দিলারা মেসবাহ…..

শিমুল আর সবুজ ওরা দুইজন জানি দোস্ত। কাস এইটে পড়ে ওরা দু’জন। তবে সবুজ একটা নামকরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে আর শিমুল সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে। শিমুলের বাবা একজন উঠতি শিল্পপতি। আর সবুজের বাবা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। মা একটা কলেজে বোটানি পড়ান। ওদের দুই বন্ধুর ফ্যাট পাশাপাশি গা লাগোয়া প্রায়। এ বাড়িতে কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলে ও ফ্যাট থেকে দিব্যি শোনা যায় আর এ ফ্যাটে ডালের ফোঁড়ন দিলে সুগন্ধটুকু ভেসে যায় ও ফ্যাটে।
তবে শিমুলদের ফ্যাট বেশ খোলামেলা আধুনিক ঝাঁকঝকে চকচকে। সাইজ ৩০০০ স্কয়ার ফিট। সবুজদের ফ্যাটটি কিছুটা ছোট তবে ঝুল বারান্দা আছে তিনটি- ওদের হলো গিয়ে ১৫০০ স্কয়ার ফিট।
আষাঢ় মাসে ঘোর বর্ষা। আকাশে কালো মেঘের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকেলের দিকে আকাশ খানিকটা প্রসন্ন হলো। হালকা কমলারঙের রোদে ভরে গেছে চারপাশ। সবুজ এসেছে বন্ধুর ফ্যাটে। আজ শিমুলের জন্মদিন। দশ পাউন্ডের স্পেশাল চকলেট কেক এসেছে আর রাজ্যের খাবার দশসই টেবিলজুড়ে। শাহি হালিম থেকে চিকেন রোল পিৎজা কাস্টার্ড কী নেই! হৈ হল্লা করে কেক কাটল শিমুল। পেশাদার ফটোগ্রাফার এসেছে। তাছাড়া শিমুলের বাবা-মায়ের হাতেও ক্যামেরা। চারপাশে কিক কিক। একটা খুব জমকালো পাঞ্জাবি পরেছে আজ শিমুল। যেন আজ ও শাহজাদা।
বন্ধুদের মধ্যে সাজ্জাদ, তানভির, টুটুল, হেনরি, সেজান ও আরো অনেকে চলে গেছে। সবুজ রয়ে গেছে। শিমুল বলছিল, ‘সবুজ তুই কিন্তু এখনই চলে যাবি না। আমি আর তুই দু’জনে মিলে গিফট প্যাকেটগুলো খুলব, কেমন? খুব মজা হবে রে।’
সবুজ মনে মনে একটু বিব্রত হয় বৈকি! মা বসে থাকবেন। বাবাও ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে পছন্দ করেন।
কিন্তু বন্ধুর এ আন্তরিক আমন্ত্রণ কি ফেলে দেয়া যায়?
দোটানায় পড়ে সবুজ চুপ করে খানিকক্ষণ ভাবে। তারপর বলে ওঠে, ‘চল চল জলদি। রাত হয়ে যাচ্ছে বন্ধু।’ শিমুল হাসে, ‘কী এমন রাত দেখলি দোস্ত? সবে ত সন্ধ্যা সাতটা। দুই পা বাড়ালেই তো নিজের ঘরে চলে যাবে।’
ওরা দু’জন হাসতে হাসতে গিফট প্যাকেটগুলো খুলতে যায়।
ওগুলো লাল মিয়া শিমুলের সুন্দর ঝকঝকে উজ্জ্বল পর্দা আর দামি ফার্নিচার দিয়ে সাজানো ঘরে এসে বসে। ঘরের একপাশে একটা সুদৃশ্য ডিভনা। তাতে স্তূপ করে রাখা খেলনা, বাইনাকুলার ঢেডি বিয়ার, ক্যামেরা ইত্যাদি। একটা প্যাকেট সুদৃশ্য মোড়কে প্যাকেট করা। মনে হচ্ছে বই। চটপট খুলে ফেলে সবুজ। সত্যিই একরাশ প্রিয় বই। বুড়ো আঙলা, চাঁদের পাহাড়, রানী খালের সাঁকো, সঞ্চিতা, আমার ছেলেবেলা। বইগুলো দিয়ে কী সুন্দর সুগন্ধ! সবুজের মন ভরে গেল। ওর উজ্জ্বল চোখজোড়া নেচে উঠল, ‘শিমুল তোর এই বইগুলো আমি কিন্তু একটা একটা করে পড়তে নেব। আবার ঠিকমতো ফেরত দিয়ে যাব।’
শিমুল হা হা করে হেসে ওঠে। বইগুলো আমি তোকে গিফট করলাম। ওগুলো তোর ফ্রেন্ড। আমি কী অত কঠিন বাংলা পড়তে পারি! তাছাড়া আমার তেমন ইন্টারেস্টও নেই। শিমুলের মা এক সময় ছেলের ঘরে এলেন। বইগুলোই প্রথম হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলেন তারপর ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘ওহু এই প্রেজেন্ট করেছে!’ ক্যামেরাটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘কিউট, বেশ। টেস্ট আছে বলতো হবে।’…
সবুজ ওদের ফ্যাট ‘নিরিবিলি’র লিফটে চারতলায় উঠে গেল। মা হাসমত আরা বসে ছিলেন ছেলের অপেক্ষায়। ওকে দেখে বলে উঠলেন, ‘এত দেরি করলি যে সবুজ।’ সবুজ আমতা আমতা করে বলে, ‘আর বলো না মা। শিমুল ছাড়তেই চায় না। ওর গিফটগুলো খুলে খুলে দেখাল। কতগুলো সুন্দর বই পেয়েছে মা। মাহেরা খালাম্মা দিয়েছেন। তা শিমুলের তেমন পছন্দ নয়।’ হাসমত আরা নিজে বইপাগল মানুষ, ছেলেও হয়েছে তাই। তিনি মৃদু হাসেন। সবই বুঝে নেন।
বেগম হাসমত আরা এক সময় বলেন, ‘আচ্ছা সবুজ পাশাপাশি থাকি আমরা। আমি তো দুইদিন গেলাম ওদের ফ্যাটে। শিমুলের মা তো একদিনও এলেন না। তুই আমার হয়ে বলবি আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতে কেমন?’
মঙ্গলবার হলুদ পাখির ডানার মতো বিকেলটা ফিকে হয়ে আসছে। এমনি সময় বেজে উঠল ডোরবেল। দরজা খুলে টুনি সবুজের মায়ের দীর্ঘদিনের সংসারের কাজের সহযোগী। শিমুল ভাইয়া! তার সাথে তার মা- ঝলমলে শাড়ি গহনা পরা ফর্সা মোটাসোটা। দরজা খুলে ড্রইংরুমের ফ্যান ছেড়ে দিয়ে টুনি দৌড়ে যায় ভেতরে। উত্তেজিত গলায় টুনি বলে, ‘খালাম্মা, শিমুল ভাইয়ার মায় বোধকরি আইছেন। আইয়েন জলদি।’ হাসমত আরা আলমিরা গোছাচ্ছিলেন। কোনোরকমে অগোছালো কাপড় চোপড়গুলো আলমিরা বন্ধ করে ব্যস্ত পায়ে ড্রইংরুমে আসেন। আন্তরিকতা মাখা গলায় বলেন, ‘ওহু শিমুল মাকে নিয়ে এসেছ। খুব খুশি হলাম।’ নানান আলাপচারিতার পর টিউলিপ চৌধুরী পা বাড়ালেন ডাইনিং স্পেসে। শিমুলের মা নিজে হাতে তৈরি পেঁপের হালুয়া, চটপটি দিয়ে যত্ন করে চা পরিবেশন করলেন। টিউলিপের মা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে এদিক ওদিক পরখ করেন। তারপর কেমন একটা উদাসীন গলায় বলেন, ‘ভাবী, আপনাদের ফ্যাটটা কত স্কয়ার ফিট? হাসমত আরা বলেন, ‘পনের শ স্কয়ার ফিট। আমাদের এতেই চলে যায়। ঐত একটাই ছেলে আমার।’ টিউলিপ চৌধুরীর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ভদ্রতার খাতিরে মুখে কিছু বলেন না। মনে মনে বলেন, ‘এত ছোট! মাগো কবুতরের খোপ। হাঁটাচলার উপায় নেই। আমার ফ্যাট তো এর ডাবল। তারপরও মনে হয় স্পেস কম।’ ফস করে বলেই বসেন, আচ্ছা ভাবী গেস্ট এলে কী করেন।’ মৃদ্যু হাসেন হাসমত আরা। সহজ গলায় বলেন, ‘কেন ভাবী সবুজ ওর ঘর ছেড়ে দেয়। ওকে ড্রইংরুমে ফোরে বিছানা করে দিই। বেশ মজাই পায় ছেলেটা।’
মিসেস টিউলিপ রাঙা ঠোঁট নেড়ে বলেন, ‘ওহ গড শিমুল কোনদিন ফোরে শোয়নি। তাছাড়া আমার তো চারটে বেডরুম। গেস্টরুম একটা। তেমন অসুবিধা হয় না।’
বেগম হাসমত আরার বই আর গাছের নেশা। ঝুল বারান্দায় ছোট ছোট টব। ঝোপালো গাছ লতাগুল্ম। লতিয়ে উঠেছে অপরাজিতা। ঝাঁকে ঝাঁকে ফুল ফোটে নীল, প্রজাপতির মতো। দক্ষিণের ঝুল বারান্দাটি হাসমত আরার বেডরুমে লাগোয়া। দেয়ালে কেরোসিন কাঠ দিয়ে বুক শেলফ করে কায়দা করে ফিক্সড করে দিয়েছেন। কত বই নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক ইত্যাদি। ঘরও একটা বুক শেলফ আছে। কিন্তু তাতে বইয়ের জায়গা হয় না।…
দেখতে দেখতে মাহে রমজান এসে গেল। এক মাসের সিয়াম সাধনা সহি-সালামতে শেষও হলো। আজ রাতে চিকন চাঁদ উঠেছে আকাশে। ঈদের ঐ পবিত্র চাঁদ দেখার আনন্দই একেবারে অন্যরকম। কী দারুণ উত্তেজনা! সবুজ আজ চিকন সোনার ফিতের মতো ঈদের চাঁদ দেখল। মা-বাবাও ছাদে উঠেছেন অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ঈদের চাঁদ দেখলেন।
এবার মায়ের আর টুনির সারারাত জেগে ঈদের প্রস্তুতি চলল। রান্নাবান্না, বেড কভার, টেবিল কথ রেডি করে রাখা আরো কত কাজ! সকালে ঈদগাহ থেকে ফিরে কোলাকুলির উৎসব শুরু হলো যেন। মায়ের হাতের প্রিয় দুধ-সেমাই কাবাব খেয়ে সবুজ গেল শিমুলদের বাড়ি। দুপুরে অনেক করে খেতে বলেছে ওর বন্ধু। এদিকে মায়ের হাতের ভুনা খিচুড়ির সুগন্ধ রান্নাঘর থেকে বাতাসে পাক খেয়ে খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দোস্তর বাড়ি না গেলেই নয়। স্কুলের বন্ধু পারভেজ আর ইফতেখারও এসেছে। টেবিলজুড়ে খাবার মেলা। মুরগি মোসাল্লাম থেকে শুরু করে কাচ্চি বিনিয়ানি। ট্রলিতে সাজানো হরেক রকম জেজার্ড। ওদের স্পেশাল বাবুর্চি আছে। ঈদে, বিশেষ পার্টিতে রান্নাবান্না করে।
বিকেলে সবুজদের বাসায় ওরা তিনজন বন্ধু আসবে। চা নাশতা খেয়ে ওরা রাতের খাবার খাবে। পারভেজ, ইফতেখার এই প্রথম সবুজদের বাসায় আসবে। … ওরা তিনজন এসে পড়েছে! সবুজের ঘরে বসে নানা গল্পে মেতে উঠেছে। এর মধ্যে টুনি চানাচুর, টম্যাটো কুচি, ধনেপাতা দিয়ে মুড়ি মাখা লবঙ্গলতিকা পিঠা নিয়ে এল। মজা করে খেল ওরা। পারভেজ একটু অন্য ধাঁচের ছেলে। ও যেমন মেধাবী তেমনি অমায়িক। পারভেজের চোখে মুখে আন্তরিক ভালো লাগার ঝিলিক ঝিলমিল করছে।
বেগম হাসমত আরার মা মা সুন্দর চেহারার মধ্যে কী যে মায়া মমতা! পারভেজকে মুগ্ধ করে। সত্যি কথা বলতে কী ওর কাছে সবুজদের বাসাটা বড় আপন আপন লাগছে। বেগম হাসমত আরা ঘর সাজিয়েছেন মাটির বিভিন্ন সুদৃশ্য পটের মধ্যে তাজা সবুজ গাছগাছালি দিয়ে। কোনটাতে ঝাপড়া মানিপ্যান্ট। কোনটাতে চোখজুড়ানো লতানো সবুজ লতা। পুরো ঝুল বারান্দা বাগানবিলাস থেকে পাথরকুচি ক্যাকটাস আর ফার্ন ইত্যাদি দিয়ে। খুব যত্ন বোঝা যায়। একটাও মরা পাতা নেই। খালাম্মার ঘর থেকে ভেসে আসছে মৃদু গানের সুর, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী’… পারভেজের মনে হলো কেমন অপূর্ব ঘোর লাগানো মিষ্টি ঘরদুয়ার। ও একটু অন্যরকম ভাবুক ছেলে। এই বয়সেই অনেক রকমের ভাবনা তার মনের ভেতর আনাগোনা করে। সবুজদের ফ্যাটটি একটু ছোট তাতে কী! শিমুলদের অত বিশাল ফ্যাট পারভেজের মনকে তেমন স্পর্শ করেনি। অথচ কী নেই ওদের! একটা আলগা কৃত্রিম সৌজন্যের ঝলমলে বাহার ছড়িয়ে আছে সারা বাড়ি। ওদের বসার ঘরে হায়দরি ভিক্টোরিয়ান সোফা। লাল টকটকে কভার পর্দাও টকটকে ঢেউখেলানো ঝুলটুল দিয়ে একেবারে জবরজং। চোখ জুড়ায় না, বরং চোখে কেমন ধাক্কা লাগে। আর এত বেশি ক্রিস্টালের শোপিস ঢাউস ঢাউস ফাওয়ার ভাসে যত্রতত্র প্লাস্টিকের ফুল ইয়া লম্বা লম্বা স্টিক গোঁজা। মনে হয় সবটাই বোধহয় লোক দেখানো। ঝাড়বাতিটার দিকে তাকিয়ে পারভেজের চোখজোড়া ফিরে এলো। সৌন্দর্য কতটুকু বুঝতে পারল না ও! ওর মনে হলো এক ধরনেরে উদ্ভিদ দম্ভ অহমিকা বিন্দু বিন্দু হয়ে জমাট বেঁধে আছে ওখানে। শিমুলদের ফ্যাটের ঝুল বারান্দা চারটি। সব যেন হু হু করছ। দামি চেয়ার পাতা। লাভ বার্ডগুলো খাঁচায় বন্দিত্বের কষ্টে কিচির মিচির করছে। কোথাও একটা জীবন্ত গাছ নেই।
মিসেস টিউলিপ গাছগাছড়া পছন্দ করেন না। বড় জংলী জংলী লাগে তাছাড়া মাটিতে কেঁচো হয়। বড় গা ঘিন ঘিন করে। শিমুলদের ফ্যাটের কারুকার্যময় দরজা, দামি দামি ফার্নিচার ইত্যাদির মধ্যে বিত্তবৈভবের ছড়াছড়ি। মনে হয় খুব সাবধানে বসতে হবে নড়াচড়া করতে হবে যেন কোন মহামূল্য শোপিস ইত্যাদি চূর্ণ-বিচূর্ণ না হয়ে যায়। পারভেজ সবুজের পিঠে হাত দিয়ে মুগ্ধ স্বরে ফিস ফিস করে বলে,
‘সবুজ তুই কিছু মনে করিস না ভাই। একটা কথা না বলে পারছি না শিমুলদের ফ্যাটে ঐশ্বর্যের বড়াই যেন ওঁৎ পেতে বসে আছে। মনে হয় ওটা একটা মিউজিয়াম-জাদুঘর। খুব সাবধানে পরখ করতে হয়, স্পর্শ করা যাবে না। আর তোদের ফ্যাটে পরতে পরতে নান্দনিকতা ভালোবাসা মমতা। তোদের বসার ঘরে বেডের সোফা সুন্দর কুশনগুলো মাটির পটে লতা সবুজ গাছগুলো। কী সুন্দর!’
সবুজ বলে, ‘ধন্যবাদ বন্ধু। কিন্তু আস্তে, শিশুল শুনলে দুঃখ পাবে।’
পারভেজ হাসে, ‘ওরা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত।’
টেবিল সাজাচ্ছেন সবুজের মা আর টুনিবুয়া। নারকেলের দুধ দিয়ে সাদা পোলাও, মুরগির কোরমা আর ফিরনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে তার ধূসর বোরকা দুলিয়ে। সবুজ মায়ের স্পেশাল বারান্দায় নিয়ে বসাল বন্ধুদের। ছোট ছোট মোড়া পাতা আছে ওখানে। দক্ষিণের হালকা বাতাস বইছে। ধবধবে সাদা নয়নতারা সবুজ পাতার ফাঁকে মুখ লুকিয়ে হাসছে। বাগানবিলাস ফুটেছে মেজেন্টা আর সাদা। এক টবে দুই রঙের গাছ লাগিয়েছেন বেগম হাসমত আরা। আর থরে থরে ফুটেছে লাজুক সন্ধ্যামণি। মেজেন্টা হলুদ। চার চারটি টব ভরে। বাতাস এতো সুরভিময়! শিমুলের আজ হঠাৎ যেন ময়ূরের মতো পেখম মেলে দিল। কী মিষ্টি সুগন্ধ! কী যে ভালো লাগছে শিমুলের! সবুজের মা গাছে নিয়মিত পানি দেন, চাপাতা, ডিমের খোসা গুঁড়ো করে মাটিতে নিজের হাতে মিশিয়ে দেন অসীম মমতায়। গাছের পুষ্টি হয়। ফুলও ফোটে থোকায় থোকায়।
শিমুল যেন নিজের মনকেই চিনতে পারছে না। নিবিড় আনন্দে থৈ থৈ করে উঠছে। বন্ধুকে বলে,
‘এই সবুজ এই ফুলের নামটা কিরে? ঠিক সন্ধ্যায় ফোটে! আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’
স্নিগ্ধ গলায় সবুজ বলে, ‘এর নাম বন্ধু সন্ধ্যামণি। মায়ের খুব পছন্দের ফুল। মায়ের কৈশোর নাকি জড়িয়ে আছে এই সন্ধ্যামণির পাপড়িতে পাপড়িতে। মায়েদের বাড়িতে অনেক সন্ধ্যামণি ফুটত তো। বারান্দায় বসে মা যখন পড়াশোনা করতেন তখন চারপাশটা সন্ধ্যামণির সুগন্ধে ম’ ম’ করত। মা আজো সে স্মৃতি ভুলতে পারেন না।’
পারভেজ নিরুত্তর। ওর মনের দু’কূল ভেসে যাচ্ছে আনন্দের বাঁধভাঙা ঢেউয়ে। এই ফুলফোটা ঈদ সন্ধ্যায় ওরা তিন বন্ধু যেন আত্মার আত্মীয় হয়ে গেল নতুন করে। পারভেজ কথাগুলো না বলে পারছে না।
‘জানিস তো দোস্তরা আমাদের বাতাসে বিষ সীসা ফলমূল, শাকসবজি, দুধ মাছে ফরমালিন আরও কত রকমের বিষক্রিয়া। এর মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু লোভী অমানুষ মানুষের জন্য এ দেশের আমজনতা ভুগছে। এর পরিণতি ভয়াবহ। বন্ধুরা নিজের পায়ে আমরা নিজেরাই কুড়াল মেরে চলেছি। অন্তত বাতাসের দূষণ আমরা কিছুটা হলেও দূর করতে পারি। গাছকে ভালবেসে। সারি সারি গাছ লাগিয়ে। দিনরাত গাছ কাটার মচ্ছব চলছে। হায় হায়রে নির্বোধ মানুষ তোদের অক্সিজেন কে দেবে? কার্বন-ডাই-অক্সাইড কে শুষে নেবে? জানিস তো গাছ আমাদের বন্ধু-আমাদের সাহস- প্রিয় বন্ধু- শক্তি গাছ আমাদের বেঁচে থাকার আনন্দ। আমাদের আত্মার আত্মীয় পরমাত্মীয়। একটু লেকচার দিয়ে ফেললাম। কিন্তু বুঝদার মানুষ মাত্রই এসব নিয়ে ভাববে, ভাবতেই হবে। বেলা যে বয়ে যায় রে ।’….
সবুজ, ইফতেখার একান্ত মনোযোগী শ্রোতার মতো ওর সুন্দর কথাগুলো শোনে। তখন সন্ধ্যামণিগুলো পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়েছে ।

শিমুল আর সবুজ ওরা দুইজন জানি দোস্ত। কাস এইটে পড়ে ওরা দু’জন। তবে সবুজ একটা নামকরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে আর শিমুল সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে। শিমুলের বাবা একজন উঠতি শিল্পপতি। আর সবুজের বাবা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। মা একটা কলেজে বোটানি পড়ান। ওদের দুই বন্ধুর ফ্যাট পাশাপাশি গা লাগোয়া প্রায়। এ বাড়িতে কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলে ও ফ্যাট থেকে দিব্যি শোনা যায় আর এ ফ্যাটে ডালের ফোঁড়ন দিলে সুগন্ধটুকু ভেসে যায় ও ফ্যাটে। তবে শিমুলদের ফ্যাট বেশ খোলামেলা আধুনিক ঝাঁ চকচকে। সাইজ ৩০০০ স্কয়ার ফিট। সবুজদের ফ্যাটটি কিছুটা ছোট তবে ঝুল বারান্দা আছে তিনটি- ওদের হলো গিয়ে ১৫০০ স্কয়ার ফিট। আষাঢ় মাসে ঘোর বর্ষা। আকাশে কালো মেঘের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকেলের দিকে আকাশ খানিকটা প্রসন্ন হলো। হালকা কমলারঙের রোদে ভরে গেছে চারপাশ। সবুজ এসেছে বন্ধুর ফ্যাটে। আজ শিমুলের জš§দিন। দশ পাউন্ডের স্পেশাল চকলেট কেক এসেছে আর রাজ্যের খাবার দশসই টেবিলজুড়ে। শাহি হালিম থেকে চিকেন রোল পিৎজা কাস্টার্ড কী নেই! হৈ হল্লা কওে কেক কাটল শিমুল। পেশাদার ফটোগ্রাফার এসেছে। তাছাড়া শিমুলের বাবা-মায়ের হাতেও ক্যামেরা। চারপাশে কিক কিক। একটা খুব জমকালো পাঞ্জাবি পরেছে আজ শিমুল। যেন আজ ও শাহজাদা। বন্ধুদের মধ্যে সাজ্জাদ, তানভির, টুটুল, হেনরি, সেজান ও আরো অনেকে চলে গেছে। সবুজ রয়ে গেছে। শিমুল বলছিল, ‘সবুজ তুই কিন্তু এখনই চলে যাবি না। আমি আর তুই দু’জনে মিলে গিফট প্যাকেটগুলো খুলব, কেমন? খুব মজা হবে রে।’সবুজ মনে মনে একটু বিব্রত হয় বৈকি! মা বসে থাকবেন। বাবাও ঘরে ফিরে ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু বন্ধুর এ আন্তরিক আমন্ত্রণ কি ফেলে দেয়া যায়? দোটানায় পড়ে সবুজ চুপ করে খানিকক্ষণ ভাবে। তারপর বলে ওঠে, ‘চল চল জলদি। রাত হয়ে যাচ্ছে বন্ধু।’ শিমুল হাসে, ‘কী এমন রাত দেখলি দোস্ত? সবে ত সন্ধ্যা সাতটা। দুই পা বাড়ালেই তো নিজের ঘরে চলে যাবে।’ ওরা দু’জন হাসতে হাসতে গিফট প্যাকেটগুলো খুলতে যায়। ওগুলো লাল মিয়া শিমুলের সুন্দর ঝকঝকে উজ্জ্বল পর্দা আর দামি ফার্নিচার দিয়ে সাজানো ঘরে এসে বসে। ঘরের একপাশে একটা সুদৃশ্য ডিভনা। তাতে স্তূপ করে রাখা খেলনা, বাইনাকুলার ঢেডি বিয়ার, ক্যামেরা ইত্যাদি। একটা প্যাকেট সুদৃশ্য মোড়কে প্যাকেট করা। মনে হচ্ছে বই। চটপট খুলে ফেলে সবুজ। সত্যিই একরাশ প্রিয় বই। বুড়ো আঙলা, চাঁদের পাহাড়, রানী খালের সাঁকো, সঞ্চিতা, আমার ছেলেবেলা। বইগুলো দিয়ে কী সুন্দর সুগন্ধ! সবুজের মন ভরে গেল। ওর উজ্জ্বল চোখজোড়া নেচে উঠল, ‘শিমুল তোর এই বইগুলো আমি কিন্তু একটা একটা করে পড়তে নেব। আবার ঠিকমতো ফেরত দিয়ে যাব।’ শিমুল হা হা করে হেসে ওঠে। বইগুলো আমি তোকে গিফট করলাম। ওগুলো তোর ফ্রেন্ড। আমি কী অত কঠিন বাংলা পড়তে পারি! তাছাড়া আমার তেমন ইন্টারেস্টও নেই। শিমুলের মা এক সময় ছেলের ঘরে এলেন। বইগুলোই প্রথম হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলেন তারপর ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘ওহু এই প্রেজেন্ট করেছে!’ ক্যামেরাটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘কিউট, বেশ। টেস্ট আছে বলতো হবে।’…সবুজ ওদের ফ্যাট ‘নিরিবিলি’র লিফটে চারতলায় উঠে গেল। মা হাসমত আরা বসে ছিলেন ছেলের অপেক্ষায়। ওকে দেখে বলে উঠলেন, ‘এত দেরি করলি যে সবুজ।’ সবুজ আমতা আমতা করে বলে, ‘আর বলো না মা। শিমুল ছাড়তেই চায় না। ওর গিফটগুলো খুলে খুলে দেখাল। কতগুলো সুন্দর বই পেয়েছে মা। মাহেরা খালাম্মা দিয়েছেন। তা শিমুলের তেমন পছন্দ নয়।’ হাসমত আরা নিজে বইপাগল মানুষ, ছেলেও হয়েছে তাই। তিনি মৃদু হাসেন। সবই বুঝে নেন।বেগম হাসমত আরা এক সময় বলেন, ‘আচ্ছা সবুজ পাশাপাশি থাকি আমরা। আমি তো দুইদিন গেলাম ওদের ফ্যাটে। শিমুলের মা তো একদিনও এলেন না। তুই আমার হয়ে বলবি আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতে কেমন?’ মঙ্গলবার হলুদ পাখির ডানার মতো বিকেলটা ফিকে হয়ে আসছে। এমনি সময় বেজে উঠল ডোরবেল। দরজা খুলে টুনি সবুজের মায়ের দীর্ঘদিনের সংসারের কাজের সহযোগী। শিমুল ভাইয়া! তার সাথে তার মা- ঝলমলে শাড়ি গহনা পরা ফর্সা মোটাসোটা। দরজা খুলে ড্রইংরুমের ফ্যান ছেড়ে দিয়ে টুনি দৌড়ে যায় ভেতরে। উত্তেজিত গলায় টুনি বলে, ‘খালাম্মা, শিমুল ভাইয়ার মায় বোধকরি আইছেন। আইয়েন জলদি।’ হাসমত আরা আলমিরা গোছাচ্ছিলেন। কোনোরকমে অগোছালো কাপড় চোপড়গুলো আলমিরা বন্ধ করে ব্যস্ত পায়ে ড্রইংরুমে আসেন। আন্তরিকতা মাখা গলায় বলেন, ‘ওহু শিমুল মাকে নিয়ে এসেছ। খুব খুশি হলাম।’ নানান আলাপচারিতার পর টিউলিপ চৌধুরী পা বাড়ালেন ডাইনিং স্পেসে। শিমুলের মা নিজে হাতে তৈরি পেঁপের হালুয়া, চটপটি দিয়ে যতœ করে চা পরিবেশন করলেন। টিউলিপের মা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে এদিক ওদিক পরখ করেন। তারপর কেমন একটা উদাসীন গলায় বলেন, ‘ভাবী, আপনাদের ফ্যাটটা কত স্কয়ার ফিট? হাসমত আরা বলেন, ‘পনের শ স্কয়ার ফিট। আমাদের এতেই চলে যায়। ঐত একটাই ছেলে আমার।’ টিউলিপ চৌধুরীর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ভদ্রতার খাতিরে মুখে কিছু বলেন না। মনে মনে বলেন, ‘এত ছোট! মাগো কবুতরের খোপ। হাঁটাচলার উপায় নেই। আমার ফ্যাট তো এর ডাবল। তারপরও মনে হয় স্পেস কম।’ ফস করে বলেই বসেন, আচ্ছা ভাবী গেস্ট এলে কী করেন।’ মৃদ্যু হাসেন হাসমত আরা। সহজ গলায় বলেন, ‘কেন ভাবী সবুজ ওর ঘর ছেড়ে দেয়। ওকে ড্রইংরুমে ফোরে বিছানা করে দিই। বেশ মজাই পায় ছেলেটা।’ মিসেস টিউলিপ রাঙা ঠোঁট নেড়ে বলেন, ‘ওহ গড শিমুল কোনদিন ফোরে শোয়নি। তাছাড়া আমার তো চারটে বেডরুম। গেস্টরুম একটা। তেমন অসুবিধা হয় না।’ বেগম হাসমত আরার বই আর গাছের নেশা। ঝুল বারান্দায় ছোট ছোট টব। ঝোপালো গাছ লতাগুল্ম। লতিয়ে উঠেছে অপরাজিতা। ঝাঁকে ঝাঁকে ফুল ফোটে নীল, প্রজাপতির মতো। দক্ষিণের ঝুল বারান্দাটি হাসমত আরার বেডরুমে লাগোয়া। দেয়ালে কেরোসিন কাঠ দিয়ে বুক শেলফ করে কায়দা করে ফিক্সড করে দিয়েছেন। কত বই নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক ইত্যাদি। ঘরও একটা বুক শেলফ আছে। কিন্তু তাতে বইয়ের জায়গা হয় না।…দেখতে দেখতে মাহে রমজান এসে গেল। এক মাসের সিয়াম সাধনা সহি-সালামতে শেষও হলো। আজ রাতে চিকন চাঁদ উঠেছে আকাশে। ঈদের ঐ পবিত্র চাঁদ দেখার আনন্দই একেবারে অন্যরকম। কী দারুণ উত্তেজনা! সবুজ আজ চিকন সোনার ফিতের মতো ঈদের চাঁদ দেখল। মা-বাবাও ছাদে উঠেছেন অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ঈদের চাঁদ দেখলেন। এবার মায়ের আর টুনির সারারাত জেগে ঈদের প্রস্তুতি চলল। রান্নাবান্না, বেড কভার, টেবিল কথ রেডি করে রাখা আরো কত কাজ! সকালে ঈদগাহ থেকে ফিরে কোলাকুলির উৎসব শুরু হলো যেন। মায়ের হাতের প্রিয় দুধ-সেমাই কাবাব খেয়ে সবুজ গেল শিমুলদের বাড়ি। দুপুরে অনেক করে খেতে বলেছে ওর বন্ধু। এদিকে মায়ের হাতের ভুনা খিচুড়ির সুগন্ধ রান্নাঘর থেকে বাতাসে পাক খেয়ে খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দোস্তর বাড়ি না গেলেই নয়। স্কুলের বন্ধু পারভেজ আর ইফতেখারও এসেছে। টেবিলজুড়ে খাবার মেলা। মুরগি মোসাল্লাম থেকে শুরু করে কাচ্চি বিনিয়ানি। ট্রলিতে সাজানো হরেক রকম জেজার্ড। ওদের স্পেশাল বাবুর্চি আছে। ঈদে, বিশেষ পার্টিতে রান্নাবান্না করে। বিকেলে সবুজদের বাসায় ওরা তিনজন বন্ধু আসবে। চা নাশতা খেয়ে ওরা রাতের খাবার খাবে। পারভেজ, ইফতেখার এই প্রথম সবুজদের বাসায় আসবে। … ওরা তিনজন এসে পড়েছে! সবুজের ঘরে বসে নানা গল্পে মেতে উঠেছে। এর মধ্যে টুনি চানাচুর, টম্যাটো কুচি, ধনেপাতা দিয়ে মুড়ি মাখা লবঙ্গলতিকা পিঠা নিয়ে এল। মজা করে খেল ওরা। পারভেজ একটু অন্য ধাঁচের ছেলে। ও যেমন মেধাবী তেমনি অমায়িক। পারভেজের চোখে মুখে আন্তরিক ভালো লাগার ঝিলিক ঝিলমিল করছে। বেগম হাসমত আরার মা মা সুন্দর চেহারার মধ্যে কী যে মায়া মমতা! পারভেজকে মুগ্ধ করে। সত্যি কথা বলতে কী ওর কাছে সবুজদের বাসাটা বড় আপন আপন লাগছে। বেগম হাসমত আরা ঘর সাজিয়েছেন মাটির বিভিন্ন সুদৃশ্য পটের মধ্যে তাজা সবুজ গাছগাছালি দিয়ে। কোনটাতে ঝাপড়া মানিপ্যান্ট। কোনটাতে চোখজুড়ানো লতানো সবুজ লতা। পুরো ঝুল বারান্দা বাগানবিলাস থেকে পাথরকুচি ক্যাকটাস আর ফার্ন ইত্যাদি দিয়ে। খুব যতœ করেন বোঝা যায়। একটাও মরা পাতা নেই। খালাম্মার ঘর থেকে ভেসে আসছে মৃদু গানের সুর, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী’… পারভেজের মনে হলো কেমন অপূর্ব ঘোর লাগানো মিষ্টি ঘরদুয়ার। ও একটু অন্যরকম ভাবুক ছেলে। এই বয়সেই অনেক রকমের ভাবনা তার মনের ভেতর আনাগোনা করে। সবুজদের ফ্যাটটি একটু ছোট তাতে কী! শিমুলদের অত বিশাল ফ্যাট পারভেজের মনকে তেমন স্পর্শ করেনি। অথচ কী নেই ওদের! একটা আলগা কৃত্রিম সৌজন্যের ঝলমলে বাহার ছড়িয়ে আছে সারা বাড়ি। ওদের বসার ঘরে হায়দরি ভিক্টোরিয়ান সোফা। লাল টকটকে কভার পর্দাও টকটকে ঢেউখেলানো ঝুলটুল দিয়ে একেবারে জবরজং। চোখ জুড়ায় না, বরং চোখে কেমন ধাক্কা লাগে। আর এত বেশি ক্রিস্টালের শোপিস ঢাউস ঢাউস ফাওয়ার ভাসে যত্রতত্র প্লাস্টিকের ফুল ইয়া লম্বা লম্বা স্টিক গোঁজা। মনে হয় সবটাই বোধহয় লোক দেখানো। ঝাড়বাতিটার দিকে তাকিয়ে পারভেজের চোখজোড়া ফিরে এলো। সৌন্দর্য কতটুকু বুঝতে পারল না ও! ওর মনে হলো এক ধরনেরে উদ্ভিদ দম্ভ অহমিকা বিন্দু বিন্দু হয়ে জমাট বেঁধে আছে ওখানে। শিমুলদের ফ্যাটের ঝুল বারান্দা চারটি। সব যেন হু হু করছ। দামি চেয়ার পাতা। লাভ বার্ডগুলো খাঁচায় বন্দিত্বের কষ্টে কিচির মিচির করছে। কোথাও একটা জীবন্ত গাছ নেই। মিসেস টিউলিপ গাছগাছড়া পছন্দ করেন না। বড় জংলী জংলী লাগে তাছাড়া মাটিতে কেঁচো হয়। বড় গা ঘিন ঘিন করে। শিমুলদের ফ্যাটের কারুকার্যময় দরজা, দামি দামি ফার্নিচার ইত্যাদির মধ্যে বিত্তবৈভবের ছড়াছড়ি। মনে হয় খুব সাবধানে বসতে হবে নড়াচড়া করতে হবে যেন কোন মহামূল্য শোপিস ইত্যাদি চূর্ণ-বিচূর্ণ না হয়ে যায়। পারভেজ সবুজের পিঠে হাত দিয়ে মুগ্ধ স্বরে ফিস ফিস করে বলে, ‘সবুজ তুই কিছু মনে করিস না ভাই। একটা কথা না বলে পারছি না শিমুলদের ফ্যাটে ঐশ্বর্যের বড়াই যেন ওঁৎ পেতে বসে আছে। মনে হয় ওটা একটা মিউজিয়াম-জাদুঘর। খুব সাবধানে পরখ করতে হয়, স্পর্শ করা যাবে না। আর তোদের ফ্যাটে পরতে পরতে নান্দনিকতা ভালোবাসা মমতা। তোদের বসার ঘরে বেডের সোফা সুন্দর কুশনগুলো মাটির পটে লতা সবুজ গাছগুলো। কী সুন্দর!’সবুজ বলে, ‘ধন্যবাদ বন্ধু। কিন্তু আস্তে, শিশুল শুনলে দুঃখ পাবে।’পারভেজ হাসে, ‘ওরা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত।’ টেবিল সাজাচ্ছেন সবুজের মা আর টুনিবুয়া। নারকেলের দুধ দিয়ে সাদা পোলাও, মুরগির কোরমা আর ফিরনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে তার ধূসর বোরকা দুলিয়ে। সবুজ মায়ের স্পেশাল বারান্দায় নিয়ে বসাল বন্ধুদের। ছোট ছোট মোড়া পাতা আছে ওখানে। দক্ষিণের হালকা বাতাস বইছে। ধবধবে সাদা নয়নতারা সবুজ পাতার ফাঁকে মুখ লুকিয়ে হাসছে। বাগানবিলাস ফুটেছে মেজেন্টা আর সাদা। এক টবে দুই রঙের গাছ লাগিয়েছেন বেগম হাসমত আরা। আর থরে থরে ফুটেছে লাজুক সন্ধ্যামণি। মেজেন্টা হলুদ। চার চারটি টব ভরে। বাতাস এতো সুরভিময়! শিমুলের আজ হঠাৎ যেন ময়ূরের মতো পেখম মেলে দিল। কী মিষ্টি সুগন্ধ! কী যে ভালো লাগছে শিমুলের! সবুজের মা গাছে নিয়মিত পানি দেন, চাপাতা, ডিমের খোসা গুঁড়ো করে মাটিতে নিজের হাতে মিশিয়ে দেন অসীম মমতায়। গাছের পুষ্টি হয়। ফুলও ফোটে থোকায় থোকায়। শিমুল যেন নিজের মনকেই চিনতে পারছে না। নিবিড় আনন্দে থৈ থৈ করে উঠছে। বন্ধুকে বলে, ‘এই সবুজ এই ফুলের নামটা কিরে? ঠিক সন্ধ্যায় ফোটে! আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’ স্নিগ্ধ গলায় সবুজ বলে, ‘এর নাম বন্ধু সন্ধ্যামণি। মায়ের খুব পছন্দের ফুল। মায়ের কৈশোর নাকি জড়িয়ে আছে এই সন্ধ্যামণির পাপড়িতে পাপড়িতে। মায়েদের বাড়িতে অনেক সন্ধ্যামণি ফুটত তো। বারান্দায় বসে মা যখন পড়াশোনা করতেন তখন চারপাশটা সন্ধ্যামণির সুগন্ধে ম’ ম’ করত। মা আজো সে স্মৃতি ভুলতে পারেন না।’পারভেজ নিরুত্তর। ওর মনের দু’কূল ভেসে যাচ্ছে আনন্দের বাঁধভাঙা ঢেউয়ে। এই ফুলফোটা ঈদ সন্ধ্যায় ওরা তিন বন্ধু যেন আত্মার আত্মীয় হয়ে গেল নতুন করে। পারভেজ কথাগুলো না বলে পারছে না।‘জানিস তো দোস্তরা আমাদের বাতাসে বিষ সীসা ফলমূল, শাকসবজি, দুধ মাছে ফরমালিন আরও কত রকমের বিষক্রিয়া। এর মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু লোভী অমানুষ মানুষের জন্য এ দেশের আমজনতা ভুগছে। এর পরিণতি ভয়াবহ। বন্ধুরা নিজের পায়ে আমরা নিজেরাই কুড়াল মেরে চলেছি। অন্তত বাতাসের দূষণ আমরা কিছুটা হলেও দূর করতে পারি। গাছকে ভালবেসে। সারি সারি গাছ লাগিয়ে। দিনরাত গাছ কাটার মচ্ছব চলছে। হায় হায়রে নির্বোধ মানুষ তোদের অক্সিজেন কে দেবে? কার্বন-ডাই-অক্সাইড কে শুষে নেবে? জানিস তো গাছ আমাদের বন্ধু- আমাদের সাহস- প্রিয় বন্ধু- শক্তি গাছ আমাদের বেঁচে থাকার আনন্দ। আমাদের আত্মার আত্মীয় পরমাত্মীয়। একটু লেকচার দিয়ে ফেললাম। কিন্তু বুঝদার মানুষ মাত্রই এসব নিয়ে ভাববে, ভাবতেই হবে। বেলা যে বয়ে যায় রে ।’….সবুজ, ইফতেখার একান্ত মনোযোগী শ্রোতার মতো ওর সুন্দর কথাগুলো শোনে। তখন সন্ধ্যামণিগুলো পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়েছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*