Home নিয়মিত এক বর্ষায়

এক বর্ষায়

মাহীদ ইমরান

ঝম ঝম বৃষ্টি। ঘন ঘন বিদ্যুৎ। গুরুগম্ভীর বজ্রধ্বনি। আকাশের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ঘোর কালো মেঘমালা বিস্তৃৃত। যেন কালোমুখী মেঘমালা মুগ্ধরূপী বাংলার সাথে অভিমান করে বেজার মুখে, ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে, ছল ছল করে তাকিয়ে আছে। আর অপ্রসন্ন মনে প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছে। মাঝে মাঝে আবার তর্জে গর্জে হাঁকডাক দিয়ে চেঁচিয়ে তুলছে গোটা প্রকৃতিকে। এক বর্ষাঝরা প্রভাতে কেদারায় দুলে দুলে বাতায়নের পর্দা সরিয়ে অপলক নেত্রে দূরদিগন্তে আলোকপাত করছিলাম এবং অত্যন্ত আবেগ প্রবাহে আপ্লুত হয়ে ভাবালুতা, সতেজ সরল মনে কী সব ভাবছিলাম। আব্বুর মারের ভয়ে বাংলা বইখানা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে পড়ার ভান করছিলাম। প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও আম্মা রান্না করেছেন। কেননা একটু পরে আমার ক্লাসে যেতে হবে। তবে আজকের খাবারের আয়োজনটা ছিল অন্যরকম। পদ্মার রূপালি ইলিশ ভাজি, লাউশাক দিয়ে ইলিশের মাথা রান্না, মসুরিসহ আরো হরেক রকম খাবার ছিল আজকের ডাইনিং টেবিলে। ইলিশ ভাজির ঘ্রাণটা ছিল মনমাতানো। মুহূর্তের মধ্যেই যেন ঘ্রাণে ঘ্রাণে ছেয়ে গেছে চারদিক। মুগ্ধময় গন্ধে জিভটা চোঁ চোঁ করে উঠল। অভিমানে ভারমুখী মেঘমালারও যেন ইলিশের সুঘ্রাণে আকুল হয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। বৃষ্টিরা হুম হুম করে আরো প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে। বৃষ্টিদেরও যেন ইলিশের পরে লোভ লেগেছে। নিস্তব্ধ নীরব প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে বর্ষাকে নিয়ে এমনি করে ভাবতে বেজায় ভাল লাগছিল আমার। দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িটা যেন আমার সাথে রেষারেষি শুরু করেছে। দ্রুতগতিতে শুধু এগিয়েই চলছে। মুহূর্তের মধ্যেই টঙ টঙ করে ক্লাসে যাওয়ার ঘণ্টা বাজাল। তড়িঘড়ি ছুটে গেলাম ডাইনং টেবিলে। প্রগাঢ় লোভে আপ্লুত হয়ে পড়লাম এবং খুব মজা করেই খেলাম।  ঝটপট ইউনিফর্ম পরে স্কুলব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেশ আড়ম্বরের সাথে স্কুলের উদ্দেশে রওনা হলাম। ছাতা মাথায় প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। মাঝে মধ্যে ঝড়োবাতাসের রুক্ষ মূর্তি, যেন মাথার ছাতা ছিনিয়ে নেবে। হাঁটছিলাম অতীব আগ্রহের সাথে স্কুলপথে। কী দারুণ মজা লাগছিল আমার! অপূর্ব দোলায় দোলায়, সুশোভিত পুষ্পের ন্যায় আনন্দে উচ্ছল হয়ে পড়ল হৃদয়-মন। ক্ষণিকের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে গেলাম। ক্লাসে প্রবেশ করলাম। এরপর স্যার এলেন। বাংলা স্যার বর্ষাকে নিয়ে বেশ মজার মজার গল্প বললেন। তাছাড়া অন্যান্য টিচারদের মুখেও কম-বেশি গল্প গুজব, তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিকথা শুনলাম। তখনও কিন্তু অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। দ্বিপ্রহর ঘনিয়ে এলো। দফতরি ছুটির ঘণ্টা বাজাল। তখন ঠিক দুপুর। আকাশের কালো কালো মেঘে চারদিক ঘোর অন্ধকার। দুপুরকে উপলব্ধিই করা যাচ্ছে না, যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দ্বিপ্রহরের এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, মেঘের নির্মম কবলে পড়ে হয়তো, তেজোদীপ্ত সূর্যের মুখশ্রী হিম-শীতল হয়ে চির অস্তমিত হয়ে গেছে। বাড়ির দিকে ছুটলাম। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেল। ক্ষুধার তাড়নায় পেটে হুম হুম শব্দ শুরু করে দিলো। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বাড়িতে তো আজ পিঠা-পুলির আয়োজন। আম্মাতো পিঠে তৈরি করছেন। বর্ষার দিনে পিঠে খেতে কী যে মজা!  বর্ষাকে নিয়ে এখন আর ভাবতে ভাল লাগছে না। মনও বসছে না। এখন শুধু পিঠে আর ইলিশ, কখন যাব? কখন খাব? হাঁটছি তো হাঁটছিই। ডানে-বামেও ফেরা নেই, শশব্যস্ত! সহসা কে যেন  পেছনে থেকে শিশুসুলভকণ্ঠে, অত্যন্ত করুণ সুরে ডাক দিল – ভাইয়া! ভাইয়া! ভাইয়া। আমি  পেছনে তো ফিরে তাকালাম- ই না বরং বেশি একটা গুরুত্বের সাথে কর্ণপাত না করে হেঁটেই চললাম। কিছুক্ষণ পর অতিশয় মিনতির স্বরে ভাইয়া! ভাইয়া! বলে আবারও সম্বোধন করল। আমি অত্যন্ত বিরক্তি বোধ করলাম এবং তীক্ষ দৃষ্টিতে  পেছনে ফিরে তাকালাম। দেখতে পেলাম আট-নয় বছর বয়সের একটি বালক হাঁফাতে হাঁফাতে আমার কাছে দৌড়ে আসছে। বালকটি অত্যন্ত নমনীয় পদে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। তখন বেশি একটা বৃষ্টি নেই, গুঁড়ি গুঁড়ি ঝরছে। বালকটি ভারাক্রান্ত হৃদয়, অসহায়ের মতো ছল ছল করে আমার মুখের পানে তাকিয়ে কী যেন বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হচ্ছে। শুকনো মুখ থেকে যেন কথা বেরোচ্ছে না। কষ্টে বুকটা খাঁ খাঁ করছে। কী এক করুণ দৃশ্য ফুটে আছে বালকটির মুখমণ্ডলে। মাথার অগোছালো উসকো-খুসকো চুলগুলো ভিজে টুপটুপে হয়ে আছে। আমি ছাতাটা এগিয়ে বালকটিকে ছাতার তলে নিয়ে নিলাম। বালকটির শুষ্ক মুখের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা টেনে অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে – ভাইয়া! এতটুকু বর্ষায় ভিজলে আর কী হবে? সারা রাত সারা দিন বর্ষার মধ্যে-ই কাটাতে হয়। আমি বললাম, তাহলে কি তোমাদের বাড়িঘর নেই? বালকটি আর্ত-বিহ্বল কণ্ঠে জবাব দিল, নদীর পাড়ে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর আছে ভাইয়া! বর্ষা এলে ঝুপ ঝুপ করে চালার ফাঁকা দিয়ে পানি পড়ে। অনেক কষ্টে সেখানে থাকতে হয়। আমার সমস্ত শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।  বালকটিকে কী যেন বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু বলতে পারলাম না। ক্ষণকাল বালকটির সঙ্কীর্ণ মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরপর বালকটি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে চরম বিরক্তির স্বরে বলল, ভাইয়া আমি আজ দুই দিন অনাহারে, বাবা কাজ করতে পারেন না। বর্ষায় ভিজে কাজ করতে করতে অসুখ লেগেছে। বিছানায় পড়ে অসহায়ভাবে আর্তনাদ করছে। ওষুধ খেতে পারছে না। ক্ষুধা পেয়েছে অসুস্থ বাবার। কিন্তু বাবাকে দেয়ার মতো আমাদের ঘরে কিছুই নেই, আমরা সকলে অনাহারে থাকি। মা নদীতে জাল ফেলে কিছু মাছ ধরে, তা বিক্রি করে যে সামান্য পরিমাণ টাকা পাওয়া যায়, তাতে বর্তমানে উচ্চমূল্যের বাজার থেকে এক বেলার আহারও ক্রয় করতে পারি না। বালকটির এই হৃদয়বিদারক ভাষ্যে আমার হৃদয় বিষাদে আপ্লুত হয়ে পড়ল। আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ইতস্তত হয়ে বালকটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম তোমার নাম কী? বলল লিখন। বললাম, লিখন, তুমি এখন কোথায় যাবে? লিখন অবনত মস্তকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বলল, ভাইয়া! কোথায় আর যাব, দুটো টাকার জন্য আপনাকে ডেকেছিলাম,  দেবেন কি? আমি পকেটে থাকা মাত্র বিশ টাকার নোটটা লিখনের হাতে তুলে দিলাম। লিখন সাথে সাথে আমার পায়ের পরে লুটিয়ে পড়ল এবং অস্পষ্ট মৃদুকণ্ঠে বলল, ভাইয়া! আপনি এত্ত ভাল! আবেগঘন ভঙ্গির মাধ্যমে, বাহুদ্বয় প্রসারিত করে লিখনকে পা থেকে তুলে নিলাম। বুকের সাথে আলিঙ্গন করলাম।  বলল ভাইয়া, আমি এখন চললাম। আমি মায়াবী মুখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম লিখনের যাওয়া পথের দিকে। নিমেষের মধ্যে লিখন অদৃশ্য হয়ে গেল। গুটি গুটি পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম এবং মনঃক্ষুন্ন হয়ে ভাবলাম, সকালে পেটপুরে মজাদার সুস্বাদু খাবার খেয়ে এলাম, ক্লাসের মাঝে আবার টিফিন করলাম। দুপুর না গড়াতেই আবার হুম হুম করে ছুটছি পিঠে আর ইলিশ! কখন যাব? কখন খাব? কিন্তু লিখন কি ওর জীবনে একবারও ইলিশ পিঠে খেতে পেরেছে?

সেই বৃষ্টিমুখর এক দুপুর থেকে আমি প্রতিদিন লিখনকে খুঁজে ফিরি, না জানি লিখন কতদিন অনাহারে আছে। বর্ষায় ভিজে পথে পথে দুটো টাকা ভিক্ষে করে ফিরছে। হৃদয়ের তারে তারে ঝঙ্কার হয়ে আজ শুধু একটি প্রশ্নই উঁকি দিচ্ছে বারবার, তাহলে কি লিখনের ঐ ফুলের মতো পবিত্র জীবনটা এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে?

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply