Home তোমাদের গল্প স্বপ্ন

স্বপ্ন

এক.
আজানের ধ্বনি কর্ণে ভেসে আসতেই ঘুম ভেঙে যায় রাহাতের। তাড়াতাড়ি উঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য চলে যায় বাথরুমে। কাজ সেরে দ্রুত পায়ে রওনা হয় মসজিদ পানে।
জিকির করতে করতে চলতে থাকে তার পথচলা। আল্লাহু, আল্লাহু…। হঠাৎ কেউ ডেকে উঠে এই রাহাত শুন, শুন।
শব্দটা আরও দীর্ঘতর হতে থাকে কিন্তু রাহাতের সেদিকে কোন দৃষ্টি নেই। চলতে থাকে; আর আপন মনে ডেকে যায় আল্লাহু আল্লাহু…। এভাবে ডেকে সাড়া পাওয়া যাবে না, তাই ভেবে রুহিত দ্রুত পা বাড়ায়। বরাবর যেতে না যেতেই রাহাতের কাঁধে হাত রাখে। রাহাত চমকে ওঠে, পেছনে ফিরে তাকায়। রুহিতকে দেখে সে বলে, কিরে তুই। এভাবে না ধরে আমাকে ডাকলেই পারতি।
ডেকেতো গলাটা শুকিয়ে গেছে অথচ তোর কোন সাড়া নেই। ভাবলাম জিকির করছিস তাই হয়তো আমার স্বর তোর কানে পৌঁছায়নি।
স্যরি দোস্ত। একদম খেয়াল করিনি।
থাক, স্যরি বলতে হবে না। তাড়াতাড়ি চল, জামাত দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
আচ্ছা চল। তোর আব্বু আসেননি?
উনি আগেই চলে গেছেন। তোর আব্বু?
না, তার কথা বলে আর লাভ কী! দ্রুত পা বাড়া, পরে এই সম্পর্কে কথা বলা যাবে।

দুই.
সকালে সূর্য ওঠে। দিকে দিকে রটে যায় পাখিদের কলরব। কলতানে সুর মেলায় শিশিরসিক্ত ভেজা সবুজ ঘাস। শিশিরসিক্ত পায়ে হেঁটে চলে রাহাত। ভালো লাগে তার, তাইতো প্রত্যহ হেঁটে চলা। এই সময় হাঁটলে শরীর-মন দুটোই ভালো থাকে। ফ্রেশ হয় হৃদয়। তাইতো রুহিতের সাথে সাথে এই অভ্যাসটা গড়ে তুলেছে রাহাত। আর সেই জন্য সব সময় ধন্যবাদ দেয় রুহিতকে। অবশ্য সামনে কোনদিন এই ধন্যবাদ দেয়া হয়নি তাকে। কারণ বন্ধুত্বের মাঝে ধন্যবাদ থাকাটা নিরর্থক। তার নিকট এই শব্দটা বিদঘুটে মনে হয়। তাই সচরাচর সে কাউকে ধন্যবাদ দেয় না। পাশের বাড়ির কলিম চাচাকে আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায় রাহাত।
কী ব্যাপার, চাচা এভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন? দাঁড়িয়ে থাকবে না এগিয়ে যাবে তা ভেবে ঠিক করতে পারছে না। এসব ভেবে উঠতে না উঠতেই কলিম চাচা এসে ধাক্কা খায় রাহাতের সাথে। রাহাত সম্বিত ফিরে পায়। প্রশ্ন করে –
কী ব্যাপার, চাচা আপনি এভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন?
আর বলো না বাবা, আমাদের বাড়ির রহিমের বৌয়ের হঠাৎ প্রসবব্যথা উঠেছে। তাই ডাক্তার আনতে যাচ্ছি।
আপনি বাড়ি যান। আমি ডাক্তার নিয়ে আসছি। ও ভালো কথা, রহিম ভাইকে খবর দেয়া হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে। ঠিক আছে বাবা তুমি যাও। তাহলে আমি বাড়ির দিকটা সামাল দিই তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
কিছুক্ষণের মধ্যে রাহাত ডাক্তার নিয়ে উপস্থিত। সবাইকে দেখে অবাক। অবাক হওয়ারই কথা। ওর বাবা যদি আজ দেখে তাহলে আস্ত রাখবে না। না জানি আজ ছেলেটাকে কতো মার খেতে হয়। আগে শুনেছি ‘যেমনি বাপ তেমনি বেটা’ কিন্তু এখন দেখছি তার উল্টো। অবশ্য রাহাতকে না দেখলে বোঝা যেতো না। অন্যের উপকার তার বাবা একদম পছন্দ করেন না। তার বাবা বলে, ‘এটা মানুষের গোলামি। এই কাজ কখনো করবি না।’ কলিম চাচাকে দেখে সালাম দিয়ে বললো, চাচা আমি এখন আসি। ভালো-মন্দ আমাকে জানাবেন। আল্লাহ হাফিজ।

তিন.
রাহাত মন খারাপ করে বসে আছে বকুল তলায়। কত কী ভাবে, তার কূল পায় না সে। কত স্বপ্ন ছবি আঁকে, তাও তার অজানা। মনের অজান্তেই এঁকে চলেছে। কতক্ষণ এভাবে বসে আছে তার সঠিক হিসাব তার নিকট নেই। রুহিতের ডাকে সকল ভাবনার যবনিকা টানতে হয়।
কিরে একাকী বসে বসে কী ভাবছিস?
মানুষ ভাবেতো একা বসেই।
তা ঠিক। মন খারাপ নাকি?
কিছুটা।
কেন?
রবিউলের আম্মুর খুব জ্বর। কিন্তু পথ্য ক্রয় করার পয়সা নেই। খবরটা শোনার পর থেকে কিছু একটা না করা পর্যন্ত একটুও স্বস্তি পাচ্ছি না। কী করি বলতো? ঐ দিকে টিফিনের টাকা যা ছিলো তা দিয়ে দিলাম নুরু ভাইকে মানে নুরু পাগলাকে।
এসব নিয়ে তোর এতো মাথাব্যথা কেন? আসলে মানুষ চেনা বড় দায়। না মিশলে কাউকে চেনা যায় না। তোর নিকট আসতে পেরেছি তাই জানতে পেরেছি। না হলে ভিন্ন ধারণা থাকতো। এখন কী করবি ভাবছিস?
কিছু একটাতো করতেই হবে। শুয়ে একটা বের কর প্লিজ।
রুহিত কিছুক্ষণ ভাবে তারপর বলে, আমার নিকট পাঁচ শ’ টাকা আছে। চল, এগুলো দিয়ে কিছুটাতো ক্রয় করা যাবে।
এগুলো দিলে বই ক্রয় করবি কিভাবে?
দেখবি ম্যানেজ হয়ে যাবে। তুই এতো চিন্তা করিস না।
আচ্ছা, ঠিক আছে, চল।
মায়ের বকুনি আর বাবার শাসন দুটোই রাহাতের জীবটাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বাবা সারাদিন এটা-ওটা বলে গালাগালি করে। মারধর করে। মা এসব দেখে বাবাকে কিছু না বলতে পেরে ছেলেটাকে উল্টো বকা দেন। আর বসে বসে নিজে কান্নাকাটি করেন। রাহাত এসব দেখে বুঝতে পারে, তাই মায়ের নিকট দৌড়ে যায়। মাকে প্রশ্ন করে, মা তুমি কাঁদছো কেন? সুখে, মহাসুখে। আমার ছেলের কাজ দেখে। আবার দুঃখে কাঁদি তোর বাবার আচরণ দেখে। তোর বাবা সব সময় বলে তোমার ছেলে দাতা হাতেম তায়ী হয়েছে। এই রকম দান করলে আমিতো ফতুর হয়ে যাবো। ছেলেটাকে বলো, যাতে আমার সর্বনাশ না করে।
মা তুমিই বলো, এগুলো কি খারাপ কাজ? আর এতে বাবার কি এমন লস হয়। আমিতো দেখি না। আমি মনে করি এগুলোর অনেক বেশি আল্লাহ বাবাকে দিয়ে দেন।
হ্যাঁ বাবা আমিও তাই মনে করি। কিন্তু তোর বাবা তা বিশ্বাস করে না। তোর বাবা বলে, তুই দান করলে নিজে ইনকাম করে দান করবি।
ঠিক আছে মা আমি ইনকাম করেই দান করবো। কারণ ভাল থাকার উপায়গুলোর মধ্যে এটাও আছে, ‘প্রচুর দান করো’।
রাহাত মায়ের চোখের জল মুছে দেয়। মা তাকে বুকে টেনে নেন, কপালে চুমু খান। সোহাগ করেন। রাহাত আনন্দে আত্মহারা। মায়ের অনুপ্রেরণা আর উৎসাহে রাহাতের সুখটা যেন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আজ রাহাতের মতো খুশি আর কেউ নয়। রাহাত মনে মনে পণ করে জীবনে যত দুঃখ-কষ্ট আসুক তবু কখনো মিথ্যার নিকট মাথা নোয়াবে না। আজীবন থাকবে সত্যের পূজারি। এসব ভাবতে ভাবতে গভীর নিদ্রা অনুভব করে। চোখ ছোট হয়ে আসে। ধীরে ধীরে গভীর নিদ্রা ভর করে তার দু’চোখে। মা বুঝতে পেরে হাঁটু থেকে মাথা নামিয়ে একটা বালিশ মাথার নিচে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে নিজের কাজে চলে যান।

চার.
মানুষটি অন্ধ। রাস্তা পার হতে পারছে না। কারও সেদিকে কোন দৃষ্টি নেই। তাকে দেখে রাহাতের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। কত কী ভাবতে থাকে। কিন্তু কোন ফল মেলাতে পারলো না। বুঝতে পারলো, মানুষ কত সমস্যা নিয়ে দিনাতিপাত করছে। কার কত সমস্যা। মহান অধিপতি তাকে কত সুখে রেখেছেন। আর এই মানুষটিকে রেখেছেন কত দুঃখে। আসলে আমরা মানুষরা অকৃতজ্ঞ। বিধাতা আমাদের যা দিয়েছেন তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা শুধু চাই। যত পাই তত আরও চাই। আমাদের চাওয়ার যেন শেষ নেই। যদি আমরা নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতাম তাহলে আমরা কত সুখী হতাম। আমাদের চোখ সবার ওপরে। কিন্তু আমরা কখনো নিচের দিকে তাকাই না, তাকালে বুঝতে পারতাম আমরা কত সুখী আমরা কি পারি না? নিজের চাওয়াটাকে ছোট করে দেখে অন্যের চাওয়ার মূল্যায়ন করতে। হঠাৎ অন্ধ লোকটির কথা মনে পড়তেই সকল ভাবনার ইতি টানলো। টিফিনের জন্য রাখা ২০ টাকা তাকে দান করে জিজ্ঞেস করলো, চাচা আপনি কি রাস্তা পার হবেন?
বৃদ্ধ লোকটি তার মাথায় হাত রেখে বললো, ‘হ্যাঁ, পার হবো। কিন্তু যেতে তো পারছি না। অবশ্য আমিও কাউকে বলিনি। তাই পার হতে পারিনি।
আপনি বলছেন না দেখে হয়তো কেউ এগিয়ে আসেনি।
তুমি বুঝলে কী করে? আমিতো তোমাকেও বলিনি।
সেটা বলতে পারবো না। তবে মনে হলো তাই জিজ্ঞেস করলাম।
আসলে যাদের মন আছে তারাই কেবল বুঝতে পারে। আর কেউ পারে না। তা বাবা তুমি কী করো? নিশ্চয়ই পড়ালেখা?
হ্যাঁ, আমি ক্লাস টেনে পড়ি। আমার নাম রাহাত।
ঠিক আছে বাবা, ভাল করে পড়ালেখা কর। কারণ এর বিকল্প কিছুই নেই।
চাচা আপনি ভিক্ষা করেন কেন? আপনার বুঝি এই ত্রিভুবনে কেউ নেই?
একান্তই দায়ে পড়ে। দায় না থাকলে তো এই নিকৃষ্ট কাজটা কেউ করত না।
কিসের দায় চাচা?
পেটের দায়। এই দায়টাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় দায়।
ঠিক আছে চাচা, আমার স্কুলের সময় হয়ে গেছে। আরেকদিন আপনার জীবনকাহিনী শুনবো। আপনি কিন্তু আমাকে সময় দিতে হবে।
ঠিক আছে, দেবো। তুমি যে কোন দিন বিকেলে এসো।
আসি চাচা, আসসালামু আলাইকুম।

পাঁচ.
রাহাত মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আর মাঝে মাঝে মাকে নানা রকম প্রশ্নে জর্জরিত করছে। মা কিছুটা বিরক্তি বোধ করলেও তা প্রকাশ না করে হ্যাঁ, না বলে যাচ্ছেন। কিন্তু রাহাতের সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। রাহাত বলেই চলছে। মা তার মাথার এলোমেলো চুলগুলো নাড়াচাড়া করছেন। রাহাত সুযোগ পেয়ে আরও আদর পাওয়ার আশায় এটা-ওটা বলে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে আসে বাবার প্রসঙ্গ।
মা বাবা নামাজ পড়েন না কেন? তুমি কি বাবাকে নামাজ পড়ার জন্য তাগিদ দাও না। আমি তোর আব্বুকে সবসময় বলি কিন্তু আমার কথা শুনে না।
ভাল করে বললে নিশ্চয়ই শুনবে।
আমি অনেক বলেছি, কিন্তু কাজ হয় না। তুই একটু চেষ্টা করে দেখতে পারিস।
কিন্তু বাবা কি আমার কথা শুনবে? শুনবে না তো উল্টো আরও মার দেবে।
না মারবে না।
কেন?
কারণ তোর বাবা তোকে অনেক ভালবাসে।
তবুও আমার ভয় করছে।
না ভয় করার কোন কারণ নেই। কারণ, তুইতো আর খারাপ কথা বলবি না। তুইতো বলবি দীনের কথা, আলোর কথা। আর যতই খারাপ হোক না কেন, তোর বাবার সুন্দর একটা মন আছে।
ঠিক আছে তুমি বাবাকে ডাকো।
ঠিক আছে ডাকছি। তুই বসে থাক। আমি নিয়ে আসছি।
মা চলে গেলেন বাবার নিকট। আর এর মধ্যে রাহাত কী কী বলবে সব ঠিক করে নিলো।
রায়হান চৌধুরী এসে চেয়ার নিয়ে বসলেন। রাহাত উঠে গিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। পা ধরেই বসে আছে। আর এই অবস্থা দেখে বাবা হতভম্বের মত ছেলের মুখপানে চেয়ে রইলেন। তার মাথায় কিছুই ধরে না। ছেলের এই রকম আচরণ তিনি আশা করেননি। কিছু বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলেন, এভাবে বসে থাকবি না কিছু বলবি।
বলার জন্য সাহস পাচ্ছি না।
বাবা তাকে টেনে নিয়ে খাটের ওপর বসিয়ে বললেন, নেকামো না করে যা বলার সরাসরি বল।
আপনি মারবেন নাতো।
– না মারবো না না।
সত্যি ব-ব-ল-ছে-ন।
হ্যাঁ সত্যি বলছি। মারবো না, ভনিতা না করে এবার বল।
আপনি নামাজ পড়েন না কেন?
‘নিজের চরকায় তেল দে’।
আপনি হয়তবা ভাবছেন আমি আপনার দোষ ধরেছি। আর এতে আপনার রাগ হচ্ছে। কিন্তু রাগ হওয়ার মতো কিছু আমি বলিনি। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, ‘যে আমার দোষ ধরে, বন্ধু সে জনা।’ তাই বলছি আপনি নামাজ পড়েন না কেন?
আর তার জন্য কি তোকে জবাবদিহি করতে হবে?
না বাবা এখানে জবাবদিহির প্রশ্ন নয়। সেটা করা হবে বোকামি। আমি আপনার ভালোর জন্য আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। এতে আপনার রাগান্বিত হওয়া উচিত নয়।
এখন তুই কী বলতে চাস?
আমি বলতে চাই, নামাজ কোন মনগড়া জিনিস নয় যে ইচ্ছে হলে করলাম, না হলে করলাম না। মুসলমান হিসেবে এটা আমাদের সকলের কর্তব্য। শুধু কর্তব্য নয়, এটা মুসলমানের প্রধান কর্তব্য। যারা আল্লাহ এবং তার রাসূলের প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী জীবন যাপন করেন না তাদেরকে তিনি পছন্দ করেন না। তাদের জন্য শুধু-ই রয়েছে ঘৃণা এবং কঠিন আজাব। তুই কি আমার ওপর মাস্টারি ফলাতে চাস? ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শেখাও’।
না আব্বু তা নয়। আমি শুধু আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। যা আপনি এতদিন ভুলে বসে আছেন। আল্লাহ কেবলমাত্র তার ওপর সন্তুষ্ট হন যারা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করে। হালাল-হারাম দেখে খায়। অন্যের হক আদায় করে। আর যারা সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করে এবং সুন্নতমতো চলাফেরা করে আল্লাহ তাদের ওপর খুশি হন। আর যারা এসব কাজ হতে দূরে থাকে তিনি তাদের ওপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের ওপর হতে সব রহমত বরকত উঠিয়ে নিয়ে যান।
আর কিছু বলবি?
হ্যাঁ আব্বু আরও অনেক কথা বলার আছে। যদি আপনার শোনার মানসিকতা থাকে।
ঠিক আছে বল।
যারা আল্লাহ এবং রাসূলের পথ অনুযায়ী চলে না তাদের স্থান হয় জাহান্নামে। তারা সারাজীবন জাহান্নামের অনলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আরও কত ভয়ঙ্কর শাস্তি হবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
আর কিছু বলার আছে?
আছে।
তাহলে বল।
আপনি মানুষকে হিংসা করেন কেন? আপনি মনে হয় মানুষ শব্দের অর্থ জানেন না? জানলে এরকম করতেন না। মানবপ্রেম ভালবাসা ও কল্যাণই হচ্ছে মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর যাদের মধ্যে এইসব গুণ নেই তারা মানুষ না হয়ে অমানুষে পরিণত হয়। আমি চাই না আমার বাবা তাদের পর্যায়ে পড়ুক। আপনি অবশ্যই জানেন, ‘অতি দর্পে হত লঙ্কা’। এর সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন যা আমাদের জানা উচিত। ইবনুল হাইসানের মতে, ‘হিংসা সাপের বিষের চেয়ে মারাত্মক। কেননা, সাপ কখনো নিজের বিষে মারা যায় না। কিন্তু হিংসুকের হিংসার আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।’
আর ইবনে হাজার আকালানি (রহ:) এর মতে, ‘হিংসুকের পাশে বাস করার চেয়ে হিংস্র বাঘের প্রতিবেশী হওয়া অনেক নিরাপদ।’ তাই বলছি, আপনি মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ সব কিছু দূর করে ফেলুন। জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবুন। আর বাবা আমি মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করি তা আপনি পছন্দ করেন না।
আপনি জানলে এমন করতেন না। আর এই সম্পর্কে স্যার উইলিয়াম বলেন, ‘যে সাহায্য করে আনন্দ পায়, তাকে না পাওয়ার দুঃখ স্পর্শ করে না।’ মানুষের সাথে শত্রুতা না করে বন্ধুত্ব করুন। মানুষকে ভালবাসুন, দেখবেন আল্লাহ আপনার ওপর অনেক খুশি হবেন। আর এর ফল একদিন আপনি অবশ্যই পাবেন। কিভাবে পাবেন তা জানার বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে ভাল-মন্দ সকল কাজের ফল সবাই ভোগ করে। আর এই সম্পর্কে শেখ সা’দী (রহ:) বলেছেন, ‘শত্রুতা আর বন্ধুর বন্ধুত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় এ কথা মনে রাখবে। কারণ উভয়ের মন আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।’
আর বাবা মানুষকে অবহেলা না করে ভালবাসতে শিখুন। মানুষের হক আদায় করতে শিখুন। কারণ, রাসূল (সা) মুসলমানের ওপর মুসলমানের পাঁচটি হকের কথা বলেছেন। এগুলো হলো – ১. সালাম দিলে জবাব দেয়া। ২. অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। ৩. মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৪. তার হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা। ৫. কেউ দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা। কিন্তু আমার বাবার মধ্যে এর কোনটি আছে আর কোনটি নেই তা তিনি নিজেই ভাল জানেন?
রাহাত বলে চলছে, কোনো দিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। তাকাতেই লক্ষ্য করলো বাবার নয়ন বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে। রাহাত বুঝতে পারলো তার বাবা অনুশোচনার অনলে দগ্ধ হচ্ছেন। উঠে গিয়ে বাবার নয়নের জল মুছে দিলো। আর বললো, বাবা তোমাকে দুঃখ দেয়ার জন্য আমি কথাগুলো বলিনি। বলেছি আমার বাবাকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য। এতে যদি আপনি দুঃখ বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে ক্ষমা করে দিন।
এ কথা বলে রাহাত আবার পা ধরে কান্না জুড়ে দেয়। আর বলে, বাবা তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে আমি মরেও শান্তি পাবো না।
বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দেন। মাথায় ছুঁয়ে আশীর্বাদ করেন। বুকে জড়িয়ে নেন। আর বলেন, না বাবা তোর কোন ভুল হয়নি। তুই আমার ভুল ভেঙে দিয়েছিস। আমাকে চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিস। তুই আমার সোনার ছেলে, তোকে কি আমি ভুল বুঝতে পারি? না আমি তোকে ভুল বুঝতে পারি না। তোর মতো এরকম ছেলে যেন প্রত্যেকটি বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়। তোকে জন্ম দিয়ে আমি যে আজ কত খুশি। আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। তুই আমার সোনামানিক। আমার বুকে এভাবে জড়িয়ে থাকবি সারাটি জীবন…।
রাহাত পরম মমতায় বাবার বুকে মুখ রেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে।

আলমগীর হোসেন ফারুক

SHARE

2 COMMENTS

  1. খুব ভাল লেগেছে । ভুলে যাওয়া অনেক কিছুই মনে পড়ল ।
    আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন লেখককে এর উত্তম পুরুস্কার দান করেন।
    আমীন…

  2. অসাধারণ হয়েছে । খুব ভাল লাগলো পরে । বিনীত অনুরধ এরকম আর বেশি করে লিখবেন । এতে উৎসাহ পাই। অনেক কিছুই মনে পরে গেল। অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply