Home গল্প নীয়নের মোবাইল পকেট

নীয়নের মোবাইল পকেট

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

আবছা ভোরে ঘুম ভেঙে যায় নীয়নের। এখনও ভালো করে সকাল হয়নি।
জানালার পরদা সরে গেছে অনেকখানি। নকশা করা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নীয়ন দেখতে পায় আমলকী, নারকেল, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা গাছগুলোতে ছোট ছোট পাখি উড়ছে। আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি। এক ফালি মেঘলা আকাশকে দেখতে পায় নীয়ন। এ সময় মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামে, কখনও আষাঢ়ের বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ে। দারুণ লাগে নীয়নের।
ভাবতে ভাবতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে। বুকের ভেতরটা আনন্দে দুলে ওঠে ওর।
ভীষণ খুশির দিন। আজ শুক্রবার, ছুটি-ছুটি-ছুটি। দুই অক্ষরের শব্দটি ভেজা ভেজা এই ভোরকে আরও সুন্দর করে তোলে।
স্কুল নেই, আব্বুর অফিস নেই, আম্মু কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ান, দু’দিন তারও ছুটি। তাই বাড়িতে কোন ছুটোছুটি নেই, ঢিমে তেতালায় চলে।
অন্য দিনের মতো পাউরুটি, মাখন, ডিম বার্গারের দুধে ভেজানো কর্নফেক্স নয়, ধীরে ধীরে আম্মু তৈরি করবেন পরোটা-ডিমভাজি-হালুয়া।
আব্বু ডাকলেন, ও টুনটুনি টুনি মা, ওঠো তাড়াতাড়ি- আজ একসাথে নাশতা করব।
খুব ঘুমোতে পারে টুনি বু। ভাগ্যিস ওর স্কুল এগারোটায়।
টুনিবু এক সময় উঠে এল। আব্বু খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। আম্মুর পরোটা ভাজার গন্ধে ভুরভুর করে ডাইনিং স্পেস। ফোনটা তখনই ক্রিং ক্রিং ক্রিং করে বেজে ওঠে।
নীয়নের সামনের প্লেটে গরম পরোটা, টম্যাটো পেঁয়াজকুচি দেয়া ওমলেট, কিন্তু ও খেতে পারছে না। কথা বলতে বলতে আব্বু গম্ভীর হয়ে গেছেন।
আম্মু ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেন, কার ফোন গো?
Ñ আর বলো না। হারুনের নাকি হঠাৎ শরীর খারাপ করেছে, ‘নীরা কিনিকে’ আছে।
হারুন আঙ্কেল মানে আব্বুর কলিগ। এ ছাড়া আব্বুর ভাই বলা যায়, বন্ধুও বলা যায়। আন্টি আর আঙ্কেল ভীষণ কাছের মানুষ ওদের। টুনি আর নীয়নকে দারুণ ভালবাসেন।
পরোটার ভেতরে ওমলেট দিয়ে পাটির মতো জড়িয়ে আব্বু আম্মু তড়িঘড়ি নাস্তা সারেন। টুনিবুর ছুটির দিনেও কোচিং কাস। পুরানা পল্টন ওদের বাসা থেকে আব্বু আম্মু টুনিকে বেইলী রোডে নামিয়ে দেবেন। তারপর গ্রিন রোডের কিনিকে যাবেন হারুন আঙ্কেলকে দেখতে।
দুড়দাড় করে সবাই নেমে যেতেই নীয়ন একবোরে একা। ফাঁকা বাড়িতে বসে থাকে ও। খুব মন খারাপ হয়। কী চমৎকার ছুটির ভোর এলো, ফোনের একটি খবরে ঝপ করে তা হারিয়েও গেল।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে ও। চেনা-অচেনা লোকজন, ফেরিওয়ালা হাঁক দিয়ে এগিয়ে যায়। সামনের বাড়ি থেকে পেয়ালা-চামচের টুংটাং ভেসে আসে। ছুটির দিন তো, খুশির হৈ হল্লা ভেসে আসছে দূরের ফ্যাটগুলো থেকে। শুধু চারতলা ফ্যাটের বি-থ্রি নম্বরের বাড়িটি একেবারে সুনসান। ড্রয়িং রুমের ঝাড়বাতির কাচে বাতাসের ছোঁয়া লাগতেই টুংটাং আওয়াজ হয়। কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে নীয়নের। পকেটে ওর ঘরের চাবি। বাইরে লক করে গেছেন মা। যাবার আগেই পই পই করে বলে গেছেন, খবরদার কাউকে চাবি দিবি না নীয়ন। শুধু টুনিবু ফিরে এলে দিও। আর কাউকে নয়।
পকেটে হাত দিয়ে চাবিটি ফের দেখে নেয় ও। দরজার ওপাশে ঠিক এ সময় পায়ের আওয়াজ পায়। খালি বাড়ি জেনে চোর-ডাকাত এল নাকি? আম্মু প্রায়ই বলেন, যা দিনকাল পড়েছে। কাউকে আর বিশ্বাস করা যায় না এখন। মানুষ যেন ওঁৎ পেতে থাকে কী করে তোমাকে ঠকাবে।
ঠিক এ সময় গোটা পুরানা পল্টন এলাকা কাঁপিয়ে ডোরবেল বেজে ওঠে। একবার- দুবার-তিনবার বাজে। নীয়নের সারা শরীরে বিনবিনে ঘাম। শিরদাঁড়াতে ভয়ের কাঁপুনি। দরজার ‘আই’ দিয়ে যে দু’জনকে দেখল ওদের কাউকেই তো সে চেনে না। এবার কী করবে ও। টুনিবুও যেন সাংঘাতিক পড়–য়া হয়ে উঠেছে। কী এমন ছাইপাশ পড়াবে ছুটির দিনেও নীয়নকে একা ফেলে যেতে হবে।
সবার ওপর অভিমানে কান্না পেতে থাকে ওর। ডোরবেল-এ কাজ হলো না বলে এবার দরজায় ধুপধাপ আওয়াজ। দরজার ‘আই’ দিয়ে দেখে অচেনা দু’জন লোক।
নীয়নের বুকের ভেতর টিপটিপ করে। ও ছোট মানুষ বলে সবাই ভয় দেখাতে এসেছে এ সময়? যখন বাড়িতে মা নেই, আব্বু নেই, বুবু নেই। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর।
Ñনীয়ন, ও নীয়নÑ দরজা খোলো।
বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের গলা শুনে সাহস ফিরে পায়। বলে, Ñআঙ্কেল, ওদের তো আমি চিনি না।
Ñআরে বাবা চেন না, তা কি করে হয়? তোমার দাদী এসেছেন তো। দাদীকে চেন না? সাচনা থেকে এসেছেন।
নীয়নের দাদী তো সুখাইড়ে থাকেন।
দাদীকে সে চেনে না? ফর্সা মোটাসোটাÑ নাম আনোয়ারা বেগম। আব্বুর মা, নীয়নকে শুধু ভাই ভাই বলে ডাকেন।
বাড়িওয়ালা ফের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেন, নীয়ন, চাবিটা দাও। ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো আছি।
দরজার নিচ দিয়ে চাবির গোছা গলিয়ে দেয়। ভেতরে ঢুকেন দু’জন। হ্যাঁ দাদী না হলেও দাদীর মতোই। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পান খাওয়া ঠোঁটে একমুঠো হাসি।
এসেই বুকে জড়িয়ে ধরেন নীয়নকে।
Ñদেখছ, গাঁও-গেরামে না গেলে কি হয়? দাদীরে চিনতে পারলা না তো। আমি হইলাম খায়রুন নাহার বিবি। এই দ্যাখ, ঐ হইল গিয়া তোমার রাব্বুচাচু। বাড়িওয়ালা হাসেন।
Ñতোমার খায়রুন দাদীকে দিয়ে গোলাম। আম্মু-আব্বু বুঝি বাড়িতে নেই?
দাদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, এবার আমি আসি তাহলে খালাম্মা।
বাড়িওয়ালা চলে গেলেন। এবার আর একা নয় নীয়ন। টুনিবু যদি সারাদিনও এখন কোচিং কাস করে তবুও কোন ভাবনা নেই। রাব্বু চাচু আছে, খায়রুন দাদীও রয়েছেন। লম্বা কালো কুচকুচে চুল নেই, চিরল দাঁতের ঝকঝকে হাসি নেই, তবে পান খাওয়া ঠোঁটে খুব মিষ্টি হাসেন দাদী, মন ভরে যায়।
কাপড়-চোপড় ছেড়ে, হাত-মুখ ধুয়ে নীয়নকে বুকে জড়িয়ে কাঁদেন কিছুক্ষণ।
Ñআমাগো বাড়ি তো তোর বাপে লইয়া যাইবার পারে। সুখাইড় থেকে সাচনা আর কদ্দুর? বাড়ির আম-জাম বাইরের মাইনষে খাইয়া যায়, তোরা পয়সা দিয়া কিইন্যা খাস। বকফুল ঝইরা ঝইরা পড়ে, খাওয়াইনা মানুষ নাই। রাব্বু চাচু বিরক্ত হয়ে বলে, এবার কান্না থামাও আম্মা। বকফুল না খেলে জীবন বৃথা হয়ে যায়?
এ সময় ফিরে এল টুনিবু। দাদী আর রাব্বু চাচুকে এক নজর দেখেই চিনে ফেলে। আব্বুর খালা। বলে, নীয়ন নিশ্চয়ই চিনতে পারেনি। তাই না চাচ্চু? রাব্বু বলে, চিনবে কী করে বল! দেখলে তো চিনবে। ছুটিছাটায় তোদের আব্বু মানে মেজভাইয়া যদি গাঁয়ে যেত, আমাদের দেখে আসত, এখন তো তোরা সিঙ্গাপুর-লন্ডন ঘুরতে যাসÑ তাই না টুনি?
টুনি নীয়ন দু’জনেই খুব লজ্জা পায়। যারা বড়, অনেক লেখাপড়া জানেন, ভাল-মন্দ বোঝেন, ওরা বলেন, Ñশিকড় ভুলে কি মানুষ বাঁচতে পারে? রুটই হলো জীবনের মূল কথা।
সত্যি দু’ভাই-বোনের মনে অপরাধবোধের কাঁটা।
পড়াশোনার এত বোঝা, গাদা গাদা হোমওয়ার্কÑ এ থেকে কিছুতেই যেন ওদের ছাড় নেই। এ ছাড়া রয়েছে আব্বুর অফিস, আম্মুর স্কুলÑ একসাথে চারজনের যেন ছুটি কিছুতেই হয় না। দু-একবার অবশ্য সিঙ্গাপুর ইংল্যান্ড সবাই মিলে ঘুরে এসেছে, এও সত্যি। দাদীর বয়স হলে কী হবে সবার খবরাখবর রাখেন।
দাদী কোমরে কাপড় জড়িয়ে বলেন, পড়াশোনা কইরা আইলি, খাবি কী! কোথায় কী আছে তাও তো জানি না। খাড়া এট্টু চাউলের গুঁড়ি, গুড়, গাছের নাইরকোল লইয়া আইছি। একটা কিছু বানাইয়া দিই।
টুনি বলে, না না দাদী, তুমি রেস্ট নাও, আম্মু মোবাইল করেছেন, ঘণ্টাখানেকের ভেতরে চলে আসবেন। তুমি বিশ্রাম নাও তো, একদম কাজ করবে না।
দাদী তবু চালের গুঁড়ো, গুড়, নারকোল কোরা বড় হাতা দিয়ে মেশাতে মেশাতে বলেন, তোমার আর ভদ্রতা করণ লাগব না নাতনী। আমার কাছে এসে বসো তো তোমরা। রাব্বু চাচুকে জিগাইয়া আও চা খাইব কি না।
দাদী যেন ম্যাজিক জানেন। পলকেই তৈরি করে নেন মালপো। চিনি-চা-দুধের কৌটো বের করে চা বানিয়ে ফেলেন। রাব্বু চাচুর পাশে বসে টুনি আর নীয়ন চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেয়।
আম্মু কখনোই ওদের চা দেয় না, সর্দিকাশি হলেÑ ও আম্মু এইটুকু চা দাও না প্লিজ, বলার পর মাঝে মাঝে চা পায়, তবে সেই থ্রিলটা আর থাকে না। হরলিকস, ওভালটিন, বুস্ট যত খুশি খাওÑ ছোটবেলা থেকে এত চায়ের নেশা কেন?
আম্মু এই কথাগুলোই বলেন।
চায়ে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিতে দিতে নীয়নের মনে হয়। ছুটির দিনটা যেমন খারাপ যাবে ভেবেছিল তা কিন্তু মোটেও হয়নি। দাদী আর রাব্বু চাচা আসায় রংধনুর মতো রঙিন হয়ে যায় আষাঢ়ের এই ভেজা দিনটি।
আব্বু-আম্মু ফিরে এলেন ১টার দিকে, হারুন আঙ্কেল এখন অনেকটা ভালো। ওদেরকে দেখে আম্মু বলে উঠলেন,Ñ আরে ছোটখালা তুমি? ইস কী যে আনন্দ হচ্ছে!
সত্যি বাড়িতে খুব আনন্দ!
খায়রুন নানীর বড় ছেলে সাব্বু দুবাই থেকে ছুটিতে আসবে বউ নিয়ে। সেই খুশিতে তিনি ওদের নিয়ে যাবার জন্য রাব্বু চাচুকে নিয়ে ঢাকাতে এসেছেন। সাব্বুকে নিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরবেন। এই সময়টুকু ডাক্তারের কাছে চেক আপও করাবেন।
বয়স হয়েছে, আকজাল প্রায়ই শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা হয়। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড মাথা ধরে। প্রেসারও ওঠানামা করে। অ্যাপায়েন্টমেন্টে করে রাব্বু চাচু নানীকে দু’দিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন। বাকি যে সময়টুকু বাড়িতে থাকেন দাদী আনন্দে ভরিয়ে রাখেন। পুরনো দিনের কত গল্পÑ শুনে শুনে নীয়ন আর টুনির আঁশ মেটে না।
কত রকমের যে মজাদার ভর্তা বানাতে পারেন দাদী গুণে শেষ করতে পারে না নীয়ন।
আম্মু আফসোস করে বলে, জানেন খালাম্মা, ছেলেমেয়ে দুটো একেবারেই ভাত খেতে চায় না। বার্গার, হটডগ কোল্ডড্রিংক দেন গপগপ করে খেয়ে ফেলবে।
দাদী বলেন, ছেলেমেয়ের দোষ দিও না বউমা, ওদের মনের মতো খাওয়া তৈরি করে না দিলে কী করে খাইব?
এ ক’দিনেই পুরো বাড়ির কাজ সামলে নিয়েছেন দাদী। গলায় আদর মেখে বলেন, আমি আইছি দুইডা দিন বিশ্রাম কইরা নেও বউমা। একা বাড়িতে তোমার তো সবই করণ লাগে।
যখন-তখন দাদী পিঠে-ফিরনি- পরোটা তৈরি করেন। নীয়ন তো ঘুম থেকে উঠেই খাওয়ার টেবিলের দিকে ছুটে যায়। কত রকমারি খাবার তৈরি করতে জানেন দাদীÑ এসব খাবার কোনদিনও খায়নি নীয়ন।
খালি বিরক্ত হন নীয়নের এলোমোলো স্বভাবের জন্য।
Ñকি রে বই-খাতা গুছায়া রাখবার পারস না? কিছু না পাইলেইÑ ও আম্মা আমার ইংরাজি বই কই, বাংলা খাতা কই? ক্যানরে খালি পড়বি আর জিনিসপত্র গুছায়া রাখবি। তাও পারিস না?
ওর জিনসের প্যান্টগুলো হাতে নিয়ে বিরক্ত হন।
Ñকি রে, এতো ভারী প্যান্ট পরস ক্যান? তর মায়ে ধোয় ক্যামনে? মায়ের কষ্ট হয় না?
আম্মু প্রায়ই বলেন, খালাম্মা আপনি এসেছেন কী যে ভালো লাগছে। কী নিশ্চিন্তে স্কুলে যাই। বাড়ির জন্য একটুও চিন্তা হয় না।
দাদী হাসতে হাসতে বলেন, পরথম দিন তো তোমার পোলায় আমারে ঢুকবার দিতেই চায় নাই।
এসব কথায় খুব লজ্জা পায় নীয়ন।
মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে বলে, হুঁ আমি কি তোমাকে কোনদিন দেখেছি? এবার থেকে আর ভুল হবে নাÑ দ্যাখো।
প্রথম দিন আম্মুর কাছে ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন করেছে ছেলে।
Ñএখন আমি পড়ব কোথায় শুনি? আমার টিচার এল কোথায় বসব? শোব কোথায় শুনি? আমি কিন্তু ঘর ছাড়ব না।
আম্মু ফিসফিস করে বলেছেন, এসব কথা বলতে হয় না নীয়ন। বাড়িতে মেহমান আসবে? তার জন্য বুঝি মন খারাপ করতে হয়? বরং কেউ এলে তার থাকার-খাওয়ার যাতে অসুবিধে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবি না? তুমি তো বড় হচ্ছ, এসব বুঝতে হবে।
দাদী খুব সহজেই সব কিছুর সমাধান করে দেন। কোনদিনও যা হয়নি তাই হয় ডাইনিং স্পেসের ফাঁকা জায়গাটিতে তোশক আর ফোম দিয়ে চমৎকার বিছানা পাতেন দাদী। সন্ধ্যা থেকে রোজ এই বিছানায় বসে আড্ডা জমে ওঠে।
আব্বু মৃদু আপত্তি করেছেন, Ñএ কী ব্যাপার খালা? তুমি মেঝেতে শোবে না কি? ছি: ছি:Ñ
দাদী বাধা দিয়ে বলেন, Ñছি: ছি: করস ক্যান? টুনি নীয়ন ওরা তো এখন খাটে ঘুমাইবারও চায় না।
আসলে সবাই মিলে মেঝেতে বিছানা করে শোয়ার যা মজা আগে কখনও বুঝতে পারেনি নীয়ন।
বিশ্বকাপ খেলা শুরু হয়েছে। সবাই বিছানায় শুয়ে বসে খেলা দেখে। চা-পান খাওয়া হয় বিছানাতে বসে।
দাদী খুশি খুশি গলায় বলেন, ক্রিকেট খেলার চাইতে ফুটবল খেলা অনেক অনেক ভালো।
Ñকেন দাদী?
Ñকেন আবার কিরে? ক্রিকেট খেলায় একটা বল লইয়া সারাক্ষণ ব্যাট দিয়ে ঠুকঠুক করা। ফুটবল খেলায় বলের পেছন ২০ জন খেলোয়াড় কেমন দৌড়ায় দেখছসনি নীয়ন? খুব জমাইয়া রাখে।
দশটা বাজলেই দাদী ঘুমে ঢুলে পড়েন। টুনি আর নীয়নকে বলেন, ঘুমা রে ঘুমা। কত রাইত হইছে।
টুনটুনি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।
Ñকত রাইতÑ বলছ কি গো দাদী, মাত্র দশটা। সাড়ে বারোটায় অন্য খেলা শুরু হবে। তা দেখে তারপর ঘুমোবোÑ তোই নারে নীয়ন। নীয়ন মাথা নাড়ে।
Ñ তাইতো, কাকা-ডুঙ্গা পোডোলক্সিদের খেলা না দেখলে কি চলে?
বালিশ থেকে মাথা তুলে উঠে বসেন দাদী।
Ñ মাইনষের খেলা দ্যাখনের এত নেশা ক্যানরে নীয়ন্যা? এই চার-পাঁচ দিনেই দাদীর খুব কাছাকাছি বলে এসেছে নীয়ন। তাইতো খায়রুন বেগমের রাগ হলে বা মেজাজ খারাপ হলে দাদী নীয়নকে বলেনÑ নীয়ন্যা।
Ñ কিসের এত নেশা রে তোগো? ওদের কি আমরা চিনি না জানি? বাংলাদেশের পোলারা খেললে রাত জাইগা খেলা দেখতাম। ওগোর খেলা আমরা দেখুম ক্যান?
টুনিদি বলল, ওদের নামগুলো কাকা-ডুঙ্গা-ওগুলো কেমন নাম বলো তো দাদী।
খায়রুন বলেন, বাপের জন্মেও এমন নাম শুনিনি। রাব্বু চাচু বলেন, তুমি কি করে শুনবে আম্মা? ওরা তো বিদেশী।
Ñ আরে বিদেশী বইলা কী হইছে? খেলোয়াড়ের নাম বুঝন লাগবো না? নাইলে খেলা দেখুম কি?
খুব রেগে গেছেন দাদী। এই জমাটি আড্ডা জমানোর জন্য টুনির গরম চা নিয়ে এসেছে।
নীয়ন বলে, তুমি দিয়েগোর নাম কোন দিন শুনেছ দাদী!
Ñ না তো।
Ñ হলো ‘দিয়া গো’Ñ মানে হলো বল দিয়ে ঝটপট চলে যাও। তাও তো দাদী, দিয়েগো ম্যারাডোনার কতো নাম।
গালে হাত দিয়ে বসে থাকেন দাদী।
Ñ ভালদে রামাÑ এমন নাম শুনেছ?
দাদীর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
নীয়ন বলে, তার মানে হলোÑ বল দে রামা। দাদী গুছিয়ে বসে বলেন, তবেই দ্যাখÑ বল দে রামাÑএটা কোন নাম হলো রে রাব্বু? ত্ইু-ই বল।
টুনি বলে, স্পেনের কোচের নাম ডেল বসকু শুনেছ কোনদিন?
Ñ কী বললি?
নীয়ন ফিক করে হেসে বলে, বসকুÑ তার মানে হলো বোঁচকা। দাদী বলেন, আর নাম পাইল না এই দুনিয়াতে। রাগ কি আর এমনই এমনই করি রে নীয়ন।
আব্বু এসে বলেন, আজ আর খেলা দেখার দরকার নেই খালা। কাল সাব্বুর ফাইট আসবে। ভোরে উঠতো হবে। দুবাই থেকে আমিরাতের যে ফাইট আসে তা ল্যান্ড করবে আটটা চল্লিশ মিনিটে। ভোরে উঠেই রেডি হতে হবে।
বড় ছেলে সাব্বু আসবে এ কথাতে বিদেশী খেলোয়াড়দের ওপর একরাশ রাগ তার পানি হয়ে যায়।
বলেন, এ্যাই নীয়ন, তোর কাছে আমার স্যুটকেসের চাবি দিই নাইÑ এখান দে ভাই। কাপড়-চোপড় বার কইরা রাখি। নীয়ন বলে, আমিও তোমার সাথে এয়ারপোর্টে যাব দাদী।
বিছানা ঠিক করতে করতে দাদী বলেন, যাবি যাবি, আগে চাবি দে আমার।
চাবির আর খুঁজে পায় না নীয়ন। এ পকেট ও পকেট হাতড়ে বেড়ায়। চাবিটার হদিস আর পাওয়া যায় না।
আম্মু বলেন, Ñআপনিও ভাল মানুষ পেয়েছেন খালা। ওর কাছে চাবি কেন রাখতে দিয়েছেন?
দাদী বলেন, পাইব না কেন? প্যান্টে একটা-দুইডা পকেট থাকে, ওর প্যান্টের পকেটের তো শেষ নেই।
টুনি বলে, এ হলো মোবাইল পকেটÑ বুঝলে দাদী? গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে বসে থাকেন খায়রুন বেগম।
Ñ মোবাইল ফোনের মতো মোবাইল পকেট?
রাব্বু বলে, ওসব তুমি বুঝবে না আম্মা। এই তো পেয়ে গেছে চাবি, দে-দে। মোবাইল পকেট হলো এখনকার স্টাইলÑ তাই না টুনি? টুনি মুচকি হাসে।
দাদীমা, রাব্বু চাচ্চু আর নীয়ন সকাল বেলাতেই এয়ারপোর্টে গিয়ে হাজির। সাব্বু চাচু, ভাবী আর পুতুলে মতো মেয়েটিকে নিয়ে যখন সবাই বাড়িতে এল তখন প্রায় বারোটা বাজে।
বাড়িতে খুব হইচই, মেহমান এসেছে, পোলাও-কোর্মা-কাবাব রেঁধে রেঁধে আম্মু হয়রান। মুখে বিনবিনে ঘাম, ঠোঁটে তবু মিষ্টি হাসিটি লেগে আছে।
টুনি আর নীয়নের মুখে হাসি ধরছে না। মেহমান আসা মানেই পড়াশোনা নেই। শুধু খাও-দাও আর আনন্দ করো। নীয়নের প্রশ্নÑ কোথায় পড়ব মা? কোথায় বসব? স্যারকে কোথায় বসতে দেব?
পড়ার টেবিলে তো দাদীর পানের বাটা-ওষুধপত্র সব।
আম্মা হাসিমুখে বলেন, এত প্রশ্ন এক সাথেÑ আমি জবাব দিতে পারি? তার চেয়ে বরং খালাম্মা যদ্দিন আছেন পড়া বাদ দাওÑ এবার হলো তো?
হাসিতে মুখ ভরে যায় দুই ভাইবোনের।
দুপুরে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া হলো, আনন্দ হলো শতগুণ। সাব্বু চাচু হইহই করা মানুষ, রাব্বু চাচুর মতো গম্ভীর নয়। হাসি-গানে মেতে ওঠে সারা ফ্যাটবাড়ি।
বিপত্তি ঘটে বিকেলে চা খাওয়ার সময় দাদীর হাতে সুতো পরানো সুঁই।
Ñ এই নীয়ন্যা, আয় তো এদিকে।
নীয়নের পরনে জিনসের প্যান্ট। এখানে ওখানে ছেঁড়া, গোড়ালি কাছে বটগাছের শিকড়ের মতো ঝুলে আছে প্যান্টের অজস্র মোটা সুতো।
নাকের ডগায় চশমা এঁটে ছেঁড়া জায়গাগুলো মনোযোগ দিয়ে সেলাই করতে থাকেন দাদী।
Ñবড় পোলা আর বউমা ভালা কাপড়-চোপড় পইরা রইছে, আর আমার নাতি ছিঁড়া প্যান্ট পইরা ঘুইরা বেড়ায়? এ তো তাজ্জবের কথা, শরমের কথা। ও টুনির মা, ও বউমা নাতির ভালা আর দামি কাপড়-চোপড় কিইনা দিবার পার্ েনা? ওর দিকে নজর দিবা না তোমরা?
Ñ ঐ নীয়ন্যা, ঐ প্যান্টটা লইয়া আয়।
Ñ কোন প্যান্ট দাদীমা?
Ñ ঐ যে তালি দিয়ে একশটা পকেট বানাইছস।
দাদী সেলাই করে চলেছেন। ছোটবেলায় স্কুলে শেখা তালি দেয়া, রিফু করার সব বিদ্যে দিয়ে নিখুঁতভাবে সেলাই করছেন। গোড়ালির কাছে সুতোগুলো কাটার সময় হাঁ হাঁ  করে ওঠে টুনি।
বলে, ওগুলো তো আজকালকার ফ্যাশন দাদী। অনেক দাম দিয়ে ফুটো প্যান্ট কিনে দিয়েছে আম্মু।
চোখ পাকিয়ে দাদী বলেন, তুই বললি আর আমি বিশ্বাস করুম?
চায়ের পেয়ালা সামনে নিয়ে আম্মু গালে হাত দিয়ে বসে থাকেন। খুব শখ করে নীয়ন মোবাইল পকেটের প্যান্ট, আর জিনসের ছেঁড়া প্যান্ট কিনেছে। ছেলে তো চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করবে। কী লজ্জার কথা। খালাম্মাই বা এমন এমন করতে গেলেন কেন?
বুকের ভেতরটা মায়ের দুরুদুরু কাঁপে।
কিন্তু কিছুই হলো না। এত শখের প্যান্ট দুটোর দুর্দশা ঘটল। ফ্যাশন-স্টাইল সব কিছু মুখ থুমড়ে পড়ে রইলÑ তবু নীয়ন আনন্দে মেতে থাকে। খায়রুন বিবির আঁচল ধরে ঘুরঘুর করে।
দাদীআম্মা-সাব্বু চাচু-রাব্বু চাচু দেশে ফিরে যাবার পর বাসাটা ঠিক আগের মতো সুনসান হয়ে গেল। আবার রুটিন মতো স্কুলে যাওয়া-স্কুল থেকে ফেরা। রুটি-মাখন-ডিম খাওয়া। শুধু নীয়ন যখন একা থাকে বন্ধ পকেটগুলোতে হাত বুলিয়ে নেয়। দাদীর কথাগুলো ঝাপটা দেয় কানে,Ñ একটা পকেট রাখবি প্যান্টে, দশটা রাখবি না। খুঁজবার গেলে সময় বরবাদ হয়Ñ বুঝলা ভাই? অকারণেই চোখের কোল ভারী হয়ে আসে। আব্বু-আম্মু, টুনিবু সবাই আছে, তবু বাড়িটা আর ওর ছোট্ট বুকের ভেতরটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা মনে হতে থাকে নীয়নের।

SHARE

Leave a Reply