Home স্মরণ একাত্তরের ঈদ

একাত্তরের ঈদ

আবু রূশ্দ

Abu-Rushdবাবা-মার প্রথম ও একমাত্র পুত্র সন্তান হিসেবে তাদের সাথেই আমার শৈশবকাল কাটানোর কথা। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করি নানার বাড়িতে, সেদিন থেকেই নানা-নানীর কাছে বেড়ে ওঠা। আব্বা ছিলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক। যমুনা ব্রিজ হওয়ার আগে ঢাকা-রংপুর যাতায়াত ছিল কষ্টসাধ্য। তাই আব্বা-আম্মা চাইলেই ঢাকায় আসতে পারতেন না। মাঝে মধ্যে তাদের মুখ দেখতাম। শিশু অবস্থায় বাবা-মা কী জিনিস তা বুঝতেও পারিনি। স্মৃতিতে নেই। নানা-নানীর সাথে ঘুমাতাম। তারাই ঈদ এলে ঢাকার বায়তুল মোকাররম বা নিউমার্কেটে নিয়ে গিয়ে জামা কাপড় কিনে দিতেন। দুই মামার কোলে চড়ে ঈদগাহ বা মসজিদে গিয়ে হাজির হতাম নামাজের জন্য। তারপর বাকি দিন কাটতো নানীর আদরে, ১৯৯৯ সালে মারা যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার সে আদরে ভাটা পড়েনি। ১৯৯৫ সালে নিজেই যখন বিয়ে ঠিক করে বিয়ের বন্দোবস্ত করি, বুঝতে পারছিলাম কেউ ততটা খুশি নয় আমার একলা চলো নীতির কারণে, কিন্তু ওই বুড়ো নানীই চীনের প্রাচীরের মতো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে অকস্মাৎ স্বাস্থ্যগত কারণে অবসর গ্রহণের পরও পরিবারের সবার বৈরিতার মুখে তার প্রেরণাতেই আবার উঠে দাঁড়াতে পেরেছি।

যাহোক, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছুদিনের জন্য নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। সম্ভবত মে মাসের দিকে আবার ঢাকায় ফিরে এলাম। বাসা ছিল টিকাটুলীর অভয়দাস লেনে। রাস্তার সোজা শেষ মাথায় বিশাল অট্টালিকা-হোটেল ইলিশিয়াম (ওটি এখন সরকারি অফিসারদের আবাসিক এলাকা)। ওখানে পাক বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। আমাদের ‘পিচ্চি বাহিনী’ ওর ধারে কাছেও যেতাম না। প্রথম দিকে পাহারারত সৈনিকরা দেখলে আমাদের ডাক দিতো। ভয়ে উল্টো ঘুরে দিতাম দৌড়। যুবক দুই মামা সে সময় সরকারি চাকরিতে। ছোট মামা যুদ্ধে যাবেন বলে মনস্থির করেছেন- এসময় একদিন তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল ১৯৭০-৭১ এ সরকার বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে। আব্বা- আম্মা, ছোট্ট শিশু বোন কোথায়, কেমন আছে তার কোন খবর নেই। নানা বহু চেষ্টা করেও তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারলেন না। আমার এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই, অচেনা বাবা-মা’র  জন্য শঙ্কাও জাগেনি মনে! আশপাশের সমবয়সীদের সাথে অভয়দাস লেন চষে বেড়াচ্ছি- সেটাই বড় ব্যাপার। বড় মামা ইংল্যান্ড থেকে ‘পাই’ কোম্পানির একটি ২৪ ইঞ্চি টেলিভিশন নিয়ে এসেছিলেন ১৯৬৯ সালে। সন্ধ্যায় সেই টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। আশপাশের বাসার অনেকে আসতেন টিভি দেখতে। কিছু বুঝি আর না বুঝি ওই ‘জাদুর বাক্স’ আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখতো। শুধু স্মরণ আছে নানী সারাদিন কান্নাকাটি করছেন। এর মাঝে কখন রোজার ঈদ এলো তা এখন আর খেয়াল নেই। বেশ কিছুদিন পর আব্বার একটি চিঠি এলো। সকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। জানা গেল তারা দাদা বাড়ি গাইবান্ধায়। চিরকুমার মেজ চাচা সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। আমাদের জন্য বড় যন্ত্রণা ছিল পাক বাহিনীর যখন তখন, যত্র তত্র রেইড দেয়ার বিষয়টি। প্রায়ই তারা বিনা নোটিশে বাসা বাড়িতে এসে হাজির হতো। স্যুটকেস, আলমারি থেকে সবকিছু চেক করে দেখতো। আতংকিত নানীর পাশে তখন বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। দিন পেরিয়ে যেতো এক এক করে। হঠাৎ একদিন আব্বা, আম্মা ও ছোট বোন এসে হাজির। ইপিআরটিসি’র (বর্তমানে বিআরটিসি) বাসে চড়ে পুরোদিন জার্নি করে এসেছেন। এটি নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। আব্বা-আম্মা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শুনলাম আব্বা কয়েকদিন আগে কলেজে কাজে যোগ দিয়েছেন। তা না করে উপায় নেই। কঠোর সরকারি নির্দেশ। যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না। কী হতে যাচ্ছে তাও তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে অসম্ভব অশান্তিতে যে আছেন তা বুঝতে পারলাম।Eid_5

ক’দিন পরই ঈদুল আজহা। অসম্ভব ধর্মভীরু বাবাকে ওবারই একমাত্র দেখেছি ঈদ নিয়ে তার মধ্যে কোন উৎসাহ নেই। তারপরও তিনি একদিন আমাকে নিয়ে বেরুলেন। বায়তুল মোকাররম মার্কেটে গিয়ে একটি জামা কিনে দিলেন, দেড় বছর বয়সী বোনের জন্যও ফ্রক কিনলেন। সে সময়ই কোনদিন যেন বায়তুল মোকাররমে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পাক আর্মির অফিসারের পরিবারের সদস্যরা বাজার করতে এসেছিলেন। বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দেশের এসব অনিশ্চয়তা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বোঝার মতো বয়স তখনো আমার হয়নি। তবে অবচেতন মনে তার প্রভাব পড়েছিল। তাই সেসময় বয়সে ছোট হলেও এখনো অনেক ঘটনা ছবির মতো মানে পড়ে। ১৯৭১ এর ঈদুল আজহার দিনটিও একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে স্মৃতিতে গেঁথে আছে। সেদিন ছিল ২১ নভেম্বর। সকালে গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিলেন আব্বা। পাজামা পাঞ্জাবি পরে জীবনে প্রথমবারের মতো জন্মদাতা পিতার হাত ধরে ঈদের জামাতের জন্য রওয়ানা হলাম। অভয়দাস লেনের মাথায় হোটেল ইলিশিয়ামের উল্টো দিকের মসজিদে গিয়ে দেখি ভেতরে জায়গা নেই। রাস্তার ওপর নামাজ পড়তে হবে। চারদিকে পাক বাহিনীর পাহারা। অনেককেই চেক করছে। বেশকিছু সৈনিকও পোশাক পরে জামাতে শরিক হয়েছে। আমাদের পাশেই বসেছে কয়েকজন। আমার সে কী ভয়! ওরা যেন মহাকাশের কোন গ্রহের অ্যালিয়েন্স! এখন মনে প্রশ্ন জাগে, ওরাও তো মুসলমান; তাহলে আমাদের ওপর হামলে পড়লো কেন? কী আমাদের অপরাধ ছিল?

যাক সেসব কথা। ওই ঈদের দিনটি যে আমার জীবনে প্রথম বাবা-মা, বোনের সাথে ঈদ ছিল তাই নয়। বড় হয়ে জেনেছি ওই দিনই গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী এক সাথে সেদিন হামলা চালিয়েছিল পাক বাহিনীর ওপর। যশোরের সীমান্তে ভয়াবহ যুদ্ধে পাক বাহিনীর কয়েকটি এম-২৪ ট্যাংক ধ্বংস হয়েছিল। সম্মুখ সমর আসলে শুরু হয়েছিল ২১ নভেম্বর থেকে। এ জন্যই প্রতি বছর সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে বাংলাদেশে ২১ নভেম্বর বিশেষ মর্যাদায় উদযাপিত হয়ে আসছে। ঈদের দিনে পাক বাহিনী কিছুটা ঢিলেঢালা অবস্থায় থাকতে পারে এই বিবেচনা হতেই হয়তো দিনটিকে আক্রমণের মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে মিসর ও সিরিয়াও ইসরাইল আক্রমণ করেছিল ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব-  ইয়ুম কিপ্পুরের দিনে। এজন্য ওই যুদ্ধকে বলা হয় ‘ ইয়ুম কিপ্পুর ওয়ার’। ইসরাইলি সেনারা সেদিন ধারণাও করতে পারেনি আরবরা এতো ভয়াবহ রূপে তাদের দখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধারে অভিযান চালাবে। মিসরীয় বাহিনী সেদিন অকস্মাৎ হামলা চালিয়ে অজেয় ‘ বারলেভ লাইন’ অতিক্রম করে সিনাই মরুভূমিতে এগিয়ে গিয়েছিল, ইসরাইলিরা ছুটে পালিয়েছিল জীবন বাঁচাতে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালনার দিনটিও তাই তাৎপর্যপূর্ণ। এখনো যখন প্রতি বছর ২১ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিই তখন ১৯৭১ এর সেই ঈদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আব্বার সাথে হাত ধরে নামাজে যাওয়ার কথা। অভয়দাস লেনের সেই মসজিদটি এখনো আগের মতোই আছে। বহুবার সেই মসজিদের সামনে গিয়েছি। দাঁড়িয়ে থেকে পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেছি। আজ মাঝ বয়সে এসে চোখ বন্ধ করলে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সেই ঈদের জামাতের দৃশ্য। আব্বা মারা গেছেন বহুদিন হলো, কিন্তু তার সাথে প্রথম ঈদ উদযাপনের সে স্মৃতি রয়ে গেছে, থাকবে আজীবন।

SHARE

3 COMMENTS

  1. ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ছিলো ঈদ। আর সেটা ঈদুল আযহা নয়, ঈদুল ফিতর।

  2. কিশোর কন্ঠের সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি, এই লেখাটি তুলে নিন

    • ধন্যবাদ সুমন ভাই, আপনার কথাটি আমরা কতৃপক্ষের কাছে পৌছে দিচ্ছি।

Leave a Reply to সুমন Cancel reply