Home নিয়মিত সূর্য

সূর্য

দু’পাশে পাহাড়-পূর্বা আর পশ্চিমা! একপাশে নদী আর একপাশে বন-পাহাড় নদী আর বনের গা ছুঁয়ে বিশাল এক ভূখণ্ড। সেই ভূখণ্ডে রয়েছে কয়েকটি গ্রাম। সেই গ্রামের ভেতর একটি গ্রাম মৌঝুরি। মৌঝুরির শেষপ্রান্তে আমজাদ মৃধার বাড়ি। যে নদীটি মৌঝুরির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সে নদীর নাম ঝিলমিল। ঝিলমিলের ওপারে তিতিরপুর। সেখানে রয়েছে তিতিরপুর বালিকা বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন আমজাদ মৃধাÑ তাই তার বাড়ির নাম হয়েছে মাস্টারবাড়ি।
মাস্টারবাড়ির ছেলে সূর্য। বারো কি তেরো বছর বয়স। কোঁকড়ানো চুল, টানাটানা চোখ, সুঠাম স্বাস্থ্য আর গায়ের রঙ ফর্সা।
যেদিন সূর্যের জন্ম হয়েছিলো সেদিন সারা পৃথিবীর আনন্দ এসে ধরা দিয়েছিলো আমজাদ মৃধার মনে। উপার্জন সীমিত। তবু তার সাধ্য মতো গ্রামের মানুষজনকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিলেন তিনি। বড়ো হয়ে বংশের নাম আলোকিত করবে, সে আশায় বুক বেঁধে ছেলের নাম রেখেছিলেন সূর্য। বন্ধু-বান্ধব আর প্রতিবেশীদের ডেকে বলতেন, আমি মাস্টার হয়েছি। আমার ছেলে প্রফেসর হবে-দেশের সেরা প্রফেসর।
মেধাবী শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধি ছিলো না আমজাদ মৃধার। বাবার আমলের যেটুকু জমিজমা ছিলো, তার কিছু নদীর বুকে আর কিছু অভাবের কারণে হারিয়েছেন। আমজাদ মৃধার মৃত্যুর পর চারদিক থেকে সেই অভাব সূর্য আর ওর মাকে জড়িয়ে ধরেছে। দিন যতো পেরিয়েছে অভাব ততো গাঢ় হয়েছে- অভাব যতো গাঢ় হয়েছে সূর্যের মন ততো বাঁধনহারা হয়েছে।
মাকে মনের ভেতর থেকে শ্রদ্ধা করে সূর্য। মায়ের জন্য সূর্য ওর জীবনটাও বিলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মায়ের কোনো শাসন মানে না সূর্য। মা যখন ওর কোনো অসুন্দর কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ান, সূর্য তখন খুব দক্ষতার সঙ্গে মায়ের বাঁধন ছিঁড়ে নিজের পথে চলে যায়। আর প্রতিবেশীদের কেউ যদি কোনো কাজের প্রতিবাদ করে, তবে তার ফল হয় উল্টো। সূর্য তাদের কথা তো শোনেই না, বরং কোনো না কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে সে তাদের বিপদে ফেলে। এ কারণে সবাই বলে সূর্য মানুষ নয়- সে একটা হনুমান। সে কথা শুনে সূর্য হাসে আর বলে, হনুমান দেখার জন্য মানুষ চিড়িয়াখানায় যায়। তাতে অনেক টাকা খরচ হয়। তা যেনো না হয়, সে জন্য আমি চিড়িয়াখানা ছেড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াই।
সূর্য কি দিনরাতের সারাটা সময় শুধু মানুষজনকে জ্বালাতনই করে? না, সারাটা সময় সে তা করে না। ভালোয়-মন্দয় মিলিয়ে যেমন মানুষ, সূর্যের মাঝেও তেমন মন্দের সঙ্গে কিছু ভালো গুণ রয়েছে। সূর্য মানুষের কষ্ট সইতে পারে না। মানুষের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংসারের অভাব ঘোচাবার জন্য উপার্জনের চেষ্টা করে। দুঃখী মাকে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। তারপরও সবাই বলে ওকে দিয়ে কোনো ভালো কাজ হবে না! সূর্য সে কথা পরোয়া করে না। কারো অভিযোগের ব্যাপারে মা প্রশ্ন করলে সূর্য বলে, সমস্যা কি জানো, আজকাল মানুষের ভালোমন্দ বোঝার জ্ঞান কমে গেছে। তাই আমার ভালো কাজগুলোও মানুষের কাছে খারাপ মনে হয়। সে জন্য কি আমি দায়ী?
এ প্রশ্নের কী জবাব দেবেন মা! বোকার মতো সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর উপযুক্ত জবাব খোঁজেন। আর যখন জবাব খুঁজে পান তখন চেয়ে দেখেন তিনি একাকী দাঁড়িয়ে আছেন- সূর্য নেই পাশে। যখন এমন হয় তখন মা আল্লাহকে ডেকে বলেন, হে আল্লাহ্! আমার ছেলেটাকে তুমি সুমতি দাও। শান্ত সুবোধ করো। সূর্য যেনো মানুষের মতো মানুষ হয়।

দুই.
নামাজ শেষ করে মা পানের ডাবা নিয়ে বসেছেন, এমন সময় একটা কাশির শব্দ শুনতে পেলেন। পানের ডাবাটাকে একপাশে রেখে তিনি ঘুরে তাকালেন। দেখতে পেলেন উল্টোপাড়ার মজিদ শেখ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তিতিরপুর বাজারে মজিদ শেখের মাছের আড়ত রয়েছে। যখন সূর্যের বাবা বেঁচে ছিলেন তখন মাঝেমধ্যে সে মাস্টারবাড়িতে আসতো। সেই মজিদ শেখ এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপার কী?
মা বললেন, মজিদ ভাই যে! কী ব্যাপার, কিছু বলবেন?
মজিদ শেখ বললো, ভাবী! ওই মোড়াটা নিয়ে আসুন, উঠোনে বসি।
উঠোনে একটা মোড়া ছিলো। সেটাতে বসলো মজিদ শেখ, মা বসলেন অন্যটাতে। তারপর বললেন, আজকাল তো এদিকে আসেন না। কেমন আছেন?
মজিদ শেখ বললো, আল্লাহ রেখেছেন একরকম। যদি জানতে চান ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন চলছে, তাহলে বলবো ভালো না। অথচ ব্যস্ততা বেড়েছে হাজার গুণ। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও খোঁজখবর রাখতে পারি না। আজ…
কথা শেষ না করে থেমে গেলো মজিদ শেখ। তা দেখে মায়ের বুকের ভেতর ধক্ করে উঠলো। প্রথমেই মনে হলো, এতোদিন পর যে মানুষটি যেচে বাড়িতে এসেছে, সে কিছু একটা বলতে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কেনো? কী বলতে চেয়েছিলো সে?
মা জিজ্ঞেস করলেন, আজ কি মজিদ ভাই? কী যেনো বলছিলেন?
মজিদ শেখ বললো, আজ এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যেটা আপনাকে না জানালেই নয়। তাই আসতে হলো।
কী ঘটেছে? রাজ্যের শঙ্কা নিয়ে মা তাকালেন মজিদ শেখের দিকে।
মজিদ শেখ বললো, আমি তিতিরপুর বাজার থেকে এপাড়ে আসার জন্য খেয়াঘাটে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি গণ্ডগোল বেধে গেছে। কোনো মাঝি যাত্রী নিয়ে এপাড়ে আসবে না। তারা স্ট্রাইক করেছে।
স্ট্রাইক করেছে খেয়াঘাটের মাঝিরা! কেনো, হঠাৎ স্ট্রাইক করেছে কেনো? জানতে চাইলেন মা।
মজিদ শেখ বললো, কেনো যে স্ট্রাইক করেছে তা জানি না। যতোটুকু শুনে এসেছি তার কতোটুকু সত্য তাও জানি না। ব্যাপারটা হলো, খেয়াঘাটে এসে যখন জানতে পারলাম তিতিরপুর থেকে কোনো যাত্রী নিয়ে কোনো মাঝি মৌঝুরি আসবে না, তখন জানতে চাইলাম কেনো আচমকা অমন গোঁ ধরেছে। সে সময় জানতে পারলাম ওদের গোঁ ধরার জন্য নাকি সূর্যই দায়ী। নিতিন বুড়োকে নদীতে ফেলে দিয়ে সূর্য তার নৌকা নিয়ে এপাড়ে চলে এসেছে। যতোই সাঁতার জানা থাক, শীতের দিন তার ওপর বুড়ো মানুষ। হাবুডুবু খেতে খেতে বেচারা ডুবেই যাচ্ছিলো। তা দেখতে পেয়ে মাঝিরা তাকে টেনে তুলেছে। নিতিন বুড়ো খুব পানি খেয়েছে। তবে এখন সুস্থ আছে।
একদমে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে লম্বা একটা শ্বাস নিলো মজিদ শেখ।
বিব্রত মা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ঠিক জানেন তো, কাজটা সূর্যই করেছে? অন্য কোনো ছেলের কাজও তো হতে পারে। হয়তো চিনতে না পেরে সূর্যের নাম বলেছে।
হাত কচলাতে কচলাতে মজিদ শেখ বললো, বলেছি তো ভাবী, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে আপনাদের সূর্য তো কারো কাছে অপরিচিত নয়। সবাই ওকে চেনে। লোকজন যখন সূর্যের কথা বলেছে, তখন ঘটনা সম্ভবত সূর্যই ঘটিয়েছে। এ নিয়ে না আবার একটা কিছু ঘটে যায়, তাই আপনাকে জানাতে এলাম।
কিছুক্ষণ আগে মায়ের বুকটা ধক্ করে উঠেছিলো, এবার বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠলো। চোখ ভিজে এলো। আঁচলের কোণ দিয়ে চোখ মুছে মা বললেন, জানিয়ে ভালোই করেছেন। মাস্টার সাহেব নেই। এখন আপনারাই তো ওর গার্জিয়ান।
সে জন্যই, শুধু সে জন্যই এলাম ভাবী। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। সূর্য তো আমাদেরই ছেলে। কেউ ওকে দু’ কথা বললে তা আমাদেরও লাগে। তো সূর্য কোথায়?
মজিদ শেখ তাকালো ঘরের দিকে। মা ম্লান কণ্ঠে বললেন, জানি না। সকালে বেরিয়েছে। এখনও ফেরেনি। কোন খালে-ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে।
মজিদ শেখ বললো, ঘুরে বেড়ানোয় সমস্যা নেই। দুষ্টুমি না করলেই হলো।
মা বললেন, দুষ্টুমিটাই তো ওর আসল কাজ। তা ভাই, আপন মনে করে যখন খবরটা জানাতে এসেছেন, তখন একটা দায়িত্ব দেবো আপনাকে। বোনের কাজ ভেবে মানা করবেন না।
মজিদ শেখ কৌতূহলী চোখে তাকালো মায়ের দিকে। মা বললেন, বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো সূর্য এতোটা দুরন্ত হতো না। আমি যে শাসন করি না তা নয়, শাসন করি। কিন্তু মায়ের শাসন বলে হয়তো ছেলেটা ততোটা পরোয়া করে না। আপনারা একটু দেখেশুনে রাখবেন।
অবশ্যই। নিজের সন্তানের মতো মনে করি বলেই তো কথাটা জানাতে এসেছি।
ভালো করেছেন। আজ আমি ওকে বুঝিয়ে দেবো কতো ধানে কতো চাল। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন এ নিয়ে যেনো বড়ো কোনো ঘটনা না ঘটে। বাবা নেই। আপনাদেরই তো সামাল দিতে হবে।
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে মা চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। আঁচলের কোণ দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর বললেন, হায় আল্লাহ্! কবে যে ছেলেটা ভালোমন্দ বুঝতে পারবে!
মজিদ শেখ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, এ বয়সে আমরাও অনেক দুষ্টুমি করেছি। তবে তখন দিনকাল ছিলো অন্যরকম। মানুষের মনে সহ্য-ধৈর্য ছিলো। দুষ্টুমি করেও পার পেয়ে গেছি। কিন্তু এখন তো মানুষ অন্যের দোষ ধরার জন্য মুখিয়ে থাকে। তবে এ নিয়ে ভাববেন না। আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। সূর্যের নাম কেউ ভুলেও উচ্চারণ করবে না।
যাবার সময় সালাম জানালো মজিদ শেখ। মা তার জবাব দিয়ে নিশ্চল হয়ে বসে রইলেন।

তিন.
প্রতিদিন সকালে যা জোটে তা মুখে দিয়ে সারাটা দিন সূর্য বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে ফিরে আসে রাত ছুঁইছুঁই সন্ধ্যায়। কিন্তু আজ সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে আসার পরও যখন সূর্য এলো না, তখন মা চিন্তিত হলেন। যিনি ভেবেছিলেন ঘরে ফিরে এলে ছেলের সাথে কথাই বলবেন না, তিনি ছেলের জন্য ব্যাকুল হলেন। নানা অশুভ আশঙ্কা তাকে ছেঁকে ধরলো। মা ভাবলেন, যতোই অবাধ্য হোক, যতোই অন্যায় করুক, সন্ধ্যার পর কোনোদিনও ছেলেটা বাইরে থাকে না। তাহলে এখনও সূর্য ফিরে আসছে না কেনো? তবে কি সূর্য যে ঘটনাটা ঘটিয়েছে, তা নিয়ে পাল্টা কোনো ঘটনা ঘটেছে? হে আল্লাহ্! তুমি রহম করো। আমার ছেলে যেনো সুস্থ শরীরে ফিরে আসে।
মা যখন এসব বলে প্রার্থনা করছিলেন, তখন তার কানে এলো চির কাক্সিক্ষত একটি ডাক – মা…
মা চমকে তাকিয়ে দেখলেন সূর্য এসেছে। ওর সারা মুখে অপূর্ব এক নির্মল হাসি ছড়িয়ে আছে।
এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! কোনো অপরাধ করলেও সূর্যের চেহারাতে অপরাধের ছাপ ফুটে ওঠে না। বরং সব সময় সেখানে নির্মল হাসি ঝলমল করে। হয়তো এ জন্য ঝলমল করে, অপরাধ ওকে দিয়ে হতে পারে, সূর্য তা ভাবতেই পারে না।
মা ঘুরে তাকালেন, তবে কোনো কথা বললেন না।
সূর্য মায়ের পাশে বসে জামার প্রান্ত দিয়ে মুখ মুছলো। তারপর বললো, ও মা! অন্ধকারে বসে আছো কেনো? হারিকেনে তেল নেই?
মা এ কথারও জবাব দিলেন না। নিঃশব্দে উঠে বেড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হারিকেনটা হাতে নিলেন। তারপর রান্নাঘর থেকে ওটাকে জ্বালিয়ে এনে সূর্যের সামনে রাখলেন। সূর্য আলোটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়ে বললো, কখন রাত হয়েছে! তুমি অন্ধকারে বসে আছো! অন্ধকার আমার ভালো লাগে না।
ভালো লাগবে না কেনো? মায়ের বুক অন্ধকার করে রেখেছিস। তোর তো অন্ধকারই ভালো লাগার কথা।
এই প্রথম কথা বললেন মা। আর সে কথাটা দুর্বোধ্য মনে হলো সূর্যের কাছে। সূর্য বললো, মানুষের বুক আবার অন্ধকারে ভরিয়ে দেয়া যায় নাকি? বুঝি না মা এসব কথা। আমার খুব খিদে পেয়েছে। খেতে দাও।
মায়ের বুকটা মুচড়ে উঠলো সূর্যের কথা শুনে। তবুও কণ্ঠে বিরক্তি ঝরিয়ে বললেন, খিদে পেয়েছে তো আমি কী করবো? দুপুরের ভাত-ডাল নষ্ট হয়ে গেছে। রাতের জন্য এখনও রাঁধিনি। মন ভালো নেই।
মন ভালো নেই কেনো? ঘরে কিছু নেই?
কি কিছু নেই! কিসের কথা বলছিস?
কিসের কথা বোঝো না? চাল, ডাল, আটা। মাঝেমধ্যে তো শুকনো ডালপালাও থাকে না। আমি সে সবের কথা বলছি।
অনুযোগের সুরে কথাগুলো বললো সূর্য। তার জবাবে মা বললেন, ওসব আছে, নেই শুধু শান্তি। ঘরেও নেই-মনেও নেই। মরে যেতে পারলে শান্তি পেতাম।
মরে যাওয়ার কথা বলছো কেনো? তুমি মরে গেলে আমি বেঁচে থাকবো কার জন্য?
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সূর্য কঠিন প্রশ্ন মেলে ধরলো। সে প্রশ্নের জবাবে মা বললেন, তুই বেঁচে থাকবি দুষ্টুমি করার জন্য। দুষ্টুমি করা তো আমার চেয়েও প্রিয় তোর কাছে।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে সূর্য বললো, না মা, কক্ষনো না। তুমি সব চেয়ে প্রিয় আমার কাছে। তোমাকে তো কোটি কোটি বার তার প্রমাণ দিয়েছি! ওই যে তোমার জ্বর হয়েছিলো, আমি বসে বসে কাঁদিনি? রেঁধে-বেড়ে খাওয়াইনি?
মা বললেন, আমি তোকে সারা জীবন রেঁধে-বেড়ে খাওয়াচ্ছি। তোর জন্য কাঁদছি। তুই একদিন তা করবি না? সব ছেলেমেয়েই মা-বাবার অসুখ হলে কান্না করে। রেঁধে-বেড়ে খাওয়ায়।
মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুটা সময় সূর্য চুপ করে রইলো। তারপর বললো, বাদ দাও এসব কথা। আমাকে খেতে দাও। খিদে পেয়েছে।
তিনটি কলা ছিলো। সেখান থেকে কলা আর মুড়ি এনে মা সূর্যের সামনে রাখলেন। কিন্তু অন্য দিনের মতো বললেন না, খা বাবা খা, মুড়িগুলো খেয়ে নে। ভাত রাঁধছি, ভাত হলে গরম ভাত দেবো।
সূর্য কলা খেলো না। মুড়িও ছুঁলো না। ধীরে ধীরে তাকালো মায়ের দিকে। দেখতে পেলো মায়ের চেহারা থমথম করছে। সেখানে অভিযোগ নয়, একটা দুঃখী দুঃখী ছাপ ফুটে উঠেছে। তার মানে কোনো কারণে মা আজ দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু কেনো? হয়েছে কী? মাকে জিজ্ঞেস করবে?
মাকে জিজ্ঞেস করার আগেই মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো, খাচ্ছিস না কেনো? মূর্তির মতো বসে থাকলে তো মুড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাবে!
সূর্য বললো, তোমার হয়েছে কী বলো তো? এসে দেখলাম অন্ধকারে বসে আছো। বললে ভাত রাঁধোনি! আর সারাটা ক্ষণ আমার সঙ্গে রেগে রেগে কথা বলছো! কী অপরাধ করেছি আমি?
কোনো অপরাধ করিসনি?
রোজ সন্ধ্যায় ফিরে আসি। আজ একটা জরুরি কাজ ছিলো তাই একটু দেরি হয়েছে। সে জন্য রাগ করেছো?
মা বললেন, সে জন্য রাগ করিনি। বিকেলে যে অঘটন ঘটিয়েছিস, সে জন্য খারাপ লাগছে। নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে। তুই কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবি না?
এতোক্ষণে সূর্য বুঝতে পারলো বাড়ির আবহাওয়া বদলে গেছে কেনো – মা খেয়াঘাটের ঘটনা জানতে পেরেছেন। কিন্তু সে তো ঝিলমিলের ওপাড়ের ঘটনা। এপাড়ে বসে মা তা জানলেন কেমন করে?
অবশেষে কথাটা মাকে জিজ্ঞেস করলো সূর্য, বিকেলে যে কিছু একটা ঘটেছে, তুমি তা জানলে কেমন করে?
মা বললেন, কেমন করে জেনেছি সেটা বড়ো কথা নয়। তুই যে অন্যায় করেছিস, সেটাই বড়ো কথা।
কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কোনো অন্যায় করিনি!
আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা প্রকাশ পেলো সূর্যের কণ্ঠে। তার জবাবে মা বললেন, তুই তো সব সময়ই এ কথা বলিস। আর বলবি না কেনো? ভালোমন্দ বলে কিছু আছে, তুই তা স্বীকারই করিস না। যা সূর্য, চোখের সামনে থেকে সরে যা।
মা ঘুরে বসলেন। সূর্য বুঝতে পারলো আজ যে ঘটনা ঘটিয়েছে, তা মাকে খুব দুঃখ দিয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি সূর্য অন্যায় করেছে? অন্যায় করেছে কিনা, একমাত্র মা-ই তা বলতে পারবেন। দেখা যাক মা কী বলেন।

চার.
মা মন খারাপ করে বসেছিলেন। পেছন থেকে সূর্য তাকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু তাতে মায়ের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে কিনা বোঝা গেলো না।
মায়ের এ ধরনের অভিব্যক্তি সূর্যকে নিশ্চুপ করে দেয়। কিন্তু আজ নিশ্চুপ থাকলে একটা মিথ্যা সত্য হয়ে যাবে। তাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সূর্য বললো, কী করেছি, কেনো করেছি, সে কথা তোমাকে শুনতেই হবে। তারপর নিজেই বুঝতে পারবে আমি অন্যায় করেছি কি না।
মা ভেজা ভেজা চোখ তুলে সূর্যের দিকে তাকালেন। তবে সূর্যের বক্তব্য শুনবেন কি শুনবেন না, তা বললেন না। এটুকুই যথেষ্ট ছিলো সূর্যের জন্য। সূর্য বুঝতে পারলো মা ওর বক্তব্য শোনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সূর্য বললো, বুঝলে মা, কাউকে অন্যায় করতে দেখলে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না। হাফিজ চাচাকে তো তুমি চেনো না, চেনো?
মা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, না।
বাবা চিনতেন। তিতিরপুর স্কুলের সামনে আচার বিক্রি করতেন। এখন বুড়ো হতে হতে নুয়ে পড়েছেন। ঘটনাটা ঘটেছে তাকে নিয়ে।
তাকে নিয়ে মানে? তবে যে শুনলাম নিতিন বুড়োর সঙ্গে গণ্ডগোল করেছিস? ঘটনা ঘটেছে তোকে নিয়ে! বললেন মা।
সূর্য বললো, বলছি মা। একটু গুছিয়ে ঘটনাটা বলতে দাও। নইলে বুঝবে কেমন করে অন্যায়টা কার! তো যা বলছিলাম, হাফিজ চাচা এর-ওর কাছ থেকে চেয়ে-পেয়ে দিন কাটান। কদিন ধরে তিনি হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। তার সাথে প্রশান্ত দাদুর দেখা হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন…
কোন্ প্রশান্ত দাদু-প্রশান্ত সেন? মালতীর বাবা? সূর্যের কথা শেষ না হতেই প্রশ্ন করলেন মা।
সূর্য বললো, হ্যাঁ মা, মালতী পিসির বাবা। তুমি তো তাকে চেনো!
চিনবো না কেনো! কী বলেছিলেন তিনি?
হাফিজ চাচাকে হাঁপানি নিয়ে কষ্ট করতে দেখে ডাক্তার দাদু বলেছিলেন তার বাড়িতে গেলে ওষুধ দিয়ে দেবেন। পয়সা লাগবে না। তো আজ বিকেলে হাফিজ চাচা ডাক্তার দাদুর কাছে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি নিতিন বুড়োকে বলেছিলেন নদী পার করে দেয়ার জন্য। নিতিন বুড়ো সোজা জানিয়ে দিয়েছে ভাড়া না পেলে হাফিজ চাচাকে এপাড়ে আনবে না। হাফিজ চাচা বলেছেন তার কাছে এক টাকা আছে। নিতিন বুড়ো বলেছে দু টাকা না পেলে কাউকে নৌকায় তুলবে না। এই যে এক টাকার জন্য এক অসহায় বুড়োকে নিতিন বুড়ো এপাড়ে আনতে চাইছিলো না, এটা কি ভালো কাজ, বলো?
মা বললেন, ভালো-খারাপ যা হোক, এতোক্ষণ যা বললি তা তো নিতিন বুড়ো আর তোর হাফিজ চাচার ব্যাপার। তোর ব্যাপারটা কী?
সূর্য বললো, আমার আবার ব্যাপার কি! ওই যে বললাম, কাউকে অন্যায় করতে দেখলে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না। গিয়েছিলাম ফুটবল ম্যাচ নিয়ে কথা বলতে। ফিরে আসার সময় দেখি খেয়াঘাটে বসে হাফিজ চাচা টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছেন আর কাঁদছেন। ব্যাপার কী তা জানতে চাইলে তিনি জানালেন হাঁপানিতে কষ্ট হচ্ছে। ডাক্তার দেখাতে যেতে চাইছেন, কিন্তু এক টাকা কম আছে বলে নিতিন মাঝি তাকে নৌকায় তুলতে চাইছে না।
এ নিয়ে ঝগড়া করেছিস? তুই নাকি বুড়ো মাঝিটাকে নদীতে ফেলে দিয়েছিস? দিয়েছিস কি না বল।
দিয়েছি মানে, দিতে হয়েছে। সে কথাই তো বলছি! একটু ধৈর্য ধরে শোনো! আমি নিতিন মাঝিকে বলেছি যে বেচারা গরিব মানুষ। হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছে। তুমি তাকে দয়া করে নৌকায় তুলে নাও। কিন্তু বুড়োটা এতো পাজি! বলে কি জানো মা, বলে এক টাকা কে দেবে? তুই দিবি না তোর বাপ দেবে?
এ কথা বলেছে?
বলেছে মা। হাজার লোকের সামনে বলেছে। সে কথা শুনে আমি বলেছি বাবা দেবেন কেনো, আমি দেবো। তুমি চাচাকে নদী পার করে দাও। হাফিজ চাচা তার হাত ধরে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু নিতিন মাঝি সে কথাও শোনেনি। তখন আমি তাকে নদীতে ফেলে দিয়ে হাফিজ চাচাকে নিয়ে নৌকা বেয়ে এপাড়ে চলে এসেছি। এখন বলো মা, আমি অন্যায় করেছি?
মা বললেন, কিছুটা তো করেছিসই। একজনকে সাহায্য করতে গিয়ে আরেকজনকে প্রায় মেরে ফেলেছিলি। শুনলাম বুড়োটা ডুবে যাচ্ছিলো। অন্যরা টেনে তুলেছে।
জানি মা। আমি যখন হাফিজ চাচাকে ডাক্তার দেখিয়ে আবার ওপাড়ে গিয়েছি, তখন সব শুনেছি। মিন্টুর কাছ থেকে ধার নিয়ে দুই টাকা মাঝিটাকে দিয়ে এসেছি। সে খুশি হয়ে হেসেছে।
মা বললেন, কী যে একেকটা কাণ্ড ঘটাস! কী দরকার ছিলো অমন করার? লোকটা যদি ডুবে যেতো? মাঝিরা যদি জোট বেঁধে তোকে মারধর করতো?
করতো না মা। শুধু তুমিই বলছো আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু সবাই বলেছে আমি ঠিক করেছি। একটা অসুস্থ মানুষ, তার জন্য নিতিন মাঝির মায়া হওয়া উচিত ছিলো। মানুষের জন্য মানুষের মায়া থাকবে না?
মা বললেন, থাক বা না থাক, তা দেখার দায়িত্ব তো তোর নয়!
সূর্য বললো, জানি এসব দেখার দায়িত্ব আমার নয়। কিন্তু হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করার পরও নিতিন মাঝি কথা শোনেনি, তাই মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। এখন এসব বাদ দিয়ে রান্নাঘরে যাও।
মা রান্নাঘরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তবে যাবার আগে সূর্যের মাথায় হাত রেখে বললেন, তোকে বুঝে উঠতে পারি না! সারাদিন দুষ্টুমি করিস। অথচ মানুষজনের বিপদে ঝাঁপিয়েও পড়িস। সে যাক, একটা কথা বললে রাখবি?
নিশ্চিন্তে বলো মা। তোমার সব কথা রাখবো।
রাখবি যখন তখন নিশ্চিন্তেই বলি, কাল সকালে বুড়ো মাঝিটার কাছে মাফ চেয়ে নিবি।
নেবো।
আর তোর হাফিজ চাচার হাতে দশ টাকা দিয়ে আসবি। বেগুন বিক্রি করে একশো সত্তর টাকা পেয়েছি। দশটা টাকা তাকে দিলে সমস্যা হবে না।
মায়ের কথা শুনে সূর্য বললো, এ টাকা পেলে হাফিজ চাচার যে কতো উপকার হবে, তোমাকে বোঝাতে পারবো না। লক্ষ্মী মা,  আমি তোমার সব কথা রাখবো। তুমি শুধু আমার একটা কথা রাখবে, রাখবে তো?
মা বললেন, না শুনে কথা দেবো না। আগে বল কী কথা।
সূর্য বললো, সেই পুরোনো কথা মা, আমার ওপর কোনো দিনও রাগ করবে না। এক কথায় জবাব দাও-হ্যাঁ কি না।
মা এ কথার জবাব দিলেন না। বিরক্তির ভান করে বললেন, আহ্ ছাড় তো! রাঁধতে যাবো। একটু পরেই তো খিদে খিদে বলে যুদ্ধ বাধাবি।

পাঁচ.
সূর্য মায়ের অনেক কথাই শোনে না। তাই বলে কোনো কথাই শোনে না, সে কথা সত্য নয়। সূর্য মায়ের কথা মতো বেগুন বিক্রি করার জন্য হাটে যায়। শুকনো পাতা কুড়িয়ে আনার জন্য বনে যায়। ছোটখাটো কাজ করে যদি কখনো দু-চার টাকা রোজগার করে, নির্দ্বিধায় তা মায়ের হাতে তুলে দেয়। মায়ের কাছে ভালোমন্দ কথা বলে। জেনেশুনে মাকে দুঃখ দিতে চায় না। সমস্যা শুধু একটিই, যে কাজটি করার জন্য সূর্য নিজের ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করে, হাজার বলেও মা ওকে সে কাজ থেকে ফেরাতে পারেন না। কারণ, সেই কাজটি করার পেছনে সূর্য কিছু যুক্তি খুঁজে পায়, আর দৃঢ়তার সঙ্গে তা মায়ের কাছে তুলেও ধরে। কোনো কোনো যুক্তি মা মেনে নেন-কোনোটি নিতে পারেন না।
আজ আকাশ-বাতাস তোলপাড় করে ঝড় বইছে। হঠাৎ সূর্যের ইচ্ছে হলো সে বাইরে যাবে। মাকে বললো, মা! পূর্বা পাহাড়ের ওদিক থেকে একটু ঘুরে আসি। ফেরার সময় কামারপাড়া থেকে তোমার জন্য আম কুড়িয়ে আনবো।
সূর্যের কথা শুনে মায়ের দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা হলো। মা দ্রুত সূর্যের পথ আগলে বললেন, কী বলছিস পাগলের মতো! এমন ঝড়বৃষ্টির মাঝে কেউ বাইরে যায়? আর পূর্বা পাহাড়ের দিকে যাবি কেনো?
সূর্য বললো, বৃষ্টির সময় পাহাড়ের গা বেয়ে পানি নামে। সেই স্রোতে ছুটোছুটি করতে ভালো লাগে।
মা বললেন, পাহাড়ে বড়ো বড়ো সাপ আছে। খিদে লাগলে যখন ওরা হাঁ করে, জীবজন্তু তখন সুড়সুড় করে ওদের পেটের ভেতর ঢুকে যায়। কি দরকার ঝুঁকি নিয়ে ওদিকে যাবার?
সূর্য বললো, তুমি শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছো মা। অমন ভয়ঙ্কর সাপ পাহাড়ে নেই। তা ছাড়া আমি তো পাহাড়ে উঠবো না। শুধু তার গা বেয়ে নেমে আসা পানিতে হুটোপুটি খেলবো। তো মা যাই…
তো মা যাই বলে আর মায়ের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করলো না সূর্য। এক লাফে উঠোনে নামলো। মা ডাকতে গিয়েও পেছন থেকে ডাকলেন না। শুধু অসহায় কণ্ঠে বললেন, হে আল্লাহ্! ওর যেনো কোনো বিপদ না হয়।

ছয়.
বাড়ি থেকে বের হয়ে যে পথটা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে, সে পথের পাশে জামে মসজিদ। সেই মসজিদের সামনে আসতেই সূর্য দেখতে পেলো সুবোধ অচেনা এক লোকের পাশে মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
সুবোধকে দেখে সূর্য থমকে দাঁড়ালো। সে সময় সুবোধও সূর্যকে দেখতে পেলো, দেখলো ভিজে পুটপুটে হয়ে সূর্য কোথাও যাচ্ছে। এমন দিনে কোথায় যাচ্ছে সূর্য?
সুবোধ জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছিস?
সূর্য বললো, বেড়াতে। ভাবলাম ঝড়বৃষ্টি নেমেছে, একটু বেড়িয়ে আসি।
সূর্যের কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক অবাক হলেন। তিনি বললেন, বেড়াতে বের হয়েছো! এই ঝড়বৃষ্টির মাঝে?
সূর্য বললো, রোদ-ছায়ার মাঝে তো রোজই ঘুরে বেড়াই। তাতে তেমন মজা নেই। আসল মজা ঝড়ের মাঝে ঘুরে বেড়ানোয়। শাঁইশাঁই করে ঝড়ের গতি যতো বাড়ে, ঝমঝম করে বৃষ্টি যতো পড়ে, মজা ততো বাড়ে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে যদি কড়কড় করে বাজ পড়ে, তাহলে মজা এতো বেড়ে যায় যে, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনাই হয় না। আহ্, আজ যদি দু-চারটা বাজ পড়তো!
সূর্য কথাগুলো এমন আবেগ মিশিয়ে বললো যে, ভদ্রলোক অনেকটা সময় ধরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, যা বললে সব সত্যি? সত্যিই, তুমি বজ্রকে ভয় পাও না?
সূর্য বললো, একটুও না। কেনো ভয় পাবো তাও বুঝি না। যখন বাজ পড়ে তখন চারদিক উজ্জ্বল আলোয় ভরে যায়। আলো তো সুন্দর। সুন্দর কিছুকে মানুষ ভয় পাবে কেনো, বলুন?
সূর্যের কথা শুনে সম্মোহিত হয়েছিলেন, এবার ভদ্রলোক অভিভূত হলেন। তিনি বললেন, খুব সাহসী ছেলে তুমি। আর খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারো। কোন্ ক্লাসে পড়ো?
সূর্য ঝটপট জবাব দিলো, ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। এখন কোনো ক্লাসেই পড়ি না। সারাদিন ঘুরে বেড়াই আর মায়ের বকুনি খাই।
লেখাপড়া করা উচিত। ও হ্যাঁ, নামটাই জানা হয়নি! কী নাম তোমার?
সূর্য বললো, আমার নাম সূর্য। আমি আমজাদ মাস্টারের ছেলে। সবাই আমার বাবাকে চেনে।
আমজাদ মাস্টার… আমজাদ মাস্টার…। এক সময় এক আমজাদ মাস্টারকে চিনতাম। যতোটুকু মনে পড়ে তিনি তিতিরপুর গার্লস স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তুমি কি তার কথা বলছো?
সূর্য বললো, হ্যাঁ। আপনি বাবাকে চিনতেন জেনে ভালো লাগছে।
ভদ্রলোক বললেন, চিনতাম মানে একবার কথা হয়েছিলো। কি একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলাম চিফ গেস্ট হয়ে। সে সময় তিনি বসেছিলেন আমার পাশে। সে তো প্রায় এগারো-বারো বছর আগের কথা! তিনি কেমন আছেন?
সূর্য বললো, বাবা কেমন আছেন জানার উপায় নেই। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন।
মারা গেছেন! আসলে আমি গ্রামে থাকি না। কলেজে চাকরি করি। নানা জেলায় ঘুরে বেড়াই। তাই সব খবর রাখা হয়ে ওঠে না। তোমার বাবা মারা গেছেন, আল্লাহ তাকে বেহেশ্ত নসিব করুন।
খুব দরদ মিশিয়ে কথাগুলো বললেন ভদ্রলোক। এক মুহূর্ত কী যেনো ভাবলেন। তারপর বললেন, যাচ্ছিলাম কদমতলী। বৃষ্টির জন্য আটকে গেলাম। আজ মনে হয় এ বৃষ্টি থামবে না।
সূর্য বললো, না থামলেই ভালো। মজা করে খেলতে পারবো। কিরে সুবো, খেলতে যাবি?
এতোক্ষণ সূর্য সুবোধের সঙ্গে কথা বলেনি। এবার কথা বলায় সে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। সুবোধ বললো, যেতে তো ইচ্ছে করছে। কিন্তু মাছ-তরকারি কিনেছি। এগুলো বাড়িতে রেখে আসতে হবে।
সূর্য বললো, তাহলে আগে তোদের বাড়িতে যাই। এগুলো রেখে তারপর পাহাড়ে যাবো।
সূর্য আর সুবোধ মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ভদ্রলোক বললেন, তোমাদের সঙ্গে পরিচয় হলো অথচ নিজের পরিচয় দেয়া হয়নি। আমার নাম আমানুর রহমান। ঢাকার এক কলেজের প্রিন্সিপ্যাল আমি।
সূর্য বললো, বুঝেছি, আপনি কলেজের হেডমাস্টার, তাই না?
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই।
সূর্য বললো, তো আমরা এখন যাই। যদি ঝড়বৃষ্টি না কমে, তবে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসবেন।
প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, সোজা তোমাদের বাড়িতে চলে যাবো? ঠিক আছে, অমন সিচিউশনে পড়লে তাই করবো।
মসজিদের বারান্দা থেকে আগে নামলো সূর্য পরে সুবোধ। পরক্ষণেই ওরা সামনের দিকে ছুটে চললো। প্রিন্সিপাল সাহেব মুগ্ধ চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সাত.
সূর্যকে নিয়ে জেলেপাড়ার ভেতর দিয়ে কুমোরপাড়ার পাশ কাটিয়ে সুবোধ যখন ওদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলো, তখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিলো। উঠোনের মাঝখানে সূর্যকে দাঁড় করিয়ে সুবোধ ওর মাকে ডাকলো, মা! দরজা খোলো।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে সুবোধের মা দেখলেন সুবোধ ফিরেছে, সঙ্গে এসেছে সূর্য। তার মানে সুবোধ কাদা-জলে মেখে থাকা সূর্যকে নিয়ে ঘরে ঢুকবে নয়তো খেলতে বের হবে। কোনোটাই মেনে নেয়া যায় না।
সুবোধের মা দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ইস্, ভিজে কী হাল হয়েছে তোর! আয়, ভেতরে আয়।
সুবোধ মায়ের দিকে ব্যাগটাকে বাড়িয়ে ধরে বললো, ব্যাগটা ধরো।
সুবোধের মা বললেন, তাড়াতাড়ির কী আছে! তুই ভেতরে আয়। দেখছিস না ঘর ভিজে যাচ্ছে?
সুবোধ বললো, সে জন্যই তো ঘরে ঢুকতে চাইছি না। বাইরে থেকে  ব্যাগটা নিতে বলছি।
বাইরে থেকে নেবো কেনো? ভেতরে আয়, আয় বলছি! এ কথা বলে এক ঝটকায় সুবোধকে ঘরের ভেতরে টেনে নিলেন। তারপর দরজা বন্ধ করে দিলেন।
মায়ের কাণ্ড দেখে সুবোধ অবাক হলো। মা এমন করে দরজা বন্ধ করলেন কেনো? বাইরে সূর্য দাঁড়িয়ে আছে। সে কী ভাববে!
সুবোধ বললো, দরজা বন্ধ করলে কেনো? আমরা তো খেলতে যাবো!
সুবোধের মা বললেন, এমন দিনে কোনো ভালো ছেলে খেলতে যায় না। জামাকাপড় ভিজে গেছে। ওগুলো পালটিয়ে চুপ করে বসে থাক।
সুবোধ বললো, বসে থাকতে পারবো না। সূর্যের সাথে খেলতে যাবো।
না বাবা, খেলতে যাওয়ার দরকার নেই। সারাদিন ডালে ডালে, পাতায় পাতায় ঘুরে বেড়ায়। এমন ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করলে মানুষ খারাপ বলবে। জামা-প্যান্ট বদলে ঘরে বোস। আমি চাল ভেজে দিই। মজা লাগবে খেতে।
মায়ের কথা শুনে সুবোধ বুঝলো, আজ আর ওর খেলতে যাওয়া হবে না। সুতরাং কাপড় বদলানোয় মন দিলো সে।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন সুবোধ বেরিয়ে এলো না তখন সূর্য বললো, সুবোধকে ডেকে দিন মাসিমা। আমরা খেলতে যাবো।
সুবোধের মা বললেন, সুবোধ যাবে না। এখন যা, অন্যদিন আসিস।
সূর্য বললো, অন্যদিন তো বৃষ্টি থাকবে না। আমরা বৃষ্টির মধ্যে খেলবো। বৃষ্টির ভেতর খেলতে কী যে ভালো লাগে, বোঝাতে পারবো না।
সুবোধের মা বললেন, আমাকে বোঝাতে হবে না। নিজের ভালো নিজে বুঝলেই হবে। আমার সোজা কথা, সুবোধ তোর সঙ্গে যাবে না। আর কোনো দিন ওকে ডাকতে আসিস না।
আচ্ছা, আর কোনো দিন আসবো না। শুধু আজ যেতে দিন।
আকুতি ঝরে পড়লো সূর্যের কণ্ঠে। কিন্তু তাতে সুবোধের মায়ের মন গললো না। বরং এতোক্ষণ তিনি মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, এবার সরাসরি আক্রমণ করেন। বললেন, শোন সূর্য! তোর মতো বদমাশের সঙ্গে সুবোধকে খেলতে দেবো না। আজও না-কোনো দিনও না। নিজে খারাপ হয়েছিস, আমার ছেলেটাকে আর খারাপ করিস না।
সূর্য দুষ্টু ছেলে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু জেনেশুনে কাউকে খারাপ পথে নিয়ে যাবে, তেমন ছেলে নয়। তাই সুবোধের মায়ের কথা শুনে সূর্যের বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করে উঠলো। সূর্য আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। মাথা নিচু করে সুবোধদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply to forkan Cancel reply