Home গল্প রম্যগল্প তুচ্ছ ঘটনা

তুচ্ছ ঘটনা

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

তুচ্ছ ঘটনা
তুচ্ছ ঘটনা

রমজানের শেষের দিকে বাজার যেমন গরম হয়ে ওঠে; তেমিন মানুষের মাথাও থাকে গরম। তুচ্ছ বিষয় নিয়েও ঘটে যায় সাংঘাতিক হৈচৈ। সংযমের মাসের এ সময়টিতে সংযম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

শহরের মানুষ সব সময়ই ব্যস্ত। রমজানে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার কারণে ব্যস্ততা আরো বেশি। তবু তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র্র করে জটলা পাকিয়ে তামাশা দেখার লোকের অভাব নেই শহরে।

ইঁদুরের পায়ে রশি বেঁধে কেউ রাস্তায় বসে থাকলেও তা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে যাবে কিছু মানুষ। বানরের মাথায় টুপি ও গায়ে জামা পরিয়ে একটু ডুগডুগি বাজালে রাজনৈতিক জনসভার মতো লোক সমাগম হয়ে যাবে অনায়াসে

রমজানে জিনিসপত্রের দামের সাথে বাড়ে রিকশা ভাড়াও। কিন্তু যাত্রীরা এটা অযৌক্তিক মনে করে। ফলে রিকশাওয়ালা ও যাত্রীর মধ্যে বাগি¦তণ্ডা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সংযমী আচরণ ভুলে হাতাহাতি শুরু হয় অনেক সময় রাস্তার মাঝে।

জীর্ণশীর্ণ পোশাক এলোমেলো চুলওয়ালা এক বৃদ্ধ রিকশাওয়ালাকে টেনেহিঁচড়ে প্রাইভেটকারের দিকে টেনে নিতে চেষ্টা করছে এক ভদ্রলোক। পথচারীদের কাছে এটা খুবই তুচ্ছ ঘটনা। শক্তিমানরা পথেঘাটে দুর্বলদের হেস্তনেস্ত করে একটু বীরত্ব দেখাবেই। হয়তো রিকশার ঘষায় গাড়িতে একটু আঁচড় লেগেছে। নীরবে তামাশা দেখা ছাড়া পথচারীদের তেমন কোন কাজ থাকে না এসব তুচ্ছ ঘটনায়। শুধু রমজান মাস নয়, সব সময়ই এ ব্যাপারে ভয়ানক সংযমের পরিচয় দেয় সাধারণ মানুষ। কালে-ভদ্রে দু-একজন একটু অসংযমী হয়। তবে শক্তিমানদের পক্ষ নেয় সবাই।

যতই সৎ, যোগ্য, চরিত্রবান হোক, জয়ের সম্ভাবনা না থাকলে তাকে ভোট দিয়ে কেউ ভোট পচাতে চায় না। দক্ষ দেখে কেউ পক্ষ নেয় না। দুর্বলের পক্ষে লোক পাওয়া দুষ্কর। শক্তিমানকেই সম্মান করতে হয়।

বাঘ-সিংহ মানুষের কোন উপকার করে না। হিংস্র, নরখাদক এদের পরিচয়। তবু বাঘের বাচ্চা, সিংহশাবক বলে মানুষকে সম্মান করা হয়। অথচ সভ্য ভদ্র উপকারী প্রাণী ছাগল উপাধি নিতে কেউ রাজি নয়। ছাগলের বাচ্চা ছাগল খুবই অপ্রিয় গালি। ছাগলের একটাই অপরাধ সে বাঘের মতো কামড়াতে পারে না। মহিষের মতো গুতাতে পারে না।

অবাধ্য ছাগলের মত বৃদ্ধটাকে টানছে ভদ্রলোক। অতি তুচ্ছ ঘটনা। একটু ঘাঁটলেই অনেক সময় জানা যায়, তুচ্ছ ঘটনার পেছনেও সাংঘাতিক ঘটনা রয়েছে। যেমন আজকের দৃশ্যটি

– বাবা, বাড়িতে চল।
– না, আমি যামু না।
– তোমার পায়ে ধরছি, রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করো না। আমার সাথে বাড়িতে চল।
– আমারে ছাড় কইতাছি। আমার লগে জোর দেহাইছ না। আমি যামু না। তুই কি করবি?

ভদ্রলোকের কথায় বিনয় আর বিকশাওয়ালার কণ্ঠে বীরত্ব। সুতরাং ঘটনা তুচ্ছ নয়। রিকশাওয়ালাই এবার পাবলিক সাপোর্ট পাওয়ার যোগ্য। কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় ভদ্রলোককে। পাবলিক রিমান্ড খুবই বিচিত্র।

– এই লোক আপনার কী হয়?
– আমার বাবা।
– আপনার বাবা রিকশা চালায় কেন?
– সে অনেক লম্বা কাহিনী। এটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার। আপনারা বুঝবেন না।

লম্বা কাহিনী বুঝার জন্য টেলিভিশনের অনেক চ্যানেল আছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাহিনী শোনার ধৈর্য নেই কারো। রণে ভঙ্গ দেয় সবাই। এক যুবক বিনীতভাবে প্রশ্ন করে রিকশাওয়ালাকে,

– বুড়া বয়সে রিকশা চালান কোন দুঃখে? পোলার কাছে যান না ক্যান?
– আমি নিজের কামাই খাই। কারো ধার ধারি না। হেরে যাইবার কন? চইলা যান, নইলে অপমান করমু কিন্তু।
– অপমানের আর বাকি রাখছেন কী?
– অহনো জুতা আতে লই নাই। আমার সামনেতে লড়বার কন!

ঘটনা তুচ্ছ বা সাংঘাতিক যাই হোক, ফুটপাথে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ভদ্রলোক গাড়িতে চড়ে চলে যায়। রিকশাওয়ালাও গিয়ে বসে রিকশার সিটে।  বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কোন ক্যামেরাম্যান কাছে থাকলে একটা ইন্টারভিউ নিয়ে ফেলতো। তুচ্ছ বিষয়কে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা যায় টিভির পর্দায়।  গাড়িওয়ালার বাবা রিকশাওয়ালা। একটি আকর্ষণীয় প্রতিবেদন হতে পারতো।

শফিক কোন সাংবাদিক নয়। তবু ইচ্ছে হয় তুচ্ছ ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে লম্বা কাহিনী না শুনে বরং রিকশায় চড়ে বসাই ভালো মনে করে সে।

– কই যাইবেন স্যার?
– পল্টনের দিকে চল।
– ঐদিকে যামু না স্যার। অন্য রিকশায় উডেন।
– তুমি যেদিকে যাবে, সেদিকেই চল।
– কই যাইবেন, না কইলে আমি কই লইয়া যামু?
– যেখানে খুশি যেতে পার। আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলব আর ঘুরব, যা সময় লাগে, আমি ন্যায্য ভাড়া দেবো।
– কতা কওনের লাইগা ঘুরনের দরকার কী? খামাখা প্যাডেল না মাইরা বইয়া থাইয়া শুনি।
– এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই ট্রাফিক পুলিশ ডিসটার্ব করবে। আস্তে আস্তে চালাও কোন একদিকে। ব্যস্ত এলাকা ছেড়ে একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে কথা শুরু করে দু’জন।
– ছেলের ওপর এত রাগ কেন তোমার?
– হেইডা জাই না আপনে কী করবেন? আপনে সাংবাদিক নাকি?
– না, আমি কোন সাংবাদিক নই। তোমাদের পারিবারিক কাহিনী কোন পত্রিকায় ছাপা হবে না। শুধুমাত্র জানার আগ্রহ। আল্লাহ মানুষকে মজলুমের পক্ষে থাকতে বলেছেন। যদিও কাজটা খুব কঠিন। মজলুমের পক্ষে থাকাটা রিস্কি। জালেমের সাপোর্টার তাই বেশি।
– এইডা আমাগো বাপ-পোলার ঝগড়া। এইডা লইয়া বাইরের মাইনষের লগে দেন দরবারের দরকার নাই।
– একজন মুসলমানের কাজ হলো ঝগড়ার মীমাংসা করে দেয়া। ন্যায়ের পক্ষে থাকা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।
– আপনে পারবেন সব ঝগড়াঝাটি মিডাইবার? সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করবার?
– যতটুকু সাধ্যে কুলায়, ততটুকু করাই ফরজ।
– আমার পোলারে কিছু করতে পারবেন?
– যদি জুলুম করে থাকে তবে কিছু শুনিয়ে দিতে পারব। সেকেন্ড ক্লাস মুসলমানের কাজ। কী করে আপনার ছেলে?
– পলিটিকস করে।
– রাজনীতি তো কোন খারাপ কাজ নয়। কেউ দেশ বাঁচায়, মানুষ বাঁচায়। কেউ দিন বদলের জন্য কাজ করে। তাতে দোষের কী আছে?
– আপনেতো খালি দুই দলের কতা কইলেন। দেশে কী আর দল নাই?
– এই দুই দলকেই মানুষ একবার গদিতে বসায় আবার নামায়। আরো অনেক দল আছে। যাক সে কথা।
– আপনার ছেলের মা নাই?
– আছে, পোলার লগে পোলার মা ভালাই আছে। নাতির গু-মুত ধোয়। টিভি দেহে, খায় আর ঘুমায়। পোলায় জায়নামাজ, তছবিছড়া কি না দেয়। সে নামাজ পড়ে রোজা রাহে, জিকির করে। পোলার মায়ও খুশি, পোলাও খুশি।
– শুধু তুমি সব খুশি বাদ দিয়া রিকশা চালাও?
– লেহাপড়া না জানলেও ভালা মন্দ বুঝি। হুজুরে আমারে মাত্র এককান কতা হিগাইছে। হালাল কামাই খাইলে আর এবাদত বন্দেগি করলেই আল্লাহ খুশি। হারাম কামাই খাইয়া, মাইনষেরে কষ্ট দিয়া আখেরাতে কারো রক্ষা নাই।
– অতি উত্তম কথা। শিক্ষিত মানেই গুণী নয়, অশিক্ষিত মানেই মূর্খ নয়। অশিক্ষিতরাও বুদ্ধিমান হয়, শিক্ষিতও বোকা হয়। তুমি বেশ বুদ্ধিমান। তোমার সাথে আমার অনেক মিল আছে।
– বুঝলাম না স্যার, কী কইলেন?
– তুমি যেমন তোমার ছেলের অপরাজনীতি পছন্দ কর না, আমিও আমার বাবার রাজনীতি পছন্দ করি না। তবে আমি তোমার মতো বাড়ি ছাড়ি নাই। আমি তোমার মতো আপসহীন হতে পারিনি। আপসহীন কর্মীর কথা শুনিনি। তুমিই একমাত্র আপসহীন কর্মী।
– এইসব আমি বুঝি টুজি না। গায়ে খাইডা টেহা কামাই। কারো হক মাইরা খাই না। সময় পাইলে একটু আল্লাহবিল্লা করি। কিছু দান খয়রাত করি।
– এই টুকুত্ইে বাজিমাত করে দিয়েছ।
দু’জনের সাথেই বন্ধুত্ব হয়ে যায় শফিকের। রিকশাওয়ালার গল্প করতে খারাপ লাগে না তার।
– চাচা, ছেলের আলিশান বাড়ি ছেড়ে গ্যারেজে থাক, আফসোস লাগে না?
– মোডেই না। ডেলি শ-দেড় শ টেহা কামাই। নিজে রাইন্দা খাই। আল্লাহর রহমতে ভালাই খাই। কত সায়েব দেখলাম বড় বড় চাকরি করে আর হোটেলের মরা মুরগি, পচা-মাছ খায়। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ক্যান্সার এই সব ব্যারামে কোহায়। আমি হারাদিন কাম করি আর হারা রাইত ঘুমাই।
– কথা মিথ্যা বল নাই চাচা। আমার মত সাহেব কী খায় জান? সকালে একটু জুস, দুপুরে একটা টোস্ট, রাতে একটা ডিমের পোজ। এই খেয়ে কি গায়ে বল হয়?
– তাইতো রমজান মাস এলে এদের গ্যাসট্রিক বেড়ে যায়।
আবার সেই মালিবাগ মোড়। সেই যানজট, হট্টগোল, আর একটি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে। পথচারী ও রিকশাওয়ালারা মিলে পাকড়াও করেছে এক কারড্রাইভারকে।
– ব্যাটা নেশা কইরা গাড়ি চালাস নাকি? লাইসেন আছে? কোন সাবের গাড়ি চালাস?
অপরাধ তেমন কিছু নয়। বাম্পারের ধাক্কায় রিকশা কাত হয়ে পড়ে গেছে। কোন প্যাসেঞ্জার ছিল না। রিকশাওয়ালা সামান্য ব্যথা পেয়েছে।
ড্রাইভারদের প্রতি গাড়ির মালিকদের কমন নির্দেশ-
– যেহানে যা লাগে, দিয়া গাড়ি ছুডায়া আনবি। দরকার অইলে ভিকটিমের পাও ধইরা মাফ চাইবি। গাড়ি কোন থানায় ঢুকাইবার দিবি না।
নিজের অভিজ্ঞতা ঠিক মতই কাজে লাগায় ড্রাইভার।
– চাচা, ভুল অইয়া গেছে। মাফ কইরা দেন। রোজা রমজানের দিন। বড়ই ফজিলতের মাস। আমি আপনার পোলার বয়সী মানুষ। ভিড়ের মধ্যে খেয়াল করবার পারি নাই চাচা, এইডা ধরেন চাচা। বউ-ঝি লইয়া ভালা কইরা ইফতার কইরেন। আর দুইদিন রেস্টে থাইহেন। বলে দুইটা একশ টাকার নোট রিকশাওয়ালার সামনে ধরে ড্রইভার।
– তোর চৌদ্দগুষ্ঠিরে এমনিই মাফ কইরা দিচ্ছি। তুই যাইবার পারস।
মালকোচা থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বাইর করে রিকশাওয়ালা।
– এইডা ধর। মৌচাক মার্কেটথে একটা ফাস কেলাস পাঞ্জাবি কিনা তোর সায়েবরে দিবি। কইবি, আপনের বাবায় দিছে। ছোডবেলা পোলারে এক ঈদে পাঞ্জাবি কি না দেবার পারি নাই বইলা রাগ কইরা নামাজে যায় নাই।
– ড্রাইভার অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে রিকশাওয়ালার মুখের দিকে। মনে মনে বলে,
– এ দেখছি ব্যাটাকা বাপ, ঘোড়াকা সিপাই!

SHARE

6 COMMENTS

Leave a Reply