Home উপন্যাস স্বপ্ন ও স্বাধীন

স্বপ্ন ও স্বাধীন

মুহাম্মদ ইফতেখার

স্বপ্ন ও স্বাধীন

শৈশবে স্বাধীন যখন খেলনার স্টেথোস্কোপটা কানে ঝুলিয়ে চেস্টপিসটা বাবার বুকের ওপর চেপে ধরতো আর আধো আধো স্বরে বলতো, ‘দেকি তো আব্বু, তোমার শলীলটা কেমন আছে’– মোর্শেদ সাহেব তখন মুগ্ধ-চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর গর্বিত কণ্ঠে স্ত্রীকে বলতেন, ‘দেখেছো, আমাদের স্বাধীনের মাঝে এখনই কেমন ডাক্তার-ডাক্তার ভাব, তুমি দেখো বড়ো হলে ও নিশ্চয়ই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে!’

কিন্তু স্বাধীন আজকাল যেভাবে লেখাপড়া করছে তাতে বাবার সে-স্বপ্ন কি কখনো বাস্তবায়িত হবে?
রিপোর্ট-কার্ড সাইন করতে গিয়ে ওর প্রি-টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে মোর্শেদ সাহেব সহসা ভাবনায় পড়লেন। ধমক লাগিয়ে ছেলেকে বললেন, ‘হোয়াটজ দিস, এ-তো দেখছি কোনোমতে পাস করা!’
ব্যাপারটা স্বাধীনের মোটেও ভালো লাগলো না। ও মনে করে এখন সে আর সেই ছোট্টটি নেই যে বাবা ওকে এভাবে ধমকধামক দেবেন। স্বাধীন তাই বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে মুখটা ফুলিয়ে রাখলো।
মোর্শেদ সাহেব আরো রেগে গেলেন। অনেক কিছু সহ্য করার ক্ষমতা তার আছে, কিন্তু স্বাধীনের অধঃপতন তিনি মোটেও সহ্য করতে পারেন না। নিজেদের একমাত্র সন্তানটিকে মানুষ করতে গিয়ে কতো কিছুই না করেন তিনি আর তার স্ত্রী মিলে, অথচ স্বাধীন যেন সেটা বুঝতেই চায় না।

ওর মাঝে সে-বোধটা জাগাতেই মোর্শেদ সাহেব কড়া ভাষায় বলতে লাগলেন, ‘রেজাল্টের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আর লেখাপড়া করার দরকার কী? যা গ্যারেজে গিয়ে কাজ করগে, নইলে রিকশা চালা। কাজ করলে দুটো টাকা যেমন কামাই করতে শিখবি, তেমনি জীবন সম্বন্ধে ধারণাও জন্মাবে…’
রেবা পাশেই বসা ছিলেন। স্বামীর কাপে চা ঢালছিলেন তিনি। সকালের চায়ের উষ্ণ ধোঁয়া যেনো পরিস্থিতির আভাস দিচ্ছিলো।
রেবা স্বাধীনের দিকে তাকালেন।
দেখলেন তার ছেলেটি মন খারাপ করে বসে আছে।
বড্ডো মায়া লাগলো রেবার। স্বামীকে তাই বললেন ‘থাক, যা হবার তা হয়েছে। তুমি আর এখন মাথা গরম করো না। দেখবে নেক্সট টাইমে ও ঠিকই ভালো করবে।’

ছেলের জন্য রেবার মনে স্নেহের কোনো কমতি ছিলো না। আদরের সময় আদর আর শাসনের সময় শাসন তিনি যতই এ নীতিতে অটল থাকতে চান না কেন, আবেগ তাকে দুর্বল করে দেয়। ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারানোর পর চাচা-চাচীর কাছে থেকে বড়ো হয়েছেন তিনি। ফলে বঞ্চিত হয়েছেন বাবা-মায়ের অনেক আদর আহ্লাদ থেকে। তিনি চান না তার সন্তানটিও সেই শূন্যতা অনুভব করুক। তাই শাসনের ক্ষেত্রগুলোতেও মমতাই প্রদর্শন করেন রেবা।
মোর্শেদ সাহেব স্ত্রীর কথা মানতে পারলেন না। বললেন, ‘কিসের ভালো করবে! সামনে ওর টেস্ট পরীক্ষা, তারপর এসএসসি। প্রিটেস্টে প্রশ্ন সামান্য হার্ড করেছে, তাতেই এ অবস্থা! তাহলে টেস্টে ও কী করবে? নিশ্চয়ই ফেল! আর টেস্টে ফেল করলে ওকে বোর্ড পরীক্ষা দিতে দেবে?’

স্বাধীন এবার আর চুপ করে থাকতে পারলো না। সহ্য-ধৈর্য ওর মাঝে এমনিতেই একটু কম, তা ছাড়া এক রেজাল্ট নিয়ে বাবা যা শুরু করেছেন! স্বাধীন বলেই ফেললো, ‘দেখো বাবা, আমি এখন যথেষ্ট ম্যাচিউর, আমার ভালো-মন্দ আমি বুঝি। ছোটো বাচ্চাদের মত এখন আর আমার পড়াশোনা নিয়ে তোমাদের ভাবা লাগবে না, আমারটা আমিই বুঝবো’ বলে চট করে চেয়ার থেকে উঠে ঝোলাসদৃশ স্কুল ব্যাগটা সাইডে ঝুলিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো?

রেবা কত্ত করে বললেন, এই স্বাধীন …. দাঁড়া.. যাসনে……..নাস্তাটা করে যা…………. কিন্তু মায়ের কোনো কথাই স্বাধীনের কানে গিয়ে পৌঁছলো না। ও যাওয়ার পর মোর্শেদ সাহেব স্ত্রীকে শাসিয়ে বললেন, ‘দেখেছো, কতো বেয়াদব হয়েছে! আরো লাই দাও ছেলেকে’ বলে হাতের রিপোর্ট কার্ডটায় তড়িঘড়ি করে নিজের একটা সই দিয়ে তিনিও উঠে চলে গেলেন।
রেবা একাকী বসে রইলেন ডাইনিং টেবিলে।
স্কুলে এসে স্বাধীন দেখলো অ্যাসেম্বলির জন্য সবাই মাঠে এসে জড়ো হচ্ছে। ক্লাস রুমে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না, তাই ব্যাগ নিয়েই লাইনে দাঁড়ালো ও।

দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির পর আজ স্কুলে এসে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে স্বাধীনের। এই দুইদিন বাসায় থাকতে থাকতে একদম বোর হয়ে গেছে। ছুটির দিনগুলোও আজকাল কেমন যেনো একঘেয়ে মনে হয় ওর কাছে। শুধুমাত্র সকালে একটু বেশি করে ঘুমানোর সুযোগ পাওয়া যায়- এই যা, তা ছাড়া আর সব তো সেই একই স্যারদের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়া, বাবার সামনে পাঠ্যবই নিয়ে পড়ে থাকা আর ফুরসত পেলেই টিভির রিমোট নয়তো কম্পিউটারের মাউস অথবা কি-বোর্ড টেপাটিপি করা এই চক্রাকার জীবন স্বাধীনের আর ভালো লাগে না!

বেড়াতে যাওয়ারও তেমন কোনো জায়গা নেই ওর। মায়ের দিকটায় কেউ নেই বললেই চলে। বাবার দিকটায় যারা আছেন, তারা থাকেন যশোরে, ওর দাদাবাড়ি আর তার আশপাশ এলাকায়। ঢাকায় যে দু-একজন থাকেন তারা দূর সম্পর্কে আত্মীয়, যাওয়া-আসা খুব কম।

এ ছাড়া কোনো বিনোদনকেন্দ্রে গিয়ে যে একটু শান্তিমতো ঘুরে বেড়াবে, সে সুযোগও তো নেই। ছুটির দিনগুলোতে ওসব জায়গায় যে পরিমাণ ভিড় থাকে! আগে তাও বিকেলবেলাটা এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কিংবা ক্রিকেট খেলে কাটিয়ে দেয়া যেতো, কিন্তু আসন্ন টেস্ট পরীক্ষার কারণে বাবা সেটাও বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব কারণেই স্কুলেই এখন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে স্বাধীন।
স্কুলটাও খুব সুন্দর।
বেশ পরিপাটি।

লাল ইটের তিনটি চারতলা ভবন যেনো সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কম্পাউন্ডের পূর্ব, উত্তর আর পশ্চিমাংশ জুড়ে। মাঝের ভবনটার ঠিক সামনে এক পাশে শহীদ মিনার, অপর পাশে ফুলের বাগান। এরপর ঘাসের চাদর বিছানো সবুজ মাঠ, বাস্কেটবল খেলার গ্রাউন্ড রয়েছে মাঠের একাংশে। দক্ষিণে বিশাল গেট।
স্কুলটার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আশফাক সাহেব, প্রধান শিক্ষকও ছিলেন তিনি-ই। স্কুলটাকে ঘিরে তার ছিলো অনেক স্বপ্ন, জীবদ্দশায় যেগুলো অধিকাংশই তিনি পূরণ করে যেতে পারেননি।
আশফাক সাহেবের মৃত্যুর পর শওকত চৌধুরী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্কুলের নিয়ম কানুনে অনেক পরিবর্তন এনেছেন তিনি। তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই এ ‘সেন্ট্রাল বয়েজ স্কুল’ এর ছাত্ররা শুধু লেখাপড়ায় নয়, অপরাপর ক্ষেত্রেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।
অ্যাসেম্বলি করতে করতে স্বাধীন ওদের লাইনটার দিকে তাকালো।

ষাট-পঁয়ষট্টি জন ছাত্রের দীর্ঘ সারি। স্মার্ট যে ছেলেটি সবার সামনে দাঁড়িয়ে, সে ওদের ক্লাসের ক্যাপ্টেন, নাম তন্ময়। এরপর কায়েস, ক্লাসের ফার্স্ট বয়। ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো হলেও স্বভাবে ভীষণ চঞ্চল। তারপর দাঁড়িয়ে মামুন, সাকিব, শাহরিয়ার আর মেহেদী। মামুন, সাকিব, শাহরিয়ার এরা সবাই ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র, মেহেদী ওদের মতো না হলেও ভাবভঙ্গি সবসময় ভালো ছাত্রদের মতোই থাকে। সকাল-সকাল ক্লাসে এসে ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড বেঞ্চে জায়গা নেয়, স্যার-ম্যাডামদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, ক্লাস টেস্টে হায়েস্ট মার্কস তোলে আর টার্ম পরীক্ষায় ভালো করতে তুমুল চেষ্টা করে। এবারের প্রি-টেস্টে ওর চেষ্টা অনেকখানি কাজে দিয়েছে। অল্পের জন্য ৪.৬৯ পায়নি মেহেদী, নইলে সাকিবের পরিবর্তে ও থার্ড হতো।
স্বাধীন অবশ্য খুশি-ই হয়েছে মেহেদী থার্ড হতে পারেনি। ফোর্থ হয়েই ছেলেটার দেমাগ যা বেড়েছে, থার্ড হলে না জানি কী করতো?
স্বাধীন ভাবে, কেন যে একটা সময় ও মেহেদীর সাথে মিশতো!

মেহেদীর পেছনে দাঁড়িয়ে রুদ্্র, চলাফেরায় যে বেশ উগ্র। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য শাহাদাত সাহেবের পুত্র এই রুদ্র। বাবার ক্ষমতার জোরে আর বয়সের উন্মাদনার প্রভাবে কোনো কিছুরই ধার ধারে না। ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না একেবারেই। পাশের লাইনে দাঁড়ানো কমার্সের পার্থর সঙ্গে সেই কখন থেকে ফালতু সব বিষয় নিয়ে বকবক করে যাচ্ছে। থামবার নাম নেই! পেছন থেকে আনিস ওকে থামতে বলেও উল্টো কথা শুনলো। রুদ্র আনিসকে বললো, ‘তোর গা জ্বলে কেন? তোর মুখ দিয়ে কথা বলছি?’
রুদ্র এমনই।
নিজের যা ইচ্ছা তা-ই করে। কারো কথাই শোনে না।

ওর এই স্বভাবটা স্বাধীনের খুব পছন্দ। আর তাই আজকাল রুদ্রর সাথেই থাকে ও। স্বাধীন মনে করে এভাবে চললে জীবনটাকে যেনো পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা যায়, পাওয়া যায় অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ। কিন্তু অবাধ স্বাধীনতা যে কখনো-কখনো সীমাহীন ভুলের জন্ম দেয়, তা ওকে কে বোঝাবে!
অ্যাসেম্বলির পর যথারীতি ক্লাস শুরু হলো।

ক্লাস টেনের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম পিরিয়ডটা সবসময় ‘গণিত’ দিয়ে শুরু হয়। ক্লাস নেন কবীর স্যার। প্রতিদিনের মতো আজও নাম ডাকার খাতা হাতে যথাসময়ে ক্লাস রুমে প্রবেশ করলেন তিনি।
ছাত্ররা দাঁড়িয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালো।
দাঁড়ালো না শুধু একজন।
আর সে বেয়াদবটা হচ্ছে রুদ্র। ও বসে-বসে নিজের চুলগুলো জেল দিয়ে ঠিক করছিলো।

স্বভাবতই কবির স্যার ওর আচরণে অসন্তুষ্ট হলেন, তবে সেটা তিনি মারধর করে প্রকাশ করলেন না। কারণ ছাত্র পেটানোটা তার অভ্যাসের মধ্যে নেই। তা ছাড়া পিটিয়ে কাউকে যে কোনো কিছু শেখানো যায় না, সে কথা তিনি খুব ভালো করে জানেন।
স্যার তাই নিজের বিরক্তিটা প্রকাশ করলেন এভাবে- ‘রুদ্র কী হবে চুলকে জেলি বানিয়ে? হাতে বালা আর গলায় মালা ঝুলিয়ে লাভ কীÑ বাকি সবই যদি ঠিক না থাকলো!’
সারা ক্লাস তখনো দাঁড়িয়ে। রুদ্রের দিকে তাকিয়ে কেউ মুচকি-মুচকি হাসছে, কেউবা বিরক্ত হচ্ছে।
স্বাধীন রুদ্রের পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। স্যারের কথা শুনে ওর হাসি পাচ্ছিলো।

নাম-ডাকার খাতা টেবিলে রেখে কবীর স্যার হাতের ইশারায় সবাইকে বসার অনুমতি দিলেন। নিজেও বসলেন। তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, ‘গতকাল হেডস্যার মিটিং ডেকেছিলেন। সেখানে গিয়ে শুনলাম এবারে প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় নাকি অল সাবজেক্টে পাস করেছে মাত্র ফর্টি পার্সেন্ট স্টুডেন্ট; বাকিরা কেউ এক সাবজেক্টে, কেউ দুই সাবজেক্টে, কেউবা চার-পাঁচ সাবেজেক্টে ফেল!’ বলে রুদ্রের দিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে পুনরায় সবার উদ্দেশে বলতে লাগলেন, ‘সামনে তোমাদের টেস্ট পরীক্ষা। এবার বোর্ড থেকে নির্দেশ এসেছে যারা এই পরীক্ষায় এক সাবজেক্টেও ফেল করবে তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করতে দেয়া হবে না। সুতরাং, সবকিছু বাদ দিয়ে এ-ক’টা দিন ঠিকমতো পড়াশোনা করো।’ বলে নাম-ডাকার খাতাটা খুলে রোল কল করা শুরু করলেন তিনি।

এ-স্কুলে একটি মাত্র ক্যান্টিন। বেশ বড় না হলেও একদম ছোটো নয়। পার্টিশন দিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে ভেতরটা একপাশ বেচা-কেনার জন্য, অপর পাশ টিচারদের চা-টা খাওয়ার জন্য। টিচাররা না থাকলে ক্যান্টিনের মামারা সেখানে বসেন; কখনো গল্প করেন, কখনো পেপার পড়েন।
তবে সেটা অবসর সময়ে।
এখন অবসর নয়।

একটু আগে টিফিনের ঘণ্টা দিয়েছে। ক্যান্টিনের সামনে এখন ছাত্রদের মারাত্মক ভিড়। কেউ ‘মামা একটা বার্গার, কেউবা ‘মামা একটা স্যান্ডউইচ’ বলে মামাদেরকে বার্গার-স্যান্ডউইচ বানিয়ে ফেলছে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সমাজব্যবস্থায় আহার জোগাড় করতে গিয়ে ভবিষ্যতে ওদের যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে তার চর্চাটাও বুঝি এখান থেকেই সেরে নিচ্ছে!
সেই ভিড়ের ভেতর ঢুকেই স্বাধীন একটা বার্গার কিনলো। মাঠ দিয়ে যেতে যেতে ও সেটা খেতে লাগলো।

রাতুল আশপাশেই কোথাও ছিলো। ওকে দেখে সহসা কাছে এসে বলতে লাগলো ‘কিরে দোস্ত, একা-একাই খাবি?’ রাতুল স্বাধীনের অনেক পুরনো বন্ধু। ক্লাস এইট পর্যন্ত ওরা প্রতিবছর না হোক, প্রায় বছরই একই সেকশনে থাকতো। নাইনে ওঠার পর স্বাধীন সায়েন্স আর রাতুল কমার্স নেয়ায় এখন একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে- এই যা। তবে ক্লাস বসার আগে, টিফিন পিরিয়ডে কিংবা স্কুল ছুটির পর মাঝে মধ্যে দেখা হয় ওদের। ঠিক আজ যেমনটা হয়ে গেলো।
রাতুলকে দেখে স্বাধীন মৃদু হাসলো, বার্গার থেকে কিছুটা অংশ ছিঁড়ে ওকে দিলো।
রাতুল সেটা খেতে-খেতে বললো, ‘তোদের ক্লাসে র‌্যাগডের প্রিপারেশন কেমন চলছে?’
‘র‌্যাগ ডে!’ স্বাধীন রাতুলের দিকে হা-করে তাকিয়ে রইলো।

‘কেন, তোরা এখনো প্ল্যান-প্রোগ্রাম শুরু করিসনি? আমাদেরতো শুরু হয়ে গেছে বিদ্যুত, দোদুল, রাইয়ান মিলে দায়িত্ব নিয়েছে। শুনছি খুব মজা হবে। আফটার অল, স্কুল লাইফের লাস্ট ক্লাস! সেটা কি আর দশটা দিনের মতো? হেডস্যারের অনুমতি নেয়ার জন্য অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে চাঁদাটা ওরা একটু বেশিই নিচ্ছে- পাঁচশ টাকা! কে জানে, মা দিতে পারবে কি না?’ শেষের কথাটা বলে রাতুল কেমন যেনো বিষণ হয়ে গেলো।
হাঁটতে হাঁটতে পশ্চিম দিকের স্কুল ভবনটার পেছনের একটা নিরিবিলি স্থানে এসে পড়লো ওরা। অদূরেই রুদ্র আর পার্থ দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছিলো।

ওদের পেয়ে স্বাধীন আর রাতুলের সাথে থাকতে চাইলো না। ‘তুই এখন যা, পরে কথা হবে তোর সাথে’ বলে দ্রুত পায়ে হেঁটে রুদ্র আর পার্থর কাছে চলে গেলো।
স্বাধীনকে আসতে দেখে পার্থ বলে উঠলো, ‘আররে বস, এতো দেরি করলে কেন’ স্বাধীনও ওদের সাথে মিশে গেল।
রাতুল বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে সব দেখলো। ওর মনে হলো, যে স্বাধীনকে ও চিনতো এ যেন সে নয়, বরং অন্য কেউ। ওর মাঝে কত পরিবর্তন!
রাতুল দ্রুত ফিরে এলো সেখান থেকে।

টিফিন পিরিয়ড শেষে পুনরায় ক্লাস শুরু হলো। স্বাধীন ক্লাস করলো না। রুদ্র আর পার্থর সাথেই আড্ডা চালিয়ে গেলো।
পড়ার টেবিলে বসে রাতুল শুধু হাই তুলছিলো। ও খেয়াল করে দেখেছে, পরীক্ষা সামনে এলেই এমনটা হয়। অথচ যেই পরীক্ষা শেষ, অমনি ঘুমও ছুঁ-মন্তর-ছুঁ! তখন শত চেষ্টা করেও চোখের পাতা এক করা যাবে না।
নাহ, রাতুল আর পারছিলো না। ও বই-খাতা গুটিয়ে মায়ের রুমে গেলো। মায়ের সাথে রাতের খাবারটা খেয়েই কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বে।

শাহনাজ তখন বিছানায় বসে খাতা দেখছিলেন। ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখতে দেখতে তার একেবারে বিরক্তি ধরে যাচ্ছিলো। ছেলেমেয়েরা আজকাল বাংলাকে কোনো বিষয়-ই মনে করে না। পরীক্ষার খাতায় কী যে লেখে! যেমন কাটাকুটি, তেমনি হিজিবিজি দেখলে মনে হয় পরীক্ষার খাতা নয়, বাসার রাফ খাতা! কেউ-কেউ আবার আবোল-তাবোল লিখে পাতার-পর-পাতা ভরে রাখে।
রাতুল এসে বললো, ‘মা ভাত খাবে না?’
শাহনাজ বললেন, ‘তোর ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নে, আমি পরে খাবো।’

রাতুল চলে যাচ্ছিলো, শাহনাজ হঠাৎ কী ভেবে যেন ওকে থামালেন। রাতুল মুখ ফেরানোর পর বললেন, ‘ভাত খাবি কী দিয়ে? বুয়া তো দেখলাম শুধু করলা ভাজি আর ডাল রান্না করে রেখে গেছে। তুই একটু বোস, আমি একটা ডিম ভেজে দিচ্ছি- বলে খাতাগুলো একত্রিত করে টেবিলের ওপর রেখে তিনি উঠতে যাচ্ছিলেন। রাতুল কাছে এসে বাধা দিয়ে বললো, ‘থাক মা, তোমার আর কষ্ট করার দরকার নেই। আমি ঐ দিয়ে খেয়ে নিতে পারবো।’
‘হয়েছে, আর পাকামো করা লাগবে না!’ ছেলেকে চুপচাপ বসিয়ে শাহনাজ রান্নঘরের দিকে যেতে-যেতে বললেন, ‘পাঁচ মিনিট বোস।’

রাতুল মায়ের যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। কতো সহজেই মা সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলতে পারেন!
রাতুল ভালো করেই জানে প্রতিদিন মায়ের ওপর দিয়ে কতো ধকল যায়, তবুও এক মুহূর্তের জন্যও মনে হবে না যে, তিনি ক্লান্ত কিংবা জীবন সংগ্রামে পরাজিত। আসলে এটা আর কিছুই নয়, মনের জোর। এই একটা জিনিসই তো আছে, যেটা মানুষকে চলার প্রেরণা দেয়। নইলে বাবা মারা যাওয়ার পর সবকিছুই তো শেষ হবার উপক্রম হয়েছিলো। মা ধীরে ধীরে সবকিছু আবার গুছিয়ে এনেছেন।
পেছনের কথা মনে পড়তেই রাতুল আবার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলো। গুটানো বই-খাতাগুলো খুলে রিভিশন দেয়া শুরু করলো। ওকে আরো সিরিয়াস হতে হবে।

ঘড়িতে তখন রাত ১১টা। খাবার টেবিলে স্বাধীনকে অনুপস্থিত দেখে মোর্শেদ সাহেব স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, স্বাধীন খাবে না?’

রেবা মলিন কণ্ঠে বললেন, ‘সকালের ঘটনায় ও এখনো রাগ করে আছে। দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পর রুমে ঢুকে সেই যে দরজা বন্ধ করেছে, আর খোলেনি। কতবার কতভাবে বললাম, তা-ও খুললো না’ বলতে বলতে রেবার চোখ দুটো ভারী হয়ে উঠলো।
স্ত্রীর কথা শুনে মোর্শেদ সাহেব দ্রুত স্বাধীনকে ডাকতে গেলেন। ওর দরজায় নক করতে করতে নরম গলায় বললেন, ‘স্বাধীন, দরজাটা খোল বাবা! এত রাগ ভালো নয়। দরজাটা খোল।’

স্বাধীনের কোনো সাড়াশব্দ নেই।
মোর্শেদ সাহেব আবার বলতে লাগলেন, ‘দরজাটা খোল বাবা। এভাবে না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে। বের হ, ক’টা খেয়ে নে স্বাধীন।’

এবারো কোন সাড়াশব্দ নেই।
মোর্শেদ সাহেব এবার চিন্তায় পড়লেন। আবার ওর দরজায় নক করতে যাবেন এমন সময় হঠাৎ করে দরজাটা খুলে গেলো। বাইরে বেরিয়ে এলো স্বাধীন। কোনো দিকে তা তাকিয়েই সোজা ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে বসলো।
বিকেল থেকেই পেটের ভেতর ক্ষুধার হাহাকার শুরু হয়েছে, তবুও অভিমানের কারণে এতক্ষণ সহ্য করেছিলো।

স্বাধীন খেতে আসায় রেবা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ওর প্লেটে চামচ ভরে ভরে ভাত তরকারি দিতে শুরু করলেন। মোর্শেদ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ভাতের লোকমা মুখে দিতে দিতে তিনি ভাবতে লাগলেন, তার ছোট্ট স্বাধীন কিভাবে যেন দিন দিন বড় হয়ে যাচ্ছে। বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনগুলোও ওর মাঝে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করছেন তিনি।

মোর্শেদ সাহেব ভালো করেই জানেন, এই বয়সের ছেলেমেয়েদের বিচারবুদ্ধি থাকে একটু কম, আবেগটা থাকে প্রবল। ফলে বেশি আদর পেলে যেমন বিগড়ে যাওয়ার ভয় থাকে, তেমনি কড়া শাসন করলে কিছু একটা করে ফেলতে পারে এই দুশ্চিন্তাও থাকে। তাই এদের কোনোকিছু শেখাতে ও বুঝাতে হয় সাবলীল ভাষায়, অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে, উৎসাহ এবং আত্মবিশ্বাস দিয়ে।

মোর্শেদ সাহেব সেই পন্থাই অবলম্বন করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর রেবার সাথে স্বাধীনকে নিয়ে বসলেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে বোঝাতে লাগলেন, ‘দেখ বাবা, তুই আমাদের একমাত্র সন্তান। তোকে ঘিরে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশাগুলো নষ্ট করিস না। আর কয়েক মাস পরই তো এসএসসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যদি ভালো রেজাল্ট করতে না পারিস তাহলে ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবি না। জীবনে পিছিয়ে পড়বি। হতাশা তাড়া করবে তোকে। বাবা-মা হয়ে তোর এ-অবস্থা আমরা দেখতে পারবো না। তা ছাড়া এমন তো নয় যে তুই পারবি না। একটু চেষ্টা করেই দেখ না! এখনো তো সময় আছে। সিরিয়াস হ, পড়াশোনায় মনোযোগ দে। যা বললাম, বুঝতে পেরেছিস?’

স্বাধীন মাথা নাড়লো।
কিন্তু বাবার কথাগুলো ও সত্যিই বুঝতে পারলো কি না, তা তো সময়ই বলে দেবে।….

দুই.

নীরব নিস্তব্ধ রাত।
ঘন জঙ্গল।
একাকী হেঁটে যাচ্ছে স্বাধীন।
ওর সারা শরীর ঘামে ভেজা, চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা।
কিভাবে ও এলো এখানে?
এখন কিছুই মনে করতে পারছে না।
যেভাবেই হোক এখান থেকে দ্রুত সরে পড়া উচিত।
স্বাধীন জোরে পা চালানো শুরু করলো।
ও হাঁটছে তো হাঁটছে।
সহসা কিসের সাথে যেন হোঁচট খেয়ে ও পড়ে গেলো গভীর এক খাদে।
প্রথমে ভেবেছিলো কাদামাটি, পরে বুঝলো চোরাবালি।
দ্রুত হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করলো। সাহায্য চেয়ে চিৎকার করতে লাগলো।
কিন্তু কেউ এলো না ওকে সাহায্য করতে, ও হারিয়ে যাচ্ছে চোরাবালির অতল গহ্বরে!
আমচকা ঘুমটা ভেঙে গেলো। আশপাশে তাকিয়ে দেখলো না, কিছুই হয়নি ওর। ওটা ছিলো নিছক একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু এই দুঃস্বপ্নটাই কেমন যেনো বিষণ করে দিলো স্বাধীনকে।
বায়োলজি ল্যাবের এক কোনায় চুপচাপ বসেছিলো স্বাধীন।
হঠাৎ অভি এসে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ‘কিরে কী হইছে তোর? গায়ে ঠাটা পড়ছে নাকি?’
স্বাধীন খেয়াল করে দেখেছে, এই অভি ছেলেটা সবসময় ওর পিছে লেগে থাকে। স্বাধীন একদম সহ্য করতে পারে না এটা। কেউ তার ওপর নজর রাখছে এ ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ করে না সে।
অভির প্রশ্নের জবাবে স্বাধীন কিছুই বললো না। শুধু চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।
ওদিকে শুচি ম্যাডাম এতক্ষণ ব্যবচ্ছেদ ট্রেতে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা ব্যাঙটা সেট করছিলেন। আলপিন দিয়ে সেটার সামনের ও পেছনের পায়ের তালু ট্রের মোমের সাথে আটকে দিয়ে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘এ্যাই দেখো, সবাই এদিকে তাকাও… আমি এখন ব্যাঙ কেটে দেখাবো, তোমরা সবাই খেয়াল করো’- বলে কাঁচি আর চিমটার সাহায্যে ব্যাঙটার তলদেশের মাঝ বরাবর কেটে উন্মুক্ত করলেন তিনি।
ব্যাঙের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো এভাবে এতটা কাছ থেকে দেখতে পেয়ে কিছু ছাত্র এর মাঝেই ‘এ্যাঁক’, ‘উয়্যাক’ শব্দ করা শুরু করলো।
ওদের অবস্থা দেখে শুচি ম্যাডাম বললেন, ‘ব্যাঙ দেখেই এই অবস্থা? এইচএসসি লেভেলে গিয়ে যখন তেলাপোকা কাটতে হবে, তখন তো মনে হয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।’
ক্লাসের চটপটে ছেলে অনন্ত সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘ম্যাডাম, এইচএসসি লেভেলে গিয়ে বায়োলজি নিলে তো, এখন নিয়েই যেই ধরা খাইছি!’
‘ধরা তো খাবাই। ভালো করে পড়ো বায়োলজি বইটা? পুরো সময় তো ম্যাথ, ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির পেছনে লেগে থাকো!’
ম্যাডাম ওদের ভুলটা ধরিয়ে দিলেন।

প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের পর টিফিন পিরিয়ড ছিলো।
রুদ্র স্বাধীনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিরে, যাবি নাকি?’
‘কই?’
‘আজকে পার্থর বার্থ ডে। ও বলছে আমাদের সাথে সেলিব্রেট করবে। আমরা এখনি বের হবো। বাইরে গিয়ে ঘুরবো, খাবো। তুই গেলে চল, নইলে এইখানে বয়ে-বয়ে ডিম পাড়।’
স্বাধীনের মন খারাপ ছিলো। ও ভেবে দেখলো, ঘোরাঘুরি করলে ভালো লাগতে পারে। তাই রাজি হয়ে গেলো।
দু’জনে ক্লাস রুম থেকে ব্যাগ আনতে যাবে এমন সময় অভি এসে ঘিরে ধরলো ওদের। বললো ‘তোরাই কেবল যেতে পারবি না, আমাকেও নিতে হবে।’
‘ক্যান, ঠ্যাকা পড়ছে?’ রুদ্র ওকে বোল্ড করলো। স্বাধীন রাগে দাঁত কিটমিট করছে।
‘হ্যাঁ, ঠ্যাকা পড়ছে।’
রুদ্র ওকে বোল্ড করলো। স্বাধীন রাগে দাঁত কিটমিট করছে।
‘হ্যাঁ, ঠ্যাকা পড়ছে। ’
অভিও নাছোড়বান্দা, ‘তোরা যদি আমাকে না নেস তাহলে আমি কবীর স্যারকে সব বলে দেবো।’
‘বলগে-’ রুদ্র আর কথা বাড়ালো না, স্বাধীনকে নিয়ে চলে এলো।
অন্য সময় হলে ও অভিকে কয়েকটা কিল-ঘুষি মেরে একেবারে সাইজ করে দিতো। এখন স্কুল পলানোর তালে আছে বলে কিছু করলো না।
টিফিন পিরিয়ডে তিনজন রোজ যে জায়গায় আড্ডা দিতে আসে, সেই জায়গার ওয়াল টপকে ওরা প্রথমে বাইরে বের হলো। তারপর একটা রিক্সা নিয়ে চলে গেলো ছেলেদের ফ্যাশন হাউস ‘অল ইন ওয়ান’-এ।

পার্থ প্রতিবছর নিজের বার্থ ডে-তে আর কিছু করুক-না করুক, একগাদা শপিং করবেই। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই ও অনেক কিছু কিনলো। প্রথমে নিলো জোড়াতালি দেয়া আঁটসাঁট জিন্স-প্যান্ট, তারপর ঢুলুঢুলু টি-শার্ট, এরপর ‘ডেঞ্জার’ ছাপার রিস্ট ব্যান্ড, গলার জন্য শিকল, ডাইনোসারের পায়ের সাইজের স্যান্ডেল ইত্যাদি ইত্যাদি।
ওর কেনাকাটার ধুম দেখে স্বাধীন রুদ্রকে বললো, ‘কিরে, আমাদের পার্থ কি লটারি জিতেছ নাকি? যেভাবে সব কিনছে, বিল তো পাঁচ-ছয় হাজারের নিচে আসবে না!’
কিন্তু রুদ্র কিছুই শুনতে পেলো না। শুনবে কিভাবে? দু’কানেই ইয়ার ফোন লাগানো ছিলো যে! ইদানীং চলতে-ফিরতে, উঠতে বসতে- সব জায়গাতেই কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে ও গান শোনে। ভাবটা এমন- পারলে টয়লেটে গিয়েও গান শোনে। শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা যেমন হেয়ারিং এইড ছাড়া চলতে পারে না, রুদ্রও তেমনি কানে ইয়ার ফোন না লাগিয়ে থাকতে পারে না।
স্বাধীন টান দিয়ে ওর এক কানের ইয়ার ফোন খুলে দিয়ে কথাগুলো আবার বললো।
বিষয়টা একেবারেই স্বাভাবিক এমন ভঙ্গি করে রুদ্র বললো, ‘বাদ দে তো, ওর বাপের অনেক টাকা আছে। এসব ওর কাছে মামুলি ব্যাপার।’
‘অল ইন ওয়ান’ থেকে তিনজনে গেলো ‘চায়না টাউন’ রেস্টুরেন্টে। বার্থ ডে-টা যেহেতু পার্থর তাই রুদ্র আর স্বাবধীন মিলে ওকে কিছু খাওয়াতে চাইলো। কিন্তু পার্থ কিছুতেই ওদের তা করতে দিলো না।
‘চায়না টাউন’ থেকে লাঞ্চ সেরে রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে ওরা প্লান করতে লাগলো- এরপর কোথায় যাওয়া যায়। রুদ্র একটা বললো, পার্থ একটা বললো। স্বাধীন আবার বললো আরেকটা…
ঘোরাঘুরি শেষে সন্ধ্যার ঠিক একটু আগে স্বাধীন যখন বাসায় ফিরলো, রেবা তখন বেশ উদ্বিগ্ন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে বাবা, কই ছিলি এতক্ষণ?’
স্বাধীন আমতা-আমতা করে একটা বানোয়াট জবাব দিয়ে দ্রুত কেটে পড়লো।
মোর্শেদ সাহেব এই সময়টায় বাসায় থাকেন না বলেই বেঁচে গেলো। নইলে কিছুতেই এতো সহজে ছাড় পেতো না স্বাধীন।
ঘটনাটা ঘটলো পরদিন।
কবীর স্যার ক্লাসে ঢুকে রুদ্র আর স্বাধীনকে দাঁড় করালেন। জানতে চাইলেন, কমার্সের পার্থর সাথে গতকাল স্কুল পালিয়ে তারা কোথায় গিয়েছিল।
রুদ্র স্বীকার করার পাত্র নয় এবং ও সেটা করলোও না। স্বাধীন একবার ঘাবড়ে গিয়ে বলে দিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু রুদ্রের খোঁচা খেয়ে ও সত্যটা চেপে গেলো।
কবীর স্যার মিথ্যা বলা একদম পছন্দ করেন না। তিনি ভীষণ রেগে গেলেন। রুদ্র আর স্বাধীনকে ক্লাসরুম থেকে বের করে দিলেন।
শুধু যে গতকালের ঘটনায় তিনি ওদের ওপর এতটা চটেছেন তা নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই ওদের নামে স্যার-ম্যাডামদের সম্পর্কে আজে-বাজে মন্তব্য করা, ক্লাস ফাঁকি দেয়া, চিপাচাপাতে গিয়ে আড্ডা দেয়ার মতো বড়ো ধরনের অভিযোগও পাচ্ছিলেন তিনি। মাঝে দু-একবার ওয়ার্নিংও দিয়েছেন। কাজ হয়নি। তাই আজ এমনটা করতে বাধ্য হলেন।
ওদিকে এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে স্বাধীনের খুব অপমানে লাগছিলো। ওর মনে হচ্ছিলো, সারা স্কুল যেন ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
এ-সব কিছুর মূলে অভি। দুষ্টুটা এখন মুচকি-মুচকি হাসছে!
দাঁড়া, আজ তোর একদিন কী আমার একদিনÑ স্বাধীন মনে মনে বললো।

টিফিন পিরিয়ডে স্কুলমাঠে অভির পথ আটকালো স্বাধীন। সঙ্গে রুদ্রও ছিলো।
তর্জনি উঁচিয়ে স্বাধীন ওকে বললো, ‘তোর সাহস তো কম নয়!’
অভি দৃঢ়কণ্ঠে বললো, ‘আমিতো আগে বলছিলামÑ আমারে না নিলে তোদের কথা আমি বলে দেবো।’
রুদ্র ওর শার্টের কলার চেপে ধরলো, ‘ওই, তুই আমাদের থ্রেট দিস?’
অভি নিজেকে ছাড়াতে-ছাড়াতে বললো, ‘আমার আর থ্রেট দেয়ার দরকার কী থ্রেটে তো তোরা এমনিতেই আছিস, নিজেদের চিন্তা কর।’
স্বাধীন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সহসা ওর পেটে খুব জোরে একটা ঘুষি মেরে বসলো।
সঙ্গে সঙ্গে ‘বাবা-গো’ বলে পেট ধরে মাটির ওপর বসে পড়লো অভি।
মুহূর্তেই একটা জটলা পাকিয়ে গেলো ওদের ঘিরে।
হৈচৈ শুনে শওকত সাহেব তার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। হেডস্যারকে আসতে দেখে রুদ্র আগেই কেটে পড়লো। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি পেলেন স্বাধীনকে।
ব্যাপারটা শওকত সাহেব কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারলেন না। যেখানে নিয়ম শৃঙ্খলার জন্য তার স্কুলের বিশেষ সুনাম রয়েছে, সেখানে এমন ঘটনা!
শওকত সাহেব স্বাধীনকে ঘাড় ধরে তার রুমে নিয়ে গেলেন। ফোন করে ওর গার্ডিয়ান ডাকলেন।
মোর্শেদ সাহেব হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলেন। স্বাধীনকে পেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে কী হয়েছে?’
ও কিছু বলার আগেই শওকত সাহেব শুরু করলেন, ‘এটা আপনার ছেলে?’
‘জি হ্যাঁ, কিন্তু কী হয়েছে?’
‘কী হয়নি সেটাই বলুন? এমন ভায়োলেন্ট ছেলেদের আপনারা স্কুলে পাঠান কেন যারা স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে, মামামারি করে ক্লাসমেটকে আহত করে? এদের কী শিক্ষা দেন বাসায়? আপনাদের মতো অভিভাবকদের কারণেই আমাদের সমাজের আজ এ করুণ দশা!’ শওকত সাহেবের কণ্ঠে ক্ষোভের আগুন ঝরতে লাগলো।
হেডস্যারের কথা শুনে মোর্শেদ সাহেব লজ্জায়, রাগে, অপমানে একেবারে যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলেন। ছেলেটা তাকে আর অবশিষ্ট রাখলো না!
রেবা খুব চিন্তিত ছিলেন। অনেকক্ষণ আগে মোর্শেদ সাহেব তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তাকে স্বাধীনের স্কুল থেকে ডাকা হয়েছে, কিন্তু কেন তখন বিস্তারিত কিছুই বলতে পারেননি তিনি। এরপর স্বামীর সেল ফোনে অনেকবার কল করেছেন রেবা, মোর্শেদ সাহেব কল রিসিভ করেননি। কী ব্যাপার, কী হলোÑ ভেবে ভেবে রেবার চিন্তা আরো বেড়ে গেছে অনেক গুণে।
কলিংবেলটা বাজতেই বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে দরজাটা খুললেন তিনি। মোর্শেদ সাহেবের সাথে স্বাধীন ঘরে ঢুকলো।
স্বাধীনকে ঠিকঠাক দেখে রেবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কিন্তু চিন্তামুক্ত হতে পারলেন না। স্বামীর কাছে জানতে চাইলেন কী হয়েছে।
রেবার প্রশ্ন শুনে মোর্শেদ সাহেব রেগে গেলেন। সমস্ত রাগ ঢাললেন স্ত্রীর ওপর, ‘জানতে চাও কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করো তোমার ছেলেকে, কী করেছে ও। খালিতো লাই দাও।’
রেবা এমনিতেই চিন্তিত ছিলেন, তার ওপর স্বামী আসল ব্যাপারটা না বলে আগেই তাকে দোষারোপ করছে। রেবাও রেগে গেলেন, ‘ছেলে কি আমার একার? তোমার না?’
‘না ও আমার সন্তান না। যদি আমার সন্তান হতো তাহলে সোসাইটিতে আমার সম্মানটুকু নষ্ট হতে দিতো না, স্কুলে গিয়ে গুণ্ডামি করতো না!’
‘কী? গুণ্ডামি!’ রেবা কপাল কুঁচকালেন।
‘হ্যাঁ, গুণ্ডামি। মারামারি করে এক ক্লাসমেটকে হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ওর ক্লাসটিচার আমাকে বললেন, আজকাল নাকি ও স্কুল পালায়, স্যার-ম্যাডামদের নিয়ে অশোভন মন্তব্য করে, আড্ডা দেয়, আরো কতো কী! হেডস্যার বলেছেন, এমন ছেলেকে তার স্কুলে আর রাখবেন না। ওকে টিসি দেয়ার ব্যবস্থা করছেন তিনি। তা ছাড়া ওই ছেলের যদি কিছু হয়, তাহলে আরো বড়ো ধরনের ঝামেলা হবে। আমি কিচ্ছু জানি না। ও যেমন অন্যায় করেছে, তেমনি শাস্তি পাবে। আমি আর ওর ব্যাপারে নেই। ভেবেছিলাম শুধু লেখাপড়াতেই অমনোযোগী, এখন তো দেখছি … উফ!’ মোর্শেদ সাহেব বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন, নিজ রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে মনের ভেতরের রাগটা প্রকাশ করলেন।
রেবা যেন বিশ্বাসই করতে পারলেন না। যে স্বাধীনকে তিনি এতো ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করেছেন, সেই স্বাধীন এমন করতে পারলো?
‘কিরে, তোর বাবা যা বলে গেলো ঠিক?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
স্বাধীন মাথা নামিয়ে রাখলো।
ওর নীরবতা রেবার সামনে সবকিছু স্পষ্ট করে দিলো। ফলে যেটা তিনি কখনোই করেন না, আজ সেটাই করলেন। ঠাস করে স্বাধীনের গালে একটা চড় বসিয়ে দিলেন।
এই প্রথম স্বাধীন উপলব্ধি করলো কতো বড়ো একটা ভুল সে করে ফেলেছে।
সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলো স্বাধীন। নিজেকে আজ বড় নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে ওর। মনে হচ্ছে এক সমস্যাসঙ্কুল গহ্বরের ভেতর আটকে গেছে, যেখান থেকে ওকে উদ্ধার করবার কেউ নেই। ঠিক সেই দুঃস্বপ্নের মতোই।
কিন্তু এসবের জন্য ও নিজেই কি দায়ী নয়? নিজের সবটুকু জ্ঞান বর্জন করে ও এতদিন যা করেছে, যেখানে চলেছে; তার সবটাই কি ভুল ছিলো না?
কিসের জন্য ও এসব করেছিলো, নিজের একঘেয়ে জীবনটাতে বৈচিত্র্য আনতেই তো? আর সমবয়সীদের মাঝে ‘হিরো’ হওয়ার অদম্য বাসনা থেকে। কিন্তু এর জন্য এমন ভুল পথ অবলম্বন করার কী দরকার ছিলো?
হেড স্যার যেভাবে ক্ষেপেছেন তাতে তিনি নিশ্চয়ই ওকে টিসি দিয়ে দেবেন। তারপর কোন স্কুলে ভর্তি হবে? এ অবস্থায় কোনো স্কুল তো ওকে ভর্তিও নেবে না। লাইফটা শেষ হয়ে যাবে একদম!
ইস! কেন করলো এমনটা?
কেন?
অতীতের অজ্ঞানতা, বর্তমানের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাÑ এই তিনে মিলে স্বাধীনের মাঝে গভীর হতাশার সৃষ্টি করলো। রাতে ঘুমোতে পারলো না। বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ-ওপাশ করলো।
বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে বড় কষ্ট হচ্ছে ওর। এখন শুধু চাই মুক্তি, সবকিছু থেকে অব্যাহতিÑ স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বাধীনের রুমের দরজা খোলা দেখে রেবা চমকে গেলেন।
ওর রুমে ঢুকতেই তার বুকটা ধুক করে উঠলো।
কোত্থাও নেই তার স্বাধীন। বিছানায়, বাথরুমে, ব্যালকনিতে- না কোত্থাও নেই।
বহু খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তার চোখ গিয়ে পড়লো স্বাধীনের পড়ার টেবিলে, পেপারওয়েট দিয়ে আটকে রাখা কাগজটির ওপর।
তিনি হাতে তুলে নিলেন সেটা।

স্বাধীনের চিঠি।
রেবা দ্রুত পড়তে লাগলেন।

প্রিয় বাবা ও মা,
পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
কখনো ভাবিনি, জীবনে এমন একটা দুঃসময় আসবে যখন নিজের কাছ থেকেই নিজে পালিয়ে বেড়াবো।
পরিস্থিতি এতটাই বিরূপ হয়ে উঠবে, বুঝতেই পারিনি!
আমি আর পারছি না, তাই বাসা ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্লিজ, আমার খোঁজ করো না।
ইতি
তোমাদের স্বাধীন।

চিঠিটা পড়া শেষ হতেই রেবা তাড়াতাড়ি স্বামীকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন।
সব শুনে মোর্শেদ সাহেবও অস্থির হয়ে পড়লেন। শত হোক নিজের ছেলে। ভুল যা করেছে, করেছে। তাই বলে এভাবে চলে যাবে?
মোর্শেদ সাহেব ছেলের খোঁজে বের হলেন।

ওদিকে বাস টার্মিনালের ভেতর বসে স্বাধীনও খুব একটা শান্তিতে ছিলো না। রূঢ় বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে ও সবকিছু ফেলে চলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু রেখে এসেছে পিছুটান। ক্ষণে-ক্ষণে যা ওকে প্রলুব্ধ করছে ফিরে যেতে। বাবা-মাকে খুব মিস করছে স্বাধীন!

বাসা থেকে বের হয়েছে সেই কোন ভোরে! আকাশ থেকে তখন অন্ধকার আবরণটা কেবল সরেছে মাত্র, পথে ঘাটে মানুষ ছিলো দু-একজন। স্কুল ব্যাগের ভেতর নিজের কিছু কাপড়-চোপড়, প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিসপত্র আর প্যান্টের পকেটে সমস্ত জমানো টাকা নিয়ে ও যখন বের হলো, আর একটি বারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকালো না।
মুক্তির নেশায় এতটাই মত্ত ছিলো যে, গভীরভাবে কিছুই ভেবে দেখেনি তখন। এখন খুব খারাপ লাগছে।
স্বাধীনের কেন যেন মনে হচ্ছে, আশপাশের সবাই ওর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে।
ওর খুব অস্বস্তি ও অশান্তি লাগছে।
বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকের বোতলটা বের করে ও পানির শেষ ঢোকটুকু গিললো।
শূন্য পানির বোতলটা হাতে নিয়ে আবার ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো।
এখন কোথায় যাবে ও? কী করবে? ঘুরেফিরে এই বিষয়গুলোর ভেতরই হাবুডুবু খাচ্ছিলো স্বাধীনের মন।
সহসা একটা টোকাই ছেলে এসে ওর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো। বললো, ‘ভাইজান, দুইটা ট্যাকা দেবেন?’
স্বাধীন প্রথমে পাত্তা দিলো না।

দ্বিতীয়বার ছেলেটা যখন বিনীত স্বরে বললো, ‘ভাইজান, দেন না দুইটা ট্যাকা। কাইল রাইত থেইকা কিচ্ছু খাই না!’ স্বাধীন তখন ওর দিকে তাকালো। শুকনো শরীর, তামাটে চামড়ার রঙ। পরনে মলিন হাফপ্যান্ট। এমন ছেলে ও এর আগেও রাস্তা-ঘাটে অনেক দেখেছে, কিন্তু আজ কেন যেন মায়া লাগলো।

যদিও নিজের জমানো টাকাগুলো এখন ওকে খুব হিসেব করে খরচ করতে হবে, তারপরও পকেট থেকে দশ টাকার একটা নোট বের করে ও ছেলেটাকে দিলো। ছেলেটা সেটা পেয়ে খুশিতে নাচতে নাচতে চলে গেলো।

কী আশ্চর্য, কত অল্পেই সন্তুষ্ট হতে পারে এরা! হতাশা আর গ্লানি ছাড়া আর কী আছে এদের জীবনে? তবুও তো এরা বেঁচে আছে। বাস্তবতার সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে।

ব্যাপারটা স্বাধীনকে গভীরভাবে নাড়া দিলো। ওর মাঝে একটা চেতনা জেগে উঠলো। ও উপলব্ধি করলো, যেভাবে সবকিছু ফেলে চলে এসেছে, তাতে ও মোটেও অতীত থেকে মুক্তি পাবে না। বরং তা প্রতি মুহূর্তে উল্টো ওকে তাড়া করে বেড়াবে। এর চেয়ে সত্যের মুখোমুখি হয়ে তার সাথে সংগ্রাম করাই শ্রেয়।

স্বাধীন উঠে দাঁড়ালো। ওর মেরুদণ্ড এখন টানটান, কপাল প্রশস্ত, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। যে করেই হোক ও এখন ফিরে গিয়ে সামনাসামনি সবকিছুর মোকাবেলা করবে। এতদিন যা ভুল করেছে, এখন তা শুধরাবে। ভালো ছেলে হয়ে সবাইকে দেখিয়ে দেবে, বাবা-মার স্বপ্ন কিভাবে পূরণ করতে হয়।

স্বাধীন ব্যাগটা কাঁধে ঝোলালো। টার্মিনালের ভেতর থেকে বাইরে বের হয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করলো।

নগরীর ভাঙাচোরা ফুটপাথ ওর কাছে জীবনের বন্ধুর পথের মতোই মনে হলো। তবুও এ পথ আজ পাড়ি দেবে ও। কেননা আজ স্বাধীন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাকে মানুষ হতেই হবে, প্রকৃত বড় মানুষ।

SHARE

5 COMMENTS

  1. কৈশোর বড় বিপদজ্জনক জিনিস। খুব ভাল উপলব্ধি করে লিখেছো। খুব ভাল। সবচে’ ভাল লাগল স্বাধীনের ফিরে আসার ইঙ্গিতকে। বখে যাওয়া কিংবা সে পথে ধাবমান ছেলেমেয়েদের জন্য কিছুটা হলেও শিক্ষা হবে এই গল্পটায়।

Leave a Reply