Home উপন্যাস সবুজ শহর

সবুজ শহর

রকিব হাসান….

এক.

চমকে জেগে গেল তিশা। পুরো বেডরুমটাই নীরব, শুধু ওর বুকের ধুকপুকানি ছাড়া আর কোন শব্দ কানে আসছে না। মাথা ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল ও। ভোররাত, তিনটা বাজে। বাইরে অন্ধকার। কেন জেগে গেল, ভাবছে। গভীর ঘুম ঘুমাচ্ছিল। তাহলে জাগল কেন?

বালিশে মাথা রেখে পাশ ফিরতে যাবে, এ সময় চোখ পড়ল ওর বড় আলমারিটার দিকে। ভেতর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে বেরোচ্ছে ম্লান সবুজ আভা।

বিছানায় উঠে বসে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল ও।

আরও অনেক ছেলেমেয়ের মতই তিশাও আলমারির ভেতরের অন্ধকারকে ভয় পায়। বিশেষ করে এখন, নিস্তব্ধ এই রাতের বেলা, আলমারির দরজাটাকে ফাঁক হয়ে থাকতে দেখে। আলমারির ভেতরের অন্ধকারে কী যেন রয়েছে, যেন কোনও ভয়ঙ্কর আতঙ্কপুরীতে ঢোকার প্রবেশপথ ওটা। এই অন্ধকার ঘরটাকেও ভয় পাচ্ছে এখন। ভয় পাচ্ছে বিছানাটাকে। ওর মনে হলো লম্বা কোনও একটা দানবীয় হাত এসে ওর গোড়ালি চেপে ধরে টেনে নিয়ে যাবে বিছানার তলায়। এরপর কী ঘটবে, কী ভয়ঙ্কর ঘটনা, সেটা আর ভাবতে চাইল না।

যদিও ওর বয়স এখন বারো, যথেষ্ট বড় হয়েছে, বোঝে, এই ভয় পাওয়াটা অমূলক। ওই আলমারি কিংবা বিছানার নিচে এমন কিছু নেই, যেটা ওর তি করতে পারে। কিন্তু আলমারির ভেতর থেকে যে সত্যিই সবুজ আভা বেরোচ্ছে।

দুই চোখ ডলে নিয়ে বিছানায় বসেই সামনে ঝুঁকল তিশা, ভাল করে দেখার জন্য। অদ্ভুত এক ধরনের সবুজ রঙ। ঘাসের মত নয়, গাছের পাতার মত নয়, কেমন গা গোলানো সবুজ। ওর আলমারিতে কোনও আজব প্রাণী নেই তো, যার চামড়ার রঙ কবর থেকে তোলা সবুজ ছত্রাক পড়া পুরনো লাশের মত?

উহুঁ, তা নেই!

তাহলে ওটা কী? ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করল তিশা।

কাছে গিয়ে দেখা ছাড়া জানার আর কোনো উপায় নেই।

বিছানা থেকে নেমে আলমারির কাছে হেঁটে যাওয়া ছাড়া।

কিন্তু সেটা করতে চায় না ও।

অন্তত এ মুহূর্তে।

ওর টর্চ লাইটের আলো হতে পারে। আলমারির ভেতর কোনভাবে গড়িয়ে পড়ে, সুইচে চাপ লেগে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু টর্চের আলোর রঙ সবুজ নয়। সবুজ সোয়েটার কিংবা কাপড়ের  ভেতর দিয়ে আসতে পারে। সমস্যাটা হলো, সবুজ সোয়েটার নেই ওর। সবুজ একটা শার্ট আছে, তবে সেটাও আলমারিতে নয়, চেস্ট অব ড্রয়ারে রেখেছে। টর্চটাও আলমারিতে রাখেনি। দিন দুই আগে গ্যারেজে পকেট থেকে টাকা পড়ে গিয়েছিল, সেটা খোঁজার জন্য টর্চটা নিয়ে গিয়েছিল, সেখানেই রেখে এসেছে। নাহ্, এই অদ্ভুত আলো অন্য কোন কিছুর!

‘কিসের?’ বিড়বিড় করল আপনমনে।

হাত বাড়িয়ে বেডসাইট ল্যাম্পটা জ্বালানোর চেষ্টা করল। কোন কারণে জ্বলল না ওটা। কয়েক মুহূর্ত সুইচটা টিপাটিপি করে হাল ছেড়ে দিল। এমন কী হতে পারে, আলমারির ওই সবুজ জিনিসটাই কোনভাবে জ্বলতে দিচ্ছে না ল্যাম্পটাকে? ব্যাপারটা অসম্ভব, কারণ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ও বিছানায় শোয়ার সময় ওটা জ্বলছিল। বাল্ব্ কেটে গেছে? নাকি ওই সবুজ আভাটাই ল্যাম্পটাকে নিভিয়েছে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে? হয়তো অন্ধকারে থাকতে ভালবাসে ওটা।

ওর কাছে কী চায়?

‘কচু চায়,’ জোরে শব্দ করে নিজেকে ধমক লাগাল তিশা। ‘ওটা একটা আলো। জ্যান্ত নয়। আমার তি করতে পারবে না।’

মুখে বললেও মনে মনে কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না ও। প্রচণ্ড কৌতূহল দমন করতে পারছে না। যতই ভাবনা-চিন্তা করুক, জানে, নেমে গিয়ে ওটাকে না দেখা পর্যন্ত স্বস্তি পাবে না। শুয়ে লাভ নেই। ওটা কী, না জেনে ঘুমাতেও পারবে না। হয়তো ওর ঘুমানোর সুযোগে সবুজ আলোটা ভয়াল কোনও রাস হয়ে গিয়ে গিলে খাবে ওকে। ওর বন্ধু তৃণার মতে এ ধরনের ঘটনা অসম্ভব নয়। তৃণার এ সব কথা এতদিন উড়িয়ে দিয়েছে তিশা, কিন্তু এ মুহূর্তে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে লাগল।

একবার ভাবল, তৃণাকে ফোন করে।

কিংবা ওর আরেক বন্ধু, তরুকে।

কিন্তু এখন এভাবে ডেকে আনলে ওরা ওকে ভিতু ভাববে।

‘আমি ভিতু নই,’ নিজেকে বলল তিশা। ‘তরু হলে ওটা চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে যেত দেখার জন্য। কোন কিছুকে ভয় পায় না ও।’

তরুকে তাই পছন্দ করে তিশা।

ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে এল ও। মেঝেটা ঠাণ্ডা। আলমারির দিকে এগোল। গা কাঁপছে। ওর এগোনো টের পেয়েই যেন সবুজ আভার উজ্জ্বলতা কিছুটা বেড়ে গেল।

‘প্লিজ, আমার তি কোরো না,’ আলমারির দিকে এগোতে এগোতে ফিসফিস করে বলল তিশা। দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, সেখান দিয়ে  ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। সবুজ আভায় ওর সমস্ত কাপড়ের রঙ সবুজ লাগছে। জুতো, স্যান্ডেল, হ্যাটগুলোও সবুজ। হ্যাট ভালোবাসে তিশা। ওর প্রিয় হ্যাটগুলোর এই বদলে যাওয়া রঙটা ভাল লাগল না। দেখে মনে হচ্ছে, আলমারির সমস্ত জিনিসগুলো যেন ওই সবুজ রঙ শুষে নিয়েছে। আলোটাকে কেমন ঠাণ্ডা, অপার্থিব দেখাচ্ছে।

আলোর উৎসটা দেখতে পাচ্ছে না ও।

তবে বোঝা যাচ্ছে, আলমারির  পেছন থেকে আসছে।

ভাল করে দেখতে হলে দরজাটা পুরো খুলতে হবে। সেটা করতে চায় না ও। ভেতরে যে জিনিসটা রয়েছে, বেরিয়ে এসে সেটাকে বেডরুমে ঢোকার সুযোগ দিতে চায় না।

‘কিন্তু ওটা জ্যান্ত নয়,’ নিজেকে বোঝাল আবার তিশা। ‘ওটা আমার কোন তি করতে পারবে না।’

দরজার নব চেপে ধরল তিশা।

কাঁপা হাতে, টান দিয়ে আরেকটু ফাঁক করল আলমারির দরজা।

নিভে গেল সবুজ আলোটা।

টান দিয়ে পাল্লা পুরোটা খুলে ফেলল তিশা।

আলমারির ভেতরটা পুরো অন্ধকার। স্বাভাবিকভাবে যা থাকার কথা।

‘হ্যালো?’ ডাকল তিশা, কেমন বোকা বোকা লাগল নিজেকে।

কেউ জবাব দিল না।

ওর পেছনে, বিছানার পাশে, জ্বলে উঠল ওর ল্যাম্পটা।

চমকে গেল ও। ভাগ্যিস, ল্যাম্পের আলোটা সবুজ নয়। আলো জ্বলাতে ভালই হলো। আলমারির ভেতরে ভালমত দেখতে পারল ও। ওর কাপড়, ওর জুতো, ওর হ্যাট, যেখানে যেভাবে রেখেছিল সেভাবেই আছে। তবে কিছু একটা ছিল  ভেতরে, যা ওই আলো ছড়াচ্ছিল, ভাবল ও। জিনিসটা কী, বুঝতে পারল না।

বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের ঘরে উঁকি দিল ও। মা আর ওর ছোট ভাইটা ঘুমোচ্ছে। ওদের আলমারি খুলে দেখল। ওগুলোতে সবুজ আলো নেই। ফিরে এসে নিজের আলমারিটা দেখল আরেকবার। সবুজ আলো নেই দেখে খুশি হলো। তবে রহস্যটার সমাধান না হওয়াতে খুঁতখুঁতিটা আরও বেড়ে গেল। আলমারির দরজা লাগিয়ে দিল।

বিছানায় ফিরে এসে সুইচ টিপে বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল ও।

ঘুমিয়ে পড়ল এক সময়।

গভীর ঘুমে অচেতন থাকায় টেরই পেল না আবার ঝটকা দিয়ে খুলে গেছে আলমারির দরজা। ফিরে এসেছে সবুজ আভাটা।

ঘুমিয়ে থাকায় সবুজ আভার মাঝে ফুটে ওঠা অস্পষ্ট মুখটা দেখতে পেল না তিশা।

মুখটা মানুষের মুখ নয়।

দুই.

পরদিন শুক্রবার। স্কুল ছুটি।

সকাল বেলা ওর প্রিয় রেস্টুরেন্টের দোতলায় বসে নাশতা খাচ্ছে তিশা আর তার বন্ধুরা। কোণের দিকে একটা টেবিলে বসেছে ওরা। এ সময়টায় এখানে বেশি ভিড় হয় না। যত ভিড়, নিচের হলঘরে। এখানে যারা খতে আসে, তাদের বেশির ভাগই ওখানে বসে খায়।

সবাই টেবিল ঘিরে বসেছে : তিশা, তরু, তৃণা, তৈমুর, সাব্বির ও সালমা। প্রথম চারজন মিলে একটা দল বানিয়েছে, রহস্যভেদী দল। সবার নামের প্রথম অর ‘ত’ দিয়ে হওয়াতে দলটার নাম দিয়েছে ওরা ‘ত’ বাহিনী। তিশা সুন্দরী, কোঁকড়া কালো চুল। নরম স্বভাবের মেয়ে। তরু খুব সাহসী, বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখার মতা অসাধারণ। তৃণা লম্বা, ছিপছিপে, সে-ও সুন্দরী। সারাণ বকবক করা স্বভাব, কথা না বলে থাকতে পারে না। তৈমুর চুপচাপ থাকে। ক্ষুরধার বুদ্ধি।

সাব্বির ‘ত’ বাহিনীর মূল সদস্য নয়, তবে মাঝে মাঝে রহস্য সমাধানে সাহায্য করে। কিছুটা অহঙ্কারী হলেও মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। দলের সবাই ওকে কমবেশি পছন্দ করে।

সালমা ওদের দলের একেবারে নতুন সদস্য। মাত্র কিছুদিন আগে অদ্ভুত এক কেসের সমাধান করতে গিয়ে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ‘ত’ বাহিনীর। খুব সুন্দরী। নিজের চেয়ে সুন্দরী মেয়েদের সইতে পারে না তৃণা, কিন্তু সালমার সঙ্গে কোন বিরোধ নেই ওর, মেয়েটার ভালো স্বভাবের জন্য।

যা-ই হোক, সবুজ আলোর কথা বন্ধুদের জানাচ্ছে তিশা। ‘মনে হচ্ছিল আলমারির পেছন থেকে আসছে,’ বলল ও। ‘এমন আলো আগে আর কখনও দেখিনি আমি। ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল। তেমন উজ্জ্বল নয়। অদ্ভুতভাবে যেন আমার সমস্ত কাপড় চোপড়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল।’

ভাজা গোশত দিয়ে পরোটা মুখে পুরল তরু। চিবুতে চিবুতে জিজ্ঞেস করল, ‘ঢুকে গিয়েছিল বলে কী বোঝাতে চাইছ?’

‘মনে হচ্ছিল…যেন ওই রঙে চুবিয়ে তোলা হয়েছে কাপড়গুলোকে,’ তিশা জবাব দিল। আলমারির ভেতরের সমস্ত জিনিসপত্র যেন ওই রঙ শুষে নিয়েছিল।’

‘কিন্তু সত্যিই কি চোবানো হয়েছে?’ দুধের কার্টনে চুমুক দিল তৈমুর।

‘না,’ তিশা বলল। ‘যেই আমি আলমারির কাছে গিয়ে দরজা খুললাম, আলোটা নিভে গেল। তারপর সব আবার আগের মত স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু বহু খুঁজেও আলোর উৎস কিংবা কারণ কোনটাই জানতে পারিনি।

‘স্বপ্ন দেখেছ,’ তৃণা বলল।

‘স্বপ্ন আর বাস্তবতার তফাৎ আমি বুঝি,’ রেগে উঠল তিশা।

‘এ শহরে স্বপ্ন আর বাস্তবতায় কোন তফাৎও নেই,’ তৃণা বলল।

মাথা নাড়ল তিশা। ‘আমি স্বপ্ন দেখিনি। জেগে থেকে নিজের চোখে দেখেছি। জিনিসটা কী, বলো তো তোমরা?’

‘এ রকম কিছুর কথা আগে কখনও শুনিনি,’ তৈমুর বলল।

‘হয়তো কোনও ধরনের ইন্টারডিমেনশনাল দরজা রয়েছে তোমার ঘরে,’ সাব্বির বলল।

‘আর ওর ঘরটা কিন্তু একেবারেই লাশ রাখার ঘরের মত,’ তৃণা যোগ করল।

‘তোমরা যা বলতে চাইছ, মায়াপথ, তার মত নয় কিন্তু,’ তিশা বলল। এই পথ ধরে বেশ কয়েকবার সময়-ভ্রমণ করে এসেছে ওরা, সময়কে ছাড়িয়ে অন্য সময়ে, অন্য ডিমেনশনে চলে গিয়েছিল।

‘এত শিওর হচ্ছ কী করে?’ সাব্বির জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি বলছ, আলোটার কোন উৎস খুঁজে পাওনি। হয়তো অন্য কোনও ডিমেনশন থেকে আসছিল। তুমি আলমারির দরজাটা খোলার পর কোন কারণে ওই ডিমেনশনের রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

চিন্তিত দেখাল তিশাকে। ‘তা হতে পারে।’

‘আলোটার ছোঁয়া কেমন লাগছিল?’ সালমা জিজ্ঞেস করল। পরিবর্তিত জীবনে বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে এখনও ও। তাই কোন মন্তব্য করা কিংবা পরামর্শ দেয়ার চেয়ে দেখা আর শোনাটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে অভিজ্ঞতা থেকে দলের সদস্যরা জেনে গেছে, কোনও ধরনের মতা রয়েছে ওর, যার সাহায্যে অনেক কিছুই টের। আর এই মতাটা হয়তো অতৃপ্ত আত্মার কাছ থেকেই এসেছে, যেটা দুশো বছর ধরে বাসা বেঁধে ছিল ওর দেহে। ওটা চলে যাওয়ার পরেও মতার রেশটা ওর দেহে রয়ে গেছে এখনও। বুঝতে পারলেও কথাটা কেউ ওকে বলে না, কারণ, অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে আলোচনা করতে অস্বস্তি বোধ করে সালমা।

‘কেমন লাগছিল মানে?’ বুঝতে পারল না তিশা।

‘ভাল না মন্দ?’ আবার জিজ্ঞেস করল সালমা।

দ্বিধা করল তিশা। ‘ভাল না। কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা…অশুভ।’

মাথা ঝাঁকাল সালমা। ‘আমিও তা-ই ভেবেছি।’

‘এক সেকেন্ড,’ হাত তুলল তৃণা। ‘আলোর আবার ছোঁয়া লাগে কিভাবে, অশুভ ছোঁয়া?’

‘হয়তো অশুভ শব্দটা ঠিক হয়নি,’ তিশা বলল। ‘তবে ভাল লাগছিল না, আমি খারাপ বোধ করছিলাম, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওটা যখন চলে গেল আবার ভাল বোধ করতে লাগলাম।’ সামান্য দ্বিধা করে সালমার দিকে তাকাল ও। ‘ওটাকে অশুভ ভাবলে কেন?’

যেন বহুদূরে চলে গেছে সালমার দৃষ্টি, মাঝে মাঝেই এ রকম হয় ওর।

‘আমার মনে হলো, তাই,’ মৃদুকণ্ঠে জবাব দিল সালমা।

অস্বস্তির হাসি হাসল তিশা। ‘এখন কিন্তু আমার ভয় লাগছে।’

‘হয়তো কিছুটা ভয় লাগা ভাল,’ তরু বলল। ‘হয়তো আজ রাতে সালমা কিংবা তৃণা গিয়ে ঘুমাবে তোমার সঙ্গে।’

‘আমি ওদের বাড়িতে থাকতে রাজি না,’ তৃণা বলল। ‘ঈশ্বরই জানে, আলমারি থেকে সবুজ পেস্টের মত কী বেরোয়।’

‘আমি পেস্ট বলিনি, বলেছি সবুজ আলো,’ তিশা বলল। ‘যা-ই হোক, আমি তোমার থাকা চাই না।’ এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলল, ‘একাই থাকতে পারব আমি।’

‘সত্যি পারবে?’ সালমা জিজ্ঞেস করল। ‘তোমার সঙ্গে থাকতে আমার কিন্তু আপত্তি নেই।’

জোর করে হাসল তিশা। ‘না, সামান্য একটা সবুজ আলোকে ভয় পাই না আমি।’

‘কিন্তু এমনও তো হতে পারে,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে তৈমুর বলল, ‘ওই সামান্য সবুজ আলোটা বড় কিছুর ইঙ্গিত। একটা তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বোমাও খুব মৃদু সবুজ আলো বিচ্ছুরণ করে। কিন্তু ওটার মতা ভেবে দেখো। চোখের পলকে একটা শহর ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। তিশা, তোমার আলমারিটা আমি একবার দেখতে চাই। এখনই।’

উঠে দাঁড়াল তিশা। ‘তাহলে তো খুবই ভাল হয়। এখন নিশ্চয়ই আমার মা আর ভাইটা বাড়িতে নেই, বাজার করতে গেছে। এটাই সুযোগ।’

*

তিশার আলমারিটার সামনে এমনভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াল সবাই, ভেতরে উঁকি দিতে লাগল, যেন আজব এক দেশ দেখতে পাবে সেখানে, কিংবা উদ্ভট কিছু। তবে অস্বাভাবিক কোন কিছুই চোখে পড়ল না। আলমারির পেছনটা আর দশটা সাধারণ আলমারির মতই, কাপড়গুলোতেও সবুজ আলোর কোন রেশ নেই। তিশার একটা হ্যাট তুলে নিয়ে মাথায় দিল তৃণা।

‘এই, আমাকে কেমন লাগছে?’ জিজ্ঞেস করল ও।

‘মাথায় দিলেই যখন, এমন আলগা করে রেখেছ কেন? পুরোটা টেনে বসাও,’ সাব্বির বলল। ‘তাহলে তো বোঝা যাবে, কেমন লাগে।’

ভুরু কোঁচকাল তৃণা। ‘অদ্ভুত ব্যাপার, তিশা, আমি কল্পনাই করিনি এতগুলো হ্যাট আছে তোমার।’

‘হ্যাট সংগ্রহ করা আমার হবি,’ তিশা বলল।

আলমারির ভেতর ঢুকল তরু। দেয়ালগুলোতে হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল।

‘নাহ্, গোপন দরজা-টরজা কিছু নেই,’ বলল ও। ‘আমার আঙুলে কিছু ঠেকছে না।’

মাথা ঝাঁকাল তৈমুর। ‘তাতে আশ্বস্ত বা খুশি হওয়ার কিছু নেই। হাতে কিছু না ঠেকাটা বরং আরও বেশি ভয়ের, তাহলে ধরে নিতে হবে সবুজ আলোটার উৎপত্তি ভুতুড়ে কোন কিছু থেকে।’

কুঁকড়ে গেল তিশা। ‘তার মানে তুমি বলতে চাও আমার আলমারিটাতে ভূতের আসর হয়েছে?’

‘ত-ও বলছি না।’ সালমার দিকে ঘুরল তৈমুর। ‘তোমার কোনও আজব অনুভূতি হচ্ছে এখানে?’

একটা মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সালমা।

‘নাহ্,’ অবশেষে মাথা নাড়ল ও, ‘তবে এখন তো অন্ধকার নয়। রাতে হয়তো কোন পরিবর্তন ঘটে।’

‘কী ধরনের পরিবর্তন?’ তিশা জানতে চাইল।

‘আসার পথে তুমি বলছিলে, সবুজ আলোটা যতণ আলমারিতে ছিল, তোমার ল্যাম্পটা জ্বলছিল না,’ তরু বলল। ‘আলোটা চলে যেতেই ওটা জ্বলে উঠেছে। সবুজ আলোর সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে।’

‘হয়তো নাইটলাইট জ্বেলে ঘুমানো উচিত তোমার,’ তৃণা বলল তিশাকে। ‘ফিডারখাওয়া শিশুদের মত।’

‘ব্যাটারি-চালিত একটা নাইটলাইট লাগালে অবশ্য মন্দ হয় না,’ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব সহকারেই নিল তৈমুর।

‘ব্যাটারি-চালিত কেন?’ তিশার প্রশ্ন।

‘সবুজ আলোটা হয়তো দেয়ালে বসানো সকেটের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করেছিল,’ জবাব দিল তৈমুর।

‘আমার মনে হয়, একটা সাধারণ দুঃস্বপ্নকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা,’ তৃণা বলল। তিশার আরেকটা হ্যাট পরে দেখল। এটা দেখতে গার্ল স্কাউটদের ক্যাপের মত, শুধু প্রতীকটা লাগানো নেই।

‘কিন্তু তুমিই না আমাদের সব সময় জ্ঞান দাওÑঅস্বাভাবিক যে কোন জিনিস থেকে সাবধান থেকো,’ মনে করিয়ে দিল তিশা।

‘বয়স বাড়ছে তো, তাই হয়তো সঠিক চিন্তার মতাও বাড়ছে,’ জবাব দিল তৃণা।

‘তার মানে স্বীকার করছ, এতদিন বেঠিক চিন্তা করেছ…’ তিশা বলল।

ওকে কথা শেষ করতে দিল না তরু, ঝগড়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি বাধা দিল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কী করা যায়। আজ রাতে তোমাকে একা থাকতে দেয়াটা ঠিক হবে কি না। তৈমুর, সাব্বির, তোমরা কী বলো?’

‘আরে না না, লাগবে না,’ সাহস দেখানোর চেষ্টা করল তিশা। ‘আমি একাই থাকব। রাতে যদি আবার আলোটা দেখি, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করব তোমাদের।’

গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘কোরো। তোমার ফোন পেলেই আমি চলে আসব।’

তিন.

সে-রাতে ঘুমাতে কষ্ট হলো তিশার। তাতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। পাশের বেডরুমে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মা আর ছোট ভাইটি, তাদেরকে আলোটার কথা মা বলেনি ও, ওদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে চায়নি। ভাবল, আহা, আমিও যদি এভাবে ঘুমাতে পারতাম! তিশার বাবা নেই, মারা গেছেন। বাবার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওর।

বার বার আলমারিটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে তিশার। দরজাটা শক্ত করে লাগিয়ে রেখেছে। ডেস্ক চেয়ারটা হাতলের সঙ্গে চেপে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, যাতে আলমারির দরজা খুলে ওর অজান্তে কেউ চলে আসতে না পারে। বোকামিই মনে হচ্ছে ওর, তবে সতর্ক থাকা ভাল, তাতে নিরাপত্তা বাড়ে।

কিন্তু কিসের থেকে নিরাপত্তা?

একটা নাইটলাইট কিনে নিলেই হতো, আফসোস হচ্ছে এখন।

কিছুতেই উত্তেজনা কমাতে পারছে না, ঘুম আর আসবে কী করে। যেই স্নায়ু কিছুটা শান্ত হয়ে আসে, অমনি মনে হয় আলমারির দিক থেকে মৃদু শব্দ শুনেছে, লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে। তবে প্রতিবারেই দেখে, ভুল করেছে। কিন্তু পরেরবারও আবার একই ভুল করা থেকে বিরত থাকতে পারে না।

‘উফ্, মরে গেলাম!’ জোরে জোরে বলল ও। ‘সকালবেলা উঠতে পারব না, কান্তিতে ঢুলব, অথচ সারাদিন যা পড়ার চাপ থাকবে!’

ঘড়ির দিকে তাকাল ও।

মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। একটা প্রায় বাজে।

জানালার বাইরে গভীর অন্ধকার। থেকে থেকেই কিসের যেন ঘষা লাগছে কাচে। গাছের ডাল, বুঝতে পারল তিশা, বাতাসে নড়ছে। কম্বলটা চিবুকের কাছে তুলে দিয়ে, আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল ও।

ঠিক এই সময় আবার চোখে পড়ল সবুজ আভাটা।

আলমারির দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আসছে।

বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল তিশা।

হাত বাড়াল বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচের দিকে। কিন্তু ল্যাম্পটা জ্বলল না। থাবা দিয়ে তুলে নিল ল্যাম্পের পাশে রাখা টেলিফোনের রিসিভার। কানে ঠেকিয়ে ডায়াল টোন আছে শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু অন্ধকারে তরুর নম্বর টিপতেও সমস্যা হচ্ছে। সবুজ আভাটা আগের রাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর লাগছে। তবে অবশেষে নম্বরগুলো টেপা শেষ করল ও।

তৃতীয়বার রিং হতে ঘুমজড়িত কণ্ঠে জবাব দিল তরু, ‘হ্যালো?’

‘তরু?’ ফিসফিস করে বলল তিশা, ‘ওটা ফিরে এসেছে।’

এক মুহূর্ত পরে জবাব এল, ‘সবুজ আভাটা?’

‘হ্যাঁ। আমার আলমারিতে।’

‘তাই!’

‘আমি এখন কী করব? তুমি কি আসতে পারবে?’

‘হ্যাঁ, আমি আসছি। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। আমি আসার আগে কিচ্ছু কোরো না। আলমারির কাছে যেয়ো না।’

‘আর সবাইকে ফোন করব?’

ভেবে দেখল তৈমুর। ‘উহুঁ, দরকার নেই। আমি আগে দেখি।’

‘ঠিক আছে।’

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, তিশা। ওটা শুধু আলো। তোমার কোন তি করতে পারবে না।’

‘তাহলে ওটার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলছ কেন?’

জবাব দিতে দ্বিধা করল তৈমুর। ‘এই শহরে সাবধান থাকাই ভাল। আমি আসছি।’

রিসিভার নামিয়ে রাখল তিশা। সবুজ আভাটার দিকে তাকাল। আলমারির দরজা বন্ধ, তবু নিচ দিয়ে যতখানি আসছে, তাতেই উজ্জ্বলতা বেড়েছে বলে মনে হলো ওটার, অন্তত আগের রাতের চেয়ে তো বটেই। তাতে ভয় আরও বেড়ে গেল ওর। অথচ ঘর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কী এক দুর্নিবার আকর্ষণ যেন ঘরের মধ্যেই আটকে রেখেছে ওকে। অসহায় হয়ে আলমারির সামনে পায়চারি করতে লাগল। ওই সবুজ আভাটাই যেন কোনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে ওর ওপর। ওটার কাছে যেতেও ভয় পাচ্ছে, আবার ওটাকে নজরের বাইরে যেতে দিতেও রাজি নয়।

মৃদু একটা শব্দ কানে এল ওর।

খুব হালকা একটা খসখস শব্দ। আলমারির ভেতর থেকে।

দম আটকে ফেলল তিশা।

জ্যান্ত হয়ে গেল নাকি ওটা! ক্ষুধার্ত?

মনের জোর একত্রিত করে, আলমারির কাছে এগিয়ে গেল তিশা। দরজায় চেপে রাখা চেয়ারটা পরীক্ষা করে দেখল জায়গামত আছে কি না। দেহের প্রতিটি পেশি শিহরিত হচ্ছে। আলমারির ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও খুব বেশি শব্দ করছে না ওটা, তবে করছে। দরজায় গা ঘষছে বলে মনে হলো।

বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ওকে ধরার জন্য।

চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল তিশা।

‘জলদি করো, তরু, তাড়াতাড়ি এসো,’ ফিসফিস করে বলল।

আলমারির ভেতর জোরাল একটা শব্দ হলো।

দড়াম করে দরজার গায়ে আঘাত হানল ওটা। খটখট করে উঠল চেয়ারটা।

সেই সঙ্গে যেন নাড়িয়ে দিল ওর সমস্ত স্নায়ু।

‘না!’ আপনিই গোঙানিটা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে।

আবার দড়াম করে শব্দ হলো। কাত হয়ে পড়ে গেল চেয়ারটা।

আতঙ্কে যেন জমে গেল তিশা।

দরজার নিচের ফাঁকে সবুজ আভাটা যেন সবুজ আগুনের মত জ্বলছে এখন।

ভয়ে চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল তিশার।

‘বাঁচাও! প্লিজ!’ অস্ফুট কান্নার সঙ্গে বেরিয়ে এল কথাগুলো।

কিন্তু কেউ ওর কথা শুনল না। কেউ ওকে সাহায্য করতে এল না।

ধীরে ধীরে খুলে গেল আলমারির দরজা।

আলমারি থেকে বেরিয়ে এল ওটা। ভয়ঙ্কর সেই জিনিসটা।

খামচে ধরল ওকে। ওর হাত ধরে টানতে লাগল।

চিৎকার করতে চাইল তিশা। স্বর বেরোল না।

আলমারির ভেতর ওকে টেনে নিয়ে গেল ওটা।

গভীর অন্ধকারে, যেখান থেকে কারও কানে পৌঁছবে না ওর চিৎকার।

চার.

তিশাদের বাড়িতে পৌঁছল তরু। দরজায় নক করল না। তিশার মা আর ভাইকে জাগিয়ে দেয়ার ভয়ে। এসব অ্যাডভেঞ্চারের কথা বাড়ির কাউকে বলে না দলের কেউ। গোপন রাখে। মা-বাবা শুনলে উদ্বিগ্ন হবেন। ঘরে আটকে রাখতে চাইবেন।

পা টিপে টিপে বাড়ির পাশ ঘুরে তিশার বেডরুমের জানালার কাছে চলে এল তরু। আলতো টোকা দিল জানালায়। ঠাণ্ডা রাত। জানালার পাল্লা লাগিয়ে রেখেছে তিশা। মিনিটখানেক অপো করে জবাব না পেয়ে অবাক হলো তরু। আবার টোকা দিয়ে আবার অপো করতে লাগল। অবশেষে, বাইরে থেকেই পাল্লা খোলার চেষ্টা করল। ছিটকানি লাগানো না থাকলে খুলে যাবে।

লাগানো নেই। খুলে ফেলল পাল্লা।

ভেতরে উঁকি দিয়ে তিশাকে দেখল না।

জানালা টপকে ভেতরে ঢুকল।

প্রথমেই যেটা চোখে পড়ল তরুর, তা হলো, তিশার আলমারির দরজা হাঁ হয়ে খোলা, আর ডেস্ক চেয়ারটা পড়ে রয়েছে আলমারির কাছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন পাল্লা দিয়ে ধাক্কা মেরে চেয়ারটাকে মাটিতে ফেলা হয়েছে। কোন ধরনের সবুজ আভা দেখা গেল না।

‘তিশা?’ মৃদু স্বরে ডাকল তরু।

জবাব নেই।

ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এল তরু। বসার ঘর আর রান্নাঘরে দেখল। ছোট বাড়ি। কয়েক মিনিটের মধ্যে খোঁজা শেষ করে ফেলল। তিশার মা আর ভাইয়ের ঘরেও উঁকি দিয়ে দেখল। ওসব জায়গায় থাকার কথা নয়, তবু, যদি থাকে, ভেবেছিল তরু।

কিন্তু নেই।

আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে তরু। জোর করে তাড়ানোর চেষ্টা করল।

আবার তিশার বেডরুমে ফিরে এসে, আলমারিতে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে টর্চ জ্বালল। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ওটা। অস্বাভাবিক বলতে, চেয়ারটাই শুধু উল্টে পড়ে আছে। আলমারির  ভেতরের কোন জিনিস নাড়াচাড়া করা হয়নি। কোন কিছু খোয়া গেছে বলেও মনে হচ্ছে না। কাপড়গুলো হ্যাঙারে ঝুলছে। জুতো রাখার জায়গায় সুন্দর করে সারি দিয়ে রাখা জুতো-স্যান্ডেলগুলো। এমনকি হ্যাটগুলোও ঠিক জায়গামত আছে। তৃণা মাথায় দেয়ার পর যেখানকার জিনিস সেখানেই রেখে দিয়েছে। সোজা কথা, আলমারির ভেতর, এমন কোনও চিহ্ন নেই যাতে বোঝা যায় এখানে একটা অপরাধ ঘটানো হয়েছে।

অথচ তিশা বলেছিল, সবুজ আভাটা ফিরে এসেছে।

আর এখন তো তিশাই নেই।

টর্চের আলোয় নম্বর দেখে তৈমুরকে ফোন করল তরু। তৈমুরের জবাব দেয়ার অপো করার সময় বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচ টিপল। জ্বলে উঠল আলো। তারমানে বিদ্যুতের লাইনে কোন সমস্যা নেই। মোলায়েম হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। দ্বিতীয়বার রিং হতেই রিসিভার তুলল তৈমুর।

‘হ্যালো?’ তৈমুরের গলা শুনে মনে হলো না ঘুম থেকে উঠেছে, যেন জেগেই ছিল।

‘তৈমুর, আমি,’ নিচুস্বরে বলল তরু। ‘আমি এখন তিশার বেডরুমে। দশ মিনিট আগে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল সবুজ আভাটা ফিরে এসেছে। সাইকেল নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে চলে এসেছি। এসে দেখি, তিশা উধাও।’

‘কোথায় গেছে?’

‘জানি না। তবে কে যেন ওর চেয়ারটা উল্টে ফেলেছে।’ এক মুহূর্ত থেমে বলল তরু, ‘আমার মনে হয়, কোন কিছু বেরিয়ে এসে ওকে ধরে নিয়ে গেছে।’

‘আলমারির ভেতর থেকে?’

‘হতে পারে। ভেতর থেকে, কিংবা বাইরে থেকে। কী করব বুঝতে পারছি না। আসবে একবার?’

‘ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, পেয়েছি,’ স্বীকার করল তরু।

‘আসছি। সাব্বির আর তৃণাকে জানাও। সালমাকেও জানাতে হবে। আমার তো মনে হচ্ছে, এ রহস্যের সমাধান করতে আমাদের সবার মগজ খাটানো দরকার।’

চুপ করে রইল তরু। সালমাকে ভীষণ পছন্দ করে তৈমুর। এর কারণও আছে। কিন্তু তরু সালমাকে এতটা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে না, ওদের ভয়ানক বিপজ্জনক জীবনের সঙ্গে মেয়েটাকে জড়ানো ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না।

‘সালমাকে ফোন করব?’ অবশেষে জিজ্ঞেস করল তরু।

জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না তৈমুর। ‘ওকে আমি নিজেই জানাচ্ছি। ওর বিশেষ মতাটা এখন কাজে লাগানো আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।’

‘কিন্তু…’ বলতে গিয়ে থেমে গেল তরু।

‘কিন্তু কী?’

‘এখন এত রাতে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না। এত তাড়াতাড়ি নিশ্চয় শকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ভূতগ্রস্ত হয়ে থাকার ধাক্কা, দুশো বছর ধরে একটা ভিন্ন আত্মার বশে ছিল ওর দেহটা। ওকে এখানে আনার ঝুঁকিটা নিতে চাও?’

একটা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল তৈমুর। ‘তুমি ওকে বিশ্বাস করো না, তাই না?’

‘নিশ্চয় করি। কেন করব না?’

‘এই যে, তুমি বললে, ভূতগ্রস্ত হয়ে ছিল ও।’

‘আমি ওকে বিশ্বাস করি, তৈমুর, সত্যি। তবে ওকে আমরা ভাল করে চিনি না এখনও, এটা তো ঠিক।’

‘দেখো, চিনি আর না চিনি, আমার ধারণা, এই রহস্যটাতে ও আমাদের সহযোগিতা করতে পারবে। এখন অন্য কিছু ভাবার চেয়ে তিশার নিরাপত্তার কথাটাই আগে ভাবতে হবে আমাদের, সেটা যেভাবেই আসুক। তাই না?’

‘হ্যাঁ, তাই,’ বিড়বিড় করল তরু।

স্বস্তি পাচ্ছে না। তিশা বেঁচে আছে কি না, সন্দেহ হচ্ছে তার।

*

আসতে দেরি হলো না ওদের। বিশ মিনিটের মধ্যেই তিশার বেডরুমে জড় হলো সবাই। মজার ব্যাপার হলো, এসবের কিছুই জানতে পারল না একই বাড়িতে থাকা তিশার মা কিংবা ভাই। নিজেদের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। খুব সাবধানে কথা বলছে গোয়েন্দারা, যাতে ওদের কথার শব্দ পাশের ঘরে কারও কানে না যায়। কিছু বলার আগে প্রথমেই আলমারিটা পরীক্ষা করতে গেল সাব্বির ও তৈমুর। কাছেই দাঁড়িয়ে রইল তরু, তৃণা আর সালমা। সবাই গম্ভীর। এমনকি বকবক করা স্বভাবের তৃণাও একেবারে চুপ।

ভাল করে দেখে আলমারি থেকে বেরিয়ে এল সাব্বির ও তৈমুর। তরু যা দেখার আগেই দেখেছে।

‘অস্বাভাবিক কোন কিছু দেখলাম না,’ সাব্বির বলল।

‘কোনখান থেকে সবুজ আলোটা তৈরি হয়েছে, তার কোন চিহ্ন নেই,’ বলল তৈমুর।

‘সবুজ আলো নিয়ে কে মাথা ঘামায়,’ তৃণা বলল। ‘আমার প্রশ্ন, তিশা কোথায়?’

‘মনে হয় আলোটা ওকে নিয়ে গেছে,’ সাব্বির বলল।

‘নিয়ে কী করেছে?’ তৃণার প্রশ্ন।

কাঁধ ঝাঁকাল সাব্বির। ‘জ্যান্তই খেয়ে ফেলেছে হয়তো।’

ভারি কণ্ঠে তরু বলল, ‘তিশা বেঁচে আছে ধরে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। জ্যান্ত খেয়ে ফেলেছে, না মেরে ফেলে দিয়েছে, এসব বলাটা ঠিক হচ্ছে না।’

লজ্জা পেল সাব্বির। মাথা নামিয়ে বলল, ‘আসলে, সম্ভাবনার কথা বলছিলাম আমি। যা-ই হোক, আমিও মনেপ্রাণে চাই, তিশা বেঁচে থাকুক।’

‘তদন্তের খাতিরে বলি,’ তৈমুর বলল, ‘ধরা যাক, সবুজ আলোটাই ওকে ধরে নিয়ে গেছে। ওকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা অনুমান করার আগে আমাদের জানতে হবে ওই আলো এখানে কেন এসেছিল, তিশার আলমারিতে।’

‘তিশার আলমারিতে আসার ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয়,’ তৃণা বলল। ‘ওকে হাতের কাছে পেয়েছে, ধরে নিয়ে গেছে। এ ধরনের উদ্ভট ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয় এই শহরে, প্রায়ই ঘটে।’

‘কিন্তু তাই বলে কোন সূত্রই রেখে যাবে না?’ সাব্বির বলল। ‘ওই আলমারিটার কোনও বিশেষত্বও চোখে পড়েনি আমার, ওটাতে ঢুকল কেন সবুজ আলোটা?’

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল একবার তরু। কী যেন ভাবল। বিড়বিড় করে আপনমনেই বলল, ‘হয়তো ভুল জিনিসের দিকে নজর দিচ্ছি আমরা। আলমারিটা হয়তো বিষয় নয়, বিষয় হলো তিশা।’

‘কী বলতে চাও?’ ভুরু নাচাল তৈমুর।

‘আমি শিওর নই…’ সালমার দিকে ঘুরল তরু। ‘সালমা, এমন কিছু টের পাচ্ছ এখানে, বিকেলে যেটা পাওনি?’

স্বচ্ছ নীল চোখজোড়া বন্ধ করল সালমা। একটু পর আবার যখন খুলল, ওকে কিছুটা ফ্যাকাশে মনে হলো। এক পা এগোল আলমারির দিকে। খোলা পাল্লায় হাতের তালু চেপে ধরল।

‘ভয় টের পাচ্ছি আমি,’ ফিসফিস করে বলল সালমা।

সালমার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে তরু। ‘কার ভয়? তিশার?’

চোখ বড় করে ওর দিকে তাকাল সালমা। ‘কার ভয় জানি না। শুধুই ভয়। ভয়ে ভিজে আছে জায়গাটা।’

‘ভয়ে আবার ভিজে থাকে কী করে?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল।

‘ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারব না,’ সালমা জবাব দিল। ‘ভিজে আছে, ব্যস।’

ওর আজব নতুন বন্ধুর দিকে তাকাল তৈমুর। ‘তিশা বলেছিল, ওর মনে হচ্ছিল, আলমারির  ভেতরের সমস্ত জিনিস যেন সবুজ আলো শুষে নিয়েছে। জিনিসগুলোতে বসে গেছে আলোটা। অন্যভাবে এর ব্যাখ্যা করলে বলা যেতে পারে, সবুজ আলো সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছে।’

‘ভাল কথা বলেছ তো,’ বিড়বিড় করল তরু।

‘এক সেকেন্ড,’ বাধা দিল তৃণা। ‘তোমরা বলতে চাইছ, তিশার ভয়টাই সবুজ আলো হয়ে দেখা দিয়েছে? তা যদি ভেবে থাকো, তোমাদের মাথা পরীা করানো দরকার।’

‘হয়তো ওর ভয় সবুজ আলো সৃষ্টি করেনি,’ তরু বলল। ‘বরং বলা যেতে পারে, ওর ভয়ই ওই সবুজ আলোটাকে টেনে এনেছিল, ওর আলমারির  ভেতর।’

‘কী বলছ, কিছুই বুঝতে পারছি না,’ সাব্বির বলল। ‘সহজ করে বলো।’

‘সহজ করেই তো বললাম,’ তরু বলল। ‘আমরা ধরে নিয়েছি, এই আলমারিটাতে অদ্ভুত কিছু আছে। যুক্তিসঙ্গত অনুমানই বলা যেতে পারে। কারণ, আজব আলোটা এই আলমারি থেকেই বেরিয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, রাত দুপুরে, অন্য কোথাও না এসে ঠিক এই জায়গাটাতেই, এই আলো আসার জন্য হয়তো তিশাই দায়ী। আমার এখন মনে পড়ছে, তিশা এই আলমারিটার সম্পর্কে প্রায়ই বলত, এটার দিকে তাকালেই নাকি ওর ভয় লাগত, বিশেষ করে যখন এটার পাল্লা সামান্য ফাঁক হয়ে থাকত।’

‘সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়,’ তৃণা বলল। ‘অনেক ছেলেমেয়েই এ ধরনের আলমারি, সিন্দুক, এসবকে ভয় পায়। তারা ভাবে, এগুলোতে ভুতুড়ে কিছু থাকে, যখন-তখন বেরিয়ে এসে ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে গায়েব করে দেবে। ছোটরা তো পাবেই, অনেক বড়রাই ভয় পায়।’

‘ঠিকই বলেছ,’ তরু বলল। ‘এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ধারণাটা হয়েছে আমার। অন্ধকারে ওর এই আলমারিটাকে ভয় পেত তিশা। দিনের পর দিন ওই ভয় জমা হতে হতে এত বেশি হয়ে গেছে, সেটাকে ভিত্তি করে একেবারে ঘরের  ভেতর এসে ওকে আক্রমণের সাহস পেয়েছে জিনিসটা।’

মাথা নাড়ল তৃণা। ‘একেবারেই আজব ভাবনা, উদ্ভট তত্ত্ব, তা-ও কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়া। তিশার উধাও হওয়ার অন্য কোন কারণ থাকতে পারে না? এই যেমন, আমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাত দুপুরে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে চলে গেছে?’

‘আমাকে ফোন করার সময় ভয় পাচ্ছিল ও,’ তরু বলল। ‘ওর গলা শুনেই বুঝতে পেরেছি।’

‘সেটা অভিনয় হতে পারে,’ তৃণা বলল।

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, আগে তরুর কথাগুলো ভালমত বুঝে নিই,’ সাব্বির বলল। ‘তরু, তুমি বলতে চাইছ, আলমারির অন্ধকারে দুষ্ট কোন কিছু আছে, তিশার এ ভয়টা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, যা স্পেস-টাইম বা চতুর্থ মাত্রার স্তরকে ছিন্ন করে ভিন্ন ডিমেনশনে নিয়ে চলে গেছে ওকে, দুষ্ট কোন কিছুর জগতে, কিংবা যেখানে সত্যি সত্যি দুষ্ট কোন কিছু আছে?’

‘ঠিক তা-ই,’ মাথা ঝাঁকাল তরু।

‘এর মানেটা কী? তোমরা কি সব আইনস্টাইন হয়ে যাচ্ছ নাকি?’ বিড়বিড় করল তৃণা।

তৃণার কথার জবাব না দিয়ে আপনমনে বলল তরু, ‘তিশাই আজব কিছুর স্রষ্টা, আলমারিটা নয়Ñএই আইডিয়া থেকে আমাদের এগোনোর একটা সূত্র পাওয়া গেল।’

‘তুমি বলতে চাও, দলের মধ্যে সবচেয়ে ভিতু ছিল ও?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল।

‘না,’ তরু জবাব দিল। ‘একটা কথা তো মানতেই হবে, কোন না কোন জিনিসকে ভয় পাই আমরা। তিশা ভয় পেত এই আলমারিকে, আর, তাই, এর মধ্যেই সময়ের স্তরটা ছিন্ন হয়েছে।’ এক মুহূর্ত থামল ও। ‘সালমার বিশেষ মতা আছে, শক্তিশালী জ্ঞানেন্দ্রিয় বলতে পারো একে, যা আমাদের নেই। আর এটার সাহায্যেই ভয়টা টের পেয়েছে ও, আমার তত্ত্বের সহায়ক হয়েছে।’

সালমার দিকে তাকাল তৃণা। ‘ওর এই উদ্ভট তত্ত্বের ব্যাপারে তুমি একমত?’

তরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়ে মাথা ঝাঁকাল সালমা। ‘কখনও ভুল করতে দেখিনি ওকে।’

ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল তৃণা। ‘নাহ্, মাত্র কয়েক দিনেই তুমিও ওর ভক্ত হয়ে গেলে।’

তরুকে বলল সাব্বির, ‘তুমি যা বললে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তো সময়ের স্তরের এই ছেঁড়া বা ভাঙা যা-ই বলো, সেটা মেরামত করতেও তো আবার তিশাকেই দরকারÑতিশা আর ওর ভয়।’

গম্ভীর হয়ে আছে তরু। ‘এমনও হতে পারে, সময়ের স্তরের এই ভাঙা জায়গাটা, যেটা দিয়ে ঢুকে গেছে তিশা, সেটা ইতোমধ্যেই জোড়া লেগে গেছে, আর খুলতেই পারলাম না আমরা।’

চুপ করে শুনছিল এতণ তৈমুর। এখন বলল, ‘আমি এ ব্যাপারে একমত হতে পারলাম না। ভয়ই যদি দুষ্ট জিনিসটাকে আমাদের সময়ে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে ওই ভয়টাকেই চালু করব আমরা আবার, ভয় উৎপাদন করব।’

‘কিন্তু অভিনয় করে তো আর ভয় সৃষ্টি করতে পারব না। ভয় পাওয়ার ভান করে লাভ হবে না, এর জন্য সত্যিকারের ভয় পাওয়া দরকার। যে ভয়, সালমার ভাষায়, এই ঘরের মধ্যে থিকথিক করছে।’ একটু থেমে যোগ করল তরু, ‘এ রকম ভয় পেত বলেই সবুজ আলোটা দেখতে পেয়েছে ও, আর শুধু তার চোখেই পড়েছে। এই ঘরের অন্ধকারে প্রচণ্ড ভয় পেত ও।’

‘আমি অবশ্য একটা ভিতু ছেলেকে চিনি,’ তৃণা বলল। ‘যে এতই ভিতু, সকালবেলা স্কুলে হেঁটে যেতেও ভয় পায়।’

‘কাকে?’ একসঙ্গে প্রশ্ন করল সবাই।

‘দিপু,’ তৃণা বলল। ‘ভুলে গেছ ওর কথা? আমাদের পাড়ার সেই নতুন ছেলেটাÑজয়নাল সারের  ভেতরে ঢুকে পড়া পিশাচটার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের সাহায্য করেছিল। দিপু ওর নিজের ছায়াকেও ভয় পায়। এই সবুজ আভাটা যদি এ শহরের ভিতু ছেলেমেয়েদের খোঁজেই এসে থাকে, তাহলে আমি শিওর, তার কাছে দিপুর ঠিকানাও আছে।’

উত্তেজিত মনে হলো তৈমুরকে। ‘হ্যাঁ, দিপুর কথা মনে আছে আমার। আসলেই ও একটা ভিতু, এত ভিতু দেখা যায় না। ওকে দিয়ে সময়ের স্তর আবার খোলাতে পারব আমরা।’

‘এমনও তো হতে পারে, ওর ভয়কে ব্যবহার করে সময়ের স্তরকে খোলাতে পারলাম আমরা,’ তরু বলল, ‘কিন্তু সেটা যে একই ফোকর হবেÑযেটা দিয়ে তিশা চলে গেছে, শিওর হব কী করে? একেবারে ভিন্ন কোনও ফোকর দিয়ে অন্য কোনও ডিমেনশনে চলে যেতে পারি।’

‘কিন্তু ঝুঁকিটা নিতেই হবে,’ তৈমুর বলল। ‘এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সারারাত শুধু যুক্তিতর্কের কচকচানিতে লাভ হবে না। হঠাৎ করেই তিশা এসে উদয় হবে আবার, সেটা মনে করার কোন কারণ নেই।’

‘ঠিকই বলেছ,’ তরু বলল, ‘অ্যাকশনে যেতে হবে আমাদের।’

‘কিন্তু দিপু যদি এতই ভিতু হয়ে থাকে,’ সাব্বির বলল, ‘আমাদের সহযোগিতা করতে আসবে কেন? সবুজ আলোর কথা শুনলেই তো ভয়ে কুঁকড়ে যাবে।’

‘ও যদি আমাদের সহযোগিতা করতে না চায়, তাহলে তো আরও ভাল,’ তৃণা বলল। ‘তবে আমি জানি, ইচ্ছে না থাকলেও সহযোগিতা করতে বাধ্য হবে।’

‘বুঝলাম না,’ সাব্বির বলল।

‘তোমার আর বুঝে কাজ নেই,’ দুই হাতের তালু ডলল তৃণা। ‘ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। এমন ভয় দেখাব, ভয়ের চোটে ওর আলমারির দরজায় আট-দশখান তালা লাগিয়ে দেবে।’

পাঁচ.

জেগে উঠে তিশা দেখল একটা আবছা অন্ধকার বনের ভেতরে পড়ে রয়েছে ও। ঘাসের ওপর চিত হয়ে। ঘাসে ছাওয়া ছোট একটা তৃণভূমিতে। ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা লম্বা লম্বা গাছে ঘেরা জায়গাটা। উঠে বসে ভালমত দেখল ও, মৃদু সবুজ আভা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। মেঘও নেই, তারাও নেই, চাঁদও নেই। দূরে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মস্ত ছায়ার মত কোনকিছু, নিশ্চয় পর্বতমালা। পানি বয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তবে সেটা কাছাকাছি নয়। এত অন্ধকার নয়, যে চোখে দেখে চলাফেরা করা যাবে না, আবার সবকিছুই কেমন ঝাপসা, যদিও খুব মৃদু। নিজের চোখের সমস্যা কি না ভাবল। বারবার চোখ বুজে, খুলে, তাকাল। ডলেও দেখল কয়েকবার। আলোর কোন পরিবর্তন হলো না। তারমানে ঠিকই দেখছে।

কোন মানুষ চোখে পড়ল না। একেবারেই জনমানবহীন একটা জায়গা।

যে জিনিসটা ওকে ধরে নিয়ে এসেছে, ওটাকে কোথাও দেখা গেল না। মনে পড়তেই গায়ে কাঁটা দিল ওর। অস্পষ্টভাবে মনে পড়ল, পেটমোটা একটা প্রাণী, বড় বড় সবুজ চোখ, লালা গড়ানো মুখে অসংখ্য ধারাল দাঁত। ওর হাত খামচে ধরেছিল ওটা। একটা চিৎকার দিয়েছিল শুধু তিশা, তারপর অন্ধকার, আর কিছু মনে নেই। ওকে যে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, দলের বাকি সবাই সেটা বুঝতে পেরেছে কি না কে জানে। হয়তো এখন ওকে খুঁজতে শুরু করেছে তরুরা।

কিন্তু কোথায় খুঁজবে ওরা?

আলমারির পেছনে?

এ জায়গাটা কোথায়, ও নিজেই তো বুঝতে পারছে না। এটা কি কল্পলোক, না কোন জাদুর দেশ? যা-ই হোক, ওকে এখানে ধরে এনেছে কেন? এখনও যে কোন তি করেনি, সেটাই ভাগ্য।

উঠে দাঁড়াল তিশা। পাজামার নিচে লেগে থাকা ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে চারপাশে তাকাল।

পেছনে একটা শব্দ হলো। বনের  ভেতরে।

পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। হালকা-পাতলা একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে, রূপকথার এলফদের মত দেখতে। একটা তরু, তিশার বয়সীই হবে। অনেকটা মানুষের মতই চেহারা। কানের মাথা সুচালো। গায়ের রঙ হালকা সবুজ, জ্বলজ্বলে। পরনে আঁটো পাজামা, গায়ে ধূসর রঙের আলখেল্লার মত পোশাকের ঝুল হাঁটুর কাছে নেমেছে। কোমরের চামড়ার বেল্ট থেকে ঝুলছে একটা লম্বা রুপালি তলোয়ার। ডান হাতের তালু ওটার বাঁটের ওপর রেখে বড় বড় সবুজ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এক কাঁধে ঝোলানো একটা বড় ধনুক, অন্য কাঁধে তূণ ভর্তি তীর। তিশার চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা, পাতলা গড়ন হলেও পেশিবহুল দেহ। ভাবভঙ্গি রু, ওকে দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হলো না।

‘জেগেছ,’ নরম পরিষ্কার গলায় বলল প্রাণীটা। ‘আমি তোমাকে দেখছিলাম।’

‘তুমি বাংলা জানো,’ অবাক হয়ে বলল তিশা।

‘তুমি যে ভাষায় কথা বলবে, আমি সেটা বলতে পারব।’

‘মানে?’

তলোয়ারের বাঁট থেকে হাত সরিয়ে এনে মাথার একপাশ ছুঁলো ওটা। ‘তোমার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলতে হবে, সেটা আমি আপনা আপনি জেনে যাই।’

‘ক্ষুার মানে, তুমি আমার মন পড়তে পারো?’

‘না।’

‘তাহলে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে থেকেই বাংলা জানতে?’

‘না।’

‘তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না,’ তিশা বলল।

‘তুমি মানুষ। মানুষরা বুঝতে অনেক সময় নেয়।’

অপমানিত বোধ করল তিশা। ‘তুমি কে?’

‘আমি জুগর। তুমি এখন ক্রিটাইন রাজ্যে রয়েছ।’

‘এখানে আমি এলাম কিভাবে?’

তিশার কাঁধের ওপর দিয়ে অন্যপাশে তাকাল জুগর। মনে হলো ভ্রƒকুটি করল।

‘সম্ভবত একটা ঢেঁকুর তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে,’ ছেলেটা বলল। ‘ধরে আনতে দেখিনি, তবে আমি যখন দেখেছি, তুমি তখন ওর বাহুতে এলানো ছিলে।’ আবার তলোয়ারের বাঁটে হাত ছোঁয়াল জুগর। ছোট্ট তৃণভূমির অন্যপাশ দেখিয়ে বলল, ‘আমি ওটাকে মেরে ফেলেছি।’

‘মারলে কেন?’

‘আমার সামনে পড়েছিল। তোমাকে মেরে ফেলত।’

মুখ বাঁকাল তিশা। ‘সত্যি?’

মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা। ‘তোমাকে জ্যান্ত সিদ্ধ করে তোমার মগজ খেত। মানুষের মগজ ঢেঁকুরদের খুব প্রিয় খাবার।’

পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল তিশার। ‘আমাকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এই ঢেঁকুররা কোথা থেকে এসেছে?’

‘আসেনি, এখানেই ছিল, ক্রিটাইনের এদিকটাতেই থাকে ওরা।’ হালকা বিরক্তি ছেলেটার কণ্ঠে। ‘বুদ্ধিমান লোকেরা পারতপে এদিকে আসে না।’

‘আমার তো আর আসার ইচ্ছে ছিল না। ধরে এনেছে। আমি বাংলাদেশের মেয়ে। ওটা কোথায় জানো তুমি?’

‘তুমি কি পৃথিবী থেকে এসেছ?’

‘হ্যাঁ।’

মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা। ‘পৃথিবীর নাম আমি জানি।’

‘তাই? খুব ভাল। আমি ওখানে কিভাবে ফিরব, বলতে পারো?’

‘ফিরতে তো আর পারবে না। পৃথিবী রয়েছে পর্দার অন্যপাশে।’

‘কিসের পর্দা?’

আজব আকাশের দিকে হাত তুলল ছেলেটা। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা।’

উদ্বিগ্ন হতে শুরু করল তিশা। ‘কিন্তু আমাকে যে ফিরে যেতেই হবে। কালকের হোমওয়ার্ক বাকি, স্কুলে যেতে হবে। আমার পরিবার আছে। মা আছে। ছোট একটা ভাই আছে। ওটাই আমার আসল জায়গা। এখানে নয়।’

ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটা। পা বাড়াল। ‘সেটা আমার ভাবনা নয়। ও নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’

‘দাঁড়াও! কোথায় যাচ্ছ?’

থামল ছেলেটা। ‘যুহারে ফিরতে হবে।’

‘যুহার কী?’

‘ক্রিটাইনের রাজধানী। ওখানেই থাকেন ব্রোমা, ক্রিটাইনের মহামান্য রাজা।’

‘কে এই ব্রোমা?’

‘এইমাত্র তো বললাম। তুমি কে?’

‘আমার নামি তিশা টেলর।’ হাত বাড়াল ও। ছেলেটা ওকে এই ভয়াল বনে ঢেঁকুরদের এলাকায় ফেলে চলে যাক, চায় না ও। মানুষের মগজখেকো প্রাণী, যেমন বিদঘুটে চেহারা, তেমনি নাম। ভাবতেই শিউরে উঠল তিশা। কিন্তু জুগর নির্বিকার ভঙ্গিতে ওর হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল, ধরল না।

তিশা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে তোমার সঙ্গে নেবে?’

ভেবে জবাব দিল ছেলেটা, ‘তুমি আমার গতি কমিয়ে দেবে।’

‘না, আমি খুব জোরে হাঁটতে পারি,’ তিশা বলল। ‘আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না।’

‘কেন?’

‘তুমিই তো বললে, এটা ঢেঁকুরদের এলাকা। আবার কোন একটা ঢেঁকুর আমার ওপর হামলা চালাতে পারে।’

‘ও নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই,’ জবাব দিল জুগর।

‘কিন্তু মাথাব্যথা হওয়া উচিত। দেখো, একবার তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। আরেকবার সাহায্য করলে অসুবিধে কী?’

‘তোমাকে বাঁচাইনি, আসলে জানোয়ারটা আমার সামনে পড়ে গিয়েছিল, একেবারে মুখোমুখি। নইলে এতে নাক গলাতাম না আমি।’

‘আমি জেগে ওঠা পর্যন্ত তুমি অপো করেছ।’

‘না, তোমার জন্য নয়, বসে বিশ্রাম নিয়েছি।’

‘তার মানে তুমি জানোয়ারটাকে আমার মগজ খেতে দিতে?’

‘হ্যাঁ।’

বিরক্ত হলো তিশা। ‘তুমি যে মোটেও বন্ধুর মত আচরণ করছ না, জানো সেটা?’

‘এ নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’

‘তাহলে কী নিয়ে তোমার মাথাব্যথা আছে?’

‘যুহারে ফেরা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’

‘আমি তোমার সঙ্গে যুহারে যেতে চাই। এই ব্রোমা চরিত্রটাকে দেখতে চাই।’

‘ব্রোমার সম্পর্কে ওরকম তাচ্ছিল্য করে কথা বোলো না। ব্রোমা কোন চরিত্র নন, ব্রোমা সারা ক্রিটাইনের রাজা।’

‘জানি, আগে একবার বলেছ। ওই রাজার সঙ্গে আমি দেখা করে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর উপায় জানেন কি না।’ একটু থেমে বলল, ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ব্রোমা খুব জ্ঞানী আর মতাশালী।’

দ্বিধা করল জুগর। ‘হ্যাঁ, ব্রোমা ভীষণ জ্ঞানী আর মতাশালী।’

‘তবে?’ জুগরের কথার ঢঙে তিশার মনে হলো, রাজা খুব একটা মিশুক নয়।

‘তবে শব্দটা তো বলিনি আমি,’ জুগর বলল।

‘কিন্তু তোমার কি মনে হয় রাজা আমাকে সাহায্য করতে পারবে?’

‘জানি না। প্রয়োজনও মনে করি না।’ আবার পা বাড়াল জুগর। ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। ‘তোমার ইচ্ছে হলে, আসতে পারো। তবে তোমার জন্য আমি গতি কমাব না। তোমাকে আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নিজের মতায় বাঁচতে হবে। কোন ঢেঁকুর যদি হামলা চালায়, প্রথমে আমি নিজেকে বাঁচাব, তারপর তোমাকে দেখব।’

জুগরকে ধরার জন্য দৌড় দিল তিশা। খুব জোরে হাঁটছে ছেলেটা।

‘যাক, তা-ও তো আমাকে দেখার কথা বললে। তার মানে খুব সামান্য হলেও আমাকে ভাল লেগেছে তোমার।’

‘মানুষকে ভাল লাগার কোন কারণ নেই।’

‘কেন?’

‘মানুষ দেখতে অদ্ভুত। কাজকর্মও কেমন আজব।’

‘আমাদের দেশে যদি তুমি যাও, মানুষরাও তোমাকে এ কথাই বলবে। ওরকম বিড়ালের মত চোখা কান। কখনও ভেবেছ এটা?’

‘না। মানুষ আমাকে নিয়ে কী ভাবল না ভাবল, তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’

ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল তিশা। ‘যুহার এখান থেকে কতদূর?’

‘তোমাদের সময়ের হিসেবে পুরো একটা দিন লাগবে, খুব জোরে জোরে হাঁটলে।’

‘হাঁটার সময় মাঝখানে কি থামব আমরা, জিরানোর জন্য?’

‘তোমার ইচ্ছে হলে থেমে বিশ্রাম নিতে পারো। আমি থামব না।’

‘তুমি সত্যিই আমাকে ঢেঁকুরদের খাওয়ার জন্য ফেলে রেখে যাবে?’

‘হ্যাঁ।’

মাথা নাড়ল তিশা। ‘তোমার আচরণ খুব খারাপ, জানো সেটা?’

‘একবার বলেছ ওকথা। তবে ও নিয়ে…’

‘হ্যাঁ, জানি,’ বাধা দিল তিশা। ‘তোমার কোন মাথাব্যথা নেই।’

ছয়.

দিপুদের বাড়িতে এসে ওর বেডরুমের জানালার কাছে দাঁড়াল দলটা। আস্তে করে ওর জানালায় টোকা দিল তৃণা। বেঢপ শরীর মুখের তুলনায় বড় নাক আর ছোট্ট শরীরের ছেলেটা জবাব দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি করল। ওর পরনে লাল রঙের পাজামা। মোটা ভুরুর ওপরে বসানো লাল রঙের ক্যাপটাও অদ্ভুত দেখাচ্ছে। দলটাকে দেখে অবাক হলো ও।

‘এখানে কী তোমাদের?’ জিজ্ঞেস করল।

‘তোমাকে সাবধান করতে এসেছি,’ তৃণা বলল। ‘পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। তিশার কথা মনে আছে?’

‘কোঁকড়া কালো চুলওয়ালা সুন্দরী মেয়েটা?’

‘যতটা সুন্দরী বলছ তত নয়। যা-ই হোক, একটা ভয়ঙ্কর দানব ওকে তুলে নিয়ে গেছে।’

মুখে হাত চেপে ধরল দিপু। ‘কি সাংঘাতিক! পুলিশকে জানিয়েছ?’

‘এ শহরে পুলিশকে জানানো যায় না,’ তরু বলল।

‘কেন যায় না?’

‘ওরা এত ভিতুর ভিতু, থানার বাইরে বেরোতেই ভয় পায়,’ তৃণা বলল। ‘শোনো, এতণে তিশার যা ঘটার ঘটে গেছে। নিশ্চয় ওকে খেয়ে ফেলেছে দানবটা। ওকে বাঁচাতে তোমার কাছে আসিনি আমরা, এসেছি তোমাকে বাঁচাতে। ওই ভয়ানক দানবটা কোথায় বাস করে শুনবে? লোকের বাড়ির আলমারিতে।’

কেঁপে উঠল দিপু। ‘তিশার আলমারিতে ছিল?’

সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল তৃণা, যেন কি এক জরুরি গোপন কথা বলছে, ‘শুধু ওর আলমারি নয়, যে কোন ধরনের আলমারিতে বাস করে ওটা। তবে সবাইকে ধরে না। যে ভয় পায়, তাকে ধরে। ভয় ওকে ওর ডিমেনশনের গোপন দরজা খুলতে সাহায্য করে। তুমি যদি ভয় পাও, তোমাকেও ধরবে। একবার ধরলে আর কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। বাঁচার জন্য যেটা এখন করতে হবে তোমাকে, মনে সাহস রাখতে হবে, ভয় পাওয়া চলবে না।’ থামল তৃণা। তারপর বলল, ‘এটা জানাতেই তোমার কাছে এলাম। ভাবলাম, তোমাকে সাবধান করে দেয়া আমাদের কর্তব্য। তবে এখন আমাদের যেতে হয়, অন্য ছেলেমেয়েদের সাবধান করতে…’ যাওয়ার জন্য ঘোরার ভান করল তৃণা, দলের অন্যরাও তা-ই করল।

‘দাঁড়াও!’ চেঁচিয়ে উঠল দিপু। ‘আমাকে ফেলে যেয়ো না। আমার ভয় লাগছে।’

থামল তৃণা। মাথা নাড়ল। ‘তাহলে আজ রাতে তোমাকে নিতেই আসবে ওটা। তোমার জন্য কিছুই করতে পারব না আমরা। আমরা তোমাকে সাবধান করে দিয়েছি, কিন্তু কোন লাভ হলো না। তোমার জন্য সত্যিই দুঃখ লাগছে আমার, দিপু।’

‘তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, ভাবলে পরে আসলেই লাগবে,’ তৃণার সঙ্গে যোগ করল তরু।

আবার যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল সবাই।

‘দাঁড়াও!’ অনুনয় করল দিপু। ‘তোমরা থাকো। আমাকে বাঁচাও।’

আবার থামল তৃণা। ‘আমরা কিছুই করতে পারব না, নিজেকে তোমার নিজেরই বাঁচাতে হবে। বললামই তো, ওটা তোমাকে তখনই শুধু ধরবে, যখন তুমি ভয় পাবে।’

‘দানবটার কথা আমাকে না জানালেই ভাল করতে,’ দিপু বলল। ‘তোমরা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার আগে তো ভয় পাচ্ছিলাম না।’

রেগে যাওয়ার ভান করল তৃণা। ‘হায়রে কপাল, যার জন্য চুরি করি সে-ই বলে চোর! আরে মিয়া, আমরা তো তোমার উপকার করতে এসেছিলাম। অথচ তার জন্য একটা ধন্যবাদ তো দিলেই না, উল্টে দোষ দিচ্ছ। রাত দুপুরে কাজটাজ, স্কুলের হোমওঅর্ক সব বাদ দিয়ে, তোমাকে সাবধান করতে ছুটে এলাম। নাহ্, যেচে পড়ে কারও উপকার করতে যাওয়া উচিত না। তুমি একটা অকৃতজ্ঞ।’

সঙ্গে সঙ্গে মাপ চাওয়ার ভঙ্গি করল দিপু। ‘সরি, আমি সত্যিই দুঃখিত। তোমরা এসেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। থ্যাংকস। তোমরা আমার সঙ্গে থাকো।’

‘কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকলে শহরের অন্য ছেলেমেয়েদের সাবধান করতে পারব না,’ তরু বলল। ‘এখানে বসে যখন তোমাকে পাহারা দেব আমরা, ওরা সব মরবে। তোমার কারণে আরও অনেকে মারা যাক, এটা নিশ্চয় তুমি চাও না।’

তোতলাতে লাগল দিপু, ‘না…কি-কি-কিন্তু…কিন্তু…’

বাধা দিয়ে তৃণা বলল, ‘তা ছাড়া তিশার আম্মার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। তাঁর মেয়ে যে হারিয়ে গেছে, জানাতে হবে। বিষয়টাকে কোনমতেই হালকাভাবে নিতে পারি না আমরা।’

নিঃশ্বাস ভারি হয়ে গেল দিপুর। ‘সত্যিই দানবটা ওকে খুন করেছে?’

‘নাও, বোঝো,’ হতাশ ভঙ্গিতে হাত ওল্টাল তৃণা। ‘তাহলে এতণ ধরে কী বকবক করলাম? জ্যান্ত ধরে খেয়েছে। প্রথমে মগজ খুলে খেয়েছে।’

‘তারপর হৃৎপিণ্ডটা বের করে কচকচিয়ে চিবিয়ে কপ করে গিলে ফেলেছে,’ মুখ কালো করে বলল তরু।

‘আর তারপর…’ বলতে গেল তৃণা।

গুঙিয়ে উঠে ওকে থামিয়ে দিল দিপু। ‘না না, আর বোলো না। ভয়ঙ্কর ব্যাপার।’

‘পৃথিবীটা বড় কঠিন জায়গা, দিপু,’ সহানুভূতির সুরে বলল তৃণা।

‘হুঁ,’ মাথা ঝাঁকাল দিপু। ‘কিন্তু তোমাদের মধ্যে তো কোনও বিকার নেই। এত ভয়ানক একটা ঘটনা ঘটল, তোমাদের মুখে কোন রকম দুঃখের ছাপ নেই। হাজার হোক, ও তোমাদের বন্ধু ছিল।’

‘এখানে থেকে আমরা একটা জিনিস শিখেছি, এ শহরে টিকে থাকতে হলে কারও সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো উচিত না,’ বুঝিয়ে বলল তরু। ‘এভাবে থাকাই ভাল। এই যেমন, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি তোমার ভয়ঙ্কর মৃত্যু ঘটে, আর সেটা আমাদের চোখের সামনে, হয়তে খারাপ লাগবে, তবে খুব খারাপ লাগবে না আমাদের।’

‘কিন্তু আমার খারাপ লাগবে,’ দিপু বলল।

‘তুমি তো তখন মরেই যাবে, তোমার আর খারাপ লাগবে কিভাবে? কোন অনুভূতিই থাকবে না তোমার।’ বলে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল তরু। বাকি সবাই ওর পিছু নিল। মুখ ফিরিয়ে তরু বলল, ‘আমাদের যা করার করেছি, এখন তোমারটা তুমি বোঝো। চলি, গুড-নাইট।’

‘কি করে গুড-নাইট হবে?’ ককিয়ে উঠল দিপু।

কিন্তু এবার আর থামল না ওরা। হাঁটতে হাঁটতে দিপুর দৃষ্টির বাইরে চলে এল। বাড়ির পাশ ঘুরে। অন্ধকারে থেমে দাঁড়াল কথা বলার জন্য।

‘আজ রাতে আর দুই চোখের পাতা এক করতে পারবে না ও,’ তৃণা বলল।

‘ভালভাবেই সামলেছ ওকে,’ তরু বলল।

‘থ্যাংক ইউ,’ তৃণা বলল। ‘ভয় দেখানো আর বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তুমিও কম যাও না। আমার সঙ্গে যেভাবে তাল মেলালে।’

‘এখন ওর অলে ওর ওপর আমাদের নজর রাখা দরকার,’ সাব্বির বলল। ‘কোথায় লুকানো যায়? ওদের বাড়ির পেছনের গাছে চড়ব?’

‘না, ওটা অনেক দূরে,’ মাথা নাড়ল তরু। ‘আলমারির দানবটা বেরিয়ে এসে যদি ওকে নিয়ে যেতে চায়, বাঁচানোর সময় পাব না। ঠিক ওর জানালার বাইরেই থাকতে হবে আমাদের।’

‘আমাদের দেখে ফেলে যদি ও?’ তৈমুরের প্রশ্ন।

‘ঝুঁকিটা নিতেই হবে আমাদের,’ তরু বলল।

‘ওটা কোন ঝুঁকি হবে বলে মনে হয় না,’ মৃদুকণ্ঠে বলল তৃণা। ‘আলমারির ভয়ে এতই কাবু হয়ে থাকবে এখন, রোদ ওঠার আগে আর বিছানা থেকে নামবে না। আমরা যে ওর জানালার বাইরে আছি, জানতেই পারবে না।’

‘দানবটা যদি আসে তো কী করব?’ সালমা জিজ্ঞেস করল।

ভ্রƒকুটি করল তৈমুর। ‘হ্যাঁ, আসল প্রশ্নটা করেছ। আমরা ধরেই নিচ্ছি, দানবটাকে সামলাতে পারব আমরা। কিন্তু যদি আমাদের পাঁচজনকে কাবু করে ফেলার মত শক্তিশালী হয় ওটা?’

‘তাহলে আর কী, বিপদে পড়ব,’ সাব্বির বলল।

‘ঠেকানোর কোন না কোন উপায় নিশ্চয়ই আছে,’ তরু বলল।

‘সেটা কী?’ তৃণার প্রশ্ন।

‘এখনও জানি না,’ জবাব দিল তরু।

‘বাহ্, ভাল,’ মুখ বাঁকাল তৃণা।

‘তবে যত যা-ই ঘটুক,’ তৈমুর বলল, ‘দিপুকে নিতে দেয়া যাবে না। ওকে বাঁচাতেই হবে।’

মাথা নাড়ল তরু, ‘ওকে বাঁচানোর চেয়ে দানবটার জগতে আমাদের ঢুকে পড়া অনেক বেশি জরুরি, যদি তিশাকে বাঁচাতে চাই। দিপুর কথা পরেও ভাবা যাবে।’

‘আর আমাদের নিজেদের কথা?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল।

তবে ওর প্রশ্নের জবাব দিল না কেউ, কিংবা দিতে পারল না।

নিঃশব্দে আবার বাড়িটার পেছনে চলে এল ওরা, দিপুর জানালার নিচে। মাথা উঁচু করে উঁকি দিল ঘরের ভেতরে। আলো জ্বেলে রেখেছে দিপু। আলমারির  ভেতরের খুঁটিয়ে দেখছে কোথাও কোন দুর্বলতা আছে কি না, যেখান দিয়ে দানবটা ঢুকতে পারে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে দেখার পর, আলো নিভিয়ে, বিছানায় শুতে গেল। তিশার মত করেই একটা চেয়ার ঠেসে দিল আলমারির গায়ে, হাতলটার নিচে, যাতে ভেতর থেকে ওটা ঘোরানো না যায়। কিন্তু বিছানায় শুয়ে এত বেশি ছটফট আর গড়াগড়ি করতে লাগল দিপু, মনে হলো না রোদ ওঠার আগে আর ঘুমাতে পারবে।

‘ভয় দিয়ে সময়ের স্তর তো বটেই, বাড়ির দেয়ালও যদি ভেঙে ফোকর বানিয়ে ফেলে ও, অবাক হব না,’ ফিসফিস করে বলল তৃণা।

‘ওর জন্য খারাপই লাগছে আমার,’ মৃদুকণ্ঠে বলল সালমা।

‘আমারও,’ তরু বলল।

‘সহানুভূতি এ শহরের জন্য একটা মারাত্মক আবেগ,’ তৃণা বলল।

‘আস্তে বলো,’ ফিসফিস করে বলল তরু। ‘তোমারও এই আবেগ কম না, তৃণা। তিশার জন্য যদি তোমার খারাপ না-ই লাগবে, আমাদের সঙ্গে তুমি কেন এলে?’

‘তা ঠিক,’ তৃণা বলল। ‘কিন্তু ওকে যদি আমরা বাঁচাতে পারি, দয়া করে এ কথাটা বোলো না ওকে। ও আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে। চমৎকার একটা রেষারেষির সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের।’

চুপ হয়ে গেল ওরা। এবার অপোর পালা। আলমারি আর দিপুর দিকে নজর রাখতে লাগল। আরও এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যে সন্দেহ শুরু করেছে ওরা, সবুজ আলোটা আদৌ দেখা যাবে কি না। দিপু এখনও ঘুমায়নি। বিছানায় নড়াচড়া করেই চলেছে। মচমচ শব্দ করছে খাটের স্প্রিং। প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে ও, ওরা যতটা ভেবেছিল, তারচেয়ে বেশি।

‘ওই যে!’ ফিসফিস করে বলল তৃণা।

‘চুপ করে থাকো, একদম নড়াচড়া কোরো না,’ তরু বলল। ‘ওই সবুজ আলোটা দেখা যাওয়ার মানেই ভিন্নজগতে যাওয়ার ফোকর সৃষ্টি হয়েছে, তা না-ও হতে পারে। প্রথম রাতে দানবটাকে দেখতে পায়নি তিশা, ভুলে যেয়ো না।’

‘আলোটা নিশ্চয়ই আলেকের চোখেও পড়েছে,’ তৈমুর বলল। ‘দেখো, বিছানায় উঠে বসেছে ও। খাটের স্প্রিং কিভাবে শব্দ করছে শুনছ? ভয়ে কাঁপছে ও।’

জোরে নিঃশ্বাস ফেলল সালমা। ‘ওকে সাহায্য করতে পারলে ভাল হতো।’

‘ওকে সাহায্য না করার মানে তিশাকে করছি,’ সাব্বির বলল।

তাকিয়ে আছে ওরা। আস্তে করে বিছানা থেকে নামতে দেখল দিপুকে। সুইচ টিপে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বলছে না, মনে হচ্ছে যেন তার দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহই বইছে না। অন্ধকার হয়ে রইল ঘরটা। সবুজ আলোটা বাড়ছে। ঘরের মাঝখানে মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল দিপুকে। এত বেশি ভয় পেয়েছে, দরজার দিকে দৌড়ে যেতেও সাহস করছে না। ও বুঝে গেছে, সবুজ দানবটা ওর মগজ খুবলে খেতে এসেছে। ভিতু কুকুরছানার মত কোঁ-কোঁ কাঁদতে শুরু করল ও।

আস্তে করে হাত বাড়িয়ে সাবধানে জানালার পাল্লা খুলতে আরম্ভ করল তরু।

‘চোখের পলকে ঢুকে পড়তে হবে আমাদের,’ ফিসফিস করে বলল ও।

‘কোথায়?’ জানতে চাইল তৃণা।

‘দানবটা যেখান থেকে এসেছে,’ জবাব দিল তরু।

‘নরকে!’ বিড়বিড় করল সাব্বির।

আলমারির ভেতর খটখট শব্দ হতে লাগল।

পাল্লায় ঠেস দেয়া চেয়ারটা কাঁপছে।

‘আমি ভেবেছিলাম, দানবটাকে আক্রমণ করব আমরা,’ তৃণা বলল। ‘ওটার দেশে যেতে হবে কল্পনাও করিনি।’

‘চুপ!’ সতর্ক করল তরু। ‘রেডি থাকো।’

আলমারির ভেতর দড়াম দড়াম শব্দ হচ্ছে।

পাল্লায় ধাক্কা মারছে কোন কিছু।

অস্ফুট একটা চিৎকার বেরোল দিপুর মুখ থেকে, মাঝপথে থেমে গেল।

কেঁপে উঠে কাত হয়ে পড়ে গেল চেয়ারটা।

ঝটকা দিয়ে খুলে গেল আলমারির দরজা।

গা গোলানো সবুজ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের ভিতর।

দিপুকে সবুজ দেখাচ্ছে। আবার চিৎকার করার চেষ্টা করল ও। স্বর বেরোল না।

আলমারি থেকে বেরিয়ে মস্ত, ভয়ঙ্কর দানবটা ছুটে গেল ওর দিকে।

‘চলো!’ চেঁচিয়ে উঠল তরু।

পরের কয়েকটা সেকেন্ড যেন নৈরাজ্য চলল। প্রথম সমস্যাটা হলো, জানালার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকা। সবাই একসঙ্গে যেতে চাইল, তৃণা ছাড়া। ফলে এ ওর গায়ের ওপর পড়ল, একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার অবস্থা হলো। তবে জানালাটা বড় হওয়াতে অসুবিধে আরও বেশি হলো, একসঙ্গে চৌকাঠে চড়তে পারল সবাই। দ্বিতীয় সমস্যা, দানবটা। ওটার প্রতি নজর থাকায় ওদের মনোযোগে বিঘœ সৃষ্টি হলো।

দানবটার বর্ণনা দেয়া কঠিন। সবুজ রঙ। সারা গায়ে আঠাল পদার্থ মাখা। দেহটা মানুষের চেয়ে বড়। সবুজ রংটা অবিকল সবুজ আভাটার মত, আলমারিতে যেটা দেখা গেছে, ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক হাত ওটার, কম করে হলেও চারটে। শয়তানিভার চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে। মনে হচ্ছে, হেঁটে নয়, বাতাসে ভেসে এগোচ্ছে দিপুর দিকে, একটা সবুজ মেঘের স্তরের মত। পা আছে কি না ওই ভুতুড়ে আলোয় বোঝা গেল না। তবে, খুব দ্রত চলতে পারে। জানালা দিয়ে ওরা ঘরে ঢোকার আগেই দিপুর কাছে পৌঁছে গেল ওটা, দিপুকে খামচে ধরল।

বেহুঁশ হয়ে গেল বেচারা।

‘থামো!’ চেঁচিয়ে উঠল সাব্বির। ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে ও, সবার আগে নেমেছে। পর মুহূর্তেই ওর পাশে এসে দাঁড়াল তরু। জানালার চৌকাঠে বসে এখনও ধাক্কাধাক্কি করছে তৈমুর আর সালমা, নামার চেষ্টায়। বাইরে দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছে তৃণা।

‘ধরো ওটাকে!’ চিৎকার করে বলল তরু।

‘কোনখানে ধরব?’ চেঁচিয়ে জবাব দিল সাব্বির। ‘ধরার মত জায়গা তো দেখছি না।’

‘যেখানে খুশি!’

দিপুকে শক্ত করে ধরে একটানে শূন্যে তুলে নিয়ে আলমারির দিকে ঘুরে গেল দানবটা। ওটাকে ধরার জন্য লাফ দিয়েছিল তরু আর সাব্বির। দানবটা ঘুরে যাওয়ায় পড়ল এসে ওটার পিঠের ওপর। মেঘের মত দেখালেও গা-টা অনেক শক্ত। ধাক্কাটা বেশ জোরেই লাগল। পলকের জন্য রেগে যাওয়া একটা ভয়ঙ্কর মুখ চোখে পড়ল তরুর, ধারাল দাঁত, লালা গড়াচ্ছে। ঝাড়া দিল ওটা। উড়ে চলে গেল তরু। ভাগ্যিস মেঝেতে বা শক্ত কিছুর ওপর পড়ল না, পড়ল দিপুর বিছানায়। একটা মুহূর্তের জন্য হতচেতন হয়ে রইল। ঘোরের মধ্যে যেন দেখল, অবশেষে জানালা ডিঙাল তৃণা, দৌড়ে গিয়ে লাথি মারল দানবটার পাছায়। একেবারে সময়মত কাজটা করেছে। কারণ তখন সাব্বিরকে ধরে ওর মাথাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে ওটা।

‘মর শয়তান, পচা ডোবার পিচ্ছিল শামুক কোথাকার!’ গালি দিল তৃণা। আবার একই জায়গায় লাথি মারল। তাতে গায়ে কতটা ব্যথা পেল দানবটা, বোঝা গেল না, তবে মনে নিশ্চয় খুব ব্যথা পেয়েছে। হয়তো অপমানিত বোধ করল। একে তো মেয়েমানুষের লাথি, তার ওপর বিশ্রী গালাগাল। সাব্বিরকে হাত থেকে ছেড়ে দিল। তবে দিপুকে ছাড়ল না। তৃণার সাহায্যে এগিয়ে গেল তৈমুর। ঘরে একটা বেজবল ব্যাট খুঁজে পেয়েছে। তৃণাকে তুলে নেয়ার জন্য নিচু হলো দানবটা। এই সুযোগে দানবের মাথায় ব্যাট দিয়ে বাড়ি মারল তৈমুর, যতটা জোরে পারল। মনে হলো, আঘাতটা বেশ ব্যথা দিয়েছে দানবটাকে। টলে উঠল ওটা। দিপুও ঢিল হয়ে গেল ওটার হাতে। পিছলে পড়ে গেল মেঝেতে। এখনও বেহুঁশ। বোঝাই যাচ্ছে, খুব বেশি মতাশালী নয় দানবটা। সহজেই কাবু হয়ে যাচ্ছে। দিপুকে তোলার চেষ্টা করল না। বরং পালাতে চাইল। ঘুরে দাঁড়িয়ে নখওয়ালা একটা থাবা বাড়িয়ে দিল আলমারির দিকে। সবুজ একটা ফোকরের মত হয়ে আছে আলমারির পিছনে।

লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে চেঁচিয়ে উঠল তরু, ‘যেতে দিয়ো না! যেতে দিয়ো না! ওটার  পেছন পেছন যাও!’

বলে সে-ই প্রথমে দানবের  পেছনে ছুটল। উজ্জ্বল সবুজ আভার দিকে। তৈমুর আর তৃণা গেল ওর পেছনে। মেঝেতে পড়ে ব্যথা পেয়েছে সাব্বির। উঠতে কিছুটা দেরি হলো ওর। আর সালমা দ্বিধা করতে গিয়ে দেরি করে ফেলল। তাই সে আর সাব্বির গেল সবার পরে। সবুজ ফোকরটার কাছে সময়মত পৌঁছতে পারল না। ওরা ঢোকার আগেই বন্ধ হয়ে গেল ভিন্ন জগতে যাওয়ার পথ।

তরুদের সঙ্গে যেতে পারল না ওরা। মেঝেতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।

হতবুদ্ধি হয়ে গেছে।

গুঙিয়ে উঠল মেঝেতে পড়ে থাকা দিপু।

‘ওরা চলে গেছে,’ ফিসফিস করে নিজেকেই যেন বলল সালমা, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

সত্যিই গেছে। কারণ ঘরে ওরা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই।

বিষণœ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সাব্বির। ‘কিন্তু কোথায়?’

সাত.

জুগরকে অনুসরণ করতে গিয়ে কান্ত হয়ে পড়েছে তিশা। বিরামহীনভাবে ছুটে চলেছে ছেলেটা। অসম্ভব প্রাণশক্তি। কান্ত হওয়ার কোন লণই নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেমন স্বচ্ছন্দ্যে নামছে, উঠছেও ততখানি সহজেই। আজব এক সবুজ দেশ। আকাশে আলোর পরিবর্তন হচ্ছে না, একই রকম মৃদু সবুজ আভা বিকিরণ করে চলেছে, ভুতুড়ে করে রেখেছে সবকিছু। মনে হচ্ছে সবুজ অন্ধকার। খেয়াল করে দেখতে গেলে কেমন মাথা গরম হয়ে যেতে চায়।

এমন অদ্ভুত আকাশ! ভাবল তিশা। মনে পড়ল, ওপর দিকে দেখাতে গিয়ে জুগর বলেছিল, স্বপ্নলোকের পর্দা! এতই নিচে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।

সরু একটা নালার কাছে এল ওরা।

কুলকুল করে বয়ে চলেছে।

থামল জুগর। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ইচ্ছে করলে পানি খেয়ে নিতে পারো। তবে তাড়াতাড়ি করবে।’

পানির কিনারে গিয়ে বসল তিশা।

‘পানিটা ভাল?’ জিজ্ঞেস করল ও।

‘ক্রিটাইনে সব পানিই ভালো পানি,’ জুগর জবাব দিল।

‘তাহলে তুমি খাচ্ছ না কেন?’

‘আমার তৃষ্ণা পায়নি।’

‘কিন্তু অনেকণ ধরে তো হাঁটছি আমরা।’

‘মানুষরা অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই কান্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে যায়, আমাদের ক্রিটাইনবাসীর চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি।’

লম্বা কোঁকড়া চুল হাত দিয়ে একপাশে ঠেলে সরাল তিশা। পানির ওপর ঝুঁকল। অঞ্জলি ভরে পানি তুলে মুখে দিল। টলটলে পরিষ্কার তরল। কিছুটা গরম। আর এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ, মধুর মত। তবে সব মিলিয়ে খুব ভাল স্বাদ। পেটে যেতেই দ্রুত শক্তি ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরে, তাজা হয়ে উঠছে।

‘মানুষের বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগটা কিসের?’ জিজ্ঞেস করল ও। নিচ থেকে ওপর দিকে তাকিয়ে জুগরের পায়ের পাতার ওপর চোখ পড়ল। প্রতি পায়ে চারটে করে আঙুল। একটা করে বুড়ো আঙুল, বাকিগুলো ছোট। আর তখনই ল করল, হাতেও চারটে করে আঙুল।

একটা করে আঙুল কম থাকায় ওদের অসুবিধে হয় কি না ভাবছে তিশা, এ সময় জবাব দিল জুগর, ‘না, মানুষের প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার।’

‘আমার আগে আর কোন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার?’

দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘খুব সামান্য সময়ের জন্য।’

‘কোথায় ওরা এখন? রাজধানী যুহারে?’

‘না।’

‘তাহলে কোথায়?’

‘ঢেঁকুরদের পেটে।’

মুখ কোঁচকাল তিশা। ‘তুমি নিজের চোখে ওদেরকে খেতে দেখেছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওদের সাহায্য করার জন্য কিছু করনি?’

‘না।’

রেগে গেল তিশা। ‘কেন করনি? বোলো না, ও নিয়ে তোমার কোন মাথাব্যথা ছিল না।’

থমকে গেল জুগর। ‘অনেক বেশি ঢেঁকুর ছিল। একা আমার পে ওদের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব ছিল না।’

ওর কণ্ঠে খুব মৃদু অনুশোচনার ছোঁয়া বোঝা গেল।

উঠে দাঁড়াল তিশা। ‘তোমাদের রাজা ব্রোমা ওদের এভাবে খোলামেলা চলতে দিচ্ছেন কেন?’

তীè দৃষ্টিতে তিশার দিকে তাকাল জুগর। ধমকে উঠতে গিয়েও উঠল না। আরেক দিকে চোখ ফেরাল।

‘আমি জানি না,’ মৃদুস্বরে বলল ও।

‘এই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন তুমি? যদি এতই বিপজ্জনক হয়ে থাকে?’

‘অনেক বেশি প্রশ্ন করো তুমি, তিশা।’

‘এগুলো ভাল প্রশ্ন। আমার জানা দরকার। এই এলাকায় কিজন্য এসেছ তুমি?’

চিন্তিত দেখাল জুগরকে। ‘এই এলাকাটা নিষিদ্ধ এলাকা। এখানে এসেছি ঢেঁকুরদের নিয়ে গবেষণার জন্য। ওদের জীবনপ্রণালী জানতে চাই।’

‘কেন?’

‘ব্রোমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে।’

‘সেজন্যই তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন ব্রোমা?’

‘না। আমি আমার নিজের ইচ্ছেয়ই এসেছি।’

‘ব্রোমার কাছে ঢেঁকুরদের বিষয়ে জানিয়ে তোমার লাভ কি?’

‘যাতে ওদের বিরুদ্ধে ব্রোমাকে সজাগ করতে পারি। তাহলে ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য সেনাবাহিনী পাঠাবেন ব্রোমা।’

‘একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না। তোমাকে দেখে আমার চেয়ে বেশি বয়সী মনে হয় না। একজন তরুণকে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এত কথা বলার সুযোগ কি দেবেন রাজা?’

‘দেবেন। কারণ তিনি আমার চাচা।’

‘তার মানে তুমি রাজার ভাতিজা?’

‘হ্যাঁ।’

হাসল তিশা। ‘খুব ভাল। খুশি হলাম।’

‘খুশি হতে তো বলিনি আমি।’

‘আমি যে খুশি হয়েছি, এটা শুনে সত্যিই কি ভাল লাগছে না তোমার? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারো? একজন মানুষের মেয়েকে কি এতই অসুন্দর লাগছে তোমার কাছে?’

মাথা নামাল জুগর। ‘তোমার পানি খাওয়া শেষ হয়েছে, তিশা?’

‘শুধু তিশা বলে ডেকো আমাকে।’

‘তোমার শেষ হয়েছে?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু এত দ্রুত কি চলতেই হবে তোমাকে? আমি কান্ত হয়ে গেছি।’

‘রাত নামার আগেই যুহারে ফিরতে হবে আমাদের।’

‘কী বলছ তুমি? এখন কি রাত নয়?’

মাথা নাড়ল জুগর। ‘না। তোমাদের পৃথিবীতে রাত হতে পারে, তবে আমাদের এই স্বপ্নলোকে এখন দিন। রাতের বেলা কিছুই দেখা যায় না। আর তখনই ঢেঁকুরদের সুযোগ। ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে ওরা।’

কেঁপে উঠল তিশা। ‘এই এলাকায় কি অনেক বেশি ঢেঁকুর আছে?’

থামল জুগর। নাক উঁচু করে বাতাস শুঁকল। ‘হ্যাঁ, অনেক আছে। সবখানেই ছড়িয়ে আছে ওরা। তাড়াতাড়ি করা দরকার আমাদের।’

নালাটার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল ও। সরে এল।

ওকে অনুসরণ করল তিশা। আবার একটা কান্তিকর পাহাড় বেয়ে ওঠা।

‘কথা বলব? চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছে না,’ তিশা বলল।

‘অনর্গল বকবক তো করেই চলেছ। নাহ্, তোমার কথার কবল থেকে নিস্তার নেই। ঠিক আছে, বলো, তবে স্বর নামিয়ে, প্লিজ।’

‘বাহ্, প্লিজ বললে। খুশি হলাম।’

‘আমি তোমাকে বলেছি, তোমাকে খুশি করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।’

‘তোমার কথা বিশ্বাস করলাম,’ তিশা বলল। ‘আচ্ছা, ওই যে বললে, ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য- ওরা কি সংখ্যায় খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছে?’

‘সে-রকমই মনে হলো।’

‘ওরা দেখতে কেমন? মানে বড়সড় কোনও জন্তুর মত?’

‘না।’

‘বুঝিয়ে বলবে, প্লিজ?’

‘তুমি তো আক্রান্ত হয়েছিলে। ওটাকে দেখনি?’

‘ভাল করে দেখার সুযোগ পাইনি। মনে হয়ে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।’

‘কোথা থেকে এসেছে ওরা? অন্য প্রাণীর মত ওদেরও বাচ্চা আছে?’

ভাবল জুগর। তারপর বলল, ‘এটা এক রহস্য। এ নিয়ে যুহারের জ্ঞানী পুরুষ নারীরা অনেক তর্ক করেছে।’ আবার ভাবল ও। মনে হলো কেঁপে উঠল। তারপর বলল, ‘কারও কারও মতে অবচেতন মনের ভয় থেকে ওদের জন্ম।’

ভ্রƒকুটি করল তিশা। ‘তার মানে? তোমার লোকের ওদের সৃষ্টি করে?’

মাথা নাড়ল জুগর। বনের দিকে তাকাল। ‘এখানে এ বিষয়ে আলোচনা করাটা ঠিক হচ্ছে না।’

দ্বিধা করে স্বর নামিয়ে তিশা বলল, ‘বুঝলাম। কৌতূহলটা আসলে বেশি দেখিয়ে ফেলছি।’

‘ঢেঁকুরদের ব্যাপারে বেশি কৌতূহল ভাল নয় মোটেও।’

‘মানুষের জন্য?’

‘সবার জন্য,’ জুগর বলল।

‘ব্রোমা কেমন লোক?’

‘রাজা আবার কেমন হয়? রাজাদের মতই।’

‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে কেমন?’

‘এমনভাবে বলছ যেন ব্রোমা একজন মানুষ।’

‘আসলে কি মানুষের মত?’

‘না।’

আবার ভ্রƒকুটি করল তিশা। ‘হুঁ। তোমার কি মনে হয়, তিনি আমাকে সাহায্য করবেন?’

‘না।’

‘তাহলে তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?’

‘আমি তো নিতে চাইনি, তুমিই যেতে চাইলে। আবারও বলছিল, আমি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি না।’

‘তিনি নিশ্চয় জানেন, আবার আমি কিভাবে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব?’

অনিশ্চিত মনে হলো জুগরকে। ‘ব্রোমা অনেক কিছুই জানেন। তবে সবচেয়ে বেশি জানেন, চুপ করে থাকতে।’

তিশা ল করেছে, ব্রোমার কথা বলার সময় স্বর কেমন পাল্টে যায় জুগরের।

‘তোমার চাচার সঙ্গে তোমার তেমন আন্তরিকতা নেই, তাই না?’

‘আমি তাঁকে কখনও চাচা বলে ডাকি না। আর সবার মতই মহামান্য রাজা বলে ডাকি।’

‘তোমার সঙ্গে আন্তরিকতা আছে কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম। আছে?’

সামান্য চুপ করে থেকে জবাব দিল জুগর, ‘আমি তাঁর মন বুঝতে পারি না। কেন তিনি ঢেঁকুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন না, তা-ও বুঝি না। আমার আশঙ্কা হচ্ছে…’ থেমে গেল জুগর।

‘তোমার উদ্বেগের কারণ?’

কিন্তু জবাব দিল না জুগর।

একনাগাড়ে হেঁটে চলেছে ওরা। আগের চেয়ে গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে জুগর। তাল রেখে চলতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে তিশা। গরম হয়ে গেছে শরীর। দরদর করে ঘামছে। তা-ও যদি পথটা সহজ-সরল হতো। বনের ভেতর দিয়ে গেছে। আঁকাবাঁকা। এবড়ো-থেবড়ো। মুখে বাড়ি খাচ্ছে ডালপালা, চড়াৎ চড়াৎ করে থাপ্পড় মারছে যেন। এড়ানোর জন্য দুই হাত সামনে বাড়িয়ে রাখতে হচ্ছে তিশাকে।

অসংখ্য নদী-নালা পেরোল ওরা। মাঝে মাঝে থেমে পানি খাওয়ার জন্য থামল তিশা। তবে সত্যিকারের বিশ্রাম নেয়া যাকে বলে, তা নিতে পারল না। দিনের আলো নিভে গেলে কোন বিপদে পড়বে, সবুজ আলো নেভার পরের অন্ধকারের রূপ কতখানি ভয়ঙ্কর হবে, এই দুশ্চিন্তায় সে নিজেও থামতে চাইল না।

উঁচু একটা পাহাড়ের কোলে এসে হঠাৎ থেমে গেল জুগর। নাক তুলে শুঁকতে লাগল।

তাড়াতাড়ি ওর পাশে এসে দাঁড়াল তিশা। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো?’

‘কাছাকাছি রয়েছে ওরা,’ স্বর নামিয়ে জবাব দিল জুগর।

‘ঢেঁকুররা?’

‘হ্যাঁ। আমাদের পিছু নিয়েছে।’

আতঙ্কিত হয়ে তিশা বলল, ‘তুমি শিওর?’

‘হ্যাঁ।’ চারপাশে তাকাল জুগর। ‘পাহাড়ের কোলে এভাবে খোলা জায়গায় না থেকে, আড়ালে চলে যাওয়া উচিত আমাদের।’ হাত তুলে একটা গিরিসঙ্কটের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সরু একটা নদী দেখাল ও। ‘ওই নদীটার উজানে একটা গুহা আছে। ওখানে যদি চলে যেতে পারি, তাহলে বাধা দেয়ার সুযোগ পাব। ওটাই আমাদের একমাত্র ভরসা।’

‘কয়টা ঢেঁকুর আমাদের পিছু নিয়েছে? সেটা বুঝতে পারছ?’

তলোয়ারের হাতল চেপে ধরল জুগর। ‘কম করে এক ডজন।’

শুনে তিশার মনে হলো আবার বেহুঁশ হয়ে যাবে। ‘ওদের ঠেকাবে কী করে? কোন জিনিসকে ভয় পায় ওরা?’

‘কোন কিছুকেই না,’ জুগরের জবাব।

পাহাড়ের উপত্যকা ধরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড় দিল ওরা। ঘন গাছের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে অসুবিধে হচ্ছে তিশার, তা ছাড়া বারবার শিকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ছে। তবে ওর জন্য স্বস্তির ব্যাপার হলো, কিছুতেই ওকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে না জুগর। প্রতিবার পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে হাত ধরে টেনে তুলছে।  পেছনে শোনা যাচ্ছে ছুটে আসা অসংখ্য পায়ের শব্দ। ওদের শব্দ শুনতে পাচ্ছে তিশা, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। ব্যাপারটা ওর ভয় আরও বাড়িয়ে দিল।

অবশেষে নদীর কিনারে পৌঁছল ওরা।

দম ফুরিয়ে গেছে তিশার। তবু থামল না। জুগরের সঙ্গে নদীর উজানের দিকে দৌড়ে চলল।

এক জায়গায় এসে ওকে থামিয়ে দিল জুগর। ‘আর দৌড়ে লাভ নেই। দেরি হয়ে গেছে।’

‘মানে?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল তিশা।

বাতাস শুঁকল জুগর। ‘ওরা গুহাটা চেনে। আমাদের উদ্দেশ্য টের পেয়ে শর্টকাটে আগে চলে গেছে। সামনে থেকে এখন হামলা চালাবে আমাদের ওপর।’

মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল তিশা। ‘আমাদের বাঁচার কি কোনই উপায় নেই?’

ভুরু উঁচু করল জুগর। ‘কী হবে, জানি না। রুখে দাঁড়াব। যদি মরতেই হয়, মরার আগে যে ক’টাকে পারি, শেষ করে দেব।’

‘কিন্তু মরার কথা ভাবি না আমি। আমাকে বাঁচতে হবে।’

পেছনের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল জুগর। বাড়িয়ে দিল তিশার দিকে। অবশেষে ওর চোখে সমবেদনা দেখতে পেল তিশা।

‘প্রথমে লড়াই করবে’, জুগর বলল। ‘যদি দেখো হেরে যাচ্ছ, কোনমতেই আর পারবে না, নিজেকে মেরে ফেলো। কোনমতেই ওদের হাতে ধরা দিয়ো না।’

আতঙ্কিত হয়ে ছুরিটা ঠেলে সরিয়ে দিল তিশা।

‘না,’ দম আটকে আসছে ওর। ‘আমি সেটা করতে পারব না। নিজের জীবন নিজে নিতে পারব না।’

আবার ছুরিটা ওর দিকে ঠেলে দিল জুগর।

‘কিছুতেই ওদের কাছে ধরা দিয়ো না,’ কোমল কণ্ঠে বলল ও। ‘ওরা তোমাকে কি কষ্ট দেবে, কল্পনাই করতে পারবে না। তারচেয়ে মৃত্যু ভাল।’

মতিশা হয়ে মাথা নাড়ল তিশা।

সবুজ অন্ধকার বনের ভেতরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।

হঠাৎ করেই ভয় কোথায় উধাও হয়ে গেল তিশার। প্রচণ্ড সাহস যেন জোয়ারের পানির মত প্লাবিত করে দিল মনকে।

‘না, আত্মহত্যা কখনই ভাল নয়,’ হাত বাড়িয়ে ছুরিটা নিতে নিতে বলল ও। ‘আমি ধরাও দেব না। যদি মরতেই হয়, ঢেঁকুরদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মরব।’

এই প্রথম হাসতে দেখা গেল জুগরকে। ‘তুমি একজন সাহসী মানুষ, তিশা।’

তবে এই সাহসী কথা পরের কয়েক মিনিটে তিশাকে কোনই সাহায্য করতে পারল না।

বাঁয়ে একটা সবুজ বস্তুপিণ্ড চোখে পড়ল তিশার। পাক খেয়ে সেদিকে ঘুরে গেল জুগর। তীর ছুড়ল। ছোট্ট তীরটা উড়ে গেল গাছের ফাঁক দিয়ে। অন্ত্রভেদী একটা চিৎকার দিয়ে পড়ে গেল দানবটা। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ দিকে আরও দুটো সবুজ দানব উদয় হলো। ভয়ঙ্কর চেহারা। চোখ জ্বলছে আগুনের মত। তীর ছুড়ে একটাকে মেরে ফেলল জুগর। কিন্তু ধনুকে আবার তীর পরানোর আগেই তৃতীয়টা ওদের ধরতে এল। টান দিয়ে তলোয়ার বের করল জুগর। ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দানবটা। চোখের পলকে ঘটে গেল এতগুলো ঘটনা। ছুরি তুলে দানবটার পিঠে বসিয়ে দিতে গেল তিশা। টের পেল, ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা মস্ত আকৃতি। ছুরি বসানো আর হলো না। ঘুরে গিয়ে দেখতে পেল, মস্ত একটা থাবা ওর দিকে ছুটে আসছে।

প্রচণ্ড আঘাতে চোখে যেন সর্ষে ফুল দেখতে লাগল ও।

মাথাটা মনে হলো ফেটে যাবে।

তারপর ঘন অন্ধকার।

আট.

তৃণা, তরু আর তৈমুরের মনে হলো, আকাশ থেকে নিচে পড়ছে ওরা। রাতের অন্ধকার থেকে সবুজ অন্ধকারে। কিন্তু মাটিতে পড়ে একটুও ব্যথা পেল না। অদ্ভুত ব্যাপার। পড়েই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে সবুজ জানোয়ারটাকে, কিংবা দানবটাকে অনুসরণ করে আলমারির পেছনের সবুজ ফোকর দিয়ে এখানে এসেছে ওরা, ওটাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তাড়াতাড়ি একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে ওটার মাথা ল্য করে ছুড়ে মারল তৃণা। দানবটা হয়তো ভাবল, অনেক হয়েছে, বিশ্রী এই মানুষের মেয়েটা বড়ই খারাপ! জোরে একবার গর্জে ওঠে, ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে হারিয়ে গেল বনের  ভেতরে।

এটা কিসের বন?

কোথায় রয়েছে ওরা?

ভাবছে তিনজনেই। অবাক বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল।

‘আমরা চলে এসেছি,’ কথাগুলো যেন ছিটকে বেরোল তৈমুরের মুখ থেকে।

বিষণœ হয়ে আছে তৃণা। বনটার মতই বিষণ।

‘খুশি হওয়ার মত কোন কারণ দেখছি না এখনও,’ বলল ও।

ভালমত পরিবেশটা দেখে নিল তরু, বিশেষ করে আকাশটা। মনে হচ্ছে যেন ঠিক ওদের মাথার ওপরে ঝুলে রয়েছে। সবুজ রঙের মৃদু আলো বিকিরণ করছে। বলল, ‘অন্য এক ডিমেনশনে চলে এসেছি আমরা, কোন সন্দেহ নেই। আশা করি, তিশাও এখানেই এসেছে।’

‘আর আশা করি,’ তৃণা বলল, ‘ওকে এখনও সবুজ দানবে খেয়ে ফেলেনি।’

‘তিশার মৃত্যু নিয়ে আমরা কোন কথা বলব না বলে একমত হয়েছিলাম,’ মনে করিয়ে দিল তৈমুর।

মাটির দিকে তাকাল তরু। হাত তুলে দেখাল। ‘ওই দেখো, দুই জোড়া পায়ের ছাপ। এক জোড়া তো তিশার বলেই মনে হচ্ছে।’

ছাপের পাশে নরম মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল তৈমুর।

‘দেখো,’ বলল ও, ‘এক জোড়া ছাপের চারটে করে আঙুল।’

তৈমুরের পাশে বসে তরুও ছাপগুলো পরীক্ষা করল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই ছাপ যার, সে পৃথিবীর প্রাণী বলে মনে হচ্ছে না।’

‘ছাপগুলো কোন দানবের নয় তো?’ তৃণার প্রশ্ন।

‘না,’ পুরু কাচের চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বলল তৈমুর। ‘এই ছাপগুলো প্রায় মানুষের পায়ের মত, শুধু আঙুল একটা কম।’

মাথা ঝাঁকাল তরু। চারপাশে তাকাল। ডান দিকে চলে গেছে ছাপগুলো। নরম কাদামাটি আর ঘাসের মধ্যে বেশ ভালভাবেই ছাপ পড়েছে, তাই অনুসরণ করা কঠিন হবে না। ‘হতে পারে, এখানে এসেই কোনরকম সাহায্য পেয়েছে তিশা।’

‘পেলেই ভাল,’ তৈমুর বলল।

‘এসেই স্থানীয়দের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে, তিশার স্বভাব,’ তৃণা বলল, ‘ছাপটা তিশারই।’

উঠে দাঁড়াল তরু। ‘ওদের অনুসরণ করা দরকার।’ পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে জ্বালল ও। ভুতুড়ে সবুজ আলোকে ফুঁড়ে বেরোল যেন তীব্র সাদা আলো। ‘ভাগ্যিস সঙ্গে করে এনেছিলাম এটা।’ আজব আকাশের দিকে তাকাল ও। ‘মনে হয় অন্ধকার হয়ে আসছে।’

তৈমুরও উঠে দাঁড়াল। ‘আমাদের কতখানি সামনে আছে, ও কিছু আন্দাজ করতে পারো?’

‘আমাদের ডিমেনশনের সঙ্গে যদি এখানকার সময়ের মিল থাকে,’ তরু জবাব দিল, ‘তাহলে ধরে নেয়া যেতে পারে, অন্তত দুই ঘণ্টার পথ আগে রয়েছে ওরা।’

ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে তৃণা বলল, ‘একটা ব্যাপারে শিওর, ওর পায়ে জুতো নেই।’

‘বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দানবের খপ্পরে পড়েছে,’ তৈমুর বলল। ‘জুতো পরার সময়ই পায়নি।’

‘ভালই লাগবে স্থানীয় ছেলেটার, নিজের সঙ্গে মিল দেখে,’ তৃণা বলল। ‘দুজনেরই খালি পা। একই রকম আদিম।’

‘ও যে বেঁচে আছে, খুশি হওনি তুমি?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল।

‘হব, তখন, যখন আমরা সবাই মিলে বাড়ি ফিরে যাব,’ তৃণা জবাব দিল। ‘মাথা খাটিয়ে এখানে তো নিয়ে এলে তুমি আর তরু মিলে, এখান থেকে ফিরব কী করে সেটা কিছু ভেবেছ?’

টর্চটা শক্ত করে চেপে ধরল তরু। ‘সেটা পরে ভাবব।’

‘তার মানে কিভাবে ফিরব, এখনও জানো না। যাক, শুনে বড়ই শান্তি পেলাম,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

জবাব দিল না তরু। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে চলল। দেখেই বোঝা যায়, লম্বা লম্বা কদমে এগিয়েছে দু’জনে। জোরে হেঁটেছে।

‘মনে হচ্ছে, তিশার গাইড ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে,’ তরু বলল। ‘তার মানে, কোন কিছুকে ভয় পাচ্ছে। সবুজ দানবকেই কি না কে জানে। হয়তো এ রকম আরও দানব আশপাশে রয়েছে।’

‘তোমার টর্চের আলো দেখে ওগুলো ভয় পেলেই বাঁচি এখন,’ তৈমুর বলল।

‘আমি তা মনে করি না,’ তৃণা বলল। ‘তৈমুর, তোমার লেজার পিস্তলটা আনলে না কেন?’

‘ভুলে গেছ নাকি?’ তৈমুর বলল। ‘ওটা তো ডাইনি এরিকা মুনের কাছে রয়ে গেছে, হ্যালোউইনের রাতে আমার কাছ থেকে নিয়েছিল।’

‘জানি,’ তৃণা বলল। ‘ফেরত নাওনি আর?’

‘চুপ, আস্তে!’ সাবধান করল তরু। ‘জোরে কথা বলে দানবগুলোকে আমাদের উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ো না। হয় আস্তে কথা বলো, নয়তো চুপ থাকো।’

‘আস্তে বললেও কথা আমাকে বলতেই হবে,’ তৃণা বলল। ‘এটা আমার কাছে শ্বাস নেয়ার মত। কথা বলতে না পারলে বোমার মতো ফেটে যাব আমি। ঘুমের মধ্যেও আমাকে কথা বলতে হয়।’

‘তাহলে ফিসফিস করে বলো,’ তরু বলল।

অনন্তকাল ধরে যেন হেঁটে চলল ওরা। পরের কয়েক ঘণ্টায়, আকাশের সবুজ আলো অনেক কমে গেছে, প্রায় কালোই হয়ে গেছে এখন। তরুর টর্চটা না থাকলে এতণে চলা বন্ধ হয়ে যেত ওদের। তবে ব্যাটারি আর কতণ টিকবে, সেটাই হলো চিন্তা।

‘আসার আগে নতুন ব্যাটারিই ভরেছিলাম,’ তরু বলল। ‘তবে সস্তা ব্যাটারি।’

‘সস্তা ব্যাটারি বানানো বন্ধ করে দেয়া উচিত,’ তৃণা বলল। ‘এসব কম দামি ব্যাটারি নিয়ে বেরিয়ে কতবার যে আমরা অন্ধকার বিপজ্জনক জায়গায় আটকা পড়েছি!’

আরও একটা পাহাড় বেয়ে চড়ার সময় হাঁপাতে হাঁপাতে তৈমুর বলল, ‘ওরা দু’জন তো অনেক পথ হেঁটেছে।’

মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘আমি এখন শিওর, রাত নামার আগেই কোনও একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে তিশার গাইড।’ থেমে কান পাতল ও। সামনে, নিচে পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটা নালা পেরিয়ে এসেছে ওরা, তবে এখন যেটার শব্দ শুনছে, সেটাকে রীতিমত নদী মনে হলো। ‘এই, তোমরা শুনতে পাচ্ছ?’

‘পাচ্ছি,’ তৈমুর বলল। ‘পানির শব্দ।’

‘না,’ হাঁটা থামাল না তরু। ‘বনের মধ্যে অন্য শব্দ হচ্ছে। আমাদের কাছাকাছিই।’ আলো নিভিয়ে দিল ও। গাঢ় অন্ধকার যেন গলা টিপে ধরল ওদের।

‘আরে কী করছ! জ্বালো! জ্বালো!’ হিসিয়ে উঠল তৃণা।

‘!’ সাবধান করল তরু। ‘আলো জ্বেলেও হয়তো ওদের দেখতে পাব না আমরা, তবে আলো থাকলে ওরা আমাদের ঠিকই দেখবে। তারচেয়ে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করা ভাল।’

‘এ মুহূর্তে একটুও নিরাপদ বোধ করছি না আমি,’ তৃণা বলল।

‘শুনছ?’ ফিসফিস করে বলল তরু। ‘শব্দটা কাছে আসছে।’

‘আলো জ্বালো,’ মতিশা হয়ে বলল তৃণা। ‘নিশ্চয়ই ওই দানবগুলোর একটা। আলো দেখলে ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে।’

‘এই একটু আগে না বললে তুমি তা মনে করো না,’ তৈমুর বলল।

‘এখন করি!’ দাঁড়কাকের কর্কশ স্বর বেরোল তৃণার গলা থেকে।

‘চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো,’ ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলল তরু। ‘আমার মনে হয় না ওটা দানবের শব্দ। মনে হচ্ছে, মানুষের পায়ের।’

‘চার আঙুলওয়ালা মানুষ, না পাঁচ আঙুল?’ উদ্বিগ্নকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তৃণা। ‘পাঁচ আঙুল হলে আমি বেশি খুশি হই।’

‘ডাক দেব ওকে?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল।

‘না,’ তরু বলল। ‘আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ও। তাই এদিকেই আসছে।’

‘আমাদের চেঁচানো উচিত, যাতে শুনতে পায়,’ তৃণা বলল। মনে হলো, দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে ওর। অসহ্য হয়ে উঠেছে উত্তেজনা।

‘তিশা হতে পারে,’ তৈমুর বলল।

‘তাহলে ধরে নিতে হবে গত কয়েক ঘণ্টায় গাঢ় অন্ধকারে দেখার মতা অর্জন করেছে ওর চোখ,’ বলল তরু।

অপো করতে লাগল ওরা। ঘামছে। ঢিপ ঢিপ করে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড।

শব্দটা, যতটা সম্ভব কম শব্দ করে, এগিয়ে আসছে।

অবশেষে অন্ধকারে শোনা গেল একটা কণ্ঠ, ‘এই, তোমরা তিনজনে তিশাকে চেনো?’

সাবধানে জবাব দিল তরু, ‘হ্যাঁ, চিনি। আমরা ওর বন্ধু। তুমি কে?’

‘আমার নাম জুগর। তোমাদের পৃথিবীর সময়ের হিসেবে কয়েক ঘণ্টা আগে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ওর সঙ্গে হেঁটেছি আমি।’

‘ও এখন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল তরু। ‘তোমার সঙ্গে আছে?’

দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘না। ঢেঁকুররা ওকে ধরে নিয়ে গেছে?’

‘ঢেঁকুর?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘বিচ্ছিরি ওই সবুজ রঙের শামুকের মত পিচ্ছিল দানবগুলো?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওদের নাম ঢেঁকুর কেন? সারাণ ঘাড়–ৎ-ঘুড়–ৎ করে ঢেঁকুর তোলে?’

‘না। কেন ঢেঁকুর নাম রাখা হয়েছে আমি জানি না,’ জুগর জবাব দিল। আবার সামান্য দ্বিধা করে বলল, ‘ভয়ঙ্কর প্রাণী ওরা। তিশা এখন ভীষণ বিপদের মধ্যে রয়েছে। ওদের ক্যাম্পটা দেখেছি আমি। ওকে মুক্ত করার চেষ্টা করব।’

‘ওকে নিতেই বা দিলে কেন?’ ধমকের সুরে বলল তৃণা। ‘এখন মুক্ত করতে চাও।’

‘নিচের নদীর ধারে ঢেঁকুররা হামলা করেছিল আমাদের ওপর,’ জুগরের কথায় বিষণœতার ছোঁয়া। ‘একসঙ্গে অনেক ঢেঁকুর। গোটা ছয়েককে মেরে ফেলেছি আমি। লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তিশার দিকে মনোযোগ দিতে পারিনি। ওর চিৎকার শুনে দেখলাম, ঢেঁকুররা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’

‘বানিয়ে গল্প বলার ওস্তাদ তুমি,’ তৃণা বলল।

‘আহ্, তৃণা,’ রুকণ্ঠে বলল তরু, ‘অভদ্রতা কোরো না।’

‘অভদ্রতা মানে?’ মুখিয়ে উঠল তৃণা। ‘চার পাওয়ালা এই উদ্ভট প্রাণীটা রাত দুপুরে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে বলে কি না আমাদের বন্ধুকে নিয়ে অনেক পথ হেঁটে এসেছে, এখন এসে বলছে ওকে ঢেঁকুর না ঘুড়–ৎ, কারা জানি তুলে নিয়ে গেছে, আর তুমি ওর কথা বিশ্বাস করতে চাইছ। আমরা ওকে চিনি না, জানি না…ও নিজেই ফেকুরদের দলের হয়ে ওদের সহযোগিতা করছে কি না কী করে বুঝব?’

‘ফেকুর না, ঢেঁকুর,’ শুধরে দিল জুগর। ‘আর আমি ওদের সহযোগিতা করছি না। ওরা আমার জাতশত্র“। তিশাকে উদ্ধারে তোমরা আমাকে সাহায্য করতে না চাইলে নেই, সেটা তোমাদের ব্যাপার। তবে আমি চেষ্টা করবই।’

‘কেন?’ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল তরু। ‘খুব অল্প সময় আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার। ওর জন্য তোমার জীবনের ঝুঁকি নেবে কেন?’

তৃতীয়বারের মত দ্বিধা করল জুগর। ‘সেটা আমার ব্যাপার। কারণ ও…ও এখন আমার বন্ধু।’

‘কিভাবে তোমাকে সাহায্য করব আমরা?’ জানতে চাইল তরু।

‘একটু আগে তোমার হাতে একটা শক্তিশালী আলো জ্বলছিল,’ জুগর বলল। ‘ওটা কি তোমার কথা শোনে? তুমি চাইলেই জ্বলে ওঠে?’

‘হ্যাঁ,’ তরু বলল।

‘খুব ভাল,’ জুগর বলল। ‘ওই আলো ব্যবহার করে ঢেঁকুরদের চমকে দিতে পারব। খুব সামান্য সময়ের জন্যও যদি ওদের তাড়াতে পারি, ক্যাম্পে ঢুকে তিশাকে বের করে আনতে পারব।’

‘ওকে কি বেঁধে রেখেছে?’ জানতে চাইল তৈমুর।

‘হ্যাঁ। এখান থেকে সামান্য দূরে ওদের ক্যাম্প। মস্ত আগুনের কুণ্ড জ্বেলেছে। তিশাকে জ্যান্ত খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

‘আমি জানতাম,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

‘তোমার সঙ্গে আমরা চুপি চুপি ক্যাম্পে ঢুকে যেতে পারি না?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর। ‘তাহলে বেশি সাহায্য করতে পারতাম।’

‘না। মানুষের প্রিতা খুব কম। চোখের পলকে তোমাদের ঘিরে ফেলবে ঢেঁকুররা।’ একটু থেমে জুগর বলল, ‘আমার হাত ধরে অন্ধকারে এগোবে তোমরা। আলোটা নিভিয়ে রাখো। আমি যখন বলব, সঙ্গে সঙ্গে জ্বালবে।’

‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না,’ তৃণা বলল। ‘তুমি যে আমাদেরকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছ না, কী করে বুঝব?’

‘এ মুহূর্তে তোমাকে বিশ্বাস করানোর মত কোন প্রমাণ আমি দিতে পারব না,’ জুগর বলল। ‘হয় এখানে থাকো, নয়তে আমার সঙ্গে এসো। পছন্দটা তোমাদের।’

‘আমি ওর সঙ্গে যেতে চাই,’ তৈমুর বলল।

‘আমিও,’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল তরুও।

‘দারুণ!’ অন্ধকারে তৃণার মুখ বাঁকানো দেখতে পেল না দু’জনের কেউ। ‘প্রাণীটার মুখটা পর্যন্ত আমরা কেউ দেখিনি এখনও, ওর কথায় বিশ্বাস করে মানুষখেকো ঢেঁকুরদের আস্তানায় যেতে চাইছ।’

সাবধানে জিজ্ঞেস করল জুগর, ‘তোমার নামটা কী, নারী?’

ঝাঁঝিয়ে উঠল তৃণা, ‘ধ্যাত্তোর, বলে কী? নারী! মেয়ে বলতে অসুবিধেটা কী? এই জংলী, আমার নাম তৃণা। কেন, নাম জিজ্ঞেস করছ কেন?’

‘তিশার চেয়ে তুমি আলাদা।’

‘আমাকে কি অপমানের চেষ্টা করছ?’

‘আমি সত্যি কথাটা বললাম,’ জুগর বলল।

তৃণাকে থামানোর জন্য তাড়াতাড়ি জুগরের হাত ধরল তৈমুর। তার হাত ধরল তরু। তৃণা ধরল তরুর হাত। তারপর একটা মানব-শিকল তৈরি করে অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল দলটা। একে তো গতি ধীর, তার ওপর তৃণার বকবকানি, বিরক্ত হয়ে গেল জুগর। শেষ পর্যন্ত তৃণাকে ধমক দিল, চুপ করার জন্য। লাভ হলো না। শেষে জুগর ধরেই নিল, তৃণা এসেছে ভিন্ন কোনও ডিমেনশন থেকে; তিশা, তরু কিংবা তৈমুরদের ডিমেনশন নয়। বিড়বিড় করেই চলল তৃণা। একনাগাড়ে গালি দিতে থাকল মানুষখেকো ভয়ানক দানবগুলোকে উদ্দেশ করে।

সামনে একটা হলুদ আভা দেখা গেল।

খানিকটা এগোতে আরেকটু বাড়ল আভাটা। জুগরের অবয়ব অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল ওরা।

‘আরে, এর কান তো দেখি বিড়ালের কানের মত চোখা!’ তৃণার কণ্ঠে অসন্তোষ।

ওকে চুপ থাকতে ইশারা করল জুগর। মানুষেরই মত। অবাক হলো ওরা।

‘ঢেঁকুরদের ক্যাম্পের কাছে চলে এসেছি,’ জুগর বলল। ‘আমি এখন ডান পাশ ঘুরে যাব। তোমাদের যার কাছে আলো আছে সে পা টিপে টিপে যাও সোজাসুজি আগুন ল্য করে। আগুনের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গাছের আড়ালে দাঁড়াবে। একটা শিসের শব্দ শুনতে পাবে। পাখির ডাকের মত। ওটা আমার সঙ্কেত। সঙ্গে সঙ্গে তোমার আলোটাকে জ্বলে উঠে ঢেঁকুরদের মুখে পড়ার আদেশ দেবে। খুব সামান্য সময়ের জন্য চমকে যাবে ওরা। ওই সুযোগে তিশাকে মুক্ত করে নিয়ে আসব আমি।’

‘আর তারপর ঢেঁকুররা তেড়ে আসবে আমাদের পেছনে,’ তৃণা বলল।

‘সেই সম্ভাবনাই বেশি,’ অস্বীকার করল না জুগর। ‘তবে এভাবে ছাড়া ভয়ঙ্কর মৃত্যু থেকে তিশাকে বাঁচানোর আর কোন উপায় দেখছি না আমি।’

‘আমার ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেখতে নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে না তোমার,’ তৃণা বলল।

‘জুগর,’ তৈমুর বলল, ‘তোমার কাছে তলোয়ার আর তীর-ধনুক দেখতে পাচ্ছি। একটা অস্ত্র আমাদের দেবে? তরু যখন আলো জ্বালবে, আমি হয়তো তখন হামলা করতে ছুটে আসা কোন ঢেঁকুরকে থামাতে পারব।’

তলোয়ারটা দিতে চাইল জুগর। ‘আমার কাছে একটা ছুরি আছে, তিশাকে দিয়েছিলাম, কিন্তু ঢেঁকুরে ধরার পর হাত থেকে ফেলে দিয়েছিল ও। সেটা দিয়ে ওর বাঁধন কাটতে পারব। যদি ঢেঁকুরকে মারতে চাও, তাহলে সোজা ওর হৃৎপিণ্ডে আঘাত করবে। ওটাই ওদের একমাত্র দুর্বল জায়গা।’

‘কেন, যদি মাথা কেটে ফেলি?’ তৈমুর জানতে চাইল।

‘তাতে হয়তো গতি কমাতে পারবে, ঠেকাতে পারবে না,’ জুগর বলল। ‘স্বাভাবিক জ্যান্ত প্রাণীর মত নয় ওরা।’

‘সেটা আমরা আগেই জানি,’ তৃণা বলল।

ওদের দিকে তাকিয়ে বলল জুগর, ‘আমাদের সমাজে কাউকে গুড-লাক জানানোর প্রথা নেই, তবে তিশার সঙ্গে কিছুণ থেকে বুঝেছি, এই কুসংস্কারটা তোমাদের ভালমতই আছে। তাই আমি তোমাদের প্রথামতই গুড-লাক জানাচ্ছি। তোমাদের সবাইকে গুড-লাক। নদীর ধারে দেখা হবে আবার।’

‘তোমাকেও গুড-লাক,’ তৃণা বলল।

অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকাল সবাই।

তারপর হাঁটতে শুরু করল জুগর। গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল। পা টিপে টিপে সামনে এগোল তরু আর তৈমুর। ওদের  পেছনে তৃণা।

‘আমাদের সঙ্গে আসার দরকার নেই তোমার,’ তৈমুর বলল।

‘আহা, যেন এই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকতেই আমার ভাল লাগবে,’ তৃণা জবাব দিল।

অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি চলে এল ওরা।

ঢেঁকুরদের হই-হট্টগোল কানে এল।

‘তৃণা ঠিকই বলেছে,’ তরু বলল, ‘এখন তোমার লেজার পিস্তলটা থাকলে খুব ভাল হতো।’

‘এরিকার সঙ্গে আবার দেখা হলে চেয়ে নেব,’ তৈমুর বলল।

ঢেঁকুরদের দেখতে পাচ্ছে ওরা। কম করেও দশটা হবে। আগুন ঘিরে নাচছে। ভয়ানক মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে। মনে হলো, আগুনের মাঝখানে চড়ানো বিশাল হাঁড়ির পানি ফোটার অপো করছে। কিছুটা দূরে মাটিতে পড়ে আছে তিশা। একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা। মনে হয়, বেহুঁশ। একটুও নড়ছে না। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছে তরুরা তিনজনে।

‘খোদাই জানে বেঁচে আছে কি না,’ ফিসফিস করে বলল তৃণা।

‘জুগর তো বলল, আছে,’ জবাব দিল তৈমুর।

‘এই আগুন কিন্তু যথেষ্ট উজ্জ্বল,’ তরু বলল। ‘এর মধ্যে টর্চের আলো ওদের ওপর কোনও প্রভাব ফেলবে কি না বোঝা যাচ্ছে না।’

‘তবে সাদা আলো তো ফেলবে,’ তলোয়ারটা উঁচু করে ধরল তৈমুর। যথেষ্ট ভারী। ‘হয়তো এ ধরনের আলো কখনও দেখেনি ওরা।’

‘আশা করতে দোষ নেই,’ তরু বলল।

মৃদু একটা শিসের শব্দ শোনা গেল, পাখির ডাকের মত।

এতই মৃদু, গুরুত্ব দিল না ঢেঁকুররা।

পরস্পরের দিকে তাকাল তরুরা তিনজনে।

তারপর সামনে লাফ দিল তরু। টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল ঢেঁকুরদের মুখে।

লাফিয়ে উঠে তৃণাও চেঁচানো শুরু করল, নেকড়ের মত।

উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল তরু ও তৈমুর, ভাবছে, পাগল হয়ে গেল কি না।

‘ওরা ভাববে, আমি মায়ানেকড়ে,’ বলেই আবার চোঁচাতে লাগল তৃণা।

টর্চের আলো, না তৃণার বিকট চিৎকার, কোনটা যে ঢেঁকুরদের ভয় দেখাল, বোঝা গেল না। একটা মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল আগুনের চারপাশে। তাড়াহুড়া করে সরতে গিয়ে একে অন্যের গায়ের ওপর পড়ল কয়েকটা ঢেঁকুর। ধাক্কা লেগে আগুনের ওপর পড়ল একটা। গায়ে আগুন ধরে যাওয়ায় গলা ফাটিয়ে এমন চেঁচানো শুরু করল, তৃণার চিৎকারও তার কাছে কিছু না। আগুনের কাছ থেকে দূরে গাছের কাছে জুগরকে হাঁটু গেড়ে বসতে দেখা গেল। ছুরি দিয়ে তিশার দড়ি কাটছে।

তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেল ঢেঁকুরদের হট্টগোল। তাকিয়ে রইল টর্চের দিকে। এমনকি যে ঢেঁকুরটার গায়ে আগুন ধরেছিল, সে ওটা নিভিয়ে ফেলে চুপ করে আলোর দিকে তাকাল। ভয় কাটিয়ে উঠছে। উদ্বিগ্ন হলো তরুরা তিনজন।

‘এবার পড়ব আসল বিপদে,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

ধীরে ধীরে যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ঢেঁকুররা।

এগোতে শুরু করল তরুদের দিকে।

‘তৃণা,’ তরু জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার লাইটারটা আছে তোমার সঙ্গে?’

‘আছে। কী করব ওটা দিয়ে?’ জানতে চাইল তৃণা। ‘সিগারেট ধরিয়ে দেব, ডিনার খাওয়ার পর সুখটান দেবে?’

‘আগুনের ওপর ছুড়ে ফেল,’ তরু বলল। ‘দপ্ করে জ্বলে উঠে বিস্ফোরিত হবে। তাতে হয়তো টর্চের আলোর চেয়ে বেশি ভয় পাবে ঢেঁকুররা।’

টান দিয়ে পোশাকের ভেতর থেকে লাইটারটা বের করে আনল তৃণা। ‘তোমার কথাই যেন ঠিক হয়। জানো এটার দাম কত? কাজ না হলে পুরো টাকাটাই বিফলে যাবে।’

আগুনে লাইটার ছুড়ে ফেলল তৃণা।

তিশাকে মুক্ত করে ফেলেছে ওদিকে জুগর।

দুই হাতে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বনে ঢুকে গেল।

একটা মুহূর্ত সময় নিল। তারপর বিস্ফোরিত হলো লাইটারটা।

বেশ জোরাল শব্দ হলো। চমকে দিল ঢেঁকুরদের।

টর্চ নিভিয়ে দিয়ে পাক খেয়ে ঘুরে গেল তরু। ‘চলো, পালাই,’ বলেই দৌড়াতে শুরু করল।

বাকি দু’জন পিছু নিল ওর।

‘কোথায় যাচ্ছি?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর।

‘নদীর ধারে,’ তরু বলল। ‘ভুলে গেছ, ওখানেই যেতে বলেছে আমাদের জুগর?’

‘কিন্তু যদি ঢেঁকুররা পিছু নেয়?’ তৃণার প্রশ্ন।

‘তাহলে সারা জীবন ধরে যে ঘটনাটা ঘটা নিয়ে ভয় পাও তুমি, অনবরত আমাদের সাবধান থাকতে বলো, সেটা ঘটবে, আর কখনও বিষয়টা নিয়ে ভয় পেতে হবে না, উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না, কারণ তুমি মরে যাবে,’ জবাব দিল তরু।

‘ঠিক বলেছ,’ একমত হলো তৃণা।

তবে ওদের অবাক করে দিয়ে পিছু নিল না ঢেঁকুররা।

নদীর ধারে তরুদের দেখা হলো জুগর ও তিশার সঙ্গে। আগে আগে এগোল জুগর। সবাইকে নদী পার করিয়ে নিয়ে এল একটা গুহার কাছে। ওর ধারণা, ওটাতে রাত কাটানো নিরাপদ।

তিশা ঠিক হয়ে গেছে। বন্ধুদের দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হলো।

‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না আমাকে বাঁচাতে চলে আসবে তোমরা,’ চেঁচিয়ে বলল তিশা। তরু ও তৈমুরের হাত ধরে ঝাঁকাল। তৃণার হাত ধরে ঝাঁকানোর পর ওকে জড়িয়ে ধরল। ‘তুমি কেমন আছো, তৃণা? অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে খুঁজে পেলে কিভাবে তোমরা?’

‘এর জন্য দিপুকেই ধন্যবাদটা দিতে হবে তোমাকে,’ তৃণা বলল।

অবাক হলো তিশা। ‘দিপু?’

‘সে এক লম্বা ইতিহাস, তিশা,’ তৈমুর বলল।

নয়.

পরদিন। অন্ধকার, বিষণœ এক সকাল। ঘুম ভাঙতে তিশা দেখল, গুহামুখে বসে পাহারা দিচ্ছে জুগর।

‘রাতে ঘুমাওনি?’ জিজ্ঞেস করল উদ্বিগ্ন তিশা।

মৃদু হাসল জুগর। ‘মানুষের মত এত বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না আমাদের।’

হেসে ওর বাহুতে আলতো চাপড় দিল তিশা। ‘থাক থাক, আবার তোমাদের বোলচাল শুরু কোরো না। কিছু কিছু ভদ্রতা শিখেছ অবশেষে।’

তরু আর অন্যদের ঘুমও ভেঙেছে।

গুহার বাইরে উঁকি দিল তরু। ‘তোমাদের দিনগুলো খুব অন্ধকার। এ সময় ঢেঁকুরদের আক্রমণ করার সম্ভাবনা আছে?’

‘আছে,’ জুগর জানাল। ‘তবে বেশি খিদে না পেলে আক্রমণ করে না। এ সময়টা ওদের জন্য অসময়। রাত জাগার পর এখন ওরা ঘুমাচ্ছে। সময় থাকতে থাকতে তাড়াতাড়ি যুহারে চলে যাওয়া উচিত আমাদের।’

‘ওখানে গিয়ে কী করব?’ বিড়বিড় করল তৃণা। ওর কণ্ঠে বিরক্তি। শক্ত পাথরের মেঝেতে ঘুমিয়ে আরাম পায়নি ও। বিশেষ করে ওর নিজের ঘরের গদি-বালিশ ছাড়া।

‘ব্রোমার সঙ্গে আমাদের দেখা করিয়ে দেবে বলেছে জুগর,’ তিশা বলল। ‘ব্রোমা ক্রিটাইনের রাজা। জুগরের চাচা। জুগর রাজবংশের লোক।’

তিশার কথা পছন্দ হলো না তৃণার। ‘ওই বর্ম লোকটা আমাদের জন্য কী করবে?’

‘বর্ম না, ব্রোমা,’ শুধরে দিল তিশা। জুগরের দিকে তাকাল। আবার ফিরল তৃণার দিকে। ‘রাজা আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।’

সবাই ল করল তিশার গলায় জোর নেই। আর জুগর মাথা নোয়াল।

‘রাজা কি সত্যি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন, জুগর?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল।

মুখ তুলল জুগর। ‘প্রথমে তোমাদেরকে সাহায্য করতে চাইতে হবে তাঁর। সত্যি বলতে কী, আমার সন্দেহ আছে। মানুষদের তিনি পছন্দ করেন না।’

‘তার মানে পৃথিবী থেকে আরও মানুষ এ ডিমেনশনে এসেছে,’ তরু বলল।

‘হ্যাঁ,’ জুগর বলল।

‘কিভাবে এল?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর।

‘আমার ধারণা, ঢেঁকুররাই তোমাদের পৃথিবী থেকে তাদের ধরে নিয়ে এসেছে। তোমরাও তো ওভাবেই এসেছ, তাই না?’

‘আমাকে ধরে এনেছে,’ তিশা বলল।

‘আমাদের ধরে আনেনি, তবে ঢেঁকুররা যে পথে যাওয়া-আসা করেছে, সেটা দিয়েই আমরা এসেছি,’ তরু বলল। ‘আমি এখন যা জানতে চাই, তা হলো ঢেঁকুরদের সঙ্গে তোমার চাচার সম্পর্কটা কী? রাতে তিশার কাছে শুনলাম, তোমার চাচা নাকি ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নারাজ।’

‘কথাটা ঠিকই। তবে কেন চান না, সেটা আমি বুঝতে পারি না,’ জুগর বলল।

‘ওদের সঙ্গে খাতির নেই তো?’ তরুর প্রশ্ন।

‘না,’ জুগর বলল। ‘ঢেঁকুরদের তো দেখলে। সমস্ত প্রাণী জগতের ওরা মহাশত্র“।’

‘আর কোন শত্র“ আছে তোমার চাচার?’ জানতে চাইল তরু। ‘তুমি তাঁকে রাজা বলছ, কিন্তু এ দেশের সবাই কি তা-ই মনে করে? কোন বিরোধী দল নেই তো?’

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল জুগর। বোঝা গেল, প্রশ্নটা তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

‘ক্রিটাইনের পরে হোমাব্রি নামে একটা করদ রাজ্য আছে, আমার চাচাকে কর দেয়,’ জুগর জানাল। ‘ক্রিটাইনের চেয়ে অনেক ছোট, তবে ওখানকার লোকেরা খুব শক্তিশালী। কিছুদিন থেকেই ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভাল না। এখানে ওখানে খণ্ডযুদ্ধও হয়ে গেছে।’

‘কী নিয়ে?’ তৈমুরের প্রশ্ন।

‘ওরা আমার চাচাকে রাজা মানতে নারাজ,’ জুগর বলল। ‘পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ব্রোমাকে কর দেবে না।’

‘হুঁ, বোঝা গেল,’ মাথা দোলাল তৃণা।

‘হোমাব্রির সঙ্গে পুরোপুরি যুদ্ধ লাগলে তোমার চাচার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?’ জিজ্ঞেস করল তরু।

দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘হ্যাঁ।’

তৈমুরের দিকে তাকাল তরু। উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তৈমুরকে। জুগরের কথায় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে।

‘মিত্রবাহিনী হিসেবে ঢেঁকুরদের সাহায্য নিতে চাইছেন না তো তোমার চাচা?’ জিজ্ঞেস করল তরু।

জোরে মাথা নাড়ল জুগর। ‘এই দানবদের সাহায্য নিতে চাইবেন কেন তিনি?’

‘তাহলে এদেরকে ধ্বংস করার কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?’ তরুর প্রশ্ন। ‘মতিশা মানুষেরা অনেক সময় বেপরোয়া কাজ করে থাকে। সব শুনে আমার মনে হচ্ছে, তোমার চাচা কোণঠাসা হয়ে গেছেন। তিশা বলেছে, ঢেঁকুরদের এলাকায় তোমাকে আসতে দিতেও নাকি রাজি ছিলেন না তিনি।’

‘উদ্বেগটা আসলে আমার নিরাপত্তা নিয়ে,’ জুগর জানাল।

জোরে নিঃশ্বাস ফেলল তৈমুর। ‘এ সব আলোচনা আর তর্কাতর্কি কোনও কাজে আসবে বলে মনে হয় না। চলো, আগে যুহারে যাই, তারপর দেখি, কী ঘটে।’

‘হ্যাঁ,’ তৃণাও তার সঙ্গে একমত। ‘স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমি বাড়ি ফিরতে পারলেই খুশি।’

উঠে দাঁড়াল জুগর। তলোয়ারটা বেল্টে ঢুকিয়ে রাখল। ‘তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।’

‘আর তাড়াতাড়ি মানে তাড়াতাড়ি,’ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল তিশা। ‘ওর  পেছন পেছন দৌড়াতে হবে আমাদের।’

*

গুহা থেকে বেরিয়ে তরুদের নিয়ে আবার বনের মধ্যে ঢুকল জুগর। পুরো দুই ঘণ্টা ধরে আগের দিনের মতই অসংখ্য পাহাড়ে উঠল আর নামল। অতিরিক্ত জোরে ছুটে অল্প সময়ের মধ্যেই তরুদের কান্ত করে দিল। তবে অবশেষে শেষ হলো পাহাড়, একটা চওড়া সমতল রাস্তা পাওয়া গেল। দূরে অস্পষ্টভাবে দেখা গেল পাথরে তৈরি বিশাল এক শহর।

থেমে গিয়ে হাত তুলল জুগর। ‘ওটাই যুহার।’

‘ওখানে পৌঁছতে কতণ লাগবে আমাদের?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল।

‘এই গতিতে, আট ঘণ্টা,’ জুগর বলল। ‘তবে রাতের আগেই পৌঁছে যাব। ক্রিটাইনের দিনগুলো পৃথিবীর তুলনায় অনেক লম্বা।’

‘পৃথিবী সম্পর্কে এত কিছু জানো কিভাবে তুমি?’ তরু জিজ্ঞেস করল।

‘পুরানো বইতে অনেক তথ্য লেখা আছে,’ জুগর বলল। ‘আমরা জানি, পৃথিবী রয়েছে স্বপ্নলোকের পর্দার ওপাশে।’

‘ওটা কী?’ জানতে চাইল তরু।

‘অবশ্যই আমাদের দুনিয়ার সীমানা,’ তরুর প্রশ্নটায় অবাক হয়েছে জুগর। ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, যেন স্বপ্নলোকের পর্দা শুনেই সব বুঝে ফেলা উচিত ছিল ওদের।

আবার জোরে জোরে হাঁটতে লাগল ওরা। ঘণ্টা দুই পরে রাস্তা ধরে একসারি ঘোড়ায় টানা ওয়্যাগন আসতে দেখল। ওগুলোর দিকে দীর্ঘণ তাকিয়ে থাকার পর কথা বলল জুগর। সামনের গাড়িটা উজ্জ্বল সবুজ আর লাল রঙের পতাকা বহন করছে। এতগুলো গাড়ির চাকা আর ঘোড়ার পায়ের আঘাতে অন্ধকার ধুলোর ঝড় উঠেছে যেন।

‘ওটা সেনাপতি মোরাকের পতাকা,’ জুগর বলল। ‘ভাবছি, ওর লোকেরা এখানে কী করছে? অবাকই লাগছে আমার।’

‘ও কি তোমার চাচার লোক?’ জিজ্ঞেস করল তরু।

মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘দু’জনে খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সবচেয়ে বেশি যাদের বিশ্বাস করেন চাচা, সেনাপতি মোরাক তাদের একজন।’

‘তোমাকে খুঁজতে পাঠানো হয়েছে হয়তো তাকে,’ তরু বলল।

‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ সেনাপতি আমার জন্য বিপজ্জনক?’

‘আমি বলতে চাইছি, অদ্ভুত কোন কিছু ঘটছে এই এলাকায়।’

‘সবে এলে এখানে,’ আপত্তি জানাল জুগর, ‘তুমি কী করে জানলে?’

‘প্রথম কথা, কাল রাতে আমাদের পিছু নেয়নি ঢেঁকুররা,’ তরু বলল।

‘কিন্তু ওরা তো আমাদের ধরে খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল,’ তিশা বলল।

‘হয়তো, শুধু তোমাকে,’ জবাব দিল তরু। ‘কিন্তু আমার ধারণা, জুগরকে ওরা কিছু করত না।’

তিক্তকণ্ঠে জুগর বলল, ‘আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল ঢেঁকুররা। বাঁচার জন্য লড়াই করতে হয়েছে আমাদের।’

‘তারপরও বেঁচে গেছ,’ তরু বলল। ‘এতগুলো ঢেঁকুরের হাত থেকে এভাবে বেঁচে যাওয়া, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক?’

বিরক্ত হলো জুগর। ‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ, আমার চাচা ওদের বলে দিয়েছে যাতে আমাকে ছেড়ে দেয়?’

‘হয়তো,’ তরু বলল। ‘চলো, সেনাপতির সঙ্গে কথা বলি। আমার ধারণা, অনেক মজার কথা শোনাবে আমাদের ও।’

কিন্তু সেনাপতি মোরাকের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলো না ওদের।

ওয়্যাগনের মিছিল কাছাকাছি হতেই দেখা গেল বেশির ভাগ গাড়িই চালাচ্ছে ঢেঁকুররা। ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে দানবগুলো।

বোকা হয়ে গেল যেন জুগর। ‘এটা…এটা তো হওয়ার কথা নয়!’

সেনাপতি মোরাকের পৌঁছতে দেরি হলো না। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল চোখা কানওয়ালা লম্বা একজন মানুষ, গায়ে টকটকে লাল আলখেল্লা, গলায় ঝোলানো একটা স্ফটিকের পদক। জুগরের সঙ্গে ওর মানুষ বন্ধুদের দেখে খুশি হয়নি, বোঝা গেল। ওরা কারা, জানতে চাইল।

‘এই লোকগুলো বাংলা শিখল কোথায়, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

‘মনে হয়, কোনভাবে আমাদের মগজ থেকে বের করে নিচ্ছে,’ তিশা বলল। ‘হয়তো থট রিডিং জানে এরা। কিংবা হয়তো ওরা ওদের ভাষাতেই কথা বলছে, আমরা বাংলায় আমাদের মত করে শুনছি। ভুলে যেয়ো না, অতিপ্রাকৃত জায়গা।’

সবচেয়ে কাছের ঢেঁকুরটার দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল তৃণা। ‘নিশ্চয় মনে মনে এখনও আমাদের মগজ খেতে চাইছে এই দানবগুলো।’

সেনাপতির প্রশ্নের জবাবে সামান্য মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে জুগর বলল, ‘ওরা পৃথিবীর মানুষ। নিষিদ্ধ এলাকায় ওদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ঢেঁকুরদের থাবা থেকে ওদের আমি বাঁচিয়েছি।’ ওয়্যাগনে দাঁড়ানো ঢেঁকুর-চালকটার দিকে তাকাল একবার ও। ‘কিন্তু ওদের তো আমাদের জায়গা থেকে তাড়ানোর কোন লণ দেখতে পাচ্ছি না।’

হাত তুলল সেনাপতি। ‘আজ এখানে যা দেখতে পাবে, তা নিয়ে কোন কথা বলতে পারবে না। তোমার চাচার আদেশ।’

শুনে ভাল লাগল না জুগরের। ‘তার মানে এই দানবগুলোর সঙ্গে যে হাত মিলিয়েছেন, দেখেও নীরব থাকতে হবে আমাকে? এই বন্ধুত্বের তো কোন কারণ দেখতে পাচ্ছি না। দেশের লোককে অবশ্যই জানানো উচিত। আপনি জানেন, সুযোগ পাওয়ামাত্র এই দানবগুলো আমাদের ধরে খেয়ে ফেলবে।’

পাতলা হাসি ফুটল সেনাপতির ঠোঁটে। ‘এখন অন্তত খাবে না। কিছু সময়ের জন্য আমাদের মিত্র হয়েছে ওরা, হোমাব্রিদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য। ওরা তোমার চাচাকে সিংহাসন খোয়ানো থেকে রা করবে, ওদের কাছে এর বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই আমাদের।’

‘তারপর যুদ্ধটা যখন শেষ হয়ে যাবে?’ জুগরের প্রশ্ন। ‘ঢেঁকুররা তখন কী করবে? ওদের সহযোগিতার বিনিময়ে কী পুরস্কার চাইবে ওরা? কতজনকে খেতে চাইবে?’

জোরে হাত নেড়ে জুগরকে থামিয়ে দিল সেনাপতি। ‘যাও, তোমার বন্ধুদের নিয়ে  পেছনের ওয়্যাগনটাও ওঠো। তোমাদেরকে এখন যুহারে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজার রায়ের অপো করবে।’

‘কিন্তু আমি আর আমার বন্ধুরা তো কোন অন্যায় করিনি,’ জুগর বলল।

রাগত ভঙ্গিতে একটা ভুরু উঁচু করল সেনাপতি। ‘তাই নাকি? তোমাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও রাজার কথা অমান্য করে নিষিদ্ধ এলাকায় গিয়ে গোপনে নজর রেখেছ।’

‘আমি তো চাচাকে সাহায্য করার জন্যই তথ্য জোগাড় করতে গিয়েছিলাম,’ জুগর বলল।

‘আর যতখানি জানা প্রয়োজন তারচেয়ে বেশি জেনে ফেলেছ,’ ঝাঁকি দিয়ে ঘাড় ঘোরাল সেনাপতি। মিছিলের শেষ ওয়্যাগনটা দেখিয়ে বলল, ‘যাও, ওঠো। এ নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে।’

গটমট করে গিয়ে আবার গাড়িতে উঠল সেনাপতি। ওর প্রহরীরা সামনে এগিয়ে এল।

ওদের হাতে লম্বা লম্বা তলোয়ার। গম্ভীর, থমথমে মুখ।

তরুদের নিয়ে যাওয়া হলো শেষ ওয়্যাগনটার কাছে।

ওটার চালক একটা ঢেঁকুর।

লালা ঝরানো ক্ষুধার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। কখন মগজ বের করে খাবে, সেই অপোয় রয়েছে যেন।

তরুর দিকে ফিরে তাকাল জুগর। ‘তোমার কথাই তো দেখছি ঠিক। কী করে বুঝেছিলে?’

‘শাসকদের চরিত্র আমার ভালমতই জানা,’ জবাব দিল তরু। ‘ওদের বেশির ভাগের কাছেই, দুঃখের বিষয়, একমাত্র মতায় থাকা ছাড়া অন্য কোন কিছুরই কোন গুরুত্ব নেই। আমাদের পৃথিবীতেও ঠিক একই অবস্থা। আর এ কারণেই পথে আসতে আসতে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চেয়েছিলাম।’

জুগরের পিঠে হাত রাখল তৈমুর। ‘আমরা যে বিপদে পড়েছি, তাতে তোমার কোন দোষ নেই। ভুল সময়ে এখানে চলে এসেছি আমরা।’

‘হ্যাঁ, তা-ই,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল তৃণা। ‘মনে হচ্ছে, আর কোনদিন এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারব না আমরা।’

দশ.

পাথরে তৈরি একটা ঠাণ্ডা, অন্ধকার কারাগারে এনে ভরা হলো ওদের। জুগরের ধারণা, ঘরটা মূল প্রাসাদের নিচে। সেনাপতির গার্ডেরা ওদের শেষ ওয়্যাগনটায় ঢুকিয়ে দিয়ে, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। কোন জানালা কিংবা ফাঁকফোকর নেই গাড়িটায়। কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিছুই দেখতে পারেনি ওরা। গাড়ি থামার পর চোখে কাপড় বেঁধে নামানো হলো ওদের। তারপর ধাক্কা দিয়ে এই কারাগারে ফেলে, দরজা বন্ধ করে চলে গেছে গার্ডরা।

এখানে একটাই স্বস্তি, সবাই একসঙ্গে রয়েছে, এবং কোনও ঢেঁকুর নেই। উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে মেঝেতে পায়চারি করছে জুগর, পাথরের মেঝেতে বসে বাকিরা সেটা দেখছে। এককোণে দেয়ালের বেশ কিছুটা ওপরে বসানো একটা মশাল জ্বলছে। অতি সামান্য আলো। ওদেরকে কারাগারে এনে রাখার পর এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে। সেইসঙ্গে পিপাসা।

‘এখানে নিশ্চয় কোন রুম সার্ভিস নেই, যাকে ডেকে খাবারের কথা বলতে পারো,’ জুগরকে উদ্দেশ করে বলল তৃণা।

‘আমি বুঝতে পারছি না,’ জুগর বলল, ‘চাচা এখনও আমাদের নিতে পাঠাচ্ছেন না কেন? তাঁর সঙ্গে তাড়াতাড়ি দেখা হওয়া দরকার আমার। তাঁকে বোঝানো দরকার, পুরো বিষয়টাই একটা ভুল বোঝাবুঝি।’

‘ব্রোমা আজ তোমার সঙ্গে দেখা করবেন না,’ তরু বলল। ‘হয়তো যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কথাই বলবেন না।’

থমকে দাঁড়াল জুগর। ‘অসম্ভব।’

‘তরু ঠিকই বলেছে,’ তৈমুর বলল। ‘লড়াইটা পুরোদমে চলার পর তোমাদের দল জিততে আরম্ভ না করা পর্যন্ত নিজের গোপন কথা ফাঁস করবেন না রাজা। কারণ কেবল তখনই ঢেঁকুরদের সঙ্গে মিত্রতা করার সুফলটা দেখতে পাবেন তিনি।’

কান্ত মনে হলো জুগরকে। ‘নাহ্, তোমরা মানুষেরা, মাথা গরম করে দেয়ার ওস্তাদ।’ অবশেষে বসল জুগর। ‘এই যে, যে বাংলাদেশটার কথা বলছ তোমরা, সেটা কি পৃথিবী দেশটার মহান রাজধানী?’

‘এখনও হয়নি, তবে কোনও একদিন হবে,’ জবাব দিল তৃণা।

জুগরকে বলল তিশা, ‘এখানে যা ঘটছে, তার জন্য আমাদের সত্যি খারাপ লাগছে, জুগর, কিন্তু আমাদেরকে আমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতেই হবে। নইলে তারা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা করবে।’

‘তোমাদের জন্য আমারও খারাপ লাগছে,’ জুগর বলল। ‘তোমাদেরকে কিভাবে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে, আমি জানি না। তবে একটা কথা ঠিক, এ মুহূর্তে তোমাদেরকে কোনরকম সাহায্য করবে না আমার চাচা।’

‘তোমার সেই কথাটা নিয়ে এখনও ভাবছি আমি,’ তিশা বলল। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা। তুমি বলেছ, ওটা তোমাদের দুনিয়াকে ঢেকে রেখেছে। এ কথা বলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছ?’

ওপর দিকে হাত তুলল জুগর। ‘ওপরেই আছে ওটা। সব কিছুকে ঢেকে রেখেছে।’

সামনে ঝুঁকল তরু। ‘ওপর দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছ। এর মানেটা কি, আকাশ বোঝাচ্ছ?’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই। স্বপ্নলোকের পর্দা। অন্য পৃথিবী থেকে আমাদের আলাদা করে রেখেছে। তোমাদের পৃথিবীতেও নিশ্চয় এমন পর্দা আছে?’

‘নাহ্, ঠিক এমন নয়,’ বলে তৈমুর ও তৃণার দিকে ঘুরে তাকাল তরু। ‘দিপুর আলমারির  ভেতর দিয়ে ঢেঁকুরটাকে আমরা তাড়া করে আসার সময় ওই পতনের মত অনুভূতিটার কথা মনে আছে?’

‘আছে,’ জবাব দিল তৈমুর। ‘আমার মনে হচ্ছিল, নিচে পড়ে হাড়গোড় ভাঙব আমরা।’

মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘সবাই আমরা এমন করে পড়েছি, যেন ওপর থেকে নিচে নেমেছি। হয়তো তা-ই করেছি।’

‘কী বলছ তোমরা?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে কি আকাশ থেকে পড়েছি বলতে চাইছ?’

চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল তরু, ‘হ্যাঁ।’

হাসল তৃণা। ‘এমন অদ্ভুত কথা এই প্রথম শুনলাম।’

‘আমারও অবাক লাগছে,’ তরু বলল। ‘এখানকার আকাশটা ভালমত দেখেছি আমি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগবে-খুব বেশি দূরে নয় ওটা।’

‘কিন্তু আকাশ আকাশই,’ তৃণা বলল। ‘ওটা এক জায়গায় সাঁটা কোনও অটল জিনিস নয়।’

‘আমাদের পৃথিবীতে নয়,’ তরু বলল। ‘কিন্তু এখানে নিশ্চয় অন্যরকম। জুগর?’

‘অবশ্যই আকাশটা দেখতে পর্দার মত,’ অবাক হয়ে জুগর বলল। ‘ওটা অটলই আছে। এ ছাড়া আর কিভাবে থাকবে?’

সোজা হয়ে বসল তৈমুর। ‘তরু, তুমি বলতে চাইছ ওই পর্দার ঠিক অন্যপাশেই রয়েছে আমাদের পৃথিবী? তার মানে যদি ওই পর্দার কাছে উঠতে পারি, ওটা ভেদ করে অন্যপাশে গিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারব?’

‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল তরু। ‘তবে ওপরে উঠে আকাশটাকে কোনভাবে খুলতে হবে। জুগর, এখানে এমন কোন পর্বত আছে, বলতে পারো, যেটার চূড়া ওই পর্দার কাছে পৌঁছেছে?’

‘নিশ্চয়ই আছে,’ জুগর বলল। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা তো কয়েকটা চূড়ার ওপরই বসে আছে। কাছেই একটা চূড়া আছে, যেটা আকাশ ছুঁয়েছে।’

‘ভারি অদ্ভুত একটা দেশ,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

‘ওই চূড়ার কাছে আমাদের নিয়ে যেতে পারবে?’ তরু জিজ্ঞেস করল।

মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘আমার চাচা আমাদের এখান থেকে ছেড়ে দিলেই তোমাদেরকে চূড়াটার কাছে নিয়ে যাব। ঘোড়ার পিঠে চড়ে গেলে খুব বেশিণ লাগবে না। তোমাদের সময়ের হিসেবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা, একেবারেই কম।’

‘আজকে আর যেতে পারব বলে মনে হয় না,’ ভারি কণ্ঠে বলল তৈমুর।

এ সময় কারাগারের দরজায় থাবার শব্দ হলো।

লাফিয়ে উঠে তাড়াহুড়া করে ছুটে গেল জুগর। শিক লাগানো চারকোনা ছোট একটা জানালা লাগানো রয়েছে দরজার পাল্লায়, সেখান দিয়ে অন্যপাশে দেখা যায়। হাতে মশাল নিয়ে অন্যপাশের পাথরে তৈরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছোটখাট একটা মূর্তি।

‘ডোরা!’ চেঁচিয়ে বলল জুগর। ‘তুমি এলে কেন?’

‘ডোরা কে?’ তিশা জানতে চাইল।

ফিরে তাকাল জুগর। ‘আমার বন্ধু। আমাদের সাহায্য করতে এসেছে।’

সবাই লাফিয়ে উঠল।

দরজার কাছে এসে জড় হলো। বাইরে দাঁড়ানো মেয়েটা জুগরের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি খাটো। চোখা কান দুটো বাদ দিলে যথেষ্ট সুন্দরী। রেশমের মত মসৃণ লম্বা চুলের রঙ সবুজ। পৃথিবীর মানুষদের দেখে অবাক হলো না। কথাবার্তা বেশির ভাগ জুগরের সঙ্গেই বলল।

‘জুগর,’ বিষণœ কণ্ঠে বলল মেয়েটা, ‘খবরটা শুনে আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি, তোমার চাচা তোমাদেরকে জেলখানায় ভরে রেখেছেন। কী করেছিলে, বলো তো?’

‘কোন অন্যায় করিনি, এটুকু বলতে পারি,’ জুগর জবাব দিল। ‘শুধু জেনে গেছি, ঢেঁকুরদের সঙ্গে চাচা হাত মিলিয়েছে, ওদেরকে মিত্রবাহিনী বানিয়েছে হোমাব্রিদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।’

কুঁকড়ে গেল ডোরা। ‘সত্যি? কিন্তু ওরা তো দানব।’

গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল জুগর। ‘হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি। আমাকে এখানে আটকে রাখার কারণ, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি যাতে বেরোতে না পারি, এই খবরটা জনগণকে জানাতে না পারি। তবে আমার ভয়, ততণে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে ঢেঁকুররা। হয়তো তখন আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের রাজ্য দখল করে নেবে।’

‘আমি কিছু করতে পারি?’ ডোরা জিজ্ঞেস করল।

‘এখান থেকে আমাদের বেরোনোর ব্যবস্থা করো,’ জুগর বলল। ‘তোমার বাবাকে গিয়ে বলো। তিনি আমাকে চেনেন, আমাকে বিশ্বাস করেন। তাঁকে গিয়ে বলো, আমি নিষিদ্ধ এলাকায় গিয়েছিলাম। ঢেঁকুরদেরসহ গিয়ে ওখান থেকে সেনাপতি মোরাক আমাদের ধরে এনেছে। বলবে, আমার চাচার বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ঢেঁকুরবাহিনী আমাদের সবাইকে খুন করবে।’

তরুদের দিকে তাকাল ডোরা। ভুরু কোঁচকাল। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কিভাবে দেখা হলো?’

‘সে এক লম্বা কাহিনী, ডোরা, এখন বলার সময় নেই,’ জুগর বলল। ‘তুমি তোমার বাবাকে গিয়ে জানাও, রাজা ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। দেশের মঙ্গলের জন্যই তাঁকে ঠেকানো দরকার। দেশবাসীর কানে খবরটা পৌঁছানো গেলে, তারাই বিদ্রোহ করে রাজাকে ঠেকাবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমাদেরকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করো।’

‘আমি ভাবছি, দেশের মানুষ বিদ্রোহ করলে রেগে গিয়ে রাজা না শেষে আমাদেরকেই মেরে ফেলেন,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে তরু বলল। ‘তিনি হয়তো ধরে নেবেন, আমরাই যত নষ্টের মূল।’

এগারো.

তরুর কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। দুই ঘণ্টা পর জেল থেকে বেরিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পর্বতের দিকে ছুটছে ওরা, পালাচ্ছে বললেই ঠিক হয়, আর প্রচণ্ড রেগে গিয়ে রাজা তাঁর ঢেঁকুরবাহিনী নিয়ে ওদের পিছু নিয়েছেন। মানুষের দৃষ্টিশক্তির বাইরে রয়েছে এখনও দলটা। তবে জুগর তার অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি দিয়ে এখনই দেখতে পাচ্ছে। ঢেঁকুরদের সঙ্গে রাজার মিত্রতার খবরটা নিশ্চয় জানাজানি হয়ে গেছে, তাই জুগরকেই প্রধান বিদ্রোহী ধরে নিয়ে রাজা প্রথমে তাকেই শাস্তি দিতে আসছেন।

ডোরা তার কাজটা ঠিকমতই করেছে। ওর বাবা রাজ্যের একজন প্রভাবশালী লোক। নিজের লোক পাঠিয়েছে জেল থেকে জুগর আর তার বন্ধুদের মুক্ত করিয়েছেন। রাজার প্রহরীরা তাদের বাধা দেয়ার সাহস পায়নি।

একটা পাহাড়ের কোলে একটুণের জন্য বিশ্রাম নিতে থামলে জুগর বলল, ‘আমি কল্পনাই করিনি, আমার চাচা কোনদিন এভাবে ঢেঁকুরদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন।’

ডোরার পাশাপাশি আরেকটা ঘোড়ায় চড়েছে ডোরা। পর্বতের অর্ধেক পথ চলে এসেছে দলটা।

ওপর দিকে তাকাল তরু। পর্বতের চূড়াটাকে যেন ছুঁয়ে আছে সবুজ আকাশ। আর কিছুণের মধ্যেই চূড়ায় উঠে ওরাও ওই আকাশটাকে ছুঁতে পারবে।

‘রাজা পাপ করছেন,’ ডোরা বলল। ‘তাঁকে থামানো দরকার।’

‘চেষ্টা করব, যদি ঢেঁকুরদের হাত থেকে মুক্তি পাই,’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলল জুগর।

‘কোন না কোন পথ নিশ্চয় আছে,’ তরু বলল।

‘তুমি কিছু ভাবছ?’ তিশা জিজ্ঞেস করল।

‘অনেক কিছুই ভাবছি,’ মাথা ঝাঁকাল তরু। পর্বতের চূড়ার দিকে দেখাল। ‘তবে সেটা কার্যকর করতে হলে ওরা আমাদের ধরে ফেলার আগেই ওখানে পৌঁছুতে হবে।’

ক্রমেই কাছে আসছে রাজা আর তার সেনাবাহিনী। দেশের সেরা ঘোড়াগুলো নিয়ে আসছে, তাই গতিও তরুদের ঘোড়াগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুত।

পর্বতের ঢাল বেয়ে উঠে চলল তরুরা। ভাগ্য এখন ওদের সহায় হলেই হয়। পর্বতের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পথ।

সেটা বেয়ে উঠতে উঠতে আকাশের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। ওদের মাথার ওপরে মস্ত সবুজ চাদরের মত বিছিয়ে রয়েছে আকাশটা। ঘোড়া থেকে নেমে তাড়াহুড়া করে চূড়ায় উঠে এল ওরা।

হাত দিয়ে আকাশের গায়ে গুঁতো দিল। দেখতে নরম দেখালেও পুরু প্লাস্টিকের মত শক্ত, টান টান হয়ে আছে।

‘সত্যিই আজব জায়গা,’ বিড়বিড় করল তৃণা।

‘এটা ভেদ করে ওপাশে যাব কী করে?’ তরুকে জিজ্ঞেস করল তিশা।

‘তা ছাড়া অন্যপাশে কি ফাঁকা জায়গা আছে?’ তৈমুরের প্রশ্ন। ‘হয়তো দেখা যাবে মহাকাশের কালো শূন্যতা ভ্যাকিউয়াম কিনারের মত টান দিয়ে আমাদেরকে নিজের পেটে ভরে ফেলেছে।’

‘এই আকাশ ভেদ করে যাওয়া যাবে না,’ তরু বলল, ‘যদি এটা নিজে থেকে আমাদের জন্য খুলে না যায়।’

দিগন্তের দিকে তাকাল তৃণা। পৃথিবীর আকাশের মতই বাঁকা হয়ে মাটির দিকে নেমেছে মনে হয়।

‘কী করে খুলব?’ তৃণার প্রশ্ন। ‘আমি তো কোন উপায় দেখতে পাচ্ছি না।’

‘আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে,’ হঠাৎ বলে উঠল তরু।

সেনাবাহিনীর দিকে ফিরে তাকাল তৈমুর। আরও কাছে চলে এসেছে। ঢেঁকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে তৈমুরের মনে হলো, রাজা হয়তো ঠিক করেছেন, তাঁর কাজে বাধা দেয়ার শাস্তি হিসেবে জুগর আর তার বন্ধুদের ধরে ঢেঁকুর দিয়ে খাওয়াবেন।

‘যা করার তাড়াতাড়ি করো,’ তৈমুর বলল। ‘আর বেশি সময় নেই।’

‘করব,’ শান্তকণ্ঠে তরু বলল, ‘দলবল নিয়ে রাজা এখানে এসে পৌঁছাক, তারপর।’

‘কী?’ একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল সবাই।

হাত তুলল তরু। ‘অস্থির হয়ো না। ঢেঁকুর সমস্যার সমাধান কিভাবে করতে হবে, আমি বুঝে গেছি। চিরকালের জন্য ওদের হাত থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করব।’

‘কিন্তু ওটা আমাদের সমস্যা নয়,’ তৃণা বলল। ‘আমরা ছোটমানুষ, বড়দের রাজনীতিতে জড়ানোর কি দরকার। সময় থাকতে এখান থেকে কেটে পড়াই ভাল।’

‘যদি সত্যিই তুমি কিছু করতে পারো, করো, প্লিজ,’ তরুর দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বলল ডোরা। ‘আমাদের উপকার হবে।’

উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে তিশার দিকে তাকাল জুগর।

‘তোমাদের সাহায্য আমরা অবশ্যই চাই,’ বলল ও। ‘তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেটা করতে বলব না। তোমরা নিরাপদে বাড়ি ফিরে গেছÑএটা দেখলেই বরং আমি বেশি খুশি হব।’

হাসল তরু। ‘ভয় নেই। ঢেঁকুরদেরও পরাজিত করব, একইসঙ্গে বাড়িও ফিরে যাব, তোমাকে কথা দিলাম। আসলে, দুটো ব্যাপারই একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত।’

‘কিন্তু কিভাবে, সেটা বলো না,’ বুঝতে পারল না তৈমুর।

‘ভেবে দেখো, কিভাবে এখানে এসেছি আমরা,’ তরু বলল। ‘স্পেস-টাইম বা চতুর্থ মাত্রার স্তরকেÑসহজ কথায় বলতে গেলে, সময়ের চাদরকে ছিন্ন করে এখানে চলে এসেছি আমরা। কিসের ওপর ভিত্তি করে? একটা বিশেষ জায়গা সম্পর্কে কেন্দ্রীভূত ভয়। যেটা ঘটেছে দিপুর আলমারিতে। একইভাবে সময়ের আরেকটা ফোকর তৈরি হয়েছিল তিশার আলমারিতেÑওই ভয়ের ওপর ভিত্তি করেইÑযেখান দিয়ে ঢেঁকুরটা ঢুকতে পেরেছিল, ধরে নিয়ে এসেছিল ওকে। এখানে ভয়টাই হলো চাবি। ভয় আমাদেরকে এই স্বপ্নলোকে আটকে রেখেছে। ভয়ই মাথার ওপরের ওই আকাশ সৃষ্টি করেছেÑপুরু, দুর্ভেদ্য একটা পর্দার মত। কিন্তু যদি আমরা আমাদের ভয় ঝেড়ে ফেলতে পারি, আমি শিওর, ওই পর্দা ভেদ করে সহজেই আমাদের জগতে ফিরে যেতে পারব, হয়তো বা পানির ভেতর দিয়ে সাঁতরে চলে যাওয়ার মত করে।’

‘তাহলে চলো!’ সেনাবাহিনীকে আরও কাছে চলে আসতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল তৃণা। নেতৃত্ব দিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসছেন রাজা। বেল্ট থেকে তলোয়ার খুলে হাতে নিয়েছেন। তাঁর মুখে ফুটে ওঠা রাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঢেঁকুরদের মুখে চওড়া হাসি। এতগুলো মানুষের মগজ খাওয়ার আনন্দেই বোধহয়।

‘কিন্তু ঢেঁকুরদের ঠেকাব কী করে?’ জুগরের প্রশ্ন।

‘সেই একইভাবে,’ জবাব দিল তরু। ‘শুধু একটা কাজই করতে হবে, ওদের ভয় পাওয়া চলবে না। ভয় পেয়ো না ওদের। আমার বিশ্বাস, জুগর, ডোরা, তোমরাই ঢেঁকুরদের জন্মদাতা। তোমাদের ভয়ই এই দানবগুলোকে সৃষ্টি করেছে। প্রচণ্ড দানবের ভয় মনের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। জুগর, ঢেঁকুরদের সম্পর্কে কী বলেছিলে, তিশা আমাকে বলেছে। বলেছিলে : তোমাদের দেশের জ্ঞানী লোকেদের মতে অবচেতন মনের ভয় থেকে ওদের জন্ম। এই সূত্রটাই আমাকে এভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে।’

‘এখন ওদের ঠেকাব কিভাবে আমরা?’ জুগর জানতে চাইল।

‘দানবের ভয় মন থেকে দূর করো, ওদের দিকে তাকিয়ে হাসো,’ তরু বলল। ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উধাও হয়ে যাবে ওরা।’

‘তুমি বলতে চাইছ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ওদের তাড়াতে হবে,’ তৃণা বিড়বিড় করল।

‘কিন্তু যদি উধাও না হয়?’ তিশার প্রশ্ন।

কাঁধ ঝাঁকাল তরু। ‘তাহলে মরতে হবে।’

জুগর বলল, ‘হয়তো তুমি ঠিকই বলেছে, ঢেঁকুরদের হয়তো পরাজিত করতে পারব আমরা। তবে, বিফল হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। তা ছাড়া এটা আমাদের সমস্যা। তাই বলছি, অকারণ ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে, সময় থাকতে থাকতে এই স্বপ্নলোক থেকে চলে যাও, যদি পারো।’

‘হ্যাঁ, সেটাই করা উচিত,’ তৃণা বলল।

‘কিন্তু,’ বাধা দিয়ে তৈমুর বলল, ‘বন্ধুদের বিপদের মুখে ফেলে কাপুরুষের মত এভাবে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে চলে যেতে পারব না আমি।’

‘ঠিক বলেছ, আমিও পারব না,’ বলে জুগর ও ডোরার দিকে তাকাল তিশা। ‘আমাদের বাঁচাতে তোমরা তোমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছ, এখন তোমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করব আমরা। তোমাদের নিরাপদ দেখে তবেই তবেই যাব এখান থেকে।’

‘যা ভেবেছিলাম, তোমরা মানুষেরা দেখছি তারচেয়ে সাহসী,’ প্রশংসা না করে পারল না জুগর।

‘এবং অনেক বেশি বোকা,’ তৃণা বলল।

মিনিটখানেকের মধ্যেই ওদের কাছে পৌঁছে গেল সেনাবাহিনী। ঢেঁকুর প্রহরীর কাঁধে ভর দিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন রাজা ব্রোমা। গটগট করে হেঁটে এলেন জুগরের কাছে। মাথা উঁচু করে তার দিকে এগোল জুগর। সত্যিকারের রাজা মনে হচ্ছে ব্রোমাকে দেখে, যদিও কান দুটো চোখা আর গায়ের রঙ সবুজ। যথেষ্ট লম্বা। পেশিবহুল গঠন। মাথায় রত্নখচিত সোনার মুকুট।

রাজার হাতে উদ্যত তলোয়ার। চোখে ঘৃণা। কোন কিছু না বলে আচমকা তলোয়ারটা জুগরের গলায় চেপে ধরলেন। চমকে উঠে সবাই ভাবল, জুগরের গলা কেটে ফেলবেন তিনি। কিন্তু চোখের পাপড়িটাও কাঁপল না জুগরের। চাচার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ভয়লেশহীন চোখে। রাজার দুই পাশে দুটো বিশাল ঢেঁকুরের মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে।

‘নিজের রক্তের সঙ্গে বেইমানি!’ চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা। ‘এখুনি তোমাকে মেরে ফেলে এই বিদ্রোহের অবসান ঘটানো উচিত। এ রকম একটা কাজ কী করে করতে পারলে?’

শান্ত কণ্ঠে জুগর বলল, ‘তুমিই বা নিজের লোকদের সঙ্গে এ রকম কাজ করতে পারলে?’

‘আমার দেশবাসীকে হোমাব্রিদের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি।’

গলায় এখনও তলোয়ার চেপে ধরা। এই অবস্থায় থেকেই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল ও। ‘দেশবাসীকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত দানবের সঙ্গে হাত মেলাতে হলো? হোমাব্রিরা খেপল কেন, সেটা আগে ভেবে দেখো। যদি তুমি ওদের এত চাপ না দিতে, কর বাড়িয়ে বাড়িয়ে কোণঠাসা করে না ফেলতে, অবাধ্য হতো না ওরা। বিদ্রোহ করত না। লড়াইয়ের দরকারই হতো না তোমার।’

‘সেটা আমার বিষয়!’ গর্জে উঠলেন রাজা। ‘ওদেরকে যা করতে বলা হয়েছে, সেটা করতে বাধ্য ওরা! যেমন, তোমাকে যা বলা হয়েছিল, করা উচিত ছিল তোমার।’

‘তা ঠিক, স্বীকার করছি,’ শান্ত রয়েছে জুগর। ‘কিন্তু আমি তোমার ভাতিজা। আমি তোমার ভাল চাই। আমি এখনও মনে করি না, তুমি এতটাই খারাপ হয়ে গেছ যে আমাকে খুন করতেও দ্বিধা করবে না। যতই আমি তোমার তোমার পরিকল্পনায় বাধা দিই না কেন।’

অহঙ্কারী ভঙ্গিতে রাজা বললেন, ‘আমার পরিকল্পনা তুমি ব্যর্থ করতে পারবে না, জুগর।’

‘পারব,’ জুগর জবাব দিল।

রাজার পাশে দাঁড়ানো একটা ঢেঁকুরদের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল ও।

বরফের মত জমে গেল যেন ঢেঁকুরগুলো। স্তব্ধ হয়ে গেছে।

ব্যাপারটা আশার সঞ্চার করল তৃণার মনে। আঙুল তুলে বলল, ‘দেখো দেখো, হাসি ওদের ভাল লাগছে না। হাসো, সবাই হাসতে থাকো ওদের দিকে তাকিয়ে।’

ঢেঁকুরদের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। ব্যঙ্গের হাসি। একই সঙ্গে ইয়ার্কি দিয়ে কথা বলতে শুরু করল।

‘বিচ্ছিরি পিচ্ছিল পোকার দল,’ তৃণা বলল। ‘সবুজ শামুক।’

‘বোকা জানোয়ার,’ তরু বলল।

‘লালা গড়ানো ভূত,’ বলল তৈমুর।

‘অরুচিকর সঙ্গী,’ বলল তিশা।

তিশার দিকে ঘুরল তৃণা। ‘উহুঁ, এত ভদ্র কথায় কাজ হবে না। আরও আগুন ঝরাও।’ বলে তীব্র গালির ফোয়ারা ছোটাল ও।

তবে এত গালির আর প্রয়োজন ছিল না। ওদের হাসি আর নির্ভীক ভাবভঙ্গিই কাবু করে দিল ঢেঁকুরদের। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোমের মত গলতে আরম্ভ করল দানবগুলো। দেখতে দেখতে একেবারে একা হয়ে গেলেন রাজা, তাঁর আশপাশে পড়ে রইল শুধু সবুজ রঙের কিছু তরল পদার্থ। বিস্ময়ে বিমূঢ়ের মত চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তিনি। ভয় দেখা গেল চোখে।

‘তোমরা আমার মিত্রবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছ,’ ফিসফিস করে বললেন তিনি।

‘বরং বলুন আপনার আসল শত্র“দের হাত থেকে বাঁচিয়েছি,’ তরু বলল। ‘মহামান্য রাজা, আপনি হোমাব্রিদের ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন না কেন? তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন, কেন কর বাড়িয়েছেন তাদেরকে বোঝান। আমি শিওর, আপনি যুদ্ধের ভাবনা মাথা থেকে বিদেয় করলে ওরাও ভুলে যাবে। যুদ্ধ করার অনেক ঝামেলা, অনেক বিপদ, শেষ পর্যন্ত দুই পকেই তিগ্রস্ত হতে হয়।’

তরুর ভাষণে কাজ হলো। কিংবা হয়তো গার্ডদের গলে যাওয়ার চমকটা কাটিয়ে উঠছেন রাজা। এমন ভঙ্গিতে তরুদের দিকে তাকালেন, যেন এই প্রথম দেখছেন। ওর চোখের রাগ আর ভয় বদলে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল বিস্ময়।

‘হায় হায়, তোমার গলায় তলোয়ার ঠেকিয়েছি আমি, জুগর!’ রাজা বললেন। ‘খুব অন্যায়, খুব অন্যায়। আমাকে মাফ করো। তুমি আমার একমাত্র ভাতিজা।’

মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘আমাকেও মাপ করো, চাচা। তোমার অবাধ্য হয়েছি।’

তরুদের দেখতে লাগলেন রাজা। ‘এরা তোমার বন্ধু, তাই না, জুগর?’

মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘নিষিদ্ধ এলাকায় ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। পৃথিবী থেকে আমাদের রাজ্যে এসেছে আমাদের সাহায্য করার জন্য।’ এর সঙ্গে যোগ করল, ‘পৃথিবীতে ওদেরকে মহান সাব্বির হিসেবে গণ্য করা হয়।’

‘তা ঠিক নয়,’ প্রতিবাদ করতে গেল তৃণা।

মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন রাজা। ‘নিজের চোখেই তো ওদের বীরত্ব দেখলাম। ভীষণ শক্তিমান যোদ্ধা ওরা, শুধু হাসি দিয়েই ঢেঁকুরদের মত ভয়ানক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিল। ওদের পৃথিবীবাসীরাও নিশ্চয় অনেক জ্ঞানী। ওদের অনুসরণের চেষ্টা করব আমি, হোমাব্রিদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করব। বয়স হয়ে গেছে, আমি বুড়ো হচ্ছি, লড়াই করার মতা হারিয়েছি, সেজন্য ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম। ওদের সহযোগিতা ছাড়া জিততে পারতাম না।’ একটু থামলেন তিনি। ‘পৃথিবীবাসীদের জিজ্ঞেস করো তো, ওরা আমার রাজ্যে থাকবে কি না, আমার ব্যক্তিগত প্রহরী হবে কি না?’

‘থাকতে পারলে খুশিই হতাম, মহান রাজা ব্রোমা,’ তিশা বলল। ‘কিন্তু আজ রোববার, আমাদের জরুরি হোমওয়ার্ক আছে, পৃথিবীতে ফিরে সেগুলো শেষ করতে হবে। তবে অন্য কোন সময় আবার আসতে পারি আমরা, বেড়াতে, হোমাব্রিদের সঙ্গে যখন আপনার মিটমাট হয়ে যাবে।’

‘হ্যাঁ, সেটাই ভাল হবে,’ রাজা বললেন। ‘তোমরা আমার চোখ খুলে দিয়েছ। তোমাদের কাছে আমি ঋণী হয়ে রইলাম। যাও, এখন তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি, যেখানে ইচ্ছে যাও।’

মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল তরু ও তৈমুর।

মাত্র কয়েক ফুট দূরত্ব, অথচ মনে হচ্ছে কতদূর।

‘এখন কী করব?’ নিচুস্বরে তরুকে জিজ্ঞেস করল তৈমুর।

‘আত্মবিশ্বাসী হও আর ভয় দূর করো,’ তরু বলল। তারপর মুখের কাছে দুই হাত জড় করে ডাকল, ‘সাব্বির? সালমা? দিপু? ওখানে আছো তোমরা?’

আকাশের অন্য পাশ থেকে সাড়া দিল সাব্বির, ‘হ্যাঁ। তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা কোথায়?’

‘কাছেই,’ জবাব দিল তরু। ‘তোমরা কি এখনও দিপুর ঘরেই আছো?’

‘হ্যাঁ। ওর আলমারির ভেতরে বসে আছি। তোমার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আলমারির  পেছন থেকে সবুজ আভা বেরোতে শুরু করেছে। তোমাদের কাছে আসার চেষ্টা করব আমরা?’

‘না,’ তরু বলল। ‘শুধু তোমার হাতটা আলোর ভেতর দিয়ে ঠেলে দাও। আমাদের টেনে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করো।’

‘ঠিক আছে।’

আকাশের পর্দা ভেদ করে বেরিয়ে এল দুই জোড়া মানুষের হাত।

একজোড়া দেখে বোঝা গেল ওগুলো সাব্বিরের, আরেক জোড়া সালমার।

দিপুর হাত না দেখে অবাক হলো না ওরা। ও এতই ভিতুর ভিতু, হাত বের করতে ভয় পাচ্ছে।

‘এভাবে মুক্তি পাওয়াটা কেমন অদ্ভুত লাগছে আমার কাছে,’ তৃণা বলল। ‘তবে বেরিয়ে যাওয়াটাই আসল কথা, যেভাবেই হোক। আর বেরোনোর সময় আকাশের মাঝখানে আটকা না পড়লেই খুশি থাকব।’

‘ওসব নেতিবাচক কথা ভুলেও ভেবো না,’ সাবধান করে দিল তরু।

জুগর আর ডোরার সঙ্গে হাত মেলাল তিশা। বলল, ‘এবার গুড-বাই জানাতে হচ্ছে। তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুবই খুশি হয়েছি। তোমাদের কথা চিরকাল মনে থাকবে আমার। ভাল থেকো তোমরা।’

‘আবার এসো, যত তাড়াতাড়ি পারো,’ আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখল জুগর।

‘তোমাকে মিস করব আমরা,’ ডোরা বলল।

‘আসব, শিগগিরই আসব আবার,’ কথা দিল তিশা।

হেসে যোগ করল তরু, ‘তবে তার জন্য ভয় পেতে হবে তোমাকে, ভীষণ ভয়। কোনও রাতে, আলমারির দিকে তাকিয়ে যখন ভয়ে ঘুম আসতে চাইবে না তোমার, তখনই শুধু খুলতে পারবে এখানে আসার পথ।’

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply