Home স্মরণ কথাশিল্পী শাহেদ আলী ক্ষণজন্মা পুরুষ

কথাশিল্পী শাহেদ আলী ক্ষণজন্মা পুরুষ

কিশোরকণ্ঠের নতুন অফিস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে (ডান থেকে) কথাশিল্পী শাহেদ আলী
কবি আল মাহমুদ, নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ ও শিশু সংগঠক সানাউল্লাহ নূরী

বাংলা ছোট গল্পের বয়সটা সোয়া শ’ বছর পেরিয়ে গেছে। নানা কারণে ছোট গল্পের জনক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে (১৮৬১-১৯৪১) অভিহিত করা হয়। যদিও এর আগেও ছোট আকারে গল্প লেখার প্রয়াস চালান স্বর্ণকুমারী দেবী ও খগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘাটের কথা’কে (১২৯১) বাংলা ছোট গল্পের সূচনাসঙ্গীত হিসেবে ধরা হয়।
বাংলা ছোট গল্পকে পরবর্তীকালে যারা সমৃদ্ধ করেছেন তাদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তবে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে কয়জন ক্ষণজন্মা ছোট গল্পকার আমরা পেয়েছি তার মধ্যে চল্লিশ দশকের শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১) নানা দিক বিবেচনায় উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য তিনি তাঁর যোগ্য আসন আজ অবধি পাননি। আর সবচাইতে যে বিষয়টির জন্য শাহেদ আলীকে আমাদের পাঠ করা এবং মূল্যায়ন করা উচিত তা হলো, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিম জীবনের সার্থক রূপকার। তাঁর গল্পের ভেতর দিয়ে ভাটি বাংলার সাধারণ মুসলিম জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জীবন যাপনের নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যায়।
এই অসাধারণ শক্তিমান কথাশিল্পীর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র ৬টি। শাহেদ আলী স্বল্পপ্রজ ধাঁচের লেখক। কিন্তু কম লিখলে কী হবে, তাঁর প্রতিটি গ্রন্থ, প্রতিটি গল্প সাহিত্য মূল্য বিচারে কুলীন গোত্রের। শাহেদ আলীর গল্পগ্রন্থগুলো হচ্ছেÑ
ষ    জিবরাইলের ডানা (১৯৫৩)
ষ    একই সমতলে (১৯৬৩)
ষ    শা’নযর (১৯৮৫)
ষ    অতীত রাতের কাহিনী (১৯৮৬)
ষ    অমর কাহিনী (১৯৮৬)
ষ    নতুন জমিনদার (১৯৯২)
এ ছাড়া শাহেদ আলীর ছয়টি গল্পগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত গল্প সঙ্কলন ‘শাহেদ আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প’ প্রকাশ পায় ১৯৯৬ সালে। তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘হৃদয়ে নদী’ (১৯৬৫) ও বেশ কিছু গল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, সাময়িকীতে প্রকাশ পেয়েছে যা গ্রন্থভুক্ত হয়নি।
ছোটদের জন্যও তাঁর রয়েছে তিনটি গ্রন্থ। ‘সোনার গাঁয়ের সোনার মানুষ’, ‘ছোটদের ইমাম আবু হানিফা’ এবং ‘রুহির প্রথম পাঠ’। রয়েছে তাঁর অনুবাদ ও দর্শনতাত্ত্বিক মূল্যবান বেশ কিছু গ্রন্থ। এর মধ্যে মুহাম্মদ আসাদ-এর ‘রোড টু মক্কা’র অনুবাদ ‘মক্কার পথে’ এবং হিরোডোটাস-এর বর্ণিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘ইতিবৃত্ত’ অসাধারণ অনুবাদ গ্রন্থ হিসেবে নন্দিত।
শাহেদ আলীর প্রথম গল্পগ্রন্থের নামে গল্প ‘জিবরাইলের ডানা’ বহুল জনপ্রিয় এবং পাঠকনন্দিত একটি গল্প। গল্পের নায়ক বালক নবী অত্যন্ত গরিব পরিবারে ছেলে। সংসারে আছেন তার শুধু মা। মা হালিমা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন। তাতে যা পান তাতে মা-ছেলের আধপেটা খেয়ে দিন কাটে। নবীর বয়স আট। তেমন কাজ করার মত সময় হয়নি তার। তাই, মা বিনে বেতনে বিড়ির কারখানায় দিয়ে রেখেছেন এই আশায় কাজ শিখে একটু বড় হলে রোজগারে হবে ছেলে তার। তখন মায়ের দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু নবীর মন কাজে বসতে চায় না। তার মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে। যেখানে ওর মত সমবয়সী অনেক ছেলে ঘুড়ি উড়ায়, খেলে। তারও ইচ্ছে হয় ঘুড়ি উড়াতে। কিন্তু ঘুড়ি উড়াতে হলে চাই সুতো, নাটাই এবং ঘুড়ি। নবীর আরো ইচ্ছে, ঘুড়ি উড়িয়ে উড়িয়ে আসমানের আল্লাহর কাছে সে তার দুঃখের কথা জানাবে, যাতে আল্লাহ তাদের দুঃখের কথা জেনে একটা ব্যবস্থা করে দেন। নবী সত্যি সত্যি সুতো, নাটাই এবং ঘুড়ি জোগাড় করে আকাশে ঘুড়ি উড়ালো। প্রথম দিন তার জোগাড় করা সুতো দিয়ে ঘুড়ি উড়িয়ে সে আল্লাহর নাগাল পেলো না। কারণ তার সুতো বেশি ছিল না। নবী স্টেশনে কুলির কাজ করে আরো কিছু পয়সা আয় করে সুতো কেনে। যথারীতি সে ঘুড়ি উড়ায়। সুতো বেশি হওয়ায় তার ঘুড়ি এক সময় অনেক উঁচুতে যেতে যেতে দৃষ্টিসীমার প্রায় বাইরে চলে যায়।
গল্পের ভাষায় – ‘রশি বেয়ে নবীর বিস্মিত দৃষ্টিও হারিয়ে যায় আসমানে। আজকে আর সে ঘুড়ির রশি গুটাবে না, লোকচক্ষুর ওপারে ঘুড়ি উড়ে বেড়াক আপন ইচ্ছায় – আপন খুশিতে। এক সময় হয়তো আটকে যাবে আরশের পায়ায়, আরো শক্ত টান পড়বে হাতে। তখন রশিতে টান দিয়ে সে টলিয়ে দেবে আল্লাহর আরশ। চকিত আঁখি মেলে আজ আল্লাহ মাটির মানুষের দিকে তাকাবেন – অনিচ্ছায়ও শুনতে হবে তার দুঃখী বান্দার কাহিনী – তাদের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণার কথা।’ শাহেদ আলী বালক নবীর মনের আকুতি ও আবেগকে গোটা গরিব মানুষের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই গল্পে। গরিব মানুষের ধারণা থাকে আল্লাহ বুঝি তাদের কথা শুনতে পান না, দেখতে পান না। আল্লাহ বুঝি ধনী লোকদের শুধু ভালবাসেন, তাদের দেখতে পান। যেটাকে আমরা বলতে পারি ‘স্যাডিস্ট থট’ দুঃখভারাক্রান্ত ভাবনা। আর এর সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে হাদিস শরীফে, ‘দারিদ্র্য কুফরির দিকে ধাবিত করে’।
স্বপ্ন ও বাস্তবতার দুই জগৎ নিয়ে মানুষের জীবনের যে প্রতিদিনের টানাপড়েন এবং গতিমান জীবনের সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব এসব অত্যন্ত সুন্দরভাবে শাহেদ আলী তাঁর এ গল্পে তুলে ধরেছেন।
শাহেদ আলীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি যখন গল্প বর্ণনা করেন তা এমনভাবে বর্ণনা করেন যা একদিকে আমাদের অত্যন্ত চেনা-জানা জগৎ অপর দিকে এমন নিখুঁত বর্ণনা যেনো মুভি ক্যামেরায় তোলা চিত্রের পরম্পরা দেখছি।
আগেই বলেছি শাহেদ আলী লিখেছেন কম। তাঁর প্রকাশের বিরতিও অসহ্য দীর্ঘ সময়ের। তাছাড়া তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যে আদর্শকে (ইসলাম) লালন করতেন তা তাঁর লেখার ভেতর ফুটে উঠতো। তিনি মুসলিম জীবনের কাহিনী যেভাবে আঁকতে প্রয়াস পেয়েছেন, তেমনি শব্দ চয়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। এমন সব শব্দ তিনি তাঁর গল্পে ব্যবহার করেছেন যা পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষা এবং মুসলিম জনজীবনের ব্যবহৃত শব্দাবলি। তাঁর গল্প পড়লেই চট করে বলে দেয়া যায় এটা মুসলিম সমাজের চিত্র।
শাহেদ আলী শুধু কথাশিল্পীই ছিলেন না, তিনি সমাজসংস্কারকও ছিলেন। তাই, তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ‘তমুদ্দুন মজলিস’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সৈনিক’ পত্রিকার তিনি ছিলেন সম্পাদক। যে পত্রিকাটি ছিল তৎকালে ভাষা আন্দোলনের বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও মুখপত্র।
শাহেদ আলী ইসলামিক ফাউন্ডেশনে দীর্ঘদিন প্রকাশনা পরিচালক পদে কর্মরত থেকে বহু গ্রন্থ, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বিশেষ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘বিশ্বকোষ’-এর তিনি ছিলেন অন্যতম সম্পাদক। এমন গুণী ব্যক্তিটি কিন্তু অনেকটা আড়ালে আবডালে থেকে গেছেন। অথচ তিনি শুধুমাত্র কথাশিল্পী হিসেবেই চল্লিশ দশকের শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, আবু রুশদ, শামসুদ্দিন আবুল কালামসহ কয়েকটি নামের সঙ্গে যে নামটি উচ্চারিত হওয়া বাঞ্ছনীয় তা শাহেদ আলী।
শাহেদ আলীর জীবন ছিল বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল। একটি ধারায় সবসময় নিজেকে নিযুক্ত রাখেননি। কিছুকাল তিনি ‘খেলাফতে রাব্বানী’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। এ দলটি থেকে তিনি একবার প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে (এমএনএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এই গুণী ব্যক্তিটি জন্মেছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জের মাহমুদপুর গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৬ মে এবং ইন্তেকাল করেন ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply