালিকের দোকানে ফোনের সাহায্যে। মফিজ বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছে। মিথ্যা সন্দেহের কারণে এরা কি সত্যিই তাকেই দায়ী করবে? যেভাবে জেরা করছে, তাতে তার এতক্ষণে ঘোর কেটে গিয়ে ভয় করছে। ঘণ্টা ভর জেরার পর পুলিশ অফিসার বললেন,

ছেলের শরীর ভালো হলে আসল ব্যাপারটা বোঝা যাবে। কেউ কি ওকে কিছু খাইয়ে পথ ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো? অথবা …দেখা যাক! আপাতত বাচ্চাটাকে সুস্থ করে তোলাই আসল কথা।

রাত বারোটার দিকে তন্দ্রার ভাবটা কেটে গেলে রাইয়ানের। সন্ধ্যা থেকে কয়েকবারই উঠে বসার চেষ্টা করেছে রাইয়ান। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে জানতে চেয়েছে আম্মু কবুতর ওয়ালাকই?
– কোন কবুতরওয়ালা বাবা? কে তোকে নিয়ে গিয়েছিলল? বল আম্মাকে। আব্বুকে বলো বাবা। আব্বা মাথায় হাত রেখে চোখ মুছে বললেন, এখন কেমন লাগছে বাবা? ঘুম ছাড়েনি?
দাদী মাথার কাছে সারাটা সময় বসে ঠাণ্ডা তোয়ালে দিয়ে ঘাড়, কপাল লাল গাল আর চোখের পাতা মুছে দিচ্ছিলেন। ডাক্তার এসে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে গেছেন। বলে গেছেন, অতিরিক্ত গরম, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া আর কান্তির ফলে এরকম হয়েছে। এখনও চোখ ভালো করে খুলতে পারছে না রাইয়ান। তবু এতক্ষণে সে ভাঙা ভাঙা গলায় দুটো একটা কথা বলছে। ঘুম ঘুম চোখে রাইয়ান দেখতে থাকে, কবুতরওয়ালা তাকে বলেছিলো, সে থাকে নদীর হেই পারে। বলেছিলো মায়ের কাছে থেকে পয়সা আনতে। দুটো কবুতর দিয়ে দেবে তাকে। কিন্তু পেছন ফিরে রাইয়ান দেখেছিলো, স্কুলের চেনা মাঠ, মস্তবড় গাছটা, চেনা রাস্তা, সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এ কোথায় এসেছে সে? রোদের তাপে তখন চোখের সামনে ধোঁয়াটে কুয়াশা … তারপর যে কী হল, …কিছু মনে পড়ে না তার।
একটু ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করলো রাইয়ান তারপর বাবার কোলে মাথা রেখে কেঁদে উঠলো।
– রিকশাওয়ালা ভাই যদি, যদি আমাকে না খুঁজে পেতো, তাহলে তাহলে
– কিছু হতো না বাবা! পুলিশ তোমাকে ঠিক খুঁজে আনতো।
– না, না, না, … ওরা তো পারেনি আব্বু! রিকশাওয়ালা ভাই যদি না দেখতো, তাহলে আমি হারিয়ে যেতাম আম্মু?

ছুটির দিনে অনেক দিন পরে আব্বুর সঙ্গে ছবি আঁকার খেলায় মেতে উঠেছে রাইয়ান। আব্বা এখন সাবধান। কারণ আব্বুর গল্প শুনে শুনেই তো দুপুর রোদের হাত ধর কবুতর আনতে বেরিয়ে ছিলো রাইয়ান।
দাদী সেদিন দুধ-ভাত মেখে খাওয়ার টেবিলে বসলেন। বললেন, তোদের যে কী সব ধারণা হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মাথায় যত নতুন নতুন আইডিয়া বোঝাই করে যুগের হাওয়া তৈরি করছিস। আর বাবা, ওরা সেসব শিখতে গিয়ে বিপদে পড়বে কি না, ওরা ঠিকঠাক তৈরি না হয়ে ভুল করবে কি না, সেসব কথা ভেবে-চিন্তে তবে না পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবি। তার চেয়ে আয় তো দুধ-ভাত খাইয়ে, তোদের যেভাবে শিখিয়েছি, সেভাবেই শিখিয়ে দিই। সোহরাব-রুস্তমের গল্প, বীর ঈশা খাঁর কাহিনী, বদর ডাকাত, আরজাব সর্দারের কাহিনী আরো কত কী!
– ঠিক আছে আম্মা, আপনি যেভাবে ওকে দেশের ইতিহাস শেখাতে চান আপনার মতো করেই শিখুক রাইয়ান। আর এটা দেখেছেন আম্মা? রাইয়ানের আম্মা হাতের ওপরে রাখা ছবির মস্ত খাতাটা খুলে মেলে ধরলেন। আরো, ভারী চমৎকার ছবি এঁকেছে রাইয়ান। দেখি দেখি?
এক পাতায় বরফ ঢাকা এভারেস্ট পাহাড়ের চূড়া। তার ওপরে দুইজন পর্বত বিজয়ীর ছবি। মাঝখানে বাংলদেশের পতাকা। মাথার ওপরে হলুদ সূর্যের ছটা।
– কেমন হয়েছে দাদী? সাগ্রহে জানতে চায় রাইয়ান। ওকে এবার স্কুলের উৎসবে পর্বত বিজয়ীর পোশাক তৈরি করে পরিয়ে দেবো।
– খুব মজা হবে আম্মু। আমি টুপি পরে বরফের লাঠি হাতে করে তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো। একটু থেমে রাইয়ান বলে, আম্মা, রবিনও থাকবে আমার সঙ্গে। ও সেদিন আমার জন্য অনেক কেঁদেছিলো তো। দুধ-ভাত খাওয়া শেষ করেই বাইরে ক্রিং ক্রিং ঘণ্টির আওয়াজ শোনা যায়। এক লাফে বাইরে আসে রাইয়ান। মফিজ রিকশা নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে। বলে, আমার ভাইজান আইজ কেমুন আছে? হাসি মুখে কাছে আসে রাইয়ান। বলে
– রিকশাওয়ালা ভাই, আমার তো স্কুল আজ ছুটি। আমাকে একটা চক্কর দিয়ে আনবে? কলোনির মধ্য দিয়ে যে পাকা বাঁধানো রাস্তা, সেখান দিয়ে মফিজ রিকশায় করে দৌড় করিয়ে নিয়ে আসে।
– এই দেহেন ভাইজান, আমার অ্যারোপ্লেনে আপনারে উড়াইয়া লইয়া যাইবে …ও …ও।’
জানালায় দাঁড়িয়ে আব্বা বলে, ঐ যে তোমার ছেলে পাইলট হয়ে প্লেন চালাতে চললো।
মফিজ এলে তাকে কিছু না খাইয়ে কখনও যেতে দেন না রাইয়ানের দাদী আর আম্মা। অনেক চেষ্টা করেও তাকে পুরস্কার হিসেবে কিছু টাকা তার হাতে দিতে পারেননি। ঘড়ি ধরে রাইয়ানকে স্কুলে আনা-নেয়ার ডিউটি কিন্তু সে নির্ভুল করে যাবে। এতেই তার আনন্দ।

সন্ধ্যাবেলা বাইরে ঘাস জমির ওপরে হেঁটে ঘরে ফিরে এলেন রাইয়ানের আব্বা। রাইয়ানের হারিয়ে যাওয়া তাকে ফিরে পাওয়া নিয়ে একটা প্রামাণ্য কাহিনী লিখছেন তিনি।
সেটা নিয়ে কম্পউটারে কাজ করছেন। আমাদের দেশের মানুষ কত ভাল হয়, মানুষ চিনতে আমরা ভুল করি, তাকে ভুল বুঝি, সে কথাও লিখছেন তিনি।
এক সময় কারও সাবধানী আঙুল তার পিঠে টোকা দিলো। ফিরে তাকিয়ে হাসলেন আব্বু,
– কিরে বাবা? কিছু বলবি?
– আব্বু, আদুরে গলায় রাইয়ান বললো,
– আমি না স্বপ্ন দেখেছি। বিকেলে ঘুমিয়েছিলাম না?
– হ্যাঁ তো, কী হয়েছে?
– দেখি, আমি অ্যারোপ্লেনে উড়ে যাচ্ছি।
– গুড ভেরি গুড। তো তরপর কী হল রাইয়ান?
– তার পর না, দেখি কি বড় বড় অনেকগুলো কাক এসে আমাদের প্লেনটা ঘিরে উড়ছে। আমাকে বলে কী,
– কী বলে? কম্পউটারে চোখ রেখে বলেন আব্বু।
– কাক পাখিরা বলে, আমাদের সঙ্গে চলো, খুব জোরে উড়ে  উড়ে আকাশে বেড়াতে পারবে।
ওদের কথা শুনে উড়ে যাবার জন্য যেই আমি যেতে নিলাম, অমনি খাট থেকে পড়ে গেলাম আব্বু।
-এ্যাঁ? বলিস কী রাইয়ান? আঁতকে ওঠে ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন আব্বু। আদর করে বললেন, মেঘের সঙ্গে, কাকের সঙ্গে, কবতুরের সঙ্গে যাতায়াতের কথা তুমি মনেই রেখো না কেমন? যতদিন পারো, আমার হোন্ডা, মফিজের রিকশা এসবেই বেড়ানো ঠিক হবে। কেমন? বিকেলটা ভারী সুন্দর। বারান্দায় বসে হাতের লেখা লিখছিলো রাইয়ান।
দি স্কাই ইজ ব্লু … আই লাভ মাই মাদার, গ্রাস ইজ গ্রিন… এই পর্যন্ত লিখে বাইরের আকাশে তাকালো রাইয়ান। ঐ যে, আকাশে মেঘেরা চলেছে ছবি আঁকতে আঁকতে। একটা ঘুড়ি… একটা নৌকা, আরে একটা কবুতরও যে এঁকে চলেছ মেঘেরা! ছুটে গিয়ে গ্রিল ধরে চেঁচিয়ে ওঠে রাইয়ান, আম্মু, আম্মু দেখবে এসো, মেঘেরা ছবি আঁকছে!
আম্মা ছেলের জন্য দুধের পেয়ালা নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে দরজাটা খুলে দিলেন আর কোথা থেকে যেন শব্দ উঠলো, বক বকুম বক বকুম …
আরে! কবুতর কোথা থেকে এলো? চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠলো রাইয়ানের। ছুটে গেল ঝুড়িতে বসে ডাকতে থাকা কবুতরগুলোর পাশে। জ্বল জ্বলে চোখ ছল ছল করে উঠলো অভিমানে। দরজায় দাঁড়িয়ে মফিজ চোখে মুছে বরলোÑ ভাইজান এই পক্ষীগুলোর জইন্য তুমি কত কষ্ট পাইছিলা। তাই আমি লইয়া আইছি। পছন্দ হইছে ভাইজান?
-পরিষ্কার টরিষ্কার আছে তো মফিজ? আম্মা জানতে চান, হাতের কাছে রাখা যাবে না। সারাদিন ঘাঁটবে।
জে না আম্মা, একদম সাফ সুতরা কইরা গোসল করাইয়া তয় আনছি। উঁচা কইরা বসাকো লাগাইয়া দিমু ঐ পাশে। এইডার লাইগ্যাই তো এমুন কাণ্ড হইছিল আম্মা! চোখ বুঁজে সেদিনের বিকেলের কথা মনে করে শিউরে ওঠে মফিজ। রাইয়ানের আব্বা আম্মা তো ছেলের সে অবস্থা দেখননি!
Ñ দাম কত বললে তো।
– দিয়েন অইন্য সময়।
দুধ খেয়ে মুখ মুছে হাঁটু গেড়ে বসে রাইয়ান। একটু আগেই তো মেঘেরা কত কিছু ছবি এঁকে দেখিয়েছে আমাকে। এই কবতুরগুলোও। খুব সাবধানে হাতটা ছোঁয়ায় রাইয়ান। গলা ফুলিয়ে বাদামি ধূসর কবুতরটা বলে বাক বাকুম। সঙ্গে সঙ্গে ছাইরঙের বন্ধু উত্তর দেয়, বাক বাকুম।
– ইস, কী সুন্দর! আম্মা, দেখ দেখ কী সুন্দর জুতা পরেছে পায়ে…

ঝুড়িতে বসে, ঘুরে ঘুরে ডাকছে কবুতরগুলো। ঐভাবে বসে বসে ঘুমে ঢুলুনি আসছে ছেলের তবু সে উঠবে না। শেষে এক সময় দাদী এসে তাকে কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন।

হোন্ডায় চেপে রাইয়ান বললো, আব্বা, ছুটি হলে কী রিকশাওয়ালা ভাই আমাকে নিয়ে যাবে?
– হ্যাঁ। সে তোমাকে মেঘের ঘোড়ায় নয়, রিকশায় ডানা লাগিয়ে উড়িয়ে বাসায় পৌঁছে দেবে। রাজি তো?
– হ্যাঁ আব্বু। আব্বুর কোমরটা জড়িয়ে ধরে রাইয়ান।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply